জামিয়া আরাবিয়া মিফতাহুল উলুম। শিক্ষানগরী বলে খ্যাত ময়মনসিংহের খ্যাতনামা এক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। মাসকান্দা বাসস্ট্যান্ড থেকে এক কিলোমিটার পশ্চিমে অবস্থিত শিক্ষালয়টি মাসকান্দার ‘চারতলা মাদ্রাসা’ ও ‘মিফতাহুল উলুম’ নামে পরিচিত। এই প্রতিষ্ঠানের পড়াশোনার উন্নতি-অগ্রগতি, মনোরম আবাসন ব্যবস্থাপনা এবং মনোরম প্রাকৃতিক পরিবেশ যে কাউকে মুগ্ধ করে।
দারুল উলুম দেওবন্দের মত ও পথ ধরে ইসলামি শিক্ষার বিস্তার ও দ্বীনের আদর্শ বাস্তবায়নের লক্ষ্যে ১৯৭৬ সালে (১৩৯৬ হিজরি, ১৩৮২ বাংলা) ময়মনসিংহের মাসকান্দার প্রাণকেন্দ্রে প্রতিষ্ঠিত হয় মাদ্রাসাটি, যা বর্তমানে জামিয়া আরাবিয়া মিফতাহুল উলুম, মাসকান্দা, মোমেনশাহী নামে পরিচিত। যদিও এখানে ১৯৩৯ সাল থেকে মরহুম ইলিম মণ্ডলের ওয়াকফ করা ১৩ শতাংশ জায়গায় মসজিদ এবং একটি প্রভাতি মক্তব চালু ছিল। পরে মরহুম আমীর হোসেন তার মা বিবন নেসার নামে মসজিদ লাগোয়া ছাড়ে ৬ শতাংশ জায়গা ১৯৭৬ সালে স্বতন্ত্রভাবে মাদ্রাসার জন্য ওয়াকফ করেন। সেখানে উলামায়ে-কেরাম, গণ্যমান্য ব্যক্তি ও এলাকাবাসীর প্রচেষ্টায় প্রতিষ্ঠিত হয় ‘মিফতাহুল উলুম মাদ্রাসা।’ নানা প্রতিকূলতা মোকাবিলা করে প্রভাতি মক্তব এবং মাদ্রাসা শিক্ষার প্রাথমিক দু-একটি ক্লাস নিয়ে চলতে থাকে ১৯৯৩ সাল পর্যন্ত। ১৯৯৪ সালে হজরত মাওলানা যাকারিয়া, মুফতি আহমদ আলী, হজরত মাওলানা দেলাওয়ার হোসাইন ও হজরত মাওলানা ইসহাক (রহ.) এ প্রতিষ্ঠানে যোগদান করলে মাদ্রাসার কার্যক্রমে প্রাণচাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়। ১৯৭৬ সালে মক্তব আকারে শুরু হওয়া প্রতিষ্ঠানটি বিগত ২০০৬-০৭ ইংরেজি শিক্ষাবর্ষে মাদ্রাসা শিক্ষার সর্বোচ্চ ক্লাস দাওরায়ে হাদিস চালুর মাধ্যমে জামিয়ায় উন্নীত হয়। মাদ্রাসার নামকরণ করা হয় জামিয়া আরাবিয়া মিফতাহুল উলুম।
এই প্রতিষ্ঠানে রয়েছে স্বতন্ত্র তিনটি বিভাগ। হিফজুল কোরআন বিভাগ, মাস্টার্স সমমনা কিতাব বিভাগ এবং উচ্চতর ইসলামি আইন ও গবেষণা বিভাগ। প্রতি বছর বোর্ড পরীক্ষায় একাধিক শিক্ষার্থী মেধাতালিকা অর্জন করে মাদ্রাসার জন্য সুনাম বয়ে এনেছে এবং বোদ্ধামহলের ব্যাপক প্রশংসা কুড়িয়েছে। নিঃসন্দেহে যেকোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের জন্য এটি অত্যন্ত সুখকর বিষয়। ধর্মপ্রাণ মুসলমানদের শরয়ি যেকোনো জিজ্ঞাসা এবং মাসয়ালা সমাধানের জন্য নিবিড়ভাবে কাজ করে যাচ্ছে উচ্চতর ইসলামি আইন ও গবেষণা বিভাগ। এই বিভাগের দায়িত্বে রয়েছেন দেশ সেরা বিজ্ঞ কয়েকজন মুফতি।
পড়াশোনার পাশাপাশি বৈকালিক খেলাধুলায় শরীরচর্চা, সাহিত্য রচনা ও প্রকাশনা, বক্তৃতা ও বিতর্ক প্রতিযোগিতা, কম্পিউটার প্রশিক্ষণ, দাওয়াত ও তাবলিগের কাজসহ প্রভৃতি ব্যবহারিক শিক্ষার উন্নত ব্যবস্থা রয়েছে, যা শিক্ষার্থীদের যোগ্য আলেম এবং দেশের আদর্শ নাগরিক হিসেবে গড়ে তোলে। যারা সময়ের ভাষা বোঝেন এবং সেই ভাষায় কথা বলেন।
পড়াশোনাসহ প্রতিষ্ঠানের সার্বিক উন্নয়নে অধ্যক্ষ মাওলানা দেলাওয়ার হোসাইন অত্যন্ত দক্ষতা ও বিচক্ষণতার সঙ্গে বিভিন্ন কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করছেন এবং এই বিষয়ে শিক্ষকমণ্ডলী ও কর্মচারীদের গভীরভাবে প্রণোদনা জুগিয়ে যাচ্ছেন। এই প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে এলাকাবাসীসহ দেশের ধর্মপ্রাণ মুসলমানদের রয়েছে গভীর সম্পৃক্ততা। মূলত তাদের ভালোবাসা ও আন্তরিকতাই প্রতিষ্ঠানটির চালিকাশক্তি। মহান আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন, মানুষের প্রতি মানুষের ভ্রাতৃত্ববোধ বৃদ্ধি, ইসলামচর্চাকে ব্যাপকভাবে জোরদার করা এবং ইসলামের শান্তি বাণী ছড়িয়ে দেওয়াই প্রতিষ্ঠানটির প্রধান লক্ষ্য।
আগামী ৬ ফেব্রুয়ারি এই প্রতিষ্ঠানের শিক্ষাবর্ষের সমাপ্তি উপলক্ষে বিশেষ অনুষ্ঠানে আয়োজন করা হয়েছে। অনুষ্ঠানে তিন বিভাগের বিদায়ী শিক্ষার্থীদের বিশেষ সম্মাননা প্রদানসহ বোখারি শরিফের সর্বশেষ হাদিস পাঠদান করা হবে। বোখারি শরিফের সর্বশেষ হাদিস পাঠদান করবেন উপমহাদেশের বিখ্যাত বিদ্যাপীঠ দারুল উলুম দেওবন্দের মজলিসে শুরার সদস্য মাহমুদ হাসান রাজস্থানী।