লিচু উৎপাদনে দেশের অন্যতম জেলা দিনাজপুর। এ জেলায় উৎপাদিত লিচু দেশ ও বিদেশে সরবরাহ করা হয়। লিচুগাছে মুকুলের শিষ বের হওয়ার সময় চলছে এখন। কিন্তু দিনাজপুরের অধিকাংশ লিচুগাছে মুকুলের শিষের পরিবর্তে নতুন পাতা বের হয়েছে, যা কৃষকদের ভাবিয়ে তুলছে। কারণ নতুন পাতা বের হলে ওই গাছে লিচু ধরবে না। অনেক চাষি বাধ্য হয়ে বিষ দিয়ে নতুন পাতা পুড়িয়ে ফেলছেন। তাদের অভিযোগ, কয়েক বছর ধরে গাছগুলোতে মুকুলের শিষ আসার পরিবর্তে নতুন পাতা বের হলেও কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের এ ব্যাপারে কোনো মাথাব্যথা নেই। এমনকি চাষিদের সঙ্গে কথা বলে পরামর্শ দেওয়ার জন্য মাঠে পর্যন্ত যান না কর্মকর্তারা। ফলে এ বছর নতুন পাতা বের হওয়ার হার অনেক বেড়েছে। চাষিদের অভিযোগ অস্বীকার করে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক জানান, কৃষকদের সমস্যা সমাধানে মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তারা কাজ করছেন।
দিনাজপুর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, গত বছর এই জেলায় ৫ হাজার ৪৮০ হেক্টর জমি থেকে ৩১ হাজার ৭৯০ মেট্রিক টন লিচু উৎপাদন হয়েছিল। এ বছর আবাদ হচ্ছে ৫ হাজার ৪৮৫ হেক্টর জমিতে। ১৩ হাজার ৯৯১টি বাগানে এসব লিচুর আবাদ হচ্ছে।
জেলা সদরের পুলহাট, মাশিমপুর, শিকদারহাট, সৈয়দপুর, উলিপুর গ্রামে সবচেয়ে বেশি লিচুর ফলন হয়। সরেজমিনে এসব এলাকার কয়েকটি লিচুবাগান ঘুরে দেখা গেছে, অধিকাংশ গাছে মুকুলের শিষ বের হওয়ার পরিবর্তে নতুন পাতা বের হচ্ছে। সৈয়দপুর গ্রামের চাষি সাইদুর রহমান নিজের বাগানের নতুন পাতা বিষ প্রয়োগ করে পুড়িয়ে দিয়েছেন।
এ বিষয়ে তিনি বলেন, ‘আমার বাগানে মোট ৮০টি বেদেনা লিচুর গাছ রয়েছে। বাগানের অধিকাংশ গাছে বর্তমানে নতুন পাতার কুশি বের হচ্ছে। তাই আমি আমার বাগানে গবেষণা চালাচ্ছি। গাছের নতুন পাতা নষ্ট করার জন্য একটা ওষুধ ব্যবহার করেছি। এতে কুশি পুড়ে গেছে। এখন এরপর যদি মুকুলের শিষ বের হয়। মুকুল হলে লিচু ধরার সম্ভাবনা রয়েছে।’
তিনি অভিযোগ করে বলেন, ‘আমরা এত সমস্যার মধ্যে আছি, কিন্তু কৃষি কর্মকর্তারা কোনো দিন আমাদের কাছে আসে নাই। তারা কী ধরনের কাজ করে, তাও আমরা জানি না।’
দক্ষিণ উলিপুর গ্রামের চাষি মোজাফ্ফর হোসেন বলেন, ‘নতুন পাতার কারণে আমরা চিন্তায় পড়ে গেছি। কারণ নতুন পাতায় লিচুর মুকুল বা লিচু ধরে না। আমি বাগানের পাশাপাশি এই এলাকার বেশ কয়েকটি লিচুবাগান থেকে লিচু সংগ্রহ করে বিভিন্ন জেলায় সরবরাহ করি। প্রতিটি বাগানের একই অবস্থা। অনেক টাকা দিয়ে বাগান নিয়েছি। ফল না পেলে অনেক ক্ষতি হবে।’
একই এলাকার চাষি আবদুল হামিদ বলেন, ‘বাংলাদেশে পাট, গম, ধান, ভুট্টাসহ বিভিন্ন ফসলের গবেষণাগার স্থাপন করা হলেও লিচুর গবেষণাগার স্থাপন করা হয়নি। অবিলম্বে দেশে লিচু গবেষণাগার স্থাপনের দাবি জানাই।’
উদ্ভিদবিদ মোসাদ্দেক হোসেন বলেন, ‘কয়েক বছর ধরে দিনাজপুরের লিচুর বাগানগুলোতে ক্রমাগতভাবে ফলন কমে আসছে। এটা যে বৈশি^ক জলবায়ুর প্রভাব তা একপ্রকার স্পষ্ট হয়ে আসছে। এটি ক্রমাগত আরও বাড়তে পারে। এ বিষয়টি নিয়ে গবেষণার মাধ্যমে করণীয় ঠিক করতে হবে।’
দিনাজপুর আঞ্চলিক কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত পরিচালক শাহ আলম বলেন, ‘এ বছর দিনাজপুরে বৃষ্টিপাত খুব কম হয়েছে। আবহাওয়ার কারণে অন্যান্য বছরের তুলনায় লিচুর মুকুলের পরিবর্তে নতুন কুশি বের হচ্ছে বেশি। তাই এ বছর লিচুর ফলন কম হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তারপরও আমরা কৃষকদের নানাভাবে পরামর্শ দিয়ে যাচ্ছি।’
