রোববার, ২৩ জুন ২০২৪, ৯ আষাঢ় ১৪৩১
দেশ রূপান্তর

পঞ্চাশ পেরিয়ে বাংলা ব্যান্ড

আপডেট : ২৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৩, ০৬:৩৭ এএম

স্বাধীনতার পর থেকে এখন পর্যন্ত বাংলাদেশে যে কটি বিষয় নিয়ে তারুণ্যের উচ্ছ্বাস খুব বেশি লক্ষ করা গেছে তার মধ্যে ব্যান্ডসংগীত অন্যতম। মূলত সারা বিশ্বেই তারুণ্যের উদ্দীপনার আরেক নাম ব্যান্ড। আমাদের দেশে ব্যান্ডসংগীতের শুরুটা হয়েছিল ষাটের দশকে। সেন্ট গ্রেগরি স্কুলের ফজলে রব গিটার কিনে বন্ধুদের সঙ্গে নিয়ে শুরু করেছিলেন এই যুদ্ধ। ব্যান্ডের নাম ছিল ‘আইওলাইটস’, যার পরে নাম পাল্টে হয়েছিল ‘উইন্ডি সাইড অব কেয়ার’।

সেই ষাটের দশকেই আরও ছিল লাইটেনিংস, র‌্যাম্বলিং স্টোন, জিংগাসহ আরও গোটা দশেক ব্যান্ড। ঢাকায় আমেরিকান দুটি স্কুল ব্যান্ডও ছিল এর মধ্যে। এরা কিন্তু তখন কেউ বাংলায় গান গাইত না। সবাই তাদের প্রিয় ইংরেজি গানগুলো কাভার করত। তখন আসলে ব্যান্ড সীমাবদ্ধ ছিল নির্দিষ্ট একটি গণ্ডির মধ্যে। মূলত কয়েকটি হোটেলে শো হতো।

এরপর স্বাধীনতার পর এলেন একজন আজম খান। আজম খান এবং তার ব্যান্ড উচ্চারণ সত্তরের দশকে এক বিপ্লবের নাম। যার গানে উঠে এসেছিল মানুষের হৃদয়ের কথা। আজম খান এবং সেই সত্তরের দশকের ব্যান্ডগুলো বাংলায় গান গেয়ে পাড়া-মহল্লার বিভিন্ন অনুষ্ঠানে মাতিয়ে রাখত। বলতে গেলে বাংলা মৌলিক গানের সঙ্গে পাশ্চাত্য সংগীতের মেলবন্ধন রচনা করেছিলেন আজম খান।

এরপর এই রাস্তা ধরেই একে একে জন্ম নিয়েছিল সোলস, ফিডব্যাক, ফিলিংস, মাইলস, এলআরবির মতো ব্যান্ড। মূলত সেই সময়টায় বাংলাদেশের ব্যান্ডসিন হেলে ছিল পপ মিউজিকের দিকে। সেই অবস্থায় দাঁড়িয়ে সে সময় নতুন গঠন হওয়া ব্যান্ডগুলো চেষ্টা করেছিল ভিন্ন ধরণের সাউন্ড শ্রোতাদের কানে পৌঁছে দিতে। অর্থাৎ আধুনিকভাবে উপস্থাপন করার একটা তাড়না তাদের ছিল। তাই সত্তর-আশির দশকের সেই পপ ব্যান্ডগুলোই পরবর্তী সময়ে রক, জ্যাজ, ব্লুজের মতো জনরাতেও গান করা শুরু করেছিল। এ সময়টাতেও জেমস কিংবা আইয়ুব বাচ্চু অতটা জনপ্রিয় হননি। তবে তখনই তাদের ব্যক্তিগত নৈপুণ্য গোটা ব্যান্ডের পরিচয়ের বাইরে তাদের আলাদা স্থান ছিল এরই মধ্যে।

image

সে সময় সেই আশির দশকে কিছু হারানোর ঘটনাও ঘটেছিল। বাংলা ব্যান্ডের ইতিহাসে প্রথম কোনো বড় ধাক্কা ছিল হ্যাপী আখান্দের মৃত্যু। আবার বাংলাদেশের প্রথম গিটার সেনসেশন, আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে পরিচিতি পাওয়া প্রথম গিটারিস্ট, আইয়ুব বাচ্চুদের প্রজন্মের গিটার শেখার অনুপ্রেরণা সেই নয়ন মুন্সীও মারা গিয়েছিলেন আশির দশকেই।

এই আশির দশকেই আবার পৃথিবীজুড়ে সাংগীতিক এক পরিবর্তনের হাওয়া বয়েছিল। বাংলাদেশে এর ছোঁয়া লাগে মোটাদাগে রকস্ট্রাটা, ওয়ারফেজের হাত ধরে। রক থেকে এলো হার্ডরক, অন্যদিকে হেভি মেটাল। মাথাভর্তি লম্বা চুল, জিনস-টি-শার্টে হাতে গিটার, বেজ ও ড্রামস। ওয়ারফেজ বাংলাদেশে প্রথম হার্ড রক ও হেভি মেটাল মিউজিকের অ্যালবাম প্রকাশ করেছিল। আমাদের তরুণসমাজ যারা একসময় বিদেশি ব্যান্ডের হার্ড রক জনরার গান শুনত, তারা এই প্রথম বাংলা ভাষায় তাদের প্রিয় জনরার গান শুনতে পেরেছিল।

এরপর সেই নব্বইয়ের দশক। বাংলা ব্যান্ডের সোনালি দিন। নগরবাউল জেমস, আইয়ুব বাচ্চু তখন সারা দেশে তুমুল জনপ্রিয়তা পাচ্ছে। দেশের আনাচে-কানাচে তারা পৌঁছে যাচ্ছে তাদের গান দিয়ে। আর্ক, নোভার মতো ব্যান্ডরা তারুণ্যের উন্মাদনায় ভর করে তখন নিয়মিত গান বের করতে শুরু করে। এ ছাড়া আরও অনেক ব্যান্ডের কথাই আসলে বলা যায় যারা তখন বেশ জনপ্রিয় ছিল। এর আগে কিন্তু বরাবরই ব্যান্ডসংগীতকে অপসংস্কৃতি বলা হতো। নব্বইয়ের দশকে এই দৃষ্টিভঙ্গিটি খানিকটা হলেও বদলায়। ক্যাসেটের সেই যুগে ব্যান্ডের অ্যালবাম, মিক্সড অ্যালবাম বিক্রির রেকর্ড মাইলফলক স্পর্শ করে। তখন ব্যান্ডের সদস্য যারা সংগীত পরিচালনা করতেন তারাও ব্যস্ত হয়ে পড়েন। এটি একটি যুগান্তকারী ঘটনা। চলচ্চিত্র কিংবা প্রথাগত মিউজিশিয়ানদের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে কাজ করে চলেছেন আইয়ুব বাচ্চুর মতো ব্যান্ডশিল্পীরা। তবে আশির দশকে যাদের লড়াইয়ের গল্প ছিল তারাই মূলত নব্বইয়ে এসে জনপ্রিয়তা অর্জন করেছিল।

এরপর অর্থহীন, আর্টসেল, দলছুট, শিরোনামহীন, বাংলা, ব্ল্যাক, ক্রিপটিক ফেইটের মতো ব্যান্ডগুলোর গল্প। এরা সবাই নিজেদের আলাদা আলাদা সাউন্ড দিয়ে আমাদের নতুন কিছু শোনার সুযোগ তৈরি করে দিয়েছে। নতুন দিনের বাংলা গানে এরা সবাই যার যার মতো করে নিজেদের উপস্থাপন করেছে। ফলে অনেকগুলো ব্যান্ডই এখনো তুমুল জনপ্রিয়। কিংবা এরপরের সময়কার চিরকুট, আর্বোভাইরাস, মেঘদল কিংবা জলের গান; যারা সবাই সক্রিয় থেকে পরবর্তী সময়ে নিজেদের প্রমাণ করেছে। ভিন্ন ভিন্ন আঙ্গিকে তারা নিজেদের মতো করে নিজেদের জনরাতে গান করে চলেছেন। আবার যদি এই সময়কার নতুনদের মধ্যে জনপ্রিয় ব্যান্ড হিসেবে বলি তাহলে এখানে এভোয়েড রাফা, অ্যাশেজ, সোনার বাংলা সার্কাস, কার্নিভ্যালের নাম বিশেষভাবে উল্লেখ করতে হয়। এই ব্যান্ডগুলো এখন তুমুল জনপ্রিয়। আমাদের দেশে রক মিউজিক নিয়ে যে কতটা উন্মাদনা সেটা আসলে বোঝা যাবে কনসার্টগুলোতে গেলে। বাংলা রকের সব তেজি ঘোড়ারা সেখানে পারফর্ম করছে। সামনে হাজার হাজার মানুষ টিকিট কেটে সেটা উপভোগ করতে এসেছে। আশার কথা এখন আমাদের দেশে সব ধরনের গান হচ্ছে, এক্সপেরিমেন্ট হচ্ছে। গানের নতুন জোয়ারে ভেসে যাচ্ছে সময়। আমাদের দেশের ব্যান্ডগুলো নিয়মিত বিদেশের মাটিতে যাচ্ছে গান গাইতে। অনেক নতুন ব্যান্ড অনেক ভালো করছে।

তবে আমাদের কিছু হারানো নক্ষত্র আছে যারা আজ বেঁচে নেই, তাদের কথা আমাদের বিশেষভাবে স্মরণ করা উচিত, যাদের দেখে লাখো তরুণ হাতে তুলে নিয়েছে গিটার, গাইছে গলা খুলে। আজম খান, আইয়ুব বাচ্চু, নিলয় দাস, নয়ন মুন্সী, হ্যাপী আখান্দ, শেখ ইশতিয়াক, সঞ্জীব চৌধুরীদের মতো স্তম্ভ যাদের ওপর ভর করে বাংলা ব্যান্ডসংগীত আজ এতটা জনপ্রিয়। এরা তাদের গানে বেঁচে থাকবেন আজীবন, বেঁচে থাকবেন নতুন নতুন ব্যান্ডের মধ্যে ছায়া হয়ে।

   
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত আলোচিত