একজন গিটারসাধক

আপডেট : ২৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৩, ০৬:৫২ এএম

ওস্তাদ নিয়াজ মোহাম্মদ চৌধুরী তাকে ভালোবেসে ডাকতেন গিটারসাধক। নিও ক্লাসিক্যাল এ গিটার মায়েস্ত্রোর প্রয়াণের ১৭ বছর পেরিয়ে গেলেও আজও তিনি অমলিন। আজও তার নান্দনিক বাদনশৈলী মুগ্ধ করে বোদ্ধা থেকে শ্রোতাদের।

১৯৬১ সালে জন্ম তার। সেপ্টেম্বরের শেষ দিনটিতে। তবে তিনি শুধু গিটার বাদক ছিলেন না, একাধারে ছিলেন গায়ক, সুরকার, সংগীত পরিচালক এবং অবশ্য অবশ্যই একজন জনপ্রিয় ও অভিজাত গিটারশিক্ষক। আশির দশকে গিটার শিখেছেন অথচ তার দূর বা নিকট সান্নিধ্য পাননি এমন গিটারপ্রেমিক মেলা ভার।

সে সময় তার কাছে শিখেছেন এবং পরে জনপ্রিয়তা পেয়েছেন এমন গিটাররিস্টদের তালিকা করলে সেটা অনেক বড় হয়ে যাবে। তবে দু-একজনের নাম না বললেই নয়। এরা সরাসরি আর ছাত্র ছিলেন বা তার সঙ্গে বাজাতে বাজাতে শিখেছেন। এদের মধ্যে আছেন অর্থহীন ব্যান্ডের সুমন (বেজবাবা সুমন প্রথমে একজন গিটারিস্ট, পরে বেজিস্ট), বাপ্পা মজুমদার, পার্থ বড়ুয়া অন্যতম। বর্তমান বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় গিটারিস্ট ওয়ারফেজ ব্যান্ডের ইব্রাহিম আহমেদ কমলও তার সঙ্গে বাজাতে বাজাতে গিটার শিখেছেন।

এ ছাড়াও এখনকার সময়ের প্রথম সারির ব্যান্ড হিসেবে যাদের ধরা হয়, সেসব ব্যান্ডের অনেক গিটারিস্টই প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে নিলয় দাসের হাত ধরে উঠে এসেছেন।

তিনি নিলয় দাস। বাংলাদেশের আরেক গিটার কিংবদন্তি প্রয়াত আইয়ুব বাচ্চু তার সম্পর্কে আফসোস করে বলেছিলেন, ‘ওর (নিলয় দাস) মতো করে এখন পর্যন্ত বাংলাদেশে আর কেউ গিটার বাজাতে পারে না। হি ইজ দ্য ওয়ান অ্যান্ড অনলি নিউ ক্ল্যাসিক্যাল গিটারিস্ট, গিটার প্লেয়ার। আনফরচুনেটলি বাংলাদেশ ওকে হারিয়েছে বা আমরা হারিয়ে ফেলেছি।’

ঢাকায় জন্ম নিলয় দাসের। বন্ধু ও ক্ষণজন্মা হ্যাপি আখন্দের পরামর্শেই গিটার হাতে তুলে নেন তিনি। এর পরেরটা ইতিহাস। একসময় নিজেই হয়ে ওঠেন প্রতিষ্ঠান।

১৯৮৮ সালের দিকে নিলয় দাস সংগীতাঙ্গনে বেশ পরিচিতি লাভ করেন। ধীরে ধীরে তিনি শুরু করলেন নিজের একক অ্যালবামের কাজ। গীতিকার কাউসার আহমেদ চৌধুরীর লেখা এবং বাংলাদেশের অন্যতম সুরকার ও সংগীত পরিচালক ফুয়াদ নাসের বাবুর সংগীত আয়োজনে সারগামের ব্যানারে প্রকাশিত হয় তার প্রথম একক অ্যালবাম ‘কত যে খুঁজেছি তোমায়’। এরপর ১৯৯২ সালে দ্বিতীয় অ্যালবামের কাজে হাত দেন। বাংলাদেশের আরকেজন গুণী সংগীতশিল্পী আশিকুজ্জামান টুলুর সংগীত পরিচালনায় ‘বিবাগী রাত’ প্রকাশিত হয়।

নিলয় দাস সংগীতজীবনের সেরা সময় ছিল নব্বইয়ের দশকে। এ সময় তিনি ‘দ্য জেনমস’ ও ‘ট্রিলজি’ নামের দুটি ব্যান্ডের সঙ্গে গিটার বাজান। ‘ট্রিলজি’ ব্যান্ডটি জনপ্রিয়তা পায় এবং তার এর মাধ্যমেই তার অসাধারণ গিটার বাদনের সঙ্গে পরিচিত হতে শুর করে শ্রোতারা।

তার হাত ধরেই বাংলাদেশে প্রথম ইন্সট্রুমেন্টাল কনসার্ট ব্যাপক প্রশংসা পায়। নিয়মিত শিল্পকলা একাডেমির মঞ্চে অনুষ্ঠিত হতো। একসময় বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির গিটার শিক্ষক পদে যোগ দেওয়ার প্রস্তাব পান তিনি। আর এ সুযোগ পেয়ে তিনি ভারতীয় উপমহাদেশের বিশিষ্ট সংগীতব্যক্তিত্ব গোলাম আলী, মেহেদী হাসানসহ আরও অনেক গুণীজনের সঙ্গে গিটার বাজানো এবং তাদের সান্নিধ্য পাওয়ার সুযোগ লাভ করেন।

বন্ধু হ্যাপি আখন্দকে স্মরণীয় রাখতে নিলয় প্রতিষ্ঠা করেন ‘হ্যাপি স্কুল অব মিউজিক’। বাংলাদেশের অনেক গিটারিস্ট, সংগীতশিল্পী এবং সংগীত পরিচালক এ মিউজিক স্কুল থেকে শিক্ষালাভ করে সংগীতজগতে প্রবেশ করেন। তবে একসময় ভীষণ অভিমানী হয়ে ওঠেন তিনি। মুখ ফিরিয়ে নেন সংগীতজগৎ থেকে। ১৯৯২ সালের পর মোটামুটি নীরবই হয়ে যান এ অসম্ভব প্রতিভাবান গিটার মায়েস্ত্রো।

২০০৬ সালের ১১ জানুয়ারি চট্টগ্রামের সেন্টার পয়েন্ট হাসপাতালে রাত ৯টার সময় বাংলাদেশের এ গিটারসাধকের প্রয়াণ ঘটে। সেই সঙ্গে পর্দা নামে এক অসাধারণ সংগীতযাত্রার।

লেখা : ইমরোজ বিন মশিউর

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত