দেশমাতৃকার প্রতিশব্দ যিনি

আপডেট : ১২ মে ২০২৩, ০১:৩০ এএম

জাহানারা ইমামের অনেক পরিচয়। তিনি প্রখ্যাত শিশুসাহিত্যিক, শিক্ষক, সাংস্কৃতিক অঙ্গনের পরিচিত মুখ, একাত্তরের ঘাতক দালালবিরোধী আন্দোলনের নেত্রী। কিন্তু তার সব পরিচয়কে ছাপিয়ে যে পরিচয়ে সবার মনে চিরজাগরূক হয়ে আছেন তা হলো, শহীদ জননী। স্বাধীনতার প্রতিশব্দ হয়ে ওঠা এই মহীয়সীকে নিয়ে লিখেছেন এনাম-উজ-জামান বিপুল

জাহানারা ইমাম জন্মগ্রহণ করেন ১৯২৯ সালের ৩ মে, পশ্চিমবঙ্গের মুর্শিদাবাদে। দেশ বিভাগের পর তিনি সপরিবারে পূর্ব বাংলায় (পরে পূর্ব পাকিস্তান) চলে আসেন। ততদিনে লেডি ব্র্যাবোর্ন কলেজ (কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়) থেকে তিনি বিএ পাস করেছেন, বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হয়েছেন। ঢাকায় এসে বিএড ডিগ্রি অর্জন করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে। যুক্তরাষ্ট্র থেকে সার্টিফিকেট ইন এডুকেশন ডিগ্রি অর্জন করেন ফুলব্রাইট স্কলারশিপ নিয়ে। শিক্ষকতা পেশা নিয়ে কাজ করার লক্ষ্যেই শিক্ষা বিষয়ে উচ্চশিক্ষা নিয়েছিলেন। অর্জিত শিক্ষাকে কাজে লাগাতে যোগ দিয়েছিলেন সিদ্ধেশ্বরী বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়, বুলবুল একাডেমি কিন্ডারগার্টেন এবং ঢাকার টিচার্স ট্রেনিং কলেজে।

জাহানারা ইমাম ছিলেন ঊনসত্তরের গণ-আন্দোলনের একজন সক্রিয় কর্মী। একাত্তরের মার্চে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী ঢাকায় গণহত্যা শুরু করলে অন্যদের মতো তারা ঢাকা ত্যাগ করেননি। যার একটি কারণ ছিল তার অতিবৃদ্ধ শ্বশুরের (নব্বই বছর বয়সী) এক স্থান থেকে আরেক স্থানে যাওয়া-আসার মতো শারীরিক সক্ষমতা ছিল না। আরেকটি কারণ ছিল তিনি, তার স্বামী শরীফ ইমাম, সন্তান রুমী, জামী তাদের পরিচিতদের সহযোগিতায় মুক্তিযোদ্ধাদের অর্থ, তথ্য ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় জিনিস সরবরাহ করছিলেন। মুক্তিযুদ্ধের সময় গেরিলা সদস্যরা তাদের বাসায় আশ্রয় নিতেন। মুক্তিযুদ্ধের সময় তার বড় ছেলে মুক্তিযুদ্ধে যোগদান করতে চাইলে মা হিসেবে সন্তানের অকল্যাণ আশঙ্কায় মানা করতে চাইলেও মুক্তিযোদ্ধাদের সহযোগীদের একজন হিসেবে তিনি মানা করতে পারেননি। ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজে ভর্তি হওয়া রুমী ক্লাস শুরুর অপেক্ষায় ছিলেন। ছেলের যুক্তিপূর্ণ কথায় পরাজিত হয়ে তাকে মুক্তিযুদ্ধে যোগদানের অনুমতি দেন তিনি। ছেলে রুমীর মুক্তিযুদ্ধে যোগদান এবং মুক্তিযোদ্ধাদের সহযোগিতার অপরাধে তার স্বামী শরীফ ইমামকে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ধরে নিয়ে যায়। সন্তান রুমী আর ফিরে আসেননি, স্বামীও পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর হাতে মৃত্যুবরণ করেন। মুক্তিযুদ্ধ ফেরত রুমীর মুক্তিযোদ্ধা বন্ধুরা তাকে আম্মা নামে ডাকতে শুরু করেন। জাহানারা ইমাম হয়ে ওঠেন সব মুক্তিযোদ্ধার মা, শহীদ রুমীর জননী হিসেবে পরিণত হন ‘শহীদ জননী’ হিসেবে। তিনি আক্ষরিক অর্থেই মুক্তিযোদ্ধাদের নিজের সন্তান হিসেবে গ্রহণ করেছিনে। তার লেখা থেকে জানা যায়, একাত্তরের ঈদে তার স্বামী সন্তান ঈদের নামাজ পড়তে যাননি, ঘরের পর্দা পরিষ্কার করেননি কিন্তু রান্না করেছিলেন সেমাই, পোলাও, কোর্মা, কাবাব। তিনি আশা করছিলেন যদি কোনো মুক্তিযোদ্ধা আসে এই ঈদের দিনে, স্বজনহীন এই ঈদের দিনে যেন সেই মুক্তিযোদ্ধা ঈদের সেমাই বঞ্চিত না হয় সে কথা চিন্তা করেই রান্না করেছিলেন সে ঈদের খাদ্য। এই মমতাই তাকে পরে দেশের সব তরুণের জননী করে তোলে। 

জাহানারা ইমামের রাজনৈতিক জীবন শুরু হয় স্বাধীনতাবিরোধী ঘাতক-দালালদের রাজনৈতিক পুনর্বাসনের প্রতিক্রিয়া হিসেবে। যে মুক্তিযুদ্ধের সহযোগী হওয়ার অপরাধে তার স্বামীকে হত্যা করা হয়েছে, যে মুক্তিযুদ্ধে তার সন্তান শহীদ হয়েছে সেই মুক্তিযুদ্ধবিরোধীদের পুনর্বাসন তিনি মেনে নিতে পারেননি। তিনি বিভিন্ন সভা-সমিতিতে বক্তৃতা করে এবং লিখে সচেতনতা গড়ে তোলার চেষ্টা করেন। ১৯৯২ সালে একাত্তরের ঘাতক-দালাল নির্মূল কমিটি গঠিত হয় এবং তিনি আহ্বায়ক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তার আহ্বানে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের সব বরেণ্য বুদ্ধিজীবী, সংস্কৃতিকর্মী, রাজনৈতিক দল ও কর্মীরা, দেশপ্রেমিক তরুণ সমাজ এবং প্রজন্ম ’৭১ এগিয়ে আসেন এবং মুক্তিযুদ্ধবিরোধীদের বিরুদ্ধে গণআদালত গঠন করেন। এ ধরনের ‘পাবলিক ট্রায়াল’-এর আয়োজন করেছিলেন দার্শনিক বার্ট্রান্ড রাসেল। তিনি ভিয়েতনাম যুদ্ধে নিরীহদের হত্যার বিচারের দাবিতে এই ‘পাবলিক ট্রায়াল’-এর আয়োজন করেছিলেন। সেই একই আদলে গণআদালত গঠন করে বিচারের আয়োজন করে জাতীয় সমন্বয় কমিটি। লাখো জনতাসহ জাহানারা ইমাম ১৯৯২ সালের ১২ এপ্রিল গণআদালতের রায় কার্যকর করার দাবিতে তৎকালীন সরকার ও বিরোধী দলের কাছে স্মারকলিপি পেশ করেন। জাহানারা ইমামের নেতৃত্বে সারা দেশে গণস্বাক্ষর, গণসমাবেশ, মানববন্ধন, অবস্থান ধর্মঘট, মহাসমাবেশ ইত্যাদি কর্মসূচি পালন করা হয়। এমনকি বিদেশেও গঠিত হয় নির্মূল কমিটি, হয় ব্যাপক আন্দোলনও। এর ফলে একাত্তরের যুদ্ধাপরাধীদের বিচার দাবির আন্দোলনকে সমর্থন দেয় ইউরোপীয় পার্লামেন্ট। মূলত গণআদালত ছিল স্বাধীনতাবিরোধী চক্রের অপকর্মের বিরুদ্ধে একটি প্রতীকী প্রতিবাদ। এর প্রভাব ছিল সুদূরপ্রসারী। জনমনে সোনার বাংলার (বাংলাদেশের) প্রতিশব্দ হিসেবে ধ্বনিত হতে থাকে জাহানারা ইমামের নাম। সংগীতশিল্পী জেমসের গানের পঙ্ক্তিতে ধরা পড়ে সেই প্রতিধ্বনি, তুমি (সোনার বাংলা) ছেলেহারা মা, জাহানারা ইমামের একাত্তরের দিনগুলি। এই গণআদালতই ছিল মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারের প্রেরণা। ২০১৩ সালে মানবতাবিরোধী অপরাধের সর্বোচ্চ শাস্তির দাবিতে যে গণজাগরণ মঞ্চ গড়ে ওঠে সেখানেও প্রেরণার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলেন শহীদ জননী জাহানারা ইমাম এবং তার সংগ্রামী আদর্শ। এভাবেই শহীদ রুমীর মা জাহানারা ইমাম প্রথমে সব মুক্তিযোদ্ধার মা এবং মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বাস্তবায়নের আন্দোলন সংগ্রামের মধ্য দিয়ে দেশমাতৃকার প্রতিশব্দরূপে স্থান পেয়েছেন দেশের তরুণ প্রজন্মের মনে। দেশের স্বাধীনতার মর্যাদা সমুন্নত রাখতে যারা কাজ করে চলেছেন তাদের মননে তিনি অনুপ্রেরণা হয়ে থাকবেন চিরকাল। 

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত