মশায় মশকরা নয়, প্লিজ

আপডেট : ০৪ সেপ্টেম্বর ২০২৩, ১০:২০ পিএম

চরম ধকল-ভোগান্তি শেষে মানুষ কলেরায় জিতেছে। মহামারী করোনাকেও কাবু করেছে। করোনা-কলেরা জেতা মানবকুল এখন ডেঙ্গুতে কাহিল। ধরন এবং ব্যাপকতা বিবেচনায় করোনার চেয়ে বিধ্বংসী নয় ডেঙ্গু। কিন্তু গত কদিন ধরে এতে মৃত্যু ও আক্রান্ত রেকর্ড গড়ে চলছে। ডাক্তার-নার্সরাও অসহিষ্ণু হয়ে উঠেছেন। চিকিৎসাসেবা দিচ্ছেন, রোগী ও স্বজনদের সঙ্গে দুর্ব্যবহারও করছেন। এমন আজাবের দিনে কয়েকজন ডাক্তার আবার সাংবাদিকদের ওপর হামলেও পড়ছেন। শিশুসন্তানকে ভর্তি করতে গিয়ে চিকিৎসক ও হাসপাতালের কর্মীদের হাতে মারধরই নয়, পুলিশের কাছে সোপর্দ, মামলার আসামি হয়ে আদালত থেকে জামিন পর্যন্ত নিতে হয়েছে এক অভিভাবককে। প্রথম ঘটনাটি বরিশালে শেরেবাংলা মেডিকেলে। দ্বিতীয়টি রাজধানী ঢাকার মুগদা জেনারেল হাসপাতালে। 

ডেঙ্গু চিকিৎসায় যে ডাক্তার-নার্সদের গলদঘর্ম অবস্থা তা বলার অপেক্ষা রাখে না। এটি করোনার সময়ের চেয়ে বেশি কিনা, সেই তুলনা করাও সমীচীন নয়। ডেঙ্গু জ¦রের অব্যাহত প্রকোপে রাজধানীর হাসপাতালগুলোতে রোগীতে সয়লাব। পাশাপাশি ডেঙ্গু উপসর্গ নিয়ে আসা ব্যক্তিদের পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য দীর্ঘ লাইন এক আজাবের প্রতিদিনের চিত্র। মুগদা ও ঢাকা মেডিকেল কলেজসহ কয়েকটি হাসপাতালে উপচে পড়া রোগী। সিট না থাকায় মুগদায় হাসপাতালটির ফ্লোর-বারান্দায়ও রোগীর ছড়াছড়ি।

এখনো অনেক হাসপাতালে, ডেঙ্গু রোগীদের মশারি ব্যবহার নিশ্চিত করানো যাচ্ছে না। ডেঙ্গুর বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষায় দীর্ঘসূত্রতা হচ্ছে। সব হাসপাতালে ডেঙ্গু ডেডিকেটেড ওয়ার্ড বা কর্নার খোলা হয়নি। ফলে অন্যান্য রোগীর সঙ্গে থেকে চিকিৎসা নিতে হচ্ছে। এবার ডেঙ্গুর ধরন পরিবর্তন হচ্ছে। ধারণাও মিলছে না। একবার আক্রান্ত ব্যক্তি ফের আক্রান্ত হচ্ছে। সরকারি হাসপাতালগুলোর মধ্যে ডেঙ্গু রোগী সবচেয়ে বেশি মুগদা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। রোগী, স্বজন, ডাক্তার-নার্সসহ সবাই সেখানে রীতিমতো আজাবগ্রস্ত।

শুরুতে একে শুধুই রাজধানীর অসুখ ভাবা হলেও এখন চিত্র ভিন্ন। মাস দুয়েক ধরে ঢাকার চেয়ে ঢাকার বাইরে বেশি রোগী পাওয়া যাচ্ছে। এ বছর প্রথম ঢাকার বাইরে বেশি রোগী পাওয়া যায় ২ জুলাই। সেদিন ঢাকায় রোগী ছিল, ২২৪ ও ঢাকার বাইরে ২৮৫ জন। সে মাসে ১১ দিন ঢাকার বাইরে রোগী বেশি ছিল। পরে গত আগস্টে ঢাকার বাইরে রোগীর চাপ আরও বাড়তে থাকে। যা এখনো অব্যাহত। ডেঙ্গু শনাক্ত ও পরীক্ষা নিয়েও গোলমাল। এ প্রশ্নে ডেঙ্গুর নেগেটিভ রেজাল্ট নিয়ে স্বাস্থ্যমন্ত্রীর নিজের ফেসবুক পেজে প্রকাশ করা উদ্বেগটি বেশ প্রাসঙ্গিক। সেখানে লিখেছেন, ডেঙ্গু আক্রান্ত হলেও পরীক্ষায় ‘নেগেটিভ’ রিপোর্ট আসার বিষয়ে প্রায়ই রোগীদের অভিযোগ রয়েছে। এই অবস্থায় ভুল রিপোর্ট পেয়ে রোগী বাসায় থাকছে, এতে শারীরিক জটিলতা বাড়ছে। ঠিক কী পরিমাণ নেগেটিভ রেজাল্ট আসছে, সে সংক্রান্ত কোনো তথ্য নেই স্বাস্থ্যমন্ত্রীর স্ট্যাটাসটিতে। এখন পর্যন্ত স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কর্মকর্তাদের কাছেও এ সংক্রান্ত কোনো তথ্য নেই।

এবার যে ডেঙ্গু ব্যারামটি প্রাণঘাতী হয়ে উঠবে, সেই আভাস ও সতর্কবার্তা ঢের আগেই দিয়েছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা- ডব্লিউএইচও। জানানো হয়েছিল, বৈশি^ক উষ্ণায়নের কারণে ডেঙ্গুর বাহক এডিস মশা দ্রুত বংশবিস্তার করছে। বিশ^ স্বাস্থ্য সংস্থার বিশেষজ্ঞ রমন বেলাউধন সর্বশেষ  সুইজার‌ল্যান্ডের জেনেভায় সাংবাদিকদের জানিয়েছেন,  বিশে^র মোট জনসংখ্যার প্রায় অর্ধেকই ডেঙ্গুর ঝুঁকিতে। ২০১৯ সালে বিশ্বে সর্বোচ্চ ডেঙ্গুর রোগী শনাক্ত হয়। সে সময় ১২৯টি দেশে ৫২ লাখ মানুষ ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছিলেন। এ বছর এখন পর্যন্ত ৪০ লাখ মানুষ ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছেন। এর মধ্যে লাতিন আমেরিকার বিভিন্ন দেশে প্রায় ৩০ লাখ ডেঙ্গু রোগী পাওয়া গেছে। আর্জেন্টিনা, বলিভিয়া, প্যারাগুয়ে ও পেরুতে ডেঙ্গুর প্রকোপ উদ্বেগজনক পর্যায়ে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার কাছে আক্রান্ত রোগীদের যে পরিসংখ্যান রয়েছে, তাতে অধিকাংশ রোগীই আক্রান্ত হওয়ার পর জ¦র, মাংসপেশিতে ব্যথা প্রভৃতি উপসর্গে ভুগছেন। দেখা যায়, অনেকের আবার দেহে কোনো উপসর্গ নেই, কিন্তু প্লাটিলেট আশঙ্কাজনক পর্যায়ে নেমে গেছে। এখন পর্যন্ত বিশ্বে শুধু ব্রাজিলেই বাংলাদেশের চেয়ে মৃত্যু সংখ্যা বেশি।

এশিয়ার মধ্যে ডেঙ্গু বেশি মালয়েশিয়ায়। তবে সেখানে মৃত্যুহার শূন্য দশমিক শূন্য ৭। থাইল্যান্ড, ভিয়েতনাম ও ভারতে মৃত্যুহার বাংলাদেশের চেয়ে অনেক কম। ভারতে মৃত্যুহার শূন্য দশমিক ১। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এবং ইসিডিসির ওয়েবসাইটে পাওয়া তথ্যে দেখা যায়, এসব দেশের মধ্যে আগস্টের শেষ পর্যন্ত মৃত্যুহার বাংলাদেশেই সবচেয়ে বেশি। বাংলাদেশে ২০০ রোগী হাসপাতালে ভর্তি হলে তাদের একজনের মৃত্যু হচ্ছে। আবার ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মতো প্রতিষ্ঠানে ১০০ জন ভর্তি হলে তাদের মধ্যে ২ জন মারা যাচ্ছেন। অর্থাৎ হিসাবের গড় বা পরিসংখ্যান বের করা একটু কঠিন।  ৩১ আগস্ট বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সাপ্তাহিক পর্যালোচনায় বলা হয়েছে, ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে মৃতদের মধ্যে ৫৫ শতাংশ রোগী হাসপাতালে ভর্তির ২৪ ঘণ্টার মধ্যে মারা গেছেন। ৮১ শতাংশের মৃত্যু হয়েছে ভর্তি হওয়ার তিন দিনের মধ্যে। এর অর্থ, যারা মারা যাচ্ছেন, তারা দেরি করে হাসপাতালে আসছেন। যখন হাসপাতালে আসছেন, তখন চিকিৎসকদের বিশেষ কিছু করার থাকছে না। ওই পর্যালোচনায় বলা হয়েছে, মৃত রোগীর ৬৪ শতাংশের মধ্যে ডেঙ্গুর শক সিনড্রোম দেখা গেছে। ২৪ শতাংশ রোগীর লক্ষণ ছিল এক্সপানডেড ডেঙ্গু। ডেঙ্গু হেমোরেজিক ফিভার ছিল ৮ শতাংশ রোগীর। আর মৃত ব্যক্তির ৪ শতাংশের অন্যান্য দীর্ঘস্থায়ী রোগের সঙ্গে ডেঙ্গুও ছিল।

এখন ভয়ানক হয়ে দেখা দিয়েছে ঢাকার বাইরে ডেঙ্গুর বিস্তার নিয়ে। তা ছিল ধারণার বাইরে। যে কারণে ডেঙ্গু মোকাবিলার মূল ফোকাস বা অ্যাটেনশন থেকেছে শহরকেন্দ্রিক, মূলত রাজধানী ঢাকাকেন্দ্রিক। ঢাকার বাইরের মশার মধ্যেও এখন ধরনে ভিন্নতা আঁচ করছেন বিশেষজ্ঞরা। রোগতত্ত্ববিদ ও কীটতত্ত্ববিদরা বলছেন, ডেঙ্গু ছড়ায় এডিস মশা। এডিস দুই ধরনের। ডিস ইজিপ্টাই ও এডিস অ্যালবোপিক্টাস। এডিস ইজিপ্টাই থাকে মূলত শহরে। অন্যদিকে এডিস অ্যালবোপিক্টাস সক্রিয় থাকে গ্রামাঞ্চলে। এরা গাছের কোটরে, কলাগাছের বাকলের মধ্যে বা কচুপাতায় থাকা সামান্য পানিতে ডিম পাড়ে। এখন এরাও ডেঙ্গু ছড়াতে এক্সপার্ট হয়ে গেছে।

তথ্য হিসেবে এটি নতুন। এর মাঝে আবার কারও কারও মাথা ঘুরে যাওয়ার মতো টাকার অঙ্কের এক তথ্য দিলেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী। ঢাকার একটি হোটেলে আয়োজিত এক বৈঠকে স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক জানান, সরকার একজন ডেঙ্গু রোগীর পেছনে গড়ে ৫০ হাজার টাকা খরচ করছে। এ বছর এ পর্যন্ত ডেঙ্গুর জন্য ৪০০ কোটি টাকা খরচ করেছে সরকার। দেশের কজন জানতেন এ তথ্য? আক্রান্তরা জানেন, তাদের পেছনে কত টাকা যাচ্ছে সরকারের? অথবা বাস্তবে কি খরচটা হচ্ছে। নাকি মাথা গুনে অঙ্ক মিলিয়ে নেওয়া হচ্ছে? আরও জরুরি প্রশ্ন, এত বরাদ্দ থাকার পরও ডেঙ্গু চিকিৎসার এ দশা?

মশার মশকরা বা মশাকে আশকারা কোনোটাই কাম্য নয়। ডেঙ্গু এখন আর ঢাকা বা নগরীর অসুখ নয়। ডেঙ্গুর দম বেড়েছে, আরও আগ্রাসী চরিত্রে ছড়িয়ে পড়েছে দেশের ৬৩ জেলায়।  সংক্রমণ ও মৃত্যু দুই-ই বাড়ছে। জনঘনত্ব, গ্রাম ও শহরের অপরিচ্ছন্ন পরিবেশ ডেঙ্গুর জন্য হ্যাচারি তৈরি করে দিয়েছে। তরতাজায় সে তার চরিত্রও পাল্টে নিয়েছে। মোটা দাগে ডেঙ্গু এখন দাবড়ে বেড়াচ্ছে চার কিছিমে। হাসপাতালগুলোর গত কদিনের চিত্র সেই শঙ্কাকে আরও বাতাস দিচ্ছে। একসময় ধারণা ছিল, ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাব মূলত ঢাকা মহানগরকেন্দ্রিক। কিন্তু ২০১৯ সালে দেশব্যাপী ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাবের পর রোগটি নতুন করে চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। সেই সঙ্গে ডেঙ্গু বিষয়ে প্রচলিত কিছু মিথ রোগটি সম্পর্কে মানুষকে বিভ্রান্তিতে ফেলে। ডেঙ্গু জ্বরের উৎপত্তি হয়, ডেঙ্গু ভাইরাসের মাধ্যমে। মানুষের মধ্যে তা ছড়ায় মূলত এডিস মশার কামড়ে। একই প্রজাতি জিকা, চিকুনগুনিয়া এবং সমজাতীয় ভাইরাসগুলো ছড়ানোর জন্যও দায়ী। বাংলাদেশে ডেঙ্গুর প্রকোপ বহু বছর ধরে থাকলেও ২০১৯ সালে এই রোগে আক্রান্তের হার এবং মৃতের সংখ্যা বৃদ্ধি আশঙ্কাজনক হারে বাড়তে শুরু করে।

আদতে এখনকার ডেঙ্গুর সঙ্গে ২০০০ সালের এমনকি ২০১২ সালের ডেঙ্গুর আলামত আচরণ এবং সংক্রমণ শক্তির মধ্যে বিস্তর ফারাক। ফলে আগের অভিজ্ঞতার আয়নায় ডেঙ্গুকে চেনা যাচ্ছে না। দ্বিতীয়, তৃতীয় বা চতুর্থবার আক্রান্তরা ডেঙ্গু শক সিনড্রোমে পড়ছে। ডেঙ্গু বিষয়ে বাংলাদেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে প্রচলিত মিথের মধ্যে রয়েছে এডিস মশা শুধু সকালে এবং পায়ে কামড়ায়, কারও দুবার ডেঙ্গু হয় না, দুবার হলে নিশ্চিত মৃত্যু ইত্যাদি। এসব মিথ নিয়ে ভাবা বা বিশ্লেষণের সময় এখন আর নেই। কাউকে দোষারোপ বা দায়ী করাও এখন সময় নষ্টের পর্যায়ে। করোনা চিকিৎসার নামে দেশে অতিবাণিজ্য চলেছে। তা ডাব থেকে শুরু করে পেঁপে পর্যন্ত সব কিছুতে। কোনো কোনো বেসরকারি হাসপাতাল ডেঙ্গু রোগীদের চিকিৎসার ক্ষেত্রে অতিরিক্ত অর্থ আদায় করছে বলে অভিযোগ উঠছে।  ডেঙ্গু মোটেই  প্রতিরোধ অযোগ্য নয়। কিন্তু একে প্রাণঘাতী করে ফেলা হচ্ছে অব্যবস্থাপনা ও গলাকাটার মানসিকতায়। মশা কম থাকা অবস্থায় তা মারার উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। এখন মশা বেড়ে গেছে। মশা মারার সঙ্গে রোগ দমনও জরুরি হয়ে গেছে। তা চটজলদি বা ক্রাশ প্রোগ্রামে সম্ভব নয়। সিটি করপোরেশনগুলোর ‘সব অসুখের একই ওষুধ’ মার্কা নীতি ব্যর্থ হয়েছে। বারবার প্রয়োগ করা একই বিষ মশার দেহে সহনীয় হয়ে গেছে। প্রতিটি প্রাণী দেহেই প্রকৃতিগতভাবে এ সহনক্ষমতা তৈরি হয়। এডিস মশারাও এখন সেই সক্ষমতায় বলিয়ান। আশকারা-মশকরা বোঝার সক্ষমতা হয়ে গেছে মশাদেরও।

লেখক: সাংবাদিক-কলামিস্ট

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত