শিক্ষা খাতে শৃঙ্খলা রক্ষা করা কঠিন হয়ে উঠেছে বলে মন্তব্য করেছেন দেশের বিশিষ্ট শিক্ষাবিদরা। তারা বলেছেন, প্রাথমিকেই বহু ধারার শিক্ষাব্যবস্থা। ১৯৭৫ সালের পর প্রত্যেকটি শিক্ষানীতিতেই বেসরকারি খাতে শিক্ষা বিস্তারের ব্যাপারে সুপারিশ করা হয়েছে। সত্তরের দশকের মাঝামাঝি থেকে নিয়ন্ত্রণহীন ইংরেজি মাধ্যম স্কুলের পাশাপাশি মাদ্রাসা শিক্ষারও ব্যাপক প্রসার ঘটতে থাকে।
গতকাল শনিবার ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে মিলনায়তনে এক আলোচনা সভায় শিক্ষাবিদরা এমন মন্তব্য করেন।
‘সর্বজনীন গণমুখী বিজ্ঞানভিত্তিক শিক্ষানীতি : বর্তমান প্রেক্ষিতে নাগরিক ভাবনা’ শীর্ষক আলোচনা সভার আয়োজন করে জাতীয় শিক্ষা-সংস্কৃতি আন্দোলন। এতে মূল প্রবন্ধ পাঠ করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের অধ্যাপক কাবেরী গায়েন।
মূল প্রবন্ধে স্বাধীনতার ৫২ বছরেও দেশে সর্বজনীন শিক্ষা নিশ্চিত হয়নি দাবি করে কাবেরী গায়েন বলেন, দেশে প্রাথমিক শিক্ষা বাধ্যতামূলক মুখে বলা হলেও এ বিষয়ে কোনো আইন প্রণয়ন করেনি। কোনো শিক্ষানীতিই এই বিষয়ে পদক্ষেপ নেওয়ার ব্যাপারে সরকারকে সুপারিশ করেনি।
তিনি বলেন, মূল ধারার শিক্ষাব্যবস্থাতেও রয়েছে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানভেদে বিপুল তারতম্য। শিক্ষার বাণিজ্যিকীকরণ একই শহরে একই কারিকুলামের আওতায় কোথাও কয়েক হাজার টাকার বেতনে শিক্ষা কিনে নেওয়ার সুযোগ দেওয়ার পাশাপাশি অল্প টাকায় মলিন শিক্ষা পাওয়ার ব্যবস্থা নিশ্চিত করেছে।
ধর্মভিত্তিক শিক্ষাব্যবস্থারও ব্যাপক প্রসার হয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, বাংলাদেশ শিক্ষা ও পরিসংখ্যান ব্যুরোর (ব্যানবেইস) তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে দেশে ৯ হাজার ২৬৮টি আলিয়া মাদ্রাসা রয়েছে, যেখানে শিক্ষার্থীর সংখ্যা ২৭ লাখ ৬২ হাজার ২৭৭ জন। ২০২২ সালে জাতীয় সংসদে দেওয়া শিক্ষামন্ত্রী দীপু মনির তথ্য অনুযায়ী কওমি মাদ্রাসা আছে ১৯ হাজার ১৯৯টি। এখানে শিক্ষার্থী সংখ্যা ১৪ লাখের মতো। এ ছাড়া রয়েছে হাফেজিয়া, ইবতেদায়ি, ফোরকানিয়া মাদ্রাসা। এই শিক্ষাব্যবস্থা মূলত বিশ্বাসভিত্তিক এবং কারিকুলামের ওপর সরকারের নিয়ন্ত্রণ নেই ।
ইংরেজি মাধ্যমের শিক্ষা কারিকুলামও সরকারি নির্দেশ মেনে চলে না উল্লেখ করে মূল প্রবন্ধে বলা হয়, ব্যানবেইসের ২০১১ সালের তথ্য অনুযায়ী দেশে ১৪২টি স্কুল রয়েছে। যদিও ইংলিশ মিডিয়াম স্কুল অ্যাসোসিয়েশনের মতে, এই সংখ্যা ৩৫০টি। কিন্ডারগার্টেন স্কুল বাদেই শিক্ষার্থীদের সংখ্যা তিন লাখের মতো। বাংলাদেশ কিন্ডারগার্টেন ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের মতে, সাড়ে চার হাজার কিন্ডারগার্টেন স্কুল রয়েছে। শিক্ষার্থী প্রায় দুই লাখ।
বিজ্ঞান শিক্ষার অবস্থা শোচনীয় উল্লেখ করে তিনি বলেন, বেশিরভাগ সরকারি স্কুলেই বিজ্ঞান শিক্ষার অবকাঠামো তৈরি হয়নি। বিজ্ঞানী তৈরি করার জন্য কোনো সরকার আগ্রহ দেখিয়েছে বলেও জানা নেই। অনেক সরকারি স্কুলেই বিজ্ঞান শেখানোর উপযুক্ত শিক্ষক নেই, ল্যাবরেটরি নেই, প্রয়োজনীয় বইপত্র নেই। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বার্ষিক বাজেটে গবেষণায় বরাদ্দ হতাশাজনক।
সংগঠনের আহ্বায়ক মাহমুদ সেলিমের সভাপতিত্বে ও সদস্য সচিব রুস্তম আলী খোকনের পরিচালনায় আরও বক্তব্য রাখেন শিক্ষাবিদ এএন রাশেদা, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. জোবাইদা নাসরীন, দৈনিক কালবেলার বার্তা সম্পাদক রাজু আহমেদ, বাংলাদেশ কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতির যুগ্ম সম্পাদক আকমল হোসেন প্রমুখ।
