‘তোমাকে দেখেছি কবে, সেই কবে, কোন রবিবারে। দশ বছর হয় তোমায় দেখিনা।’ নাহ, বাংলা সাহিত্যের প্রেমের কবি মহাদেব সাহা এমনটা লিখেননি। তবে বিশ্বকাপের ফাইনাল শেষে ভারতীয় সমর্থকদের মনে এই পঙক্তি মনের অজান্তেই বেজে উঠতে পারে। রোহিত শর্মারা যে আরও একবার তীরে গিয়ে তরী ডুবিয়েছেন। বিরাট কোহলিদের হারে আরও একবার হৃদয়ে রক্তক্ষরণ হয়েছে কোটি সমর্থকের। ট্রফির খুব কাছে গিয়েও যে তা ছোঁয়া হলো না ভারতের। ঘরের মাঠের বিশ্বকাপ আসরের ফাইনালে অস্ট্রেলিয়ার কাছে হেরে শিরোপা বঞ্চিত হয়েছে তারা। যে হার বলে দেয়, বিশ্বকাপ জিততে ভুলে গেছে ভারত।
শুরুতেই কবি মহাদেব সাহার যে সাহার ‘এক কোটি বছর হয় তোমায় দেখি না’ কবিতার শেষাংশ লিখেছিলাম। তবে একটু ব্যতিক্রম করে। কারণ ভারত যে শেষবার আইসিসি ট্রফি জিতেছে ১০ বছর আগে। ২০১৩ সালের ২৩ জুন আইসিসি চ্যাম্পিয়নস ট্রফির ফাইনালে ইংল্যান্ডকে ৫ রানে হারিয়ে বিজয়ী হয়েছিল তারা। সেদিনটা ছিল রবিবার। সেই শেষ আইসিসির কোনো ইভেন্টে ভারতের ট্রফি জয়। তারপর থেকে যেন ভুলে গেছে তারা ফাইনাল কীভাবে জিততে হয়!
অথচ এর আগে টানা অর্ধ যুগ যেন ক্রিকেটে রাজত্ব করেছে ভারত। ২০০৭ সালে বাংলাদেশের কাছে হেরে বিশ্বকাপে ভরাডুবি হয়েছিল তাদের। ছিটকে গিয়েছিল গ্রুপ পর্ব থেকেই। কিন্তু সেখান থেকে শিক্ষা নেয় তারা। তাই তো সে বছরই আয়োজিত টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের অভিষেক আসরে চ্যাম্পিয়ন হয় তারা। সেটাও আবার চিরপ্রতিদ্বন্দ্বি পাকিস্তানকে হারিয়ে। মহেন্দ্র সিং ধোনির গল্পের উত্থানটা সেদিন থেকেই। এরপর ঘরের মাঠে ২০১১ বিশ্বকাপ জেতা, দুই বছর পর চ্যাম্পিয়নস ট্রফি। ষোলোকলাই পূর্ণ করে নেয় ভারত। তারপর থেকেই মুদ্রার ওপর পিঠ দেখতে শুরু করে বিশ্বের সবচেয়ে বিত্তশালী ক্রিকেট বোর্ড।
কেননা ২০১৪ সালে বাংলাদেশে টি-টোয়েন্টি কাপের ফাইনালে উঠেছিল তারা। প্রথম কোনো দল হিসেবে সীমিত ওভারের সবচেয়ে বড় আসরটির একাধিক শিরোপাধারী হওয়ার সুযোগ ছিল ভারতের। কিন্তু শ্রীলঙ্কার কাছে হেরে গিয়ে রানার্স-আপ হয়েই সন্তুষ্ট থাকতে হয় তাদের। এমএস ধোনির দলকে হারিয়ে লঙ্কানরা অবশ্য সেবার প্রথম টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ জয়ের উৎসবে মেতেছিল।
২০১৫ সালে অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ডে যৌথভাবে আয়োজিত হয় ওয়ানডে বিশ্বকাপ। সেবারও সেমিফাইনালে নাম লিখিয়েছিল ভারত। নেতৃত্বে ছিলেন ধোনিই। কিন্তু ক্যাপ্টেন কুল এবার সেমির বাধাই টপকাতে পারেননি। শেষ চারে থেকেই শেষ হয়েছিল বিশ্বকাপের অভিযান। পরের বছর আবার ধোনিদের ঘরের মাঠে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ আসর বসেছিল। আবার শিরোপা উৎসবে মেতে উঠবে ভারত, এমনটাই প্রত্যাশা ছিল সমর্থকদের। বিরাট কোহলিরাও এগোচ্ছিলেন সেই লক্ষ্যেই। কিন্তু আবার আটকায় তারা ঐ সেমিতে গিয়েই। ২০১৬ সালে ওয়েস্ট ইন্ডিজ ভারতকে হারিয়ে উঠে যায় ফাইনালে। পরে শ্বাসরুদ্ধকর এক জয় তুলে নিয়ে জিতে নেয় শিরোপা। যা জয়ের স্বপ্ন দেখেছিল ভারত।
পরের বছর ২০১৭ সালে ইংল্যান্ডে আবার বসে চ্যাম্পিয়নস ট্রফি। সেবার ভারত ছিল ডিফেন্ডিং চ্যাম্পিয়ন। শিরোপা ধরে রাখার মিশনে গিয়েছিল তারা। টুর্নামেন্টের কয়েক মাস আগে আবার দল অধিনায়কত্ব ছেড়ে দিয়েছিলেন ধোনি। কোহলি আসেন নেতৃত্বে। তার অধীনে প্রথম কোনো টুর্নামেন্টে ফাইনালেও চলে যায় ভারত। যেখানে আবার প্রতিপক্ষ ছিল পাকিস্তান। সেই ফাইনাল যে ভারত জিতবে সেটা আর বলার অবকাশ ছিল না। আত্মবিশ্বাস সবারই ছিল। কেননা পাকিস্তান যে ভারতকে কখনই বৈশ্বিক কোনো ইভেন্টে তখন অবধি হারাতে পারেনি। কিন্তু বিধি বাম। সেদিনও ‘ম্যান ইন ব্লু’দের কাঁদিয়ে শিরোপা উৎসবে মেতেছিল সরফরাজ আহমেদরা।
টানা চারটি বৈশ্বিক ইভেন্টে শিরোপার খুব কাছে গিয়েও জিততে না পারার হতাশা সমর্থকদের গ্রাস করে ফেলেছিল। ভেবেছিল ২০১৯ বিশ্বকাপে শিরোপা পুনরুদ্ধার করবেন কোহলিরা। রোহিত শর্মা অতিমানবীয় কিছু ইনিংস খেলেছিলেন সেবার। কিন্তু ফাইনালে আর খেলা হয়নি। সেমিতে হেরেই বিদায় নিতে হয়েছে। তারপর ২০২১ টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের ফাইনালে হার। ২০২২ টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের সেমিফাইনাল থেকেই বিদায়। এই বছর আবার টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের ফাইনালে পরাজয়। তারপর গতকাল ওয়ানডে বিশ্বকাপের ফাইনাল হার। বিশ্বকাপ জিততে যে ভারত ভুলে গেছে সেটা বোঝাতে গেলে এই পরিসংখ্যানের চেয়ে বিকল্প কিছু হতে পারে না।
আহমেদাবাদে কাল সুযোগ ছিল নিজেদের তৃতীয় ওয়ানডে বিশ্বকাপ জেতার। ক্যারিয়ার শেষটা রঙিন করে নিতে পারতেন রোহিত-কোহলিরা। শ্রেয়াস-গিলদের অভিষেক আসরটাও হতে পারত আরও জমকালো। কিন্তু হয়নি। কেন হয়নি, তার সবচেয়ে সহজ উত্তর হয়তো ‘জানা নেই’ কারোরই।
তবে যেকোনো ক্রিকেট সমর্থকের চোখেই ৫টি কারণ ধরা পড়বেই। ফাইনাল যারা দেখেছেন তারা ঝটপটই বলে দিতে পারবেন ৫টি কারণ। আর সেগুলো হলো, টস হার, বিকল্প কোনো পরিকল্পনা না থাকা, ব্যাটিংয়ে লোয়ার মিডল অর্ডারের ব্যর্থতা, প্রচুর অতিরিক্ত রান দেওয়া এবং সবশেষটি ৭ ওভার পর ভারতীয় বোলারদের ধার কমে যাওয়া।
ভারতের অন্যান্য ম্যাচে ব্যাটিংয়ের সময় একটা দ্বিতীয় পরিকল্পনা ছিল। ক্রিজে দুই ওপেনার থাকার সময় একজন ধরে খেলছিলেন, আর একজন আক্রমণ করছিলেন। কেউ আউট হলে নতুন যিনি নামছিলেন তিনি ধরে খেলছিলেন, অপরজন মারছিলেন। কিন্তু ফাইনালে ভারতের ব্যাটিংয়ে কোনো দ্বিতীয় পরিকল্পনা চোখে পড়েনি। কোহলি এবং রাহুলের জুটি বাদে কেউ দাঁড়াতেই পারেননি। এছাড়া বোলিং ব্যর্থতাও ডুবিয়েছে। ৭ ওভার শেষে ৪৭ রান তিন উইকেটে ছিল অস্ট্রেলিয়ার। তারপর বোলিংয়ের ধার কমে যায়। আর সেটাই কাল হয় ভারতীয় ক্রিকেটারদের জন্য।