শেষ ছবিটা তুলে ফেললেন স্কালোনি!

আপডেট : ২২ নভেম্বর ২০২৩, ০৭:৫৪ পিএম

প্রায় ২০ বছর আগে, ২০০৪ সালের সেপ্টেম্বরের ১৪ তারিখে আর্জেন্টিনার কোচের দায়িত্ব থেকে পদত্যাগ করেন মার্সেলো বিয়েলসা। বিয়েলসাকে মানুষ ডাকতেন ‘এল লোকো’ বা ‘পাগল’ নামে। এই প্রসঙ্গে আলাপ করতে গিয়ে এল লোকো যা বলেছিলেন তার মধ্যে একটি কথা আজও বিখ্যাত হয়ে আছে। ‘এই দায়িত্ব বইবার জন্য যতটুকু শক্তির প্রয়োজন তা আমার নিঃশেষ হয়ে গেছে।’ গতকাল মারাকানায় ব্রাজিলের দূর্গ চূর্ণ করে ১-০ গোলের জয়ের পর লিওনেল স্কালোনি যা শোনালেন, তাতে মনে হলো বিয়েলসাই যেন কথা বলছেন। 
গোটা ফুটবল বিশ্বকে তাজ্জব করে দিয়ে স্কালোনি উচ্চারণ করেন, ‘একটি জাতীয় দলের এমন একজন কোচ প্রয়োজন যার দায়িত্ব পালনের জন্য সর্বোচ্চ শক্তি রয়েছে এবং যিনি সুস্থ।’ ব্রাজিলের সঙ্গে ম্যাচ শেষে সংবাদ সম্মেলনে এই বোমা ফাটিয়েই চলে যান স্কালোনি, ৩৬ বছর পর আর্জেন্টিনাকে বিশ্বকাপ এনে দেওয়া কোচ। কিন্তু স্কালোনেতা দর্শনের জনক কেন বললেন এই কথা! তিনিও কি নিজের গুরু বিয়েলসার পদাঙ্ক অনুসরণ করতে যাচ্ছেন? 
২০০৪-এ পেরুকে বিশ্বকাপ বাছাইয়ে ৩-১ গোলে হারিয়ে লিমা থেকে ফেরার পর সবাইকে হতবাক করে দিয়ে নিজের পদত্যাগ ঘোষণা করেছিলেন বিয়েলসা। তার আগে আর্জেন্টিনার ডাগআউটে ছয় বছর পায়চারি করছেন ‘কোচদের কোচ’। ওই সময়কালে ২০০২ বিশ্বকাপে ঘটনাবহুল সুযোগ নিশ্চিত করে আর্জেন্টিনা। আবার প্রথম পর্ব থেকেই বিদায় নিতে হয়। তার চুক্তি নতুন করে বৃদ্ধি করা হয়। কোপার ফাইনালে উঠে ব্রাজিলের কাছে পেনাল্টিতে শিরোপা খোয়ায়। আবার গ্রিস অলিম্পিকে ঠিকই স্বর্ণপদক জয় করে আর্জেন্টিনা। এত কিছুর পরও ৭১ মিনিট স্থায়িত্বের সেই ঐতিহাসিক সংবাদ সম্মেলনে সোজা-সাপ্টাভাবে নিজের পদত্যাগ ঘোষণা করেন এল লোকো, ‘একজন হেডকোচের যে দায়িত্ব পালন করতে হয়, তাতে শক্তির অভাব থাকার কোনো সুযোগ নেই। যখনই মনে হলো আমার মধ্যে অস্থিরতা কাজ করছে, আমি এই সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেললাম।’ নিজের নামের সঙ্গে একেবারে মানানসই, পাগলাটে সিদ্ধান্ত বিয়েসলার। 
তখন আজেন্টিনা ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনের প্রধানের চেয়ারে বসা হুলিও গ্রন্ডোনাকে জড়িয়ে জানতে চাওয়া হলে বিয়েসলা সাফ মানা করে দিয়ে বলেন, ‘কোনো সমস্যা নেই। গ্রন্ডোনা আমাকে সর্বাত্মক সহযোগিতা করেছেন।’ গতকাল মারাকানা থেকে ফেরার বাস ধরার সময় এক রেডিও সাংবাদিক গল্পের ফাঁকে জিজ্ঞেস করলে স্কালোনি বলেন, ‘চিকি (তাপিয়া) এর সঙ্গে সবকিছুই ঠিকঠাক।’ সত্যিই কি? সময়ই বলে দেবে।
এখানেও মিলে যায় বিয়েলসা ও স্কালোনির গল্প। অবশ্য প্রকাশ্যে না এলেও, এল লোকোর বিদায়ের পেছনে যে অর্থনৈতিক কারণ ছিল তা গোপন থাকেনি। যদিও এখনো পদত্যাগ ঘোষণা করেননি স্কালোনি। কিন্তু মারাকানায় আর্জেন্টিনার সবাই যখন জয় উদযাপনে ব্যস্ত, আর্জেন্টিনা কোচিং স্টাফের সবাইকে এক করে ছবি তুলেছেন স্কালোনি। টিওয়াইসি স্পোর্টসের সাংবাদিক হোয়াকুইন ব্রুনো ওই ছবি তোলার আগে স্কালোনিকে বলতে শুনেছেন, ‘চলো শেষ ছবিটা তুলে ফেলি।’ 
এখানেই শেষ নয়। কয়েক ঘণ্টা পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ইনস্টাগ্রামে নিজের অফিশিয়াল হ্যান্ডেলে পোস্ট করেন ছবিটি। গত বছরের সেপ্টেম্বরে এই অ্যাকাউন্টটি খোলার পর এখন পর্যন্ত এই ১৫ মাসে মাত্র ৭ বার ছবি পোস্ট করেছেন স্কালোনি। যার সবগুলোই বিশেষ স্মরণীয় মুহূর্তের। মারাকানা স্কালোনিকে বিশ্বকাপের সোপান তৈরি করে দিয়েছিল। তাই ঐতিহ্যের স্টেডিয়ামটিতে আর ফেরা হবে না বলেই হয়তো বলেছেন, ‘চলো শেষ ছবিটা তুলে ফেলি।’ 
বিয়েলসার পর ২০০৪ সাল থেকে ২০১৮ পর্যন্ত ১৪ বছরে আট জন কোচ বদলেছে আর্জেন্টিনার। দুই বছর করে ভার সামলেছেন হোসে পেকারম্যান, আলফিও বাসিল, ডিয়েগো ম্যারাডোনা, জেরার্দো মার্তিনো। এক বছর করে দায়িত্বে ছিলেন সার্জিও বাতিস্তা, এডগার্দো বাউজা ও হোর্হে সাম্পাওলি। সর্বোচ্চ তিন বছর থেকে ২০১৪ বিশ্বকাপে ফাইনালে হারের কষ্ট সয়েছিলেন আলেহান্দ্রো সাবেলা ওরফে জোম্বি কাকা।
বিয়েলসার পর স্কালোনিই একমাত্র কোচ যিনি ৫ বছর ধরে সামলে চলেছেন আলবিসেলিস্তেদের দায়িত্ব। কিন্তু কদ্দিন আর তাকে দেখা যাবে এই ভূমিকায় সেটিই এখন বড় প্রশ্ন। আগামী বছর জুনে কোপা আমেরিকার আসর বসবে। বিশ্বকাপ বাছাইয়ের ৭ম রাউন্ডের খেলা আরও পরে, সেপ্টেম্বরে। ততদিন কি থাকবেন স্কালোনি?
শক্তি ফুরিয়ে যাওয়া আর ছবির পাশাপাশি সংবাদ সম্মেলনে স্কালোনির বক্তব্য এই প্রশ্নকে আরও উসকে দিতে যথেষ্ট। বিয়েলসার মতোই সবার মনোযোগ আকর্ষণ করে তিনি বলেন, ‘আমি এখন গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রসঙ্গ উত্থাপন করতে চাই। চলতে থাকা বলটি থামিয়ে এখন চিন্তা করার সময়। আমাদের এই খেলোয়াড়রা আমাকে এবং পুরো কোচিং দলকে অনেক কিছু দিয়েছে। সামনে কী করব সেই বিষয়ে এখন আমাকে গভীরভাবে ভাবতে হবে।’
কাতার বিশ্বকাপে প্রথম ম্যাচের পর থেকে শুরু করে টানা ১৪ ম্যাচ ও প্রায় এক বছর পর উরুগুয়ের কাছে প্রথমবার হার সহ্য করতে হয় স্কালোনির আর্জেন্টিনাকে। ব্রাজিলের সঙ্গে ম্যাচে জয় পেলেও মাঠের খেলায় আগের ধার দেখাতে পারেননি মেসিরা। তবে এখনই বিদায় না বললেও, বিদায়ের চিন্তা যে স্কালোনির মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছে সেটি প্রায় নিশ্চিত বলা যায়। আর তা হলে, হয়তো কোপা আমেরিকা হতে পারে আলবিসেলিস্তে কোচ হিসেবে স্কালোনির শেষ অধ্যায়।  

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত