আজ থেকে ঠিক এক বছর আগে, ৯ ডিসেম্বর ২০২২'র রাতে কাতারের লুসাইল স্টেডিয়ামে অসাধারণ কোয়ার্টার ফাইনালে টাইব্রেকারে নেদারল্যান্ডসকে হারিয়ে বিশ্বকাপ জয়ের পথে এগিয়েছিল লিওনেল মেসির আর্জেন্টিনা। ম্যাচটা মাঠে থেকে দেখেছিলেন দেশ রূপান্তরের সিনিয়র স্পোর্টস রিপোর্টার সুদীপ্ত আনন্দ। তার লেখা সেই ম্যাচের প্রতিবেদন পাঠকদের জন্য আবার তুলে ধরা হলো।
https://twitter.com/i/status/1733509638740431033
এ এক ওলট-পালট রাত। এ রাতে পাঁচবারের বিশ্বসেরা ব্রাজিলকে টাইব্রেকারে হেরে মেনে নিতে হয় বিদায়ের পরিণতি। আবার এই রাতেই টাইব্রেকার ভাগ্য নিজেদের করে আর্জেন্টিনা পা রাখে সেমিফাইনালে। রাতটা হতে পারতো লিওনেল মেসির। আবার তাঁকে ম্লান করে রাতটা নিজের করে নিতে পারতেন নেদারল্যান্ডসের বদলী স্ট্র্রাইকার ওউট ওয়েগহার্স্টও। তবে সবাইকে ছাঁপিয়ে এই ম্যাচের নায়ক এমিলিয়ানো মার্তিনেজ। আর্জেন্টিনার গোলকিপার সব আলো কেড়ে নিয়েছেন টাইব্রেকারে ডাচদের প্রথম দু'টি শট রুখে দিয়ে। ২-২-এ অমিমাংসীত ম্যাচটা আর্জেন্টিনা টাইব্রেকারে ৪-৩ গোলে জিতে চলে যায় কাতার বিশ্বকাপ ফাইনালের আরও কাছাকাছি।
এডুকেশন সিটি স্টেডিয়ামে গতবারের রানার্স-আপ ক্রোয়েশিয়া রূপকথা জন্ম দেয় হট ফেভারিট ব্রাজিলকে হারিয়ে। লুসাইল আইকনিক স্টেডিয়ামে নেদারল্যান্ডসও সেই পথেই হাটছিল। একটা সময় মেসির বিদায়ও নেইমারের মতো শূণ্য হাতে হওয়ার শঙ্কা চেপে ধরেছিল আর্জেন্টাইন শিবিরকে। তবে ভাগ্য এবার আর মুখ ফিরিয়ে নেয়নি। গত দেড় দশক বিশ্ব ফুটবলকে দু'হাত ভরে দেয়া মেসিকে যেন নিয়তি কিছুটা হলেও ফিরিয়ে দিয়েছে এই ওলট-পালট রাতে।
ব্রাজিলিয়ানদের সব হারানোর রাতে মেসি ঠিকই খেলেছেন ভয়ঙ্কর সুন্দর ফুটবল। প্রথমে সতীর্থ নিহুয়েল মলিনাকে দিয়ে গোল করিয়েছেন। এরপর পেনাল্টি থেকে ব্যবধান বাড়িয়েছেন। এরপর তাঁর বিশ্বকাপ স্বপ্নে বড়সড় ধাক্কা দিতে দৃশ্যপটে হাজির হন ডাচ বদলী স্ট্রাইকার ওউট ওয়েগহার্স্ট। ৭৮ মিনিটে মেম্পিস ডিপের জায়গায় নেমে ৮৩ মিনিটে করেন প্রথম গোল। আর দশ মিনিটের যোগ করা সময়ের শেষ মুহূর্তে ডাচদের কৌশলী ফ্রিকিক কাজে লাগিয়ে ম্যাচটা নিয়ে যান ৩০ মিনিটের অতিরিক্ত সময়ে। নতুন জীবন পেয়ে ডাচরা মনযোগী হয় নিজেদের দূর্গ সামলাতে। আর আর্জেন্টিনা মরিয়া আক্রমণ চালায় যাতে কোনভাবেই ম্যাচটা টাইব্রেকারের অনিশ্চয়তায় না যায়। তবে এই ৩০ মিনিট ভাগ্য সহায় হয়নি আলবেসেলেস্তাদের। হয়তো মেসি, ওয়েগহার্স্টকে ছাপিয়ে এমিলিয়ানো মার্তিনেজকে জয়ের নায়ক বানাতেই ঈশ্বর এভাবে লিখেছিলেন চিত্রনাট্য। ভাগ্য পরীক্ষায় শুরুতেই ভার্জির ফর ডাইক ও স্টিভেন বার্গউইনের শট রুখে দেন গত বছর কোপার সেমিফাইনালে টাইব্রেকারে কলম্বিয়ার তিনটি শট রুখে দেয়া মার্তিনেজ। ওদিকে আর্জেন্টিনার হয়ে ঠিকই লক্ষ্যভেদ করেন মেসি ও পারেদেস। ২-০ লিডটা একটা সময় ৩-২ হয় আর্জেন্টিনার হয়ে গনজালো মনতিয়েল ও হল্যান্ডের টিউন কোপমেইনার্স ও ওয়েগহার্স্ট গোল করায়। আর্জেন্টিনার হয়ে চতুর্থ শট নিতে আসা এনজো ফার্নান্দেজের শট পোস্টের বাইরে গেলে এবং লুক ডি ইয়ং গোল করলে ফের হারের শঙ্কা জাগে আর্জেন্টাইনদের। তবে লাউতারো মার্তিনেজ ঠিকই লক্ষ্যভেদ করে দলকে নিয়ে যান শেষ চারে।
এর আগে চির বৈরী ব্রাজিলের বিদায়ের খবরটা শুনে মাঠে নেমেছিল আর্জেন্টিনা। ক্রোয়েশিয়ার কাছে লাতিন শত্রুদের হারে লুসাইল স্টেডিয়ামে মহারণের আগে উপস্থিত আর্জেন্টাইন সমর্থকরা উল্লাসে মাতলেও একটা চাপা আতঙ্ক ঠিকই ছিল ভেতর ভেতর। তাদের পরিণতিও যদি ব্রাজিলের মতোই হয়? হতেও পারতো। তবে স্নায়ুর লড়াইটা জিতে ডাচদের আরেকবার হতাশায় ডুবিয়েছে মেসির আর্জেন্টিনা।
ভীতি তাড়াতে লুসাইলে সবার দৃষ্টি ছিল একজনের দিকে। আর্জেন্টাইন কোচ জানতেন ডাচরা মেসির খেলাটা সহজ হতে দিবে না। তাই ৫-৩-২ ফরম্যাশনে একাদশ সাজিয়ে কিছুটা ভড়কে দিতে চেয়েছিলেন। সেটা কাজেও লেগেছে দারুণভাবে। মেসিকে আটকে রাখার সুযোগ ডাচদের রক্ষণ আলগা হবে। সেটা কাজে লাগাতে দুই ফুলব্যাক বারবার যোগ দিবে আক্রমণে। আর এই মেসিকে সহজে আটকে রাখা যায়? ডাচরা ম্যাচের আগে যতই হম্বিতম্বি করুক। মেসিকে রোখা যায়নি। ৩৫ মিনিটে তার ডিফেন্সচেড়া পাসকে গোলে পরিণত করেন নাহুয়েল মলিনা। এরপর ৭৩ মিনিটে আকুনাকে বক্সের ভেতরে ফেলে দিয়ে পেনাল্টি উপহার দেন ডাচ ডিফেন্ডার ডামফ্রিস। যা থেকে বিশ্বকাপে নিজের দশম গোল করেন মেসি। বাকী কাজটা ছিল আর্জেন্টাইন রক্ষণের। সেটা পুরোপুরি করতে ব্যর্থ হয়েছে তারা। যার সুযোগ নিয়ে অখ্যাত থেকে বিখ্যাত হয়ে গেছেন ওয়েগহার্স্ট।ম্যাচের ৭৮ মিনিটে যখন দল ২-০ গোলে পিছিয়ে, তখনই নিভে থাকা মেম্ফিস ডিপেকে তুলে নিয়ে ওউট ওয়েগহার্স্টকে মাঠে পাঠিয়েছিলেন নেদারল্যান্ডস কোচ লুই ফন গাল। এই পরিবর্তনটাই নেদারল্যান্ডসকে ম্যাচে ফিরিয়ে এনেছিল।
তবে এই রাতটা শতভাগ লাতিন ফুটবল থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়নি বলেই বিশ্বকাপের আবেদনটা অটূট থেকে যায়।
