হৃদরোগের চিকিৎসায় ব্যবহৃত করোনারি স্টেন্টের (হার্টের রিং) নতুন খুচরা মূল্য নির্ধারণের পর থেকে হাসপাতালে সরবরাহ বন্ধ করে রেখেছে ইউরোপের ২৪টি কোম্পানির রিং আমদানিকারক ও সরবরাহকারীরা। গত ১৬ ডিসেম্বর হার্টের রিংয়ের নতুন খুচরা মূল্য কার্যকর করে ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর। কিন্তু নির্ধারিত সেই দর কমানোর প্রতিবাদে একই দিন থেকে ধর্মঘটের ডাক এবং হাসপাতালে স্টেন্ট সরবরাহ বন্ধ রাখার ঘোষণা দেয় আমদানিকারক ও সরবরাহকারীরা। এরপর থেকে ১৭ দিন ধরে হাসপাতালে রিং সরবরাহ বন্ধ রেখে দাম বাড়ানোর চেষ্টা চালাচ্ছে তারা। তবে শেষমেশ ধর্মঘটে সফল না হয়ে তারা আদালতের শরণাপন্ন হন।
আমদানিকারকদের রিটের পরিপ্রেক্ষিতে হার্টের রিংয়ের ‘বৈষম্যমূলক’ দাম কেন অবৈধ ঘোষণা করা হবে না, তা জানতে চেয়ে গত ১৮ ডিসেম্বর রুল জারি করে হাইকোর্ট। দুই সপ্তাহের মধ্যে বিবাদীদের রুলের জবাব দিতে বলা হয়। বিচারপতি জেবিএম হাসান ও বিচারপতি রাজিক আল জলিলের হাইকোর্ট বেঞ্চ এ রুল দেয়। ২৪ ডিসেম্বর থেকে ১ জানুয়ারি পর্যন্ত আদালতের অবকাশকালীন ছুটি চলে। আজ মঙ্গলবার থেকে আদালতের নিয়মিত বিচারকাজ শুরু হবে বলে জানা গেছে।
দেশে হার্টের চিকিৎসায় বহুল ব্যবহৃত পদ্ধতি হচ্ছে স্টেন্ট বা রিং পরানো। কারও হৃৎপিণ্ডে রক্ত সঞ্চালনে ব্লক বা বাধার সৃষ্টি হলে চিকিৎসক তাকে এক বা একাধিক রিং পরানোর পরামর্শ দেন। তবে এই রিং দেশে তৈরি হয় না, বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয়। যার মূল্য তালিকা বিভিন্ন হাসপাতালে টানানো থাকে। রোগী বা তার স্বজনদের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ওই তালিকা থেকে বেছে নেওয়া রিং রোগীর হার্টে স্থাপন করেন চিকিৎসকরা।
ঔষধ প্রশাসন বলছে, রিং আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানগুলো দামের বিষয়ে হাইকোর্টে রিট করেছে। আদালত যে নির্দেশনা দেবে তার আলোকে প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত নেবে দাম নির্ধারণ কমিটি। দামের সিদ্ধান্তে হাইকোর্ট স্থগিতাদেশ দেয়নি, রুল জারি করে জবাব দিতে বলেছে। শুনানি শেষে হাইকোর্ট নির্দেশনা দিলে কমিটি বসে সিদ্ধান্ত নেবে। দেশে দীর্ঘদিন ধরে হার্টের রিংয়ের দাম নির্দিষ্ট করা ছিল না, এর বিক্রিতে কোনো নিয়ন্ত্রণ সরকারের বা ঔষধ প্রশাসনের ছিল না। ফলে আমদানিকারক ও সরবরাহকারীরা ইচ্ছেমতো রোগীদের কাছ থেকে দাম আদায় করত। নতুন মূল্য কার্যকরের পর থেকে বাজারের ওপর সরবরাহকারীদের যে দখল ছিল তা নষ্ট হয়ে গেছে। তাছাড়া এখন ইচ্ছে করলেই অতিরিক্ত দাম নেওয়ার সুযোগ নেই। অতিরিক্ত দাম আদায় করলে শাস্তি ও জরিমানার বিধান রাখা হয়েছে, ফলে আমদানিকারকরা রোগীদের জিম্মি করে দাম বাড়ানোর চেষ্টা চালাচ্ছেন।
রিংয়ের দাম নিয়ে সৃষ্ট বিশৃঙ্খল পরিস্থিতির মধ্যে দাম সমন্বয়ে গঠিত জাতীয় কমিটির সদস্যদের নিয়ে সর্বশেষ গত রবিবারও জরুরি বৈঠক করেছে ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর। তবে এ বৈঠকে আমদানিকারকদের (যারা আন্দোলন করছে) ডাকা হয়নি। দামের বিষয়েও কোনো সিদ্ধান্ত আসেনি।
ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. নুরুল আলম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ঔষধ প্রশাসন কিংবা সরকার একা এ দাম নির্ধারণ করেনি। যারা দীর্ঘদিন ধরে হৃদরোগের চিকিৎসা করছেন, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও অধিদপ্তর, সরকারের বিভিন্ন সংস্থা, আমদানিকারকসহ বিভিন্ন অংশীদারের সঙ্গে কথা বলে, দফায় দফায় বৈঠক করে দাম নির্ধারণ করেছে দাম সমন্বয় কমিটি। জাতীয় কমিটির সদস্যরা দীর্ঘদিন ধরে এটা নিয়ে কাজ করেছেন, খোঁজখবর নিয়েছেন, তারপর চ‚ড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। এখানে কারও অসন্তুষ্ট হওয়ার সুযোগ নেই। এটা আলু, পেঁয়াজ বা সবজির দাম নয় যে, আপনি অতিরিক্ত মুনাফা করবেন।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমাদের দেশে যারা আমদানিকারক তারা জীবন রক্ষাকারী সরঞ্জাম নিয়েও ব্যবসা করে মুনাফা করছেন। বছরের পর বছর তারা রোগীদের কাছ থেকে ইচ্ছেমতো মূল্য আদায় করেছেন। অথচ আমাদের দেশের রোগীদের একটা বড় অংশ চিকিৎসার খরচ চালাতে পারেন না। নতুন দাম কার্যকরের ফলে মুনাফা কমে যাওয়ার শঙ্কায় তারা প্রোপাগান্ডা চালাচ্ছেন। আমাদের সিদ্ধান্ত যে সঠিক তার প্রমাণ হচ্ছে তারা আদালতে নতুন দাম স্থগিত করতে আবেদন করেছিলেন কিন্তু আদালত তা মানেনি।’
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, দেশে হার্টের রিং আমদানি করে ২৭টি কোম্পানি। এর মধ্যে ৩টি যুক্তরাষ্ট্র ও বাকি ২৪টি ইউরোপের বিভিন্ন দেশ থেকে আমদানি করে। এ ছাড়া জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া ও ভারত থেকেও রিং আমদানি করা হয়। নতুন মূল্য তালিকায় যুক্তরাষ্ট্রের রিংয়ের দাম ধরা আছে ২০ হাজার থেকে শুরু করে ১ লাখ ৪০ হাজার ৫০০ টাকা পর্যন্ত। আর ইউরোপীয় দেশ থেকে আমদানি করা রিংয়ের মূল্য সর্বনিম্ন ১৪ হাজার থেকে শুরু করে সর্বোচ্চ আয়ারল্যান্ডের রিং আছে ১ লাখ ৪০ হাজার ৫০০ টাকা পর্যন্ত। তবে প্রতিটি দেশের রিংয়ের আলাদা শ্রেণি ভাগ করা থাকে এবং সে অনুযায়ী দাম ওঠানামা করে। চিকিৎসক কোনো রোগীকে রিং বসানোর পরামর্শ দিলে রোগীর পক্ষ থেকে পছন্দসই দামের রিং চ‚ড়ান্ত করা হয়। যার অর্ডার নেয় ভেন্ডর বা হাসপাতালের সঙ্গে যুক্ত কোম্পানি এবং তারাই সেটা হাসপাতালে সরবরাহ করে।
চিকিৎসকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, দেশে শীতকালে হার্টের রোগীর সংখ্যা সবসময় কম হয়। তাছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের রিংয়ের সরবরাহ থাকার কারণে রোগীদের খুব একটা ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে না। স্টেন্টের ঘাটতির কারণে চিকিৎসা বন্ধ হয়নি। কিন্তু এভাবে বেশি দিন চললে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে সংকট দেখা দিতে পারে।
এ প্রসঙ্গে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের হৃদরোগ বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডা. আবদুল ওয়াদুদ চৌধুরী দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘রিং সরবরাহ বন্ধ রাখার প্রভাব এখনো পড়েনি, চিকিৎসা স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় চলছে। আমদানিকারকরা সরবরাহ বন্ধ রেখে হাসপাতালে ডাক্তার ও রোগীদের জিম্মি করার যে প্রবণতা, এটা খুবই খারাপ। কোম্পানিগুলোর হুমকিতে আমাদের রাজি হয়ে যাওয়া ঠিক হবে না। সরকারকে কঠোর হতে হবে।’
রিং আমদানিকারকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, নতুন মূল্য তালিকা যুক্তরাষ্ট্রের কোম্পানিগুলোর আমদানিকারকরা মেনে নিলেও তা মানতে নারাজ ইউরোপীয় রিং আমদানিকারক ও সরবরাহকারীরা। দাম নির্ধারণের ক্ষেত্রে মার্কআপ ফর্মুলা অনুসরণ করে সরকার। এ অনুযায়ী রিংয়ের কেনা মূল্যের চেয়ে ৪৩ শতাংশ বেশি রেখে দাম ঠিক করে দেওয়া হয়। যার মধ্যে থাকে আমদানি খরচ, মার্কেটিং, চিকিৎসকদের প্রশিক্ষণ ও মুনাফা। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের রিংয়ের দামের ক্ষেত্রে এ ফর্মুলা মানা হলেও ইউরোপীয়দের ক্ষেত্রে তা মানা হয়নি বলে তাদের অভিযোগ।
দেশে ইউরোপ থেকে রিং আমদানি করে ওমেগা হেলথ কেয়ার। এ প্রতিষ্ঠানের স্বত্বাধিকারী ইশতিয়াক আহমেদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ঔষধ প্রশাসন দাম নির্ধারণের ক্ষেত্রে ডলারের বাজার মূল্য চিন্তা না করে আগের মূল্য বিবেচনায় নিয়েছে, ফলে আমাদের লস বেশি হচ্ছে। আবার মার্কআপ ফর্মুলায় বলা হয়েছে, আমদানি ও সরবরাহের ক্ষেত্রে ভ্যাট দিতে হবে না, কিন্তু নতুন দাম নির্ধারণে সেই নির্দেশনা মানা হয়নি। আমরা দাম কমানোর বিপক্ষে নয়, আমাদের দাবি ছিল দাম বাড়ানোর আগে ইউরোপীয় মাদার কোম্পানির সঙ্গে (এই ২৪টি কোম্পানি যে যে কোম্পানি থেকে রিং আমদানি করে) কমিটির বৈঠক করা। কিন্তু তাদের সঙ্গে কোনো বৈঠক না করেই দাম কমানো হয়েছে। তাই আমরা উপায় না পেয়ে আদালতে গেছি।’
আদালতের নির্দেশনার আগেই সরবরাহ বন্ধ রাখা অন্যায় কি না, এমন প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, ‘আমরা রিং সরবরাহ পুরোপুরি বন্ধ করিনি। আমরা হাসপাতাল কর্র্তৃপক্ষকে চিঠি দিয়ে বলেছি, আমাদের রিং শুধু জরুরি রোগীদের ছাড়া অন্য রোগীদের না দিতে।’
এদিকে নতুন দাম নির্ধারণের পরও হার্টের স্টেন্টের দাম প্রতিবেশী দেশ ভারতের চেয়ে আড়াই থেকে তিনগুণ বেশি। দেশে দীর্ঘদিন ধরেই স্টেন্টের বাজার নিয়ন্ত্রণ করছে সিন্ডিকেট। যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানি করা রিসোলট অনিক্সের একটি স্টেন্টের দাম দেশে নির্ধারণ করা হয়েছে ১ লাখ ৪০ হাজার ৫০০ টাকা। কিন্তু একই স্টেন্ট ভারতে পাওয়া যাচ্ছে ৫০-৫১ হাজার টাকায়। যুক্তরাষ্ট্রের বোস্টন সায়েন্টিফিক লিমিটেডের রিংয়ের নতুন দাম নির্ধারণ করা হয়েছে ১ লাখ ৪০ হাজার ৫০০ টাকা। অথচ একই রিং ভারতে বিক্রি হচ্ছে ৫৩-৫৫ হাজার টাকায়। আয়ারল্যান্ডের অ্যাবোট ভাসকুলার কোম্পানির রিংয়ের দাম দেশে ৬৬ হাজার ৫০০ টাকা করা হলেও একই রিং ভারতে পাওয়া যাচ্ছে বাংলাদেশি ২৯ হাজার টাকায়।
রাজধানীর ইব্রাহিম কার্ডিয়াক হাসপাতালের কার্ডিয়াক সার্জারি বিভাগের প্রধান অধ্যাপক মাসুম সিরাজ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘অনেক আগে থেকেই আমাদের দেশে হার্টের রিংয়ের যে দাম নেওয়া হয়, তা পার্শ্ববর্তী দেশ নেপাল ও ভারতের থেকে অনেক বেশি। এমনকি নতুন দাম কার্যকরের পরও ওই দুটি দেশে আমাদের চেয়ে কম দামে হার্টের রিং বিক্রি হচ্ছে। আমাদের ব্যবসায়ীদের অধিক লাভ করার যে প্রবণতা সেই কারণে তারা নতুন মূল্য তালিকা মেনে নিতে পারছেন না। মানুষের জীবনরক্ষাকারী ওষুধ কিংবা সরঞ্জাম তো মুনাফার জন্য নয়, এটা তারা বুঝতে চান না।’
