রাজধানীর হলি ফ্যামিলি রেড ক্রিসেন্ট মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল। যা একসময় ছিল মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবার জন্য রোগীদের অন্যতম ভরসার জায়গা। ঢাকার বিত্তবান পরিবারের সদস্যরাও সেবা গ্রহণ করতেন এই হাসপাতাল থেকে। রাজধানীতে যখন সরকারি হাসপাতালের বাইরে বেসরকারি পর্যায়ে চিকিৎসার তেমন একটা সুযোগ ছিল না তখন এই হাসপাতালটিই ছিল ধনী, গরীব নির্বিশেষে সব শ্রেণী-পেশার মানুষের আস্থাস্থল। কিন্তু ১৯৯১ সাল থেকে গণতান্ত্রিক বাংলাদেশে রাজনৈতিক পরিচয়ে পরিচালনা পর্ষদের চেয়ারম্যান ও পরিচালক নিয়োগের প্রক্রিয়া শুরুর পর এই হাসপাতালের সেবার মান তলানীতে নামতে শুরু করে। এরপর থেকে বিভিন্ন সরকারের আমলে নিয়োগ পাওয়া চেয়ারম্যান ও পরিচালনা পর্ষদের সদস্যদের দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি, রাজনৈতিক প্রভাব এবং অনিয়ম ও অদক্ষতার কারণে সোনালী দিন হারিয়ে এখন কেবল নামেই টিকে আছে প্রতিষ্ঠানটি।
গত এক সপ্তাহ ধরে হলি ফ্যামিলি হাসপাতালের পরিচালক, চিকিৎসক, নার্স, কর্মকর্তা-কর্মচারী ও রোগীদের সঙ্গে কথা বলেন এই প্রতিবেদক। তাদের বয়ানে একে একে উঠে আসে হাসপাতালটির করুণ সব চিত্র। একসময়ের জনপ্রিয় ৫২৮ শয্যার এই স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানটিতে এখন দিনে ২০০ রোগীও ভর্তি থাকেন না। চিকিৎসক ও নার্স সংকট থাকলেও ৬৫০ জনবলের মধ্যে শুধুমাত্র প্রশাসনিক দায়িত্ব পালন করেন ৩৪০ এর বেশি কর্মকর্তা। দায়িত্বরত চিকিৎসকরাই এখান থেকে রোগী ভাগিয়ে প্রাইভেট ক্লিনিকে নিয়ে যাচ্ছেন। চিকিৎসা খরচের তুলনায় সুযোগ সুবিধা সীমিত। বহির্বিভাগে চিকিৎসকরা বসেন নামমাত্র। এই হাসপাতালে নিয়োগ থেকে শুরু করে পদায়ন সবকিছুই অনিয়মের ঘেরাটোপে বন্দি। চার বছরে বদলী হয়েছেন ৭ জন পরিচালক। হয়েছে কেনাকাটা ও সংস্কারকাজে অনিয়ম। এমনকি রোগীদের কাছ থেকে কমিশন আদায়ের অভিযোগও রয়েছে।
গত সোমবার সকাল ১১টার দিকে হলি ফ্যামিলি হাসপাতালের ফটকের সামনে চায়ের টং দোকানে গিয়ে সেখানে প্রতিষ্ঠানটির ১০-১৫ জন কর্মকর্তাকে আড্ডা দিতে দেখা যায়। প্রায় ৩০ মিনিটের মতো একই জায়গায় তাদের অবস্থান করতে দেখা যায়। হাসপাতালের ভেতরের খালি মাঠসহ অন্য বিভিন্ন স্থানেও কর্মকর্তাদের ঘুরাঘুরি করতে দেখা যায়। অনুসন্ধানে জানা যায়, কোনো ধরনের প্রয়োজনীয়তা ছাড়াই শুধুমাত্র রাজনৈতিক পরিচয়ে এই কর্মকর্তারা নিয়োগ পেয়েছেন। হাসপাতালে বর্তমানে যে ৬৫০ জনবল রয়েছে তার মধ্যে ৩৪২ জনই বিভিন্ন পদে কর্মকর্তা হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন। যাদের হাসপাতালে কোনো নির্দিষ্ট কাজ নেই, তারা হাসপাতালে আসেন এবং চলে যান। আর কেবল নিয়োগ পেয়েই শেষ নয়, এই কর্মকর্তারা সময়ে সময়ে নিজেদের পদোন্নতিও আদায় করে নিয়েছেন। যা এখন প্রতিষ্ঠানটির গলার কাঁটা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এসব কর্মকর্তাদের উচ্চ বেতন দিতে গিয়ে প্রতিষ্ঠান চালাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে।
তবে বিপুল সংখ্যক অপ্রয়োজনীয় জনবল থাকলেও হাসপাতালে চিকিৎসক ও নার্স রয়েছেন যথাক্রমে মাত্র ১০২ ও ২০৬ জন করে। রোগীদের সেবার জন্য নিয়োজিত এই চিকিৎসক ও নার্সদেরও অনেকে বিভিন্ন অনৈতিক পন্থায় নিয়োগ পেয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। ফলে তাদের সেবার মান নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। দি ম্যাডিক্যাল প্র্যাকটিস অ্যান্ড প্রাইভেট ক্লিনিকস অ্যান্ড ল্যাবরেটরিজ অর্ডিন্যান্স অনুযায়ী প্রতি ১০ শয্যার জন্য ৩ জন চিকিৎসক ও ৬ জন নার্সের প্রয়োজন। সে হিসেবে এই হাসপাতালে প্রয়োজন প্রায় ১৬০ চিকিৎসক ও ৩১৮ নার্স।
বিষয়টি স্বীকারও করেছেন হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল অধ্যাপক ডা. এস এম হুমায়ুন কবির (অব.)। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বিভিন্ন সময়ে অপরিকল্পিত ও অপ্রয়োজনীয় নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। এই নিয়োগপ্রাপ্তদের মধ্যে অনেকের নির্দিষ্ট কাজ না থাকলেও তাদের বেতন অনেক বেশি। অপরদিকে চিকিৎসক ও নার্সের প্রয়োজনীয়তা থাকলেও নিয়োগ দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না।’
এদিকে নানা অব্যবস্থাপনা ও সেবার মান কমে যাওয়ায় রোগীর সংকট দেখা দিয়েছে। এই হাসপাতালে এখন দিনে গড়ে ২০০ জনের কম রোগী ভর্তি থাকেন, ফলে বেশিরভাগ শয্যা ও কেবিন খালি পড়ে থাকে। হাসপাতালে রোগীদের ভর্তি ও চিকিৎসা কার্যক্রম এবং অনুদান থেকে যে টাকা আসে তা দিয়েই বেতন-ভাতাসহ যাবতীয় ব্যয় মেটাতে হয়। হলি ফ্যামিলি হাসপাতাল বাংলাদেশ রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটির একটি অঙ্গ প্রতিষ্ঠান হলেও রেড ক্রিসেন্ট কোনো আর্থিক সহায়তা দেয় না। প্রভাষক থেকে অধ্যাপক পর্যন্ত চিকিৎসকরা মেডিকেল কলেজের কোষাগার থেকে বেতন পান। অন্যদিকে রেজিস্ট্রার, কনসালটেন্ট, মেডিকেল অফিসার এবং কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন হয় হাসপাতালের আয় থেকে।
দিনে দিনে রোগী কমে যাওয়ার পেছনে এই হাসপাতালের চিকিৎসকদেরও হাত রয়েছে। হাসপাতালটির উচ্চপর্যায়ের একাধিক কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ভর্তি থাকা রোগীদের কৌশলে প্রাইভেট ক্লিনিকে নিয়ে যাচ্ছেন প্রভাষক থেকে অধ্যাপক পযায়ের বেশকিছু চিকিৎসক। এই কর্মকর্তাদের অভিযোগ, যেহেতু হাসপাতাল থেকে প্রভাষক থেকে অধ্যাপক পযায়ের চিকিৎসকদের বেতন-ভাতা দেওয়া হয় না, তাই তাদের হাসপাতালের প্রতি দরদ কাজ করে না। এই চিকিৎসকরা চিকিৎসাসেবা ভালো না, যন্ত্রপাতি নেই- এমন বিভিন্ন কথা বলে রোগীদের এই হাসপাতালে প্রাইভেট ক্লিনিকে নিয়ে যান। আর ভাগিয়ে নেয়া রোগীপ্রতি তারা সেসব ক্লিনিক থেকে নির্দিষ্ট পরিমাণ কমিশন পেয়ে থাকেন। বিষয়টি নিয়ে সম্প্রতি চিকিৎসকদের সঙ্গে কয়েক দফা বৈঠক করেছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। বহির্বিভাগে ২টা পর্যন্ত রোগী দেখার কথা থাকলেও চিকিৎসকরা চেম্বারে বসেন না।
১৯৫৫ সালে গড়ে তোলা এই হাসপাতালটি এক সময় ঢাকা শহরের উচ্চবিত্ত ও মধ্যবিত্তদের নির্ভরতার জায়গা ছিল। চিকিৎসকদের সুনামের পাশাপাশি ছিল আধুনিক সুযোগ-সুবিধা। কিন্তু ১৯৯১ সাল থেকে নানা অব্যবস্থাপনায় সেবার মান কমতে থাকে। ২০০০ সাল পরবর্তী সময়ে ঢাকায় বেসরকারি বড় বড় হাসপাতাল গড়ে উঠলে তাদের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে সংস্কার করে আধুনিক যন্ত্রপাতি স্থাপন করা হয়নি। ফলে দিনে দিনে রোগীরা এই হাসপাতাল থেকে মুখ ফিরিয়ে নিতে শুরু করেন।
সংশ্লিষ্টরা জানান, ১৯৯২ সালে তৎকালীন বিএনপি সরকারের আমলে চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পান পিরোজপুর থেকে নির্বাচিত সংসদ সদস্য শহীদুল হক জামাল। তিনি দায়িত্ব নেওয়ার পর রাজনৈতিক পরিচয়ে একক ক্ষমতায় হাসপাতালে বিপুলসংখ্যাক জনবল নিয়োগ দেন। পরবর্তীতে যখন যে সরকার দায়িত্ব পালন করেছে তারাই দলীয় চেয়ারম্যান নিয়োগ দিয়েছে। আর এই চেয়ারম্যানরা দলীয় বিবেচনায় নিয়োগ দিয়েছেন এবং কেনাকাটা থেকে শুরু করে বিভিন্ন সংস্কারকাজে হাসপাতালের তহবিল থেকে অর্থ আত্মসাত করেছেন। ২০১৫ সালে চেয়ারম্যানের স্বাক্ষর জাল করে মোটা অঙ্কের অর্থের বিনিময়ে ২৯ জন চিকিৎসক নিয়োগ দেওয়া হয়। এ নিয়ে বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রতিবেদন প্রকাশ হলেও জড়িতদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। হাসপাতালের চেয়ারম্যানের কাছে পরিচালকরা অসহায় থাকেন। কেবল ২০১৯-২২ এই ৪ বছরেই ৭ জন পরিচালককে নিয়োগ দেওয়া হয় ও ৬ জনকে বহিষ্কার করা হয়।
তবে এই হাসপাতালে রাজনৈতিক পরিচয়ে নিয়োগ পেলেও চেয়ারম্যান হিসেবে সিলেট-৫ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য হাফিজ আহমেদ মজুমদারের আমলে বেশকিছু উন্নয়ন হয়। হাসপাতালের জন্য তিনি বিভিন্ন জায়গা থেকে বড় আকারের তহবিল সংগ্রহ করে যন্ত্রপাতি কেনেন। সংস্কারকাজের পাশাপাশি সেবার মান বাড়তে থাকে। কিন্তু তার মেয়াদ শেষ হলে ফের সংকট শুরু হয়।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ২০১৭ সাল থেকে হাসপাতালের তহবিলে টাকা না থাকায় বেতন অনিয়মিয়ত হওয়া শুরু হয়। এ নিয়ে বিভিন্ন সময়ে বিক্ষোভ করেন সংশ্লিষ্টরা। ২০১৮ সালে করোনো আক্রান্ত রোগীদের চিকিৎসাসেবায় সরকার এই হাসপাতালের সঙ্গে চুক্তি করে। এতে অনেক রোগী ভর্তি হন। যা থেকে পাওয়া আয় থেকে ২০২৩ সালে সেই বকেয়া বেতন পরিশোধ করা হয়। এখন কেবল ১ মাসের বেতন বকেয়া রয়েছে। অবশ্য অর্থ সংকটের কারণে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ভবিষ্যৎ তহবিল (প্রভিডেন্ট ফান্ড) ও গ্র্যাচুইটির টাকা বকেয়া রয়েছে।
হাসপাতালের সাবেক চেয়ারম্যান হাফিজ আহমেদ মজুমদার বলেন, ‘রাজনৈতিকভাবে যারা চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন তাদের অনেকেই নির্মোহ ছিলেন না। অপ্রয়োজনে নিয়োগ দিয়ে হাসপাতালের সর্বনাশ করেছেন। তাদের বেতন-ভাতা দিতে গিয়ে হাসপাতালের তহবিল কমতে কমতে প্রায় শূন্য। চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালনের সময় কেউ দুর্নীতি বা অনিয়মে জড়ালেও দায়িত্ব পালন শেষে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ না থাকাও একটা সমস্যা।’
২০২৩ সালে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) এর এক গবেষণায় দেখা যায়, ২০১৫-২১ সাল পর্যন্ত এই হাসপাতালের উন্নয়ন, সংস্কার ও আধুনিকায়নের নামে প্রায় ৩২ কোটি টাকার অনুদান জমা হয়। কিন্তু এই টাকা কোন খাতে কীভাবে খরচ করা হয় তার সঠিক হিসাব হাসপাতালে সংরক্ষণ করা হয়নি। এখানেও নানা অনিয়ম হয়েছে বলেই ধারণা করা হচ্ছে। টিআইবি জানায়, স্বয়ংসম্পূর্ণ ডায়ালাইসিস সেন্টার থাকা সত্ত্বেও নতুনভাবে বিতর্কিত প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যন্ত্র ও শয্যাসংখ্যা বৃদ্ধি করতে অসম চুক্তি করা হয়। বিতর্কিত প্রতিষ্ঠানকে সুবিধা দিতে হাসপাতালের নিজস্ব মেশিন অকেজো রাখারও অভিযোগ তোলা হয়।
হাসপাতালের বর্তমান পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল অধ্যাপক ডা. এস এম হুমায়ুন কবির বলেন, ‘আমি দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে প্রতিষ্ঠানের সুনাম বৃদ্ধি ও চিকিৎসার মান বৃদ্ধিতে কাজ করছি।’
বিভিন্ন সময়ে ঘটে যাওয়া অনিয়ম ও দুর্নীতির বিষয়ে তদন্ত করা হবে কী না জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমিও তা শুনেছি, কিন্তু বিস্তারিত জানি না। পদক্ষেপ নেওয়ার বিষয়ে চেয়ারম্যান মহোদয়ের সঙ্গে আলোচনা করবো।’
এ ব্যাপারে বক্তব্য জানতে হাসপাতালের চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল (অব.) এ টি এম আব্দুল ওয়াহাবের সঙ্গে যোগাযোগ করার চেষ্টা করা হলেও তাকে ফোনে পাওয়া যায়নি।
