বিদ্যুতের চাহিদা বেড়ে প্রায় দ্বিগুণ হবে গ্রীষ্মে। তখন দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদনের পর্যাপ্ত সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও জ্বালানিসংকটের কারণে নিরন্তর বিদ্যুৎ সরবরাহে বিঘœ ঘটতে পারে। ডলারসংকটের কারণে সেচ মৌসুমে প্রয়োজনীয় ডিজেল সরবরাহ করা নিয়েও অনিশ্চয়তা রয়েছে।
সরকার যদিও বলছে, জ্বালানির সংকট হবে না। সরবরাহ নিরবচ্ছিন্ন রাখতে নানা পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। তবে বিশেষজ্ঞ ও খাতসংশ্লিষ্টরা ভরসা পাচ্ছেন না। ইতিমধ্যে এখনই দেশের বিভিন্ন স্থানে চরম গ্যাসসংকটের পাশাপাশি কোথাও কোথাও বিদ্যুতের লোডশেডিংও হচ্ছে।
বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (পিডিবি) হিসাবে এখন দেশে বিদ্যুতের চাহিদা গড়ে ১০ হাজার মেগাওয়াটের মধ্যে। শীতকাল হওয়ায় চাহিদা এখন কম। গরমে চাহিদা বাড়বে। জানুয়ারি থেকে মে মাস পর্যন্ত সেচ মৌসুম। এ সময়ে সেচের কারণে বিদ্যুতের চাহিদা বেশি থাকে। এ বছর সেচ মৌসুমেই শুরু হবে রোজা।
গত সেচ মৌসুমে বিদ্যুতের চাহিদা ছিল প্রায় ১৬ হাজার মেগাওয়াট। এ বছর তা ১৮ হাজার মেগাওয়াট ছাড়াবে বলে ধারণা। গত বছর বিদ্যুতের চাহিদা প্রায় ২ হাজার মেগাওয়াট কম থাকার পরও বিপুল পরিমাণ লোডশেডিং হয়েছে। ঘোষণা দিয়েই শুরু হয় লোডশেডিং। অর্থের অভাবে জ্বালানির ব্যবস্থা না হওয়ায় তীব্র বিদ্যুৎ চাহিদার মৌসুমেও গ্যাস, তেল ও কয়লাচালিত অনেক বিদ্যুৎকেন্দ্র বসিয়ে রাখতে হয়। এবারও অর্থের পাশাপাশি বৈদেশিক মুদ্রার সংকট থাকছে, তাই সংকট আরও গভীর হওয়ার শঙ্কা করছেন জ্বালানিসংশ্লিষ্টরা।
সরকারি হিসাবে এখন দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা প্রায় ২৬ হাজার মেগাওয়াট। জ্বালানিসংকট ও সঞ্চালন-বিতরণব্যবস্থার সীমাবদ্ধতার কারণে গত বছরের ১৯ এপ্রিলে সর্বোচ্চ ১৫ হাজার ৬৪৮ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদিত হয়েছে। এটিই দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ বিদ্যুৎ উৎপাদনের রেকর্ড।
গত সোমবার সচিবালয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ বলেন, ‘নিরবচ্ছিন্ন ও সাশ্রয়ী মূল্যে বিদ্যুৎ-জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা নতুন সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। প্রস্তুতি আমাদের আছে। তবে অর্থ বিভাগের সহযোগিতা লাগবে।’
বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি) যে পরিমাণ বিদ্যুৎ কিনছে তার বিল দিতে পারছে না গত বছরের এপ্রিল থেকে। রাষ্ট্রায়ত্ত এই সংস্থার কাছে বিভিন্ন বিদ্যুৎকেন্দ্রের বিল বাবদ প্রায় ৩০ হাজার কোটি টাকা বকেয়া। বেসরকারি খাতের বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর পাওনাই প্রায় ২৩ হাজার কোটি টাকা। গ্রীষ্মে তাদের কাছ থেকে চাহিদা অনুযায়ী বিদ্যুৎ পাওয়া যাবে কি না, সংশয় রয়েছে।
সেচ মৌসুমে প্রতিদিন সর্বোচ্চ ১ হাজার ৭৬০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস, ১ লাখ ৫৫ হাজার টন ফার্নেস অয়েল ও ১৫ হাজার ৬০০ টন ডিজেলের চাহিদা ধরা হয়েছে। এই চাহিদা পূরণ করা নিয়েও অনিশ্চয়তা রয়েছে।
এখনই গ্যাসসংকটের কারণে শিল্প-কারখানায় উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি বাসাবাড়িতেও রান্নাবান্নায় বিঘœ ঘটছে। সক্ষমতা থাকার পরও জ্বালানিসংকটের কারণে বর্তমানে বিদ্যুৎ উৎপাদন কম হচ্ছে প্রায় ৮ হাজার মেগাওয়াট। এমন অবস্থায় বিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য বাড়তি গ্যাস সরবরাহ দুরূহ হয়ে পড়বে। আবার বিদ্যুতে গ্যাস দিতে গেলে কারখানা ও বাসাবাড়িতে সংকট আরও বাড়বে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের জ্বালানি উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. এম শামসুল আলম মনে করেন, চাহিদা অনুযায়ী বিদ্যুৎ সরবরাহ করার সক্ষমতা সরকারের নেই। কারণ বিদ্যুৎ উৎপাদনের জ্বালানি সরবরাহ করতে সরকারের ডলার খরচের সক্ষমতা সীমিত হয়ে গেছে।
পেট্রোবাংলার সূত্রমতে, দেশের গ্যাসভিত্তিক সব বিদ্যুৎকেন্দ্র চালাতে দৈনিক অন্তত ২ হাজার ২৪১ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের দরকার। কিন্তু বর্তমানে সরবরাহ করা হচ্ছে ৮৩৬ মিলিয়ন ঘনফুট। সেচ মৌসুমে বিদ্যুতের চাহিদা পূরণ করতে আরও অন্তত ৯২৪ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস দরকার। গত বছর বিদ্যুৎ উৎপাদনে গ্যাসের চাহিদা এ বছরের চেয়ে কম (১৬০০ মিলিয়ন ঘনফুট) থাকা সত্ত্বেও প্রয়োজনীয় গ্যাস সরবরাহ করতে পারেনি সরকার। এতে বিদ্যুতের ভয়াবহ লোডশেডিং হয়। অন্যদিকে সারকারখানায় ৩২৯ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের চাহিদার বিপরীতে সরবরাহ করা হচ্ছে ২১৫ মিলিয়ন ঘনফুট। সেচ মৌসুমে সারকারখানা, শিল্পসহ অন্যান্য খাতে গ্যাস সরবরাহ কমিয়েও গতবারের মতো এবারও লোডশেডিংয়ের লাগাম টানা যাবে না বলে মনে করছেন খাতসংশ্লিষ্টরা।
দেশে প্রতিদিন ৪ হাজার ৩০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের চাহিদার বিপরীতে আমদানিসহ দেশীয় গ্যাসক্ষেত্র থেকে উৎপাদিত গ্যাসের পরিমাণ ২ হাজার ৫৬১ মিলিয়ন ঘনফুট; অর্থাৎ ১ হাজার ৭৪০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের সংকট রয়েছে। তবে দীর্ঘ মেয়াদে আমদানিকৃত ৫০০ মিলিয়ন ঘনফুট ক্ষমতার দুটি এলএনজি টার্মিনালের মধ্যে রক্ষণাবেক্ষণের কারণে একটি বন্ধ রয়েছে। রক্ষণাবেক্ষণ শেষ হলে সেখান থেকে আরও সর্বোচ্চ ৫০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা যাবে। এর বাইরে খোলাবাজার থেকে চড়া মূল্যে এলএনজি আমদানি করার ছাড়া কোনো উপায় নেই। কিন্তু সেই অর্থের জোগান নিয়েও রয়েছে শঙ্কা।
ঢাকা, গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জসহ বিভিন্ন এলাকার শিল্পমালিকরা জানিয়েছেন, গ্যাসসংকটের কারণে কোথাও কোথাও উৎপাদন এখনই অর্ধেকে নেমে এসেছে। অনেকের ব্যবসা বন্ধের উপক্রম। এমন পরিস্থিতিতে গ্রীষ্ম মৌসুমে এই সংকট আরও বাড়তে পারে এমন আশঙ্কায় শঙ্কিত তারা।
এ ছাড়া বিদ্যুৎকেন্দ্রে গ্যাস দিতে গিয়ে সারকারখানার উৎপাদন কমে গেলে কৃষিতে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
শিল্পের পাশাপাশি বাসাবাড়িতেও গ্যাসসংকট প্রকট আকার ধারণ করেছে। অধিকাংশ এলাকায় দিনের বেশিরভাগ সময় গ্যাস থাকছে না। কোথাও থাকলেও চাপ এত কম যে চুলা জ্বালে না।
রাজধানীর মিরপুর ১ নম্বরের বাসিন্দা রাজন দেশ রূপান্তরকে বলেন, পাইপলাইনের গ্যাসের সংযোগ না পেয়ে তিনি তার বাসায় এলপিজি সিলিন্ডার ব্যবহার করেন। কিন্তু তার ভবনের অনেকের বাসায় রয়েছে তিতাসের গ্যাসসংযোগ। কয়েক দিন ধরেই তার এলাকায় গ্যাসসংকট চরম আকার ধারণ করেছে।
সারা দিন বাসায় গ্যাস না থাকায় ভোররাতে উঠে দিনের রান্না শেষ করতে হয় লালবাগের বাসিন্দা রাহেলা বেগমকে। তিনি বলছিলেন, এই শীতের রাতে উঠে সারা দিনের রান্না করা আসলেই খুব কষ্টকর। প্রচ- ঠান্ডার মধ্যে ঠান্ডা-বাসি খাবারই খেতে হচ্ছে প্রতিদিন। একটু গরম করারও সুযোগ নেই।
পেট্রোবাংলা সূত্র জানিয়েছে, সংকট কাটাতে আন্তর্জাতিক খোলাবাজার থেকে এলএনজি আমদানির পরিকল্পনা করা হয়েছে। আগামী জুন পর্যন্ত ১৬১ কোটি ডলারে ৩৬ কার্গো এলএনজি আনতে চায় পেট্রোবাংলা। ডলারসংকটের কারণে তা অনিশ্চিত।
বর্তমানে দেশে দুটি এলএনজি টার্মিনালের পেছনে প্রতি মাসে গড়ে দেড় লাখ ডলার ও এলএনজি আমদানি বাবদ আরও ৫ কোটি ডলার পরিশোধ করতে হয়। সব মিলে আগামী মে মাস পর্যন্ত প্রায় ২০০ কোটি ডলার দরকার। এই অর্থ চেয়ে ডিসেম্বরের শেষ দিকে অর্থ মন্ত্রণালয়ে পেট্রোবাংলা চিঠি দিলেও এর সুরাহা এখনো হয়নি।
বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘বিদ্যুৎ খাতে যে সমস্যা ছিল তা কাটিয়ে উঠেছি। সেচ মৌসুমে বিদ্যুতের চাহিদা ১৮ হাজার মেগাওয়াট ছাড়াবে, তার প্রস্তুতিও রয়েছে। গত কয়েক মাস জ্বালানির কিছুটা সমস্যা ছিল; বিশেষ করে জেট ফুয়েলে কিছু অসুবিধা ছিল। এর সমাধান করে ফেলেছি। সেচ মৌসুমে জ্বালানিতে সমস্যা হবে না।’
ডলারসংকটে জ্বালানিকাঠামো ভেঙে পড়তে পারে এমন আশঙ্কার বিষয়ে তিনি বলেন, ‘পড়বে না, তবে কিছু সংকট তো আছেই। সেটা আমরা ম্যানেজ করছি। আশা করছি আগামী ছয়-সাত মাসে ভালো অবস্থানে চলে যাব। আমি মনে করি, সংকট পুরো না কাটলেও পরিস্থিতি তেমন খারাপের দিকে যায়নি।’
জ্বালানি বিভাগ বলছে, ফার্নেস অয়েল ও ডিজেলের ঘাটতি নেই, চাহিদা অনুপাতেই সরবরাহ হবে। বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্রগুলোতে অন্যূন দুই মাসের উৎপাদন ক্ষমতার জন্য জ্বালানির মজুদ নিশ্চিত করার তাগিদ দিয়েছে বিদ্যুৎ বিভাগ।
কিন্তু ডলারসংকটের কারণে জ্বালানি তেল সরবরাহকারী আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর বিল পরিশোধ নিয়ে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) বিপাকে পড়েছে। বকেয়া পরিশোধে চাপ দিচ্ছে বিদেশি কোম্পানিগুলো। বিপিসির হাতে নগদ টাকা থাকলেও ডলারের অভাবে জ্বালানি তেল আমদানির ঋণপত্র নিয়মিত দিতে পারছে না। সরকারের ঊর্ধ্বতন মহলের হস্তক্ষেপে সম্প্রতি ডলার ছাড় করা শুরু হলেও তা চাহিদাসাপেক্ষে নগণ্য। এক মাসে ১৩৫ মিলিয়ন ডলার পেয়েছে বিপিসি।
ডলারসংকটের সমাধান করতে অর্থ বিভাগ ও বাংলাদেশ ব্যাংক প্রায়ই আলোচনা করছে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে। কিন্তু প্রয়োজনীয় ডলার মিলছে না। বিল দেরিতে পরিশোধের কারণে নিয়মিত জরিমানাও গুনতে হচ্ছে। অনিশ্চয়তা থাকায় আন্তর্জাতিক ব্যাংকগুলো ঋণপত্রে নানা শর্ত দিচ্ছে। এতে আমদানি খরচ বেড়ে যাচ্ছে। সময়মতো অর্থ পরিশোধ না করায় জ্বালানি তেল সরবরাহকারী কয়েকটি আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান জাহাজ পাঠানো বন্ধ করে দিয়েছে।
গত ডিসেম্বরে ১০টি তেলের জাহাজ পাঠানোর কথা ছিল সংশ্লিষ্টদের। বিল-জটিলতায় ৫টি জাহাজ বিলম্বে এসেছে বলে সূত্র জানিয়েছে।
বিপিসির কাছে প্রায় ২৫০ মিলিয়ন ডলার পায় জ্বালানি তেল সরবরাহক বিদেশি প্রতিষ্ঠানগুলো। এ ছাড়া ইসলামিক ট্রেড ফাইন্যান্স করপোরেশনের ঋণের কিস্তি হিসেবে ৩৫.৫৬ মিলিয়ন ডলার বকেয়া জমেছে। এসব পাওনার অধিকাংশই সোনালী ব্যাংকে আটকে আছে। জনতা ব্যাংক, রূপালী ব্যাংক এবং অগ্রণী ব্যাংকও ডলার দিতে পারছে না।
গত বছর জ্বালানি বিভাগকে জানানো হয়েছে, বকেয়ার কারণে সরবরাহক প্রতিষ্ঠানগুলো জ্বালানি বিলম্বে সরবরাহ করার বা বাতিলের প্রস্তাব করছে। অনুরোধ জানিয়েও লাভ হচ্ছে না। কেউ কেউ জাহাজ আসার তারিখ পিছিয়ে দিচ্ছে।
দেড় বছর ধরে জ্বালানি তেলের বিল পরিশোধে নিয়মিত ডলার পাচ্ছে না বিপিসি। বিকল্প হিসেবে চীনের সঙ্গে ইউয়ান ও ভারতের সঙ্গে রুপিতে বিল পরিশোধে গত মে মাসে মন্ত্রণালয়কে প্রস্তাব দেয় বিপিসি। এটি এখনো চূড়ান্ত হয়নি।
জ্বালানির সিংহভাগই আমদানিনির্ভর। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে দফায় দফায় এই পণ্যের বাজার ওঠানামা করেছে। এখন স্থিতিশীল থাকলেও গাজা যুদ্ধ জ্বালানি তেলের বাজারকে অস্থির করে তুলতে পারে। রিজার্ভ থেকে ডলার মিললেও নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি অনিশ্চিতই থাকছে।
