গ্যাস চাই গ্যাস নাই

বেশি দামেও মেলে না শিল্পে

আপডেট : ১৭ জানুয়ারি ২০২৪, ০৩:১২ এএম

শিল্প-কারখানায় নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস সরবরাহের কথা বলে গত বছরের শুরুতে গ্যাসের দাম রেকর্ড পরিমাণ ১৭৯ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানো হলেও সংকট দূর হয়নি। উল্টো ভয়াবহ গ্যাস সংকটে কারখানার উৎপাদন কমেছে ৪০ থেকে ৫০ শতাংশ। গ্যাস না থাকায় একটি সার কারখানা বন্ধ হওয়ার পাশাপাশি বাকিগুলোও ধুঁকছে। আর সিএনজি স্টেশনের ব্যবসা বন্ধ হওয়ার উপক্রম।

অন্যদিকে গ্যাসের অভাবে অনেক বিদ্যুৎকেন্দ্রের উৎপাদন ব্যাহত হওয়ায় এ শীতেও দেশের বিভিন্ন স্থানে বিদ্যুতের লোডশেডিংয়ের খবর পাওয়া গেছে।

ভয়াবহ এ পরিস্থিতি থেকে সহসা মুক্তির কোনো আশা দেখা যাচ্ছে না এখন পর্যন্ত। যদিও সরকারের তরফ থেকে বলা হচ্ছে, এ সংকট সাময়িক। গ্যাস সরবরাহ বাড়ানোর চেষ্টা চলছে।

বিশেষজ্ঞ ও খাতসংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, সরকারের অতিমাত্রায় আমদানিপ্রীতির কারণে এ সংকট তৈরি হয়েছে। ফলে সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও দীঘদিন ধরে গ্যাস অনুসন্ধানে চরম অবহেলার কারণে দেশি গ্যাসের উৎপাদন কমছে। উচ্চমূল্যের এলএনজি আমদানি করতে বিপুল পরিমাণ যে ডলারের প্রয়োজন, তাও সরকারের হাতে নেই। ফলে সংকট আরও বাড়বে। বর্তমানে দেশে গ্যাসের চাহিদা রয়েছে প্রায় ৪ হাজার ৩০০ মিলিয়ন ঘনফুট। বিপরীতে গড়ে সরবরাহ করা হচ্ছে মাত্র ২৫৫০ মিলিয়ন ঘনফুট। এর মধ্যে ৫০০ মিলিয়ন ঘনফুট পাওয়া যাচ্ছে আমদানিকৃত এলএনজি থেকে।

শিল্প-কারখানায় প্রয়োজনীয় চাপে এবং চাহিদামতো গ্যাস না পাওয়ার অভিযোগ দীর্ঘদিনের। বছরের অন্যান্য সময় গ্যাসের সংকট বেশি থাকলেও শীতকালে বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোতে ব্যবহার কমে যাওয়ায় কিছুটা স্বস্তি মেলে। কিন্তু এবার শীতের শুরুতেই ভয়াবহ সংকট তৈরি হয়েছে। বিকল্প উপায়ে উৎপাদন স্বাভাবিক রাখতে গিয়ে ব্যয় বেড়ে গেছে ২ থেকে ৩ গুণ।

কারখানায় গ্যাসের সরবরাহ স্বাভাবিক রাখার অনুরোধ জানিয়ে গত ৫ ডিসেম্বর পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যানকে চিঠি দিয়েছে নিট পোশাক শিল্পমালিকদের সংগঠন বিকেএমইএ। প্রধানমন্ত্রীর জ্বালানি উপদেষ্টা ড. তৌফিক-ই-ইলাহী চৌধুরী, বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদসহ সংশ্লিষ্টদের কাছে ওই চিঠির অনুলিপি পাঠানো হয়। কিন্তু কেউ কোনো আশ্বাস দিতে পারেননি।

পেট্রোবাংলার কর্মকর্তারা জানান, দেশীয় গ্যাসের উৎপাদন কমতে থাকায় এমনিতেই দেশে গ্যাস সংকট। তার ওপর আবার দুটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনালের মধ্যে একটি রক্ষণাবেক্ষণ কাজের জন্য বন্ধ রয়েছে। চাইলেও এলএনজি আমদানি বাড়ানো যাচ্ছে না। এ মাসের মধ্যেই রক্ষণাবেক্ষণ শেষে টার্মিনালটি ব্যবহার উপযোগী হবে। তখন আবার শুরু হবে দ্বিতীয় টার্মিনালের রক্ষণাবেক্ষণ। ফলে সংকট থেকেই যাবে। আগামী মার্চে দুটো টার্মিনালই একসঙ্গে ব্যবহার করা যাবে। তখন প্রতিদিন আরও ৫০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ বাড়ানোর সক্ষমতা তৈরি হবে। কিন্তু এই গ্যাস বিদেশ থেকে আমদানি করতে যে পরিমাণ অর্থের দরকার, তা এখন পর্যন্ত জোগাড় হয়নি।

বিকেএমইএ তাদের চিঠিতে উল্লেখ করেছে, রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে এমনিতেই পুরো শিল্প খাতে বিরূপ প্রভাব পড়েছে। এর সঙ্গে কাঁচামালের মূল্যবৃদ্ধি এবং গ্যাসের সংকটের কারণে উৎপাদন ব্যয় অনেক বেড়ে গেছে। গ্যাস সংকটের কারণে কারখানা চালু রাখা যাচ্ছে না।

ব্যবসায়ী নেতারা বলছেন, একটি মধ্যম মানের কারখানায় প্রতিদিন ৬ থেকে ৮ লাখ টাকার বাড়তি ডিজেল ব্যবহার করতে হচ্ছে। আর প্রথম সারির কারখানায় এর পরিমাণ ১২ থেকে ১৪ লাখ টাকারও মতো। অনেক কারখানার মালিকের বিপুল পরিমাণ এ ডিজেল কেনার সামর্থ্যও নেই। নিট শিল্পে প্রায় ১৫ লাখ শ্রমিক কর্মরত রয়েছেন। আর পরোক্ষভাবে কাজ করছেন আরও ৭০ হাজার মানুষ। উৎপাদন কমে যাওয়ায় শ্রমিকদের কর্মঘণ্টা সীমিত হওয়ায় তাদের আয়ও কমে গেছে। অনেক কারখানার মালিক ঠিকমতো বেতন দিতে পারছেন না। এতে বড় ধরনের শ্রমিক অসন্তোষের আশঙ্কা করছেন তারা।

বিকেএমইএর নির্বাহী সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সরকার নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস দেওয়ার কথা বলে গ্যাসের দাম বাড়িয়েছিল। আমরা সেটা মেনে নিয়েছি। কিন্তু এখন গ্যাস পাচ্ছি না। কারখানার উৎপাদন অনেক কমে গেছে। সময়মতো পণ্য সরবরাহ করা যাচ্ছে না। শিপমেন্ট শিডিউল ফেইল করার কারণে ক্রেতারা ত্যক্ত-বিরক্ত হয়ে অর্ডার বাতিলের হুঁশিয়ারি দিয়েছেন।’

তিনি বলেন, ‘সমস্যা সমাধানে সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তরে একাধিকবার জানানোর পরও কেউ কোনো আশ্বাস দিতে পারেনি। তারা বলেছেন, ২০২৬ সালের আগে এ সংকট সমাধানের কোনো উপায় তাদের কাছে নেই।’

জ্বালানি বিভাগ সূত্রমতে, আপাতত গ্যাসের সরবরাহ বাড়ানোর কোনো উপায় তাদের হাতে নেই। ২০২৬ সাল নাগাদ ৪৬টি কূপ খনন ও সংস্কারের সে পরিকল্পনা নিয়েছে তাতে সফল হলে ৬১৮ মিলিয়ন ঘনফুট নতুন গ্যাস পাওয়া যেতে পারে। ইতিমধ্যে বেশ কয়েকটা কূপে গ্যাসের সন্ধানও মিলেছে। পাশাপাশি আরও এলএনজি আমদানির জন্য সরকার যে চুক্তি করেছে, তাতেও ২০২৬ সালের আগে নতুন গ্যাস আমদানির কোনো সুযোগ নেই। এ কারণেই কর্মকর্তারা আশা করছেন, ২০২৬ সালে পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক হতে পারে।

জ্বালানি বিভাগের একাধিক কর্মকর্তা বলছেন, পরিকল্পনা অনুযায়ী কূপ খনন ও সংস্কার করে কাক্সিক্ষত গ্যাস পাওয়া যাবে কি না, সেটা এখনই বলা মুশকিল। তাছাড়া নতুন করে উচ্চমূল্যের এলএনজি আমদানি করতে যে বিপুল পরিমাণ ডলার দরকার সেটি জোগাড় করা না গেলে আমদানি ব্যাহত হবে। এ সময়ে দেশের পুরনো কূপ থেকে গ্যাসের উৎপাদন কমে যাওয়ার পাশাপাশি দেশে চাহিদাও বেড়ে যেতে পারে। ফলে চলমান সংকট কতটা দূর হবে তা নিয়েও সংশয় রয়েছে।

বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশনের পরিচালক হোসেন মেহমুদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এমনও দিন আছে যেদিন ২২ ঘণ্টা পর্যন্ত গ্যাস পাওয়া যায় না। গ্যাস থাকলেও এর চাপ এতই কম থাকে, যা দিয়ে উৎপাদন করা যায় না। এতে পণ্যের গুণগত মান নষ্ট হচ্ছে। ‘ওয়েস্টেজের’ (অপচয়) পরিমাণও বেড়ে যাচ্ছে। অন্তত ৪০ শতাংশ উৎপাদন কমে গেছে গ্যাস সংকটের কারণে।

তিনি বলেন, ‘গ্যাস না পাওয়ার কারণে আগের চেয়ে অর্ডার নেওয়া কমিয়ে দিয়েছি। এরপরও সময়মতো পণ্য সরবরাহ করা যাচ্ছে না। এতে বাজার নষ্ট হচ্ছে। অনেক সময় জরিমানা গুনতে হচ্ছে। সামগ্রিকভাবে মারাত্মক ক্ষতির শিকার হচ্ছেন ব্যবসায়ীরা।’

রড তৈরির অন্যতম প্রতিষ্ঠান বিএসআরএমের উপব্যবস্থাপনা পরিচালক তপন সেন গুপ্ত বলেন, ‘চাহিদার তুলনায় আমরা ৬০ শতাংশের মতো গ্যাস পাচ্ছি। বাকি চাহিদা মেটাতে ফার্নেস ওয়েল এবং ডিজেল মিলিয়ে ব্যবহার করা হচ্ছে। গ্যাসের দাম ৩০ টাকা, সেখানে তেলের দাম ১০৫ টাকা। ফলে ব্যয় অনেক বেড়ে গেছে।’ গত এক মাস ধরে চাহিদামতো গ্যাস পাচ্ছেন না বলে তিনি জানান।

গ্যাস সংকটের কারণে এমনিতেই দীর্ঘদিন ধরে স্টেশনগুলোতে প্রতিদিন সন্ধ্যা ৬টা থেকে রাত ১১টা পর্যন্ত গ্যাস সরবরাহ পুরোপুরি বন্ধ রাখা হয়। কিন্তু বর্তমানে সংকটের কারণে অন্য সময়েও ঠিকমতো গ্যাস পাওয়া যায় না। আবার গভীর রাতে যখন গ্যাস থাকে তখন পরিবহনে গ্যাস নেওয়ার ক্রেতার সংখ্যা একেবারেই কমে যায় বলে জানিয়েছেন এ খাতের উদ্যোক্তারা।

সিএনজি ফিলিং স্টেশন অ্যান্ড কনভারশন ওয়ার্কশপ ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের মহাসচিব ফারহান নূর দেশ রূপান্তরকে বলেন, সরকার ঘোষিত বন্ধের সময়ের বাইরেও গ্যাসের অভাবে সকাল ৭টা থেকে দুপুর আড়াইটা ৩টা পর্যন্ত বেশিরভাগ স্টেশন বন্ধ থাকে। দুপুরের দিকে আর গভীর রাতে কিছুটা গ্যাস পাওয়া গেলেও কাক্সিক্ষত চাপ থাকে না। ফলে মেশিন চালানো যায় না। আবার চাপ কম থাকার কারণে ক্রেতারও লোকসান হয়।

গ্যাস সংকটের কারণে গত সোমবার জামালপুরের তারাকান্দির যমুনা সার কারখানায় উৎপাদন বন্ধ হয়ে গেছে। প্রতিদিন ১ হাজার ৭০০ টন ইউরিয়া সার উৎপাদন হয় এ কারখানায়। আরও অন্তত চারটি কারখানার সার উৎপাদন কমে গেছে।

কৃষি অর্থনীতিবিদরা বলছেন, সার উৎপাদন ব্যাহত হলে খাদ্য সংকটের আশঙ্কা রয়েছে। আবার কৃষি উৎপাদন ঠিক রাখতে গেলে সার আমদানিতে ব্যয় বাড়বে যার নেতিবাচক প্রভাব পড়বে সমগ্র অর্থনীতিতে।

চট্টগ্রামে আমাদের নিজস্ব প্রতিবেদক ভূঁইয়া নজরুল জানান, কোনো কোনো শিল্প গ্রুপ গ্যাসের অভাবে কমিয়ে দিয়েছে উৎপাদন। ইস্পাত কারখানাগুলোতে ১০ থেকে ২০ শতাংশ উৎপাদন কম হচ্ছে। গ্যাস সংকটে প্রতিটন রডের উৎপাদন খরচ বেড়ে গেছে এক হাজার টাকা করে।

চিটাগাং চেম্বার অব কমার্সের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, শুধু সীতাকু- এলাকায় ৫৪০টি শিল্প-কারখানা রয়েছে। ছোট কারখানাগুলোতে গ্যাসের সংকট এত তীব্র না হলেও বড় কারখানাগুলোতে গ্যাসের চাহিদা বেশি হওয়ায় সমস্যাও বেশি হচ্ছে।

শিল্পমালিকদের উদ্ধৃতি দিয়ে নারায়ণগঞ্জ প্রতিনিধি কমল খান জানান, গ্যাস সংকটের কারণে নারায়ণগঞ্জের ৪৫০টি ডায়িংসহ শিল্প-কারখানায় কাজ করতে পারছেন না শ্রমিকরা।

ফতুল্লা শিবু মার্কেট এলাকার পানামা টেক্সের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. জাকির হোসেন জানান, নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস সরবরাহের আশ্বাস দিয়ে প্রতি ইউনিট ১১ থেকে বাড়িয়ে ৩০ টাকা করা হয়েছে। তারপরও গ্যাস সরবরাহ করতে পারছে না। গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক না থাকায় পণ্য বিদেশে রপ্তানি অর্ধেকে নেমেছে।

বাংলাদেশ নিটিং অ্যান্ড ডাইং অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মাহবুবুর রহমান স্বপন বলেন, যার উৎপাদনক্ষমতা বা ডায়িং ক্যাপাসিটি ৩০ টন ফেব্রিকস, তিনি উৎপাদন করছেন মাত্র এক বা দুই টন।

গাজীপুর প্রতিনিধি মো. আমিনুল ইসলাম জানিয়েছেন, শিল্প-অধ্যুষিত গাজীপুরের বিভিন্ন শিল্প-কারখানায় বেশ কিছুদিন ধরে তীব্র গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকট দেখা দিয়েছে। এতে কারখানার উৎপাদন নেমে দাঁড়িয়েছে অর্ধেকে।

কেয়া কসমেটিকস লিমিটেডের প্রশাসনিক কর্মকর্তা মো. শওকত আলম বলেন, গ্যাসের অভাবে অনেক সময় কিছু মেশিন বন্ধ রাখতে হয়। ভর্তুকি দিয়ে কাঁচামাল সংগ্রহ এবং ভেতন-ভাতা দিতে হচ্ছে প্রতিষ্ঠানকে।

সাভার (ঢাকা) প্রতিনিধি ওমর ফারুক জানান, বিভিন্ন কারখানায় গ্যাসের পরিবর্তে ডিজেল ব্যবহার করে উৎপাদন অব্যাহত রাখার চেষ্টায় বেড়েছে উৎপাদন ব্যয়।

ভালুকা (ময়মনসিংহ) প্রতিনিধি শাহ মো. আলী আজগর জানান, সেখানকার অনেক কারখানায় উৎপাদন প্রায় ৭০ শতাংশ কমে গেছে। প্রতিদিন সন্ধ্যা ৬টা থেকে সকাল ৬টা পর্যন্ত গ্যাস সরবরাহ বন্ধ থাকে। আবার দিনের বেলায় গ্যাস থাকলেও চাপ কম থাকায় যন্ত্রপাতি ঠিকমতো চালানো যাচ্ছে না। ব্যবসায়ীদের অনেকেই তাদের কারখানা বন্ধ করার কথা চিন্তা করছেন।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত