মেটলাইফ স্টেডিয়ামে বিশ্বসেরা হওয়ার চূড়ান্ত লড়াইয়ে স্পেনের কাছে আর্জেন্টিনার ১-০ গোলের হার কেবল মাঠের লড়াইয়েই সীমাবদ্ধ ছিল না; ম্যাচ শেষে আলোচনার বড় অংশজুড়ে রয়েছে স্লোভেনিয়ান রেফারি স্ল্যাভকো ভিনচিচের কিছু বিতর্কিত সিদ্ধান্ত। কাতার বিশ্বকাপে সৌদি আরবের বিপক্ষে আর্জেন্টিনার সেই ঐতিহাসিক হারের ম্যাচেও বাঁশি ছিল এই ৪৬ বছর বয়সীর হাতে। আর এবার ফাইনালের মতো হাই-ভোল্টেজ ম্যাচে তার দুটি বড় সিদ্ধান্ত নিয়ে ফুটবল বিশ্বে শুরু হয়েছে তুমুল বিতর্ক, যা দেখে অনেকেরই মনে হয়েছে বিশ্বকাপ ফাইনালের মতো বিশাল মঞ্চের চাপ হয়তো পুরোপুরি সামলাতে পারেননি উয়েফা চ্যাম্পিয়ন্স লিগের ফাইনাল পরিচালনা করা এই অভিজ্ঞ রেফারি।
ম্যাচের সবচেয়ে বড় নাটকীয়তা মঞ্চস্থ হয় অতিরিক্ত সময়ের প্রথমার্ধে (৯৬ মিনিটে)। এমি মার্তিনেসের হাত থেকে ফস্কে যাওয়া ফিরতি বল ফাঁকা জালে জড়িয়ে স্প্যানিশ উইঙ্গার নিকো উইলিয়ামস যখন উল্লাসে মাতোয়ারা, তখনই ভিনচিচ বাঁশি বাজিয়ে গোলটি বাতিল করে দেন। রেফারির দাবি ছিল, বিল্ড-আপের সময় আর্জেন্টিনার ডিফেন্ডার নিকোলাস ওতামেন্দির পায়ে আলতো পাড়া (ফাউল) দিয়েছিলেন মিকেল মেরিনো।
ভিএআর দ্রুত এই সিদ্ধান্ত পরীক্ষা করে অন-ফিল্ড রেফারির রায়কেই বহাল রাখে, কারণ মেরিনোর পা ওতামেন্দির পায়ে লেগেছিল। তবে সাবেক ফিফা রেফারি ও পিজিএমওএল প্রধান কিথ হ্যাকেট এই সিদ্ধান্তের তীব্র সমালোচনা করে বলেন, ‘সিদ্ধান্তটি অত্যন্ত কঠোর ছিল। ফুটবল ম্যাচে এমন বুটের ওপর বুট পড়ার ঘটনা প্রায়ই ঘটে, যা শাস্তিহীন থেকে যায়। এখানে ভিএআরের হস্তক্ষেপ করা উচিত ছিল এবং গোলটি বহাল রাখা দরকার ছিল।’ প্রিমিয়ার লিগের সাবেক রেফারি অ্যান্ডি ডেভিসও একমত হয়ে জানান, ওতামেন্দি স্পর্শটুকুকে অতিরঞ্জিত করে ফুটিয়ে তুলেছিলেন এবং রেফারি তাতেই প্রলুব্ধ হন; সিদ্ধান্তটি নিঃসন্দেহে ‘সফট’ ছিল।
ম্যাচের দ্বিতীয় বিতর্কটি দানা বাঁধে অতিরিক্ত সময়ের ষষ্ঠ মিনিটে (১০৪ মিনিটে), যখন আর্জেন্টিনার মিডফিল্ডার এনজো ফার্নান্দেজকে দ্বিতীয় হলুদ কার্ড (লাল কার্ড) দেখিয়ে মাঠছাড়া করা হয়। স্পেনের পাউ কুবার্সিকে একটি বিপজ্জনক ও লেট-ট্যাকল করার অপরাধে এই কার্ডটি সম্পূর্ণ সঠিক ছিল এবং ভিএআর-ও দ্রুত তা নিশ্চিত করে। এনজো বলের কোনো নাগাল পাননি এবং প্রতিপক্ষের সুরক্ষার তোয়াক্কা না করেই চ্যালেঞ্জটি করেছিলেন।
তবে বিতর্ক তৈরি হয়েছে এনজোর পাওয়া ম্যাচের প্রথম হলুদ কার্ডটি নিয়ে। ৮২ মিনিটে নিজের ওপর হওয়া একটি ফাউল রেফারি এড়িয়ে যাওয়ায় প্রতিবাদ করেছিলেন এই আর্জেন্টাইন। ফাইনালের মতো ম্যাচে স্রেফ প্রতিবাদের কারণে ভিনচিচের অমন চটজলদি কার্ড দেখানোটা বড্ড বেশি কঠোর ছিল বলে মনে করেন অনেকেই। আর সেই আলগা প্রথম কার্ডটির মাশুলই শেষ পর্যন্ত আর্জেন্টিনাকে দিতে হয়েছে ১০ জনের দলে পরিণত হয় ৯২ মিনিটে, যা আর্জেন্টিনাকে ভারসাম্যহীন করে দেয়।
ভিনচিচের বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় অভিযোগ তিনি ম্যাচের শুরু থেকে কার্ড দেওয়ার ক্ষেত্রে এক এক সময়, এক এক রূপ দেখিয়েছেন। একদিকে প্রতিবাদের কারণে এনজোকে বুকড করলেন, অন্যদিকে ম্যাচের শুরুতে লিওনেল মেসিকে ধাক্কা দেওয়ার পরও স্পেনের অ্যালেক্স বায়ানাকে সতর্ক করেই ছেড়ে দিলেন।
একই সুবিধা পেয়েছেন আর্জেন্টিনার লিয়ান্দ্রো পারেদেসও। প্রথমার্ধের পর মাঠে নেমে শুরুতেই হলুদ কার্ড দেখার পরও বারবার ফাউল করে পার পেয়ে যান তিনি, যা স্প্যানিশ শিবিরকে ক্ষুব্ধ করে তোলে। একই রক্ষণাত্মক কৌশলে বারবার ফাউল করেও পার পেয়ে যান আলেক্সিস মাক অ্যালিস্টার। কার্ড দেওয়ার এই দ্বিমুখী নীতি ও অসঙ্গতি ম্যাচজুড়ে খেলোয়াড়দের স্নায়ুকে উত্তেজিত করে তুলেছিল, যার চূড়ান্ত প্রতিফলন দেখা গেছে ম্যাচ শেষের অনাকাক্সিক্ষত হাতাহাতি ও মুষ্টিযুদ্ধে।
যদিও ফেররান তোরেসের ১০৬ মিনিটের জয়সূচক গোলের কারণে রেফারির ভুলগুলো ম্যাচের চূড়ান্ত ফলাফলে সরাসরি প্রভাব ফেলেনি। পরিসংখ্যানও বলছে, পুরো ম্যাচে ৬৫% বল পজিশন ও ২০টি শট নিয়ে স্পেনের জয়টাই ছিল পুরোপুরি প্রাপ্য, যেখানে আর্জেন্টিনার প্রথম শটটিই এসেছে ১২১ মিনিটে। তবে রেফারিংয়ের এই অসঙ্গতি ফুটবল বোদ্ধাদের মনে এই প্রশ্নটি রেখেই দিল) মেটলাইফ স্টেডিয়ামের এই ফাইনালটি কি ভিনচিচের সামর্থ্যরে চেয়ে একটু বেশিই বড় মঞ্চ ছিল?