কংগ্রেসের দায় দেনা ও পরিণতি

আপডেট : ২৯ জানুয়ারি ২০২৪, ১২:৩১ এএম

ভারত সাংবিধানিকভাবে ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র। আগামী মে মাসে ভারতের জাতীয় নির্বাচন। এ কথা আর নতুন করে বলবার কিছু নেই ভারতে ক্ষমতাসীন বিজেপি এমন পরিস্থিতি তৈরি করেছে যে সেখানে ধর্ম ছাড়া রাজনীতি যাচ্ছে না। বিজেপিকে টক্কর দিতে নিজেকে ঐতিহাসিকভাবে সেক্যুলার দল বলে দাবি করা কংগ্রেসও ‘নরম হিন্দুত্ববাদ’ গ্রহণ করছে বলে সমালোচনা আছে। কিন্তু ভারতের আজকের পরিস্থিতির জন্য কে দায়ী! সবাই বিজেপির দিকে আঙুল তুললেও কংগ্রেস কি স্বাধীন ভারতের রাজনীতিতে ধর্মীয় অসহিষ্ণুতার দায় এড়াতে পারে!

১৯৯১ সালে ক্ষমতায় এসে কংগ্রেস একজন নন-হিন্দিভাষী রাজনীতিবিদ তেলেঙ্গানার পিভি নরসিমহা রাওকে প্রধানমন্ত্রী করে। সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের ফলে তার সরকার অর্থনীতিতে সংস্কার আনে। পারমাণবিক বোমার প্রস্তুতিও ভারত তার সরকারের আমলে নেয়। কিন্তু তার সরকারের আমলেই হিন্দুত্ববাদীরা গুঁড়িয়ে দেয় ঐতিহাসিক বাবরি মসজিদ। অন্যদিকে রাজীব গান্ধী যখন প্রধানমন্ত্রী তখন বাবরি মসজিদের চাবি তুলে দেওয়া হয় হিন্দুদের হাতে।

বাবরি মসজিদ থেকে রাম মন্দির : ভারত স্বাধীনতা পাওয়ার ঠিক দুই বছর পর ১৯৪৯ সালের ২২ ডিসেম্বর হঠাৎ বাবরি মসজিদে কেউ একজন ‘রামলালা’র (শিশু রামচন্দ্র) মূর্তি রেখে আসে। হিন্দুরা দলে দলে পূজা করতে আসে। সদ্যস্বাধীন ভারতের প্রধানমন্ত্রী জহরলাল নেহরু ও তার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বল্লভভাই প্যাটেল দুজনই মসজিদের ভেতর থেকে মূর্তিটি সরিয়ে ফেলতে চাইলেও উত্তরপ্রদেশের কংগ্রেসের মুখ্যমন্ত্রী ও প্রভাবশালী ব্রাহ্মণ নেতা গোবিন্দবল্লভ পন্থের আপত্তিতে তা সম্ভব হয়নি। তবে বিতর্কিত স্থান চিহ্নিত করে মসজিদে তালা ঝুলিয়ে দেওয়া হয়।

কিন্তু ১৯৮৪ সালে রামমন্দির গড়ার লক্ষ্যে বিশ্ব হিন্দু পরিষদ কমিটি তৈরি করে। বিজেপি নেতা লালকৃষ্ণ আদভানিকে সামনে রেখে সে আন্দোলন চাঙ্গা করার সিদ্ধান্ত হয়। এরই মধ্যে ১৯৮৬ সালের ১ ফেব্রুয়ারি ফৈজাবাদ ডিস্ট্রিক্ট সেশন জজ কে.এম পা-ে এক রায়ে হিন্দুদের বাবরি মসজিদের চাবি হস্তান্তরের পক্ষে রায় দেন। তখন কেন্দ্র ও রাজ্য ক্ষমতায় কংগ্রেস। ভারতের প্রধানমন্ত্রী রাজীব গান্ধী আর উত্তরপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী বীর বাহাদুর সিং। একটি বিতর্কিত ইস্যুতে সরকারের কোনো সংকেত ছাড়াই বিচারক এই রায় দিয়েছেন কি না, তা নিয়ে আলোচনা আছে। প্রসঙ্গত, মনে রাখা যেতে পারে যে, রাজীব গান্ধীর প্রধানমন্ত্রিত্বকালেই রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে ১৯৮৭-৮৮ সালে রামায়ণের কাহিনির ওপর নির্মিত টানা ৭৮ এপিসোডের ‘রামায়ণ’ প্রচারিত হয়। এই ‘রামায়ণ’ এতই জনপ্রিয় ছিল যে এটা প্রচারকালে রাস্তা জনশূন্য হয়ে যেত। 

যাই হোক মসজিদের তালা খুলে দিয়ে হিন্দুদের প্রবেশাধিকার দেওয়ার প্রতিবাদে ওই রায় ঘোষণার ঠিক দু’সপ্তাহ পর ১৯৮৬ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি ভারতের মুসলিমরা দেশ জুড়ে ‘কালা দিবস’ পালন করেন। অন্যদিকে, লালকৃষ্ণ আদভানির নেতৃত্বে ‘রথযাত্রা’র প্রস্তুতি শুরু হয়। ১৯৯০ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর গুজরাটের সোমনাথ মন্দির থেকে শুরু করে দেশের আটটি রাজ্যে ৬০০০ মাইল পথ পাড়ি দিয়ে রামের জন্মস্থান অযোধ্যা পর্যন্ত এই ‘রথযাত্রা’র আয়োজন করা হয়। রথযাত্রাটি ১ অক্টোবর অযোধ্যায় বাবরি মসজিদের মুখে পৌঁছলে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষ বাধে কট্টর হিন্দুদের। মূলত সেদিনের সংষর্ষ বলে দিচ্ছিল তারা যেকোনো সময় বাবরি মসজিদ ভেঙে ফেলার জন্য প্রস্তুত। তবে এই রথযাত্রাকে বিহারের তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী লালু প্রসাদ যাদব বিহারের অংশে আটকে দিয়েছিলেন জাতীয় নিরাপত্তা আইনে। তিনি স্বাধীন ভারতের ধর্মনিরপেক্ষতা রক্ষার পুরুষ হিসেবে বেঁচে থাকবেন।

১৯৯২ সালের ৬ ডিসেম্বর যখন বাবরি মসজিদ ভাঙা হয় তখন ভারতে কংগ্রেসের সরকার, প্রধানমন্ত্রী ছিলেন পি ভি নরসিমহা রাও। সকাল থেকে যখন মসজিদে হামলা করা হয় তখন মন্ত্রিসভার অনেকে তাকে ব্যবস্থা নিতে বললেও তিনি নেননি। বিমানবাহিনী দিয়ে যারা বাবরি মসজিদ ভাঙছে তাদের ওপর টিয়ারশেল নিক্ষেপ করার প্রস্তাব ছিল। কিন্তু নরসিমহা রাও সারা দিন ছিলেন একেবারে নির্বিকার, যেন সবকিছু তার ইশারায় হচ্ছে। তার মন্ত্রিসভার সদস্য ও তার ব্যক্তিগত চিকিৎসকের আত্মজীবনী বই থেকে তা জানা যায়।

রাও মন্ত্রিসভায় মানবসম্পদ উন্নয়ন মন্ত্রী অর্জুন সিং তার ‘আ গ্রেইন অব স্যান্ড ইন দা আওয়ার গ্লাস অব টাইম’ নামের আত্মজীবনীতে মন্ত্রিসভার ওই বৈঠকের বর্ণনা লিখে গেছেন। তিনি লিখেছেন, ‘পরিস্থিতিতে মন্ত্রী মাখনলাল ফোতেদার তখনই কেঁদে ফেলেছিলেন। কিন্তু পাথরের মূর্তির মতো নিশ্চুপ ছিলেন প্রধানমন্ত্রী নরসিমহা রাও।  সি. কে. জাফর শরিফ ছিলেন রেলমন্ত্রী, সবাই তার দিকে তাকালে তিনি উত্তর দিয়েছিলেন, ‘এই ঘটনার জন্য দেশ, সরকার আর কংগ্রেস পার্টিকে বড় মাশুল গুনতে হবে।’ দেশকে মাশুল দিতে হোক না হোক কংগ্রেস সরকারকে ঠিকই মাশুল দিতে হয়েছে, হচ্ছে। কংগ্রেস নেতা মাখনলাল ফোতেদার তার আত্মজীবনী বইতে লিখেছেন, তিনি ঘটনার দিন রাষ্ট্রপতি শঙ্কর দয়াল শর্মাকে ফোন করে দেখা করেন। তিনি লিখেছেন, ‘তাকে দেখে রাষ্ট্রপতি শিশুর মতো কেঁদে ফেললেন। বললেন, ‘পি ভি (প্রধানমন্ত্রী পি ভি নরসিমহা রাও) এটা কী করল?’

রাম মন্দির আন্দোলন ও বাবরি মসজিদ ভাঙার সময় জুড়ে কেন চুপ ছিলেন রাজীব গান্ধী ও নরসিমহা রাও? এ নিয়ে নানা ষড়যন্ত্র তত্ত্ব ভারতের রাজনীতিতে ঘুরে বেড়ায়। কিন্তু রাজনীতির বিশ্লেষণ আর থ্রিলার গল্প এক নয়। রাজনৈতিকভাবে হয়তো কংগ্রেস সরকার চেয়েছিল যদি বাবরি মসজিদ ভেঙে ফেলা হয় তাহলে বিজেপি রাজনীতি করার আর কোনো ইস্যু পাবে না। মূলত রাম মন্দির আন্দোলনকে ঘিরে ভারতে বিজেপির রাজনৈতিক উত্থান হচ্ছিল। তবে, এমনটাও শোনা যায় যে, যেদিন বাবরি মসজিদ ভাঙা হয় সেদিন সন্ধ্যায় অনেক কংগ্রেস নেতা, মন্ত্রী, সচিবের মুখে উচ্ছ্বাস দেখতে পেয়েছেন অনেকে। ফলে কংগ্রেসের প্রতি মুসলমানদের মধ্যে চিরতরে একটি অবিশ্বাস তৈরি হয়ে যায়। মুসলমানদের মনে যে আঘাত লেগেছে পরবর্তী সময়ে সে আঘাত লাঘবেও কংগ্রেস সরকার তেমন কিছুই করেনি।

এটা খুবই সত্য যে রামমন্দির আন্দোলন বা রথযাত্রায় কংগ্রেসের কোনো আপত্তি ছিল না। হিন্দুত্ববাদী আন্দোলনে কংগ্রেসের এই দ্বিধান্বিত ভূমিকার জন্যই মুসলমানরা আজ কংগ্রেস ছেড়েছে। তারা আর একচেটিয়া ভোট দিচ্ছে না কংগ্রেসকে। কংগ্রেস তাদের কী দিয়েছে! তাদের মসজিদ রক্ষা করেনি। স্বাধীনতার ৭৫ বছর পরেও মুসলমানদের হাতে চায়ের কেটলি, ট্রাকের চাবি না হলে মধ্যপ্রাচ্য। সম্প্রতি একটি প্রতিবেদনে দেখানো হয়েছে দলিতদের চেয়েও খারাপ সামাজিক অবস্থানে বাস করে অনেক মুসলিম। বিজেপি সে প্রতিবেদন সংসদে দেখিয়ে কংগ্রেসকে প্রশ্ন করেছে তোমরা কী করেছ মুসলমানদের জন্য! কংগ্রেসের জবাব নেই।

এটা অস্বীকার করার উপায় নেই যে, বাবরি মসজিদ ভেঙে ফেলার ঘটনা যেমন ভারতের ধর্মনিরপেক্ষ চরিত্রের ভিত নড়বড়ে করে দিয়েছে, তেমনি আজ বিজেপির একচ্ছত্র উত্থানের পেছনে রামমন্দির আন্দোলন এবং লালকৃষ্ণ আদভানির নেতৃত্বে হওয়া ‘রথযাত্রা’র বিরাট ভূমিকা রয়েছে। ১৯৮৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে যে বিজেপির মাত্র দুজন এমপি ছিলেন, সেখান থেকে মাত্র পাঁচ বছর পরেই গোটা দেশে তাদের আসনসংখ্যা বেড়ে হয় ৮৬। আর ২০১৪ সালের মধ্যেই তারা ২৮২টি আসনে জিতে একার শক্তিতে সরকার গড়ার ক্ষমতা অর্জন করে ফেলে। ২০১৯ সালের আবার ক্ষমতায় আসার পর এবার ২০২৪ সালেও ক্ষমতা নিশ্চিতের পথে। রাম মন্দির নিয়ে হিন্দি বলয়ে (উত্তর ও মধ্য ভারত) যে আবেগ ও উন্মাদনা তৈরি হয়েছে তা বিজেপিকে অপ্রতিদ্বন্দ্বী জনপ্রিয় করে তুলেছে।

যেভাবে রাম মন্দির বিজেপির রাজনৈতিক হাতিয়ার : ভারতের ওয়্যার অনলাইনে সাংবাদিক কারন থাপারের সঙ্গে এক সাক্ষাৎকারে শংকরাচার্য স্বামী অভিমুক্তেশ্বরানন্দ সরস্বতী অভিযোগ করেছেন যে, তাড়াহুড়ো করে মন্দির উদ্বোধনের কাজ করা হচ্ছে রাজনৈতিক কারণে। তিনি দাবি করেছেন, যে পণ্ডিত লগ্ন নির্ধারণ করেছেন তাকে বলা হয়েছিল জানুয়ারি মাসের মধ্যে শুভলগ্ন খুঁজে বের করতে।  উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে ছিলেন না ভারতের রাষ্ট্রপতি, উপ-রাষ্ট্রপতি বা বিজেপির বড় বড় নেতারা। সমস্ত ফোকাস ছিল প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির ওপর। অযোধ্যায় যত রামচন্দ্রের কাটআউট লাগানো হয়েছে তত সংখ্যক কাটআউট ছিল নরেন্দ্র মোদির। সমস্ত ফোকাস মোদির ওপর এনে আগামী নির্বাচনে ‘মোদি ম্যাজিক’ দিয়ে ফের ক্ষমতা নিশ্চিত করতে চায় বিজেপি।

রাম মন্দির উদ্বোধন ইস্যুতে কংগ্রেস ফের দ্বিধান্বিত। যেহেতু আদালতের রায়ে মন্দির নির্মাণ হচ্ছে সে যুক্তি দিয়ে কংগ্রেস সেখানে যোগ দিতে পারত। ফলে মোদির ফোকাস কিছুটা ভাগ হয়ে যেত। অথবা সেদিন ভারত জুড়ে ধর্ম নিরপেক্ষতার প্রভাতফেরির আয়োজন করতে পারত। কংগ্রেস রাম মন্দির নিয়ে ঐতিহাসিকভাবে তাদের দ্বিধান্বিত অবস্থান নিয়েছে। ফলে রাজনীতির কৌশলে তা বিজেপির কাছ থেকে বহু পিছিয়ে পড়েছে।  তবে আসল কাজটি করেছেন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি । তিনি রাম মন্দির উদ্বোধনের দিন সর্বধর্ম পদযাত্রা করেছেন, যাত্রাপথে মন্দির, মসজিদ, গির্জা আর গুরুদোয়ারায় গেছেন সব ধর্মের প্রতি সম্মান জানাতে। লালু প্রসাদ যাদবের মতো মমতা ব্যানার্জিকেও মানুষ মনে রাখবে ধর্মনিরপেক্ষতার বাণী জাগিয়ে রাখার জন্য।

লেখক: আন্তর্জাতিক রাজনীতিবিষয়ক রিসার্চ স্কলার ও কলামিস্ট

[email protected]

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত