আগুনে পুড়ছে শিশু কাঁদছেন মা

  • আড়াই থেকে তিন গুণ বেড়েছে আগুনে দগ্ধ রোগী
  • দল বেঁধে আগুন পোহাতে গিয়ে পুড়ছে শিশুরা
  • কারও বা অসতর্কতাবশত শরীরে গরম কিছু পড়ে ঝলসে গেছে
  • চিকিৎসকের কাছে না নিয়ে লাগানো হয় চুন, পেস্ট, গোবর
  • কুসংস্কারের বশে এমন পদক্ষেপে জটিল হচ্ছে রোগীর অবস্থা
আপডেট : ২৯ জানুয়ারি ২০২৪, ১১:২৭ পিএম

রাজধানীর শেখ হাসিনা বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটের জরুরি বিভাগে ঢুকতেই নজর পড়ে তিন বছরের শিশু নাবিলা সুলতানার দিকে। নার্সরা যখন তার কোমল হাতে ক্যানুলা লাগাচ্ছিলেন, তখন ব্যথায় কাঁদছিল নাবিলা, চোখ থেকে গড়িয়ে পড়ছিল পানি। পাশে দাঁড়িয়ে অপলক দৃষ্টিতে মেয়েকে দেখছিলেন আর চোখের জল ফেলছিলেন মা সোহানা আক্তার। এ দৃশ্য সোমবার (২৯ জানুয়ারি) সকালের।

সোহানা আক্তার দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘মেয়েকে গোসল করানোর জন্য ডেকচিতে করে গরম পানি নিয়ে বাথরুমে যাচ্ছিলাম। এমন সময় পাশের রুমে খেলতে থাকা নাবিলা দৌড়ে এসে আমাকে জাপটে ধরে। তখন কীভাবে যে হাত থেকে ডেকচি ফ্লোরে পড়ে গিয়ে পানি মেয়েটার গায়ে পড়ল বুঝতে পারিনি। মেয়েটার শরীরের বিভিন্ন জায়গা ঝলসে যায়। এরপর দ্রুত তাকে নিয়ে এই হাসপাতালের জরুরি বিভাগে চিকিৎসা করাতে নিয়ে আসি।’

সোমবার সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত শেখ হাসিনা বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউট ঘুরে নাবিলার মতো গরম পানিতে ঝলসানো বা আগুনে দগ্ধ অনেক শিশুর দেখা মেলে। এই শিশুদের কেউ কেউ দল বেঁধে আগুন পোহাতে গিয়ে পুড়েছে, আবার কারও বা অসতর্কতাবশত শরীরে গরম পানি পড়ে ঝলসে গেছে। কারও কারও ক্ষেত্রে এমনও হয়েছে, হঠাৎ করেই হামাগুড়ি দিয়ে গরম পানি, চা, দুধ, ডাল, তরকারি, ভাতের মাড় বা এ জাতীয় জিনিসে হাত দিতে গিয়ে ঝলসে গেছে শরীর। ইনস্টিটিউট জুড়েই পোড়া রোগীদের উপচে পড়া ভিড়, যার মধ্যে শিশু ও নারীদের সংখ্যা লক্ষণীয়। ইনস্টিটিউট ঘুরে কোথাও খালি শয্যা চোখে পড়েনি। শয্যা খালি হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে নতুন রোগীতে ভরে যাচ্ছে, চিকিৎসক-নার্সরা রোগীদের ড্রেসিংয়ে ব্যস্ত সময় পার করছেন। শয্যা না থাকলে দগ্ধ হয়ে চিকিৎসা নিতে আসাদের পাশের ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে পাঠিয়ে দিচ্ছেন চিকিৎসকরা। 

বার্ন ইনস্টিটিউটেই কথা হয় রাজধানীর চানখাঁরপুল এলাকার বাসিন্দা আবদুস সোবহানের সঙ্গে। একমাত্র ছেলে তানভীর বন্ধুদের সঙ্গে আগুন পোহাতে গিয়ে মারাত্মকভাবে পুড়েছে। আবদুস সোবহান বলেন, ‘সকালে আমি রিকশা চালাতে বাইরে যাই। ওর মা বাসায় রান্না করছিল। তানভীর বন্ধুদের সঙ্গে আগুন পোহাচ্ছিল। ভুলবশত তানভীর ও তার এক বন্ধু আগুনে পুড়ে যায়। আগুনে পোড়ার পর পাশের বাসার এক মহিলা তার পুড়ে যাওয়া জায়গায় চুন লাগিয়ে দেন, যার কারণে এখন ক্ষত জায়গায় ইনফেকশন (সংক্রমণ) হয়েছে।’

ভাতের গরম মাড়ে ঝলসে গেছে ২১ মাসের শিশু শ্রাবণ। ঘটনার সময় তাকে পাশে নিয়ে বাসায় রান্না করছিলেন মা সুমনা বেগম। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমি রান্না করি আর সব সময় শ্রাবণ আমার পাশে বসে খেলাধুলা করে। এক সপ্তাহ আগে আমি ভাত রান্না করে পাশে গরম মাড় রাখি, এমন সময় ফোন এলে আমি পাশের রুমে যাই। হঠাৎ শ্রাবণের কান্নায় দৌড়ে ফিরে আসি এবং দেখি গরম মাড় তার পুরো শরীরে আর ছেলেটি পাগলের মতো কাঁদছিল।’

বার্ন ইনস্টিটিউটের চিকিৎসকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, শীত মৌসুম শুরুর পর স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় দুই থেকে আড়াই গুণ বেশি রোগী চিকিৎসার জন্য আসছে। যারা আসছে তাদের মধ্যে নারী ও শিশুর সংখ্যাই বেশি। গত বছরের জুন মাসে এই ইনস্টিটিউটের জরুরি বিভাগ থেকে ৫৮১ জন চিকিৎসা নিয়েছিল। যার মধ্যে ২২৪ পুরুষ, ১৩৪ নারী এবং ১৮১ জন শিশু ছিল। কিন্তু একই বছরের নভেম্বরে এসে জরুরি বিভাগ থেকে চিকিৎসা নেওয়া রোগীর সংখ্যা দাঁড়ায় ৮১০ জন। যার মধ্যে শুধু শিশুই ছিল ৩৬৫ জন। ডিসেম্বরে রোগী বেড়ে দাঁড়ায় ১১২৬ জনে, যার মধ্যে সর্বোচ্চ ৪৬১ জনই ছিল শিশু। একই সময় ৩০৯ নারী ও ৩০০ পুরুষ আগুনে দগ্ধ হয়ে চিকিৎসা নিয়েছিল। চলতি জানুয়ারি মাসের পরিসংখ্যান এখনও তৈরি করা না হলেও চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, ডিসেম্বরের চেয়ে প্রায় দেড় গুণ বেশি রোগী এরই মধ্যে চিকিৎসা নিয়েছে।

ইনস্টিটিউটের আবাসিক সার্জন ডা. তরিকুল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘দেখা যায় গোসল করার সময় গরম পানি পাতিলে করে গোসলখানায় নিতে গিয়ে দুর্ঘটনা ঘটে। অথচ পানি বালতিতে করে নিয়ে গেলে এ দুর্ঘটনা ঘটত না। শীতের সময় আগুন পোহাতে গিয়েও অনেকেই পুড়ে যাচ্ছেন।’

এই চিকিৎসক আরও বলেন, ‘প্রতিবছর শীতকাল এলে দগ্ধ ঝলসানো শিশুর সংখ্যা বেড়ে যায়। শীতকালে ঠাণ্ডা লেগে যাওয়ার ভয়ে শিশুদের গরম পানি দিয়ে গোসল করানো হয়। আর এ সময় অভিভাবকদের অসচেতনতার কারণে শিশুরা বেশি পোড়ে। গোসল করার সময় গরম পানি পাতিলে করে নিতে গিয়ে দুর্ঘটনা ঘটে বেশি। শীতের সময় আগুন পোহাতে গিয়েও অনেক শিশু দগ্ধ হচ্ছে। আমাদের হাসপাতালে কোনো শয্যা খালি নেই। আমাদের ফ্লোরিং করার (মেঝেতে রাখার) নিয়ম নেই, তাই শয্যা শেষ হয়ে গেলে চিকিৎসা নিতে আসা রোগীদের ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠাতে হয়। শীতের এই তিন-চার মাসের সময়টা আমাদের কাছে খুবই চ্যালেঞ্জিং।’

একই অবস্থা দেখা যায় ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে (ঢামেকে)। ঢামেকের বার্ন ইউনিটে ৩০০ শয্যা থাকলেও রোগী রয়েছে তার অনেক বেশি। বার্ন ইউনিটের (বিভাগ) ওয়ার্ড ছাড়াও বারান্দায় বিছানা পেতে চিকিৎসা নিতে দেখা যায় রোগীদের। ঢামেকেও রোগীদের মধ্যে শিশুর সংখ্যাই বেশি। শীত শুরু হওয়ার পর থেকে এখানে রোগীর সংখ্যা বাড়ছে বলে জানিয়েছেন চিকিৎসকরা। 

ঢামেকে কথা হয় রংপুরের বদরগঞ্জ থেকে চিকিৎসা নিতে আসা মতিহার মিয়ার সঙ্গে। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘প্রায় দুই মাস হলো ছেলে আকিফ আগুনে দগ্ধ হয়, তার শরীরের ৩০ ভাগ পুড়ে গেছে। আকিফকে আমার মা প্রথমে ক্ষত জায়গায় টুথপেস্ট লাগিয়ে দেন। এখন সেখানে ইনফেকশন হয়েছে বলে ডাক্তাররা জানিয়েছেন। টুথপেস্ট না লাগিয়ে সঙ্গে সঙ্গে যদি ডাক্তার দেখানো যেত তাহলে আমার ছেলেটার এ অবস্থা হতো না।’

তিনি আরও বলেন, ‘প্রথমে রংপুর মেডিকেলে ভর্তি করাই, সেখানে ১৫ দিন চিকিৎসা শেষে আকিফকে নিয়ে শিশু হাসপাতালে ভর্তি হই। সেখানে আরও ১৮-২০ দিন ভর্তি ছিলাম, এরপর ঢামেকে আসি। ডাক্তাররা বুধবার অপারেশন করবেন। আকিফের গাল, গলা ও হাত বেশি পুড়েছে।’

একই হাসপাতালে কথা হয় নরসিংদীর বাসিন্দা জয়দেব রায়ের সঙ্গে। তার শিশু মেয়ে ফাল্গুনী রায় এক সপ্তাহ আগে ঝলসে গেছে রান্না করা গরম ডালে। জয়দেব রায় বলেন, ‘গরম ডাল টেবিল থেকে ফাল্গুনীর ওপরে পড়ে গিয়ে মাথা, মুখ ও শরীরের বিভিন্ন অঙ্গ ঝলসে যায়। এরপর আমার স্ত্রী এক প্রতিবেশীর পরামর্শে তার গায়ে গোবর লাগিয়ে দেন, এতে আরও সমস্যা তৈরি হয়েছে।’

ঢামেকের বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি বিভাগের ৩২১ নম্বর কক্ষে গিয়ে কথা হয় সহকারী রেজিস্ট্রার ডা. মো. আশিকুর রহমানের সঙ্গে। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় চলতি শীত মৌসুমে তিন গুণের মতো বেশি রোগী চিকিৎসা নিতে আসছে, যার মধ্যে শিশুরাই বেশি। পুড়ে যাওয়া রোগীদের মধ্যে যারা শিক্ষিত ও সচেতন নয়, তারা তেল, ডিম ও পেস্ট লাগিয়ে নিজেরাই চিকিৎসা করায়। হিন্দুদের মধ্যে ক্ষতস্থানে সিঁদুর লাগানোর প্রবণতা রয়েছে, যারা কুসংস্কারে বিশ্বাস করেন তারা গোবর লাগিয়ে দেন। এসব কারণে ইনফেকশন দেখা দেয়।’

এই চিকিৎসক আরও বলেন, ‘পোড়া রোগীর চিকিৎসা কিন্তু সাধারণ চিকিৎসার মতো নয়। কেউ পুড়ে গেলে তাকে প্লাস্টিক সার্জন কিংবা বার্ন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক দেখাতে হবে। অনেক সময় দেখা যায়, অন্য বিভাগের চিকিৎসক দেখানো হয় এবং তারা সমস্যা শনাক্ত না করে চিকিৎসা শুরু করেন। যখন সমস্যা বেড়ে যায় তখন হাসপাতালে নিয়ে আসা হয় রোগীকে। এতে রোগীদের জটিলতা বেড়ে যায়।’

 

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত