বাংলাদেশের মানুষের প্রায় সমস্ত বিষয় নিয়েই দুই বা ততোধিক পক্ষ, মতামত এবং পারস্পরিক বিপরীত অবস্থান থাকলেও, বলা হয় ক্রিকেট নাকি এই জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করে। বাংলাদেশে জাতীয় দলের (পুরুষ তো বটেই, নারী এবং বয়সভিত্তিক দলগুলোও) খেলা হলে দেখা যায় দলমত-নির্বিশেষে লোকজন টিভি সেটের সামনে বসে, খেলা নিয়ে আলোচনা করে। এমনকি শুধু ক্রিকেট লিখিয়ে না, অন্যান্য বিষয় নিয়ে লেখালেখি করা বহু বিদেশির কাছে বাংলাদেশ পরিচয় পেয়েছে ক্রিকেট উন্মাদনার দেশ হিসেবে।
কিন্তু, ক্রিকেট কি সেই উত্তেজনা হারাচ্ছে? ক্রিকেটের জনপ্রিয়তা কি নানা কারণে স্তিমিত হচ্ছে? নাকি ক্রিকেটকে যাদের ছড়ানোর কথা, এমনকি ক্রিকেট নিয়ে যারা বাণিজ্য করেন তাঁদের অক্ষমতায় ক্রিকেট থেকে যথেষ্ট ফায়দা নেওয়া হচ্ছে যাচ্ছে না? নাকি ক্রিকেট আসলে রাজনৈতিক অতি ব্যবহারে ধার হারিয়ে ফেলেছে?
এই আলাপগুলো উঠল সম্প্রতি বিসিবির সঙ্গে নতুন একটি স্পনসরশিপের চুক্তিতে। টেলিকম প্রতিষ্ঠান রবির সঙ্গে বিসিবির এই চুক্তি হয়েছে ৫০ কোটি টাকায় এবং এর মেয়াদ সাড়ে তিন বছর। অর্থাৎ প্রতি বছরে বোর্ড এই বাবদ পাবে ১৪ কোটি টাকার সামান্য বেশি। অথচ এর আগের চুক্তি ছিল আড়াই বছরে ৪০ কোটি। বছরে ১৬ কোটি টাকা করে।
বিসিবির দাবি, স্পনসরশিপ নিয়ে খুব বেশি আগ্রহ না থাকাতে তাঁরা এই চুক্তিতেই খুশি। এই খুশি তাঁরা প্রকাশ করেছেন ঘটা করে অনুষ্ঠান করে। এর আগে প্রায় তিন মাস বিসিবির মূল স্পনসর ছিলই না। ওয়ানডে বিশ্বকাপের পরের সিরিজগুলো বাংলাদেশ দল খেলেছে কোনো স্পনসর ছাড়াই।
একেতো, বছর ওয়ারী স্পনসরের থেকে আয় কমছে অন্যদিকে আমরা যদি মূল্যস্ফীতি হিসাব করি, তবে বলতেই হয়, পণ্য হিসেবে ক্রিকেটের মূল্য ক্রমশই কমছে। এর কারণ বোঝার আগে আমরা একটু এর প্রেক্ষাপট দেখে আসি।
ক্রিকেট ও জাতীয়তাবাদের আলোচনা ভারতে বেশ পুরোনো। ভারত ১৯৮৩ সালে বিশ্বকাপ জেতার পর সে দেশের শাসকগোষ্ঠী সচেতনভাবেই এর উন্মাদনা কাজে লাগায় জাতীয়তাবাদের উন্মেষে। ফলত, শত কোটির বেশি মানুষের দেশে ক্রিকেট হয়ে পড়ে সবচেয়ে বড় জাতীয়তাবাদী অনুষঙ্গ। একে কাজে লাগান হয় বাণিজ্যিকভাবে।
একটা পর্যায়ে ভারত বাণিজ্যিক ও রাজনৈতিকভাবে ক্রিকেটে এতটাই ক্ষমতাশীল হয় যে, ক্রিকেট ক্ষমতার ভরকেন্দ্র ইংল্যান্ড (এবং অস্ট্রেলিয়া) থেকে ভারতে চলে আসে। প্রতিবেশী বাংলাদেশ মূলত এই ব্লুপ্রিন্ট অনুসরণ করে।
টেস্ট স্ট্যাটাস পাওয়ার পর এই শতাব্দীর শুরু থেকে বাংলাদেশেও ক্রিকেটের অবস্থান হয় ভারতের মতো। ক্রিকেটারদের আইকোনিক মূল্য ছাপিয়ে যায় শিল্পী, সাহিত্যিক,রাজনৈতিকসহ যে কোন পেশার মানুষের চেয়ে বেশি। বড় বড় ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলো হন্য হয়ে পড়েন ক্রিকেটের ‘পোস্টার বয়দের’ নিজের ব্র্যান্ড অ্যাম্বাসেডর বা বিজ্ঞাপনে ব্যবহার করার জন্য। সংবাদমাধ্যম ও সামাজিক মাধ্যমে ক্রিকেট সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আইটেম হয়ে দাঁড়ায়, এমনকি রাজনৈতিক আলাপ ছাপিয়েও। প্রতিষ্ঠান হিসেবে বিসিবি হয়ে উঠে অন্যতম ধনী ও প্রভাবশালী। এমনকি ক্রিকেটের সঙ্গে জড়িত হওয়ার সুবাদে সংগঠকরাও রাজনীতিতে বিপুল সুবিধা পেতে থাকেন। স্বাভাবিকভাবেই, ক্ষমতা ও প্রভাবের টানে অনেকেই যুক্ত হতে থাকেন ক্রিকেটের সঙ্গে। ক্রিকেটের তোড়ে অন্য খেলাগুলার অস্তিত্ব প্রায় নেই হয়ে যায়।
তাহলে, শনৈঃ শনৈঃ উন্নতির বদলে ক্রিকেটের বাণিজ্যিক মূল্য আকাশে চড়ার বদলে নেমে আসছে কেন? যেখানে আমরা দেখি ভারতে এই ঊর্ধ্বগতি থামছেই না। এ রকম অবস্থা যে, ভারতের প্রিমিয়ার লীগ টাকার দিক দিয়ে দুনিয়ার অন্যান্য খেলার সবচেয়ে দামি লীগগুলোর সঙ্গে টক্কর দিচ্ছে। খেলার খোলনলচে আর বাণিজ্যিক কাঠামো পুরো বদলে দিচ্ছে। ব্র্যান্ড ভ্যালু ভুলোক-দ্যুলোক-গোলক ভেদিয়া আরও উপরে যাচ্ছে তো যাচ্ছেই।
তবে কি বিসিবি ক্রিকেট বিক্রি করতে পারছেন না?এর বড়কর্তারা কি বাংলাদেশের অনেক প্রতিষ্ঠানের মতোই নিজেদের স্বার্থ দেখতে গিয়ে হরেদরে প্রতিষ্ঠানের মূল্য কমিয়ে দিচ্ছেন? আঙুলটা তোলাই যায়।
তবে, পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যায় যে, ক্রিকেটের উন্মাদনা মনে হয় বেশ খানিকটাই কমেছে। আগের মতো খেলা চললে টেলিভিশনের শোরুমগুলোর সামনে জনতার ভিড় তেমন দেখা যায় না। সামাজিক মাধ্যমে উত্তেজনা কমে গেছে। কেউ কেউ হয়তো বাংলাদেশে জাতীয় দলের পারফরম্যান্সের দিকে আঙুল তুলবেন। কিন্তু, বাংলাদেশের মানুষ তো সব সময়েই- জিতি হারি দলের সঙ্গে আছি- এই মন্ত্রে বিশ্বাসী ছিল বেশির ভাগ, ফলে এই যুক্তি ধোপে টিকবে না।
তবে কি, ক্রিকেট ও ক্রিকেটারদের অতি রাজনীতি? আমরা দেখি দেশের দুজন অতি জনপ্রিয় খেলোয়াড় খেলোয়াড়ি জীবন শেষের আগেই সরকারি দলের টিকিটে সংসদ সদস্য হয়েছেন। সম্ভবত অনেক মানুষই, এই ব্যাপারটি পছন্দ করেননি। খেলোয়াড়দের যে ‘দেবতাসম’ ভাবমূর্তি ছিল তা হয়তো এতে ধসে পড়েছে।
আবার, বিসিবিসহ ক্রিকেট নিয়ে যাদের কাজ করার কথা তাঁদের ব্যর্থতাও প্রকট। ভারতের লীগের মতো না হোক, পাকিস্তান কিংবা আবুধাবি লীগের চেয়েও সম্ভবত পিছিয়ে আছে বাংলাদেশের প্রিমিয়ার লীগ। এই লীগগুলোর মূল উদ্দেশ্যই বাণিজ্য, অথচ এত বছরে সেখানে কোন কাঠামো দাঁড়াল না, মুনাফার কোন সম্ভাবনাও নেই। জোড়াতালি দেওয়া এবং সাংগঠনিক ব্যর্থতা প্রকট। রাজনৈতিক কারণ বলি আর অর্থনৈতিক টানাপোড়েন, বিনোদন বুভুক্ষু ২০ কোটি মানুষ ভালো ক্রিকেটের জন্য এখনো পয়সা খরচ করতে রাজি। কিন্তু সেটা নিশ্চিত হবে কীভাবে? আর তা না হলে ক্রিকেটের ব্র্যান্ড ভ্যালু তো কমা বই বাড়বে না।
কারণ যাই হোক, একদিকে ক্রিকেটাররা সাংসদ হচ্ছেন, ক্রিকেট বোর্ডের প্রেসিডেন্ট মন্ত্রী হয়েছেন, কিন্তু অন্যদিকে ক্রিকেট তার জৌলুশ ও বাণিজ্যিক মূল্য হারাচ্ছে। ক্রিকেট ভক্তদের জন্য ব্যাপারটা কষ্টের।
