‘যে পানির দুর্গন্ধে আপনারা নাক চেপে ধরেছেন, সে পানির ওপরে আমরা বেঁচে আছি। কয়লার মতো কালো পানিতেই আমরা নৌকা চালাই। এতে যা আয় তা দিয়েই চলে সংসার। তাই দুর্গন্ধযুক্ত কুচকুচে কালো পানি আমাদের কাছে জীবিকার উৎস।’ এক বুক চাপা কষ্ট নিয়ে কথাগুলো বলেছেন ডিঙি নৌকার মাঝি মোদাব্বের আলী। যিনি দীর্ঘ ৩০ বছর ধরে রাজধানীর বুড়িগঙ্গা নদীতে ডিঙি নৌকা চালিয়ে সংসার চালাচ্ছেন। তার মতো কয়েক’শত মাঝির আয়ের একমাত্র উৎস বুড়িগঙ্গা।
তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আগে বুড়িগঙ্গার পানিতে জেলেরা মাছ ধরে সংসার চালাতো। এখন সে দৃশ্য আর চোখে পড়ে না। যত দিন যাচ্ছে ততই কালো হচ্ছে পানি আর বাড়ছে দুর্গন্ধ। এভাবে চলতে থাকলে একসময় হয়তো আমাদেরও নৌকা চালানো বন্ধ হয়ে যাবে।’
বুড়িগঙ্গা নিয়ে এমন হতাশা শুধু মাঝিদের নয়, সব শ্রেণীর মানুষের। এক সময়ের উত্তাল বুড়িগঙ্গা অপরিকল্পিত নগরায়ন আর শিল্পায়নের বেপরোয়া যাত্রায় আজ মৃত প্রায়। তবুও জীবিকার আধার হয়ে বেঁচে আছে নিম্ন আয়ের মানুষদের মনে। তবে কতদিন এভাবে বেঁচে থাকবে তা নিয়েও রয়েছে শঙ্কা।
সরেজমিনে দেখা গেছে, শুধু সদরঘাট থেকে কামরাঙ্গীরচর পর্যন্ত প্রায় ১০টি নৌকার ঘাট রয়েছে। একেকটি ঘাটে ৫০/১০০টি নৌকা থাকে। ছোট ছোট ডিঙ্গি নৌকা ভেড়ানো থাকে ঘাটে। একেকটি নৌকায় ৮/১০ জন যাত্রী চলাচল করতে পারে। মজার বিষয় হল, নৌকাগুলোতে এখনো যান্ত্রিকতার ছোঁয়া লাগেনি। হাতের বৈঠা দিয়েই দক্ষ মাঝিরা প্রতিদিন অসংখ্যবার যাত্রী পারাপারের কাজ করে।
মাঝিদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, সারাদিন যাত্রী পারাপারের কাজ করে গড়ে ৫০০/৮০০ টাকা আয় হয়। এর মধ্যে ঘাটের নানা খরচ বাবদ কমপক্ষে ২০০ টাকা খরচ হয়। বাকি টাকা দিয়ে নিত্যদিনের সাংসারিক খরচ মেটাতে হয়। তবে দ্রব্যমূল্যের উর্দ্ধগতির কারণে এখন এ টাকায় সংসার চালানো কষ্টসাধ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বুড়িগঙ্গার পানিতে জীবনযুদ্ধে নিয়োজিত আব্দুল আউয়াল (৫৮)। গত ১৫ বছর ধরে বুড়িগঙ্গা নদীতে যাত্রী পারাপারের কাজে নিয়োজিত রয়েছেন তিনি। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, নদী ভাঙনে সব হারিয়ে ভোলা থেকে ঢাকায় আসি। সংসার চালাতে বুড়িগঙ্গা নদীতে নৌকা চালানো শুরু করি। তখন থেকে এখনও এই কাজ করে যাচ্ছি। আর কোনো কাজ করা হয়ে উঠেনি তার। সেই থেকে তার পরিচয় মাঝি। আগে ৪০০ টাকা রোজগার হলেও সংসার চলতো। এখন ৮০০ টাকা ইনকাম হলেও সংসার চালানো কঠিন হয়েছে। চাল-ডালসহ নিত্য প্রয়োজনীয় সবকিছুর দাম বেশি।
এদিকে নিজের জীবনের উন্নতি না হলেও অনেক মাঝি দুর্গন্ধযুক্ত বুড়িগঙ্গাকে নিয়ে হতাশার কথা বলেছেন। মানুষের লোভ আর পরিকল্পনাহীনতা একটি নদীর পানিকে কী পরিমাণ দূষিত করতে পারে সেটা বুড়িগঙ্গাকে না দেখলে বিশ্বাস করা যায়না।
এমন মন্তব্য করে একাধিক মাঝি বলেছেন, আর কত সহ্য করবে বুড়িগঙ্গা? শেষ পর্যন্ত পূর্বের অবস্থায় ফিরবে তো। নাকি আধুনিকতায় ছোঁয়ায় আরও হারিয়ে যাবে। বুড়িগঙ্গা না বাঁচলে আমাদের মত খেটে খাওয়া মানুষের কী হবে! এমন অবস্থা থেকে উত্তোরণের জন্য সরকারের হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন তারা।
এদিকে ছুটির দিনে সন্তানদের নিয়ে ঘুরতে আসেন আব্দুর রহমান। নদীয় পাড়ে দাঁড়িয়ে নৌকায় ঘুরার পরিকল্পনা করছিলেন। তবে দুর্গন্ধ আর পানির অবস্থা দেখে তিনি দ্বিধান্বিত হয়ে পড়েন। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, আধুনিক সভ্যতার বিকাশ এবং সময়ের সঙ্গে বুড়িগঙ্গা হারিয়েছে তার জৌলুস। এক সময় বুড়িগঙ্গার পানি ছিল স্বচ্ছ শীতল। বুড়িগঙ্গায় পাওয়া যেত বিভিন্ন প্রজাতির মাছ।
অথচ আজ বুড়িগঙ্গা নিজেই হয়ে গেছে বৃদ্ধ। আগের জোয়ার-ভাটার মতো প্রতাপ নেই। দুই পাশে জমেছে ময়লার স্তূপ। কল-কারখানার বর্জ্যে মিশ্রিত পানি এখন কালো দুর্গন্ধ ও বিষাক্ত। তবে এখানকার মাঝিরা এসবের সঙ্গে নিজেদের মানিয়ে নিয়েছেন। তাই শত প্রতিকূলতার মাঝেও বাস্তবতাকে মেনে নিয়ে আজও ঐতিহ্য ধরে রেখেছেন তারা।
