বিদ্যুতে গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধি

আপডেট : ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, ০৮:১৪ এএম

ভর্তুকি সমন্বয় করতে বিদ্যুৎ উৎপাদনে ব্যবহৃত গ্যাসের দাম ইউনিটপ্রতি ৭৫ পয়সা বাড়িয়েছে সরকার। এতে বছরে সরকারের বাড়তি আয় হবে ১ হাজার ৩৫ কোটি থেকে ১ হাজার ৬৩৬ কোটি টাকা। তবে এর পরও গ্যাস খাতে ৫ থেকে ৬ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি গুনতে হবে। এদিকে বিদ্যুতে গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধির ফলে ভোক্তা পর্যায়েও বিদ্যুতের দাম বাড়ানো হবে মার্চ থেকে। এ ছাড়া বিশ্ববাজারের সঙ্গে সমন্বয় করে মার্চের প্রথম সপ্তাহ থেকেই জ্বালানি তেলেরও মূল্য সমন্বয় করবে সরকার।

গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধিতে কলকারখানায় ব্যবহৃত ক্যাপটিভ বিদ্যুতের (কারখানার নিজস্ব উদ্যোগে নির্মিত বিদ্যুৎকেন্দ্র) দাম বেড়ে যাবে। এর সঙ্গে বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধি পেলে আরেকধাপ বাড়বে উৎপাদন ব্যয়। সেই সঙ্গে সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন ব্যয়ও বেড়ে যাবে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশীয় জ্বালানি অনুসন্ধানে অবহেলা করে অতিমাত্রায় আমদানিনির্ভরতার কারণে গ্যাস খাতে সরকারের ব্যয় অনেক বেড়ে যাওয়ায় ভর্তুকির পরিমাণও বেড়েছে। সেই সঙ্গে দুর্নীতির কারণেও বেড়েছে ব্যয়।

দাম বাড়ানোর বিষয়ে জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, বিদ্যুতে ব্যবহৃত গ্যাসের দাম ৫.৩৬ শতাংশ এবং ক্যাপটিভ বিদ্যুতে ব্যবহৃত গ্যাসের দাম ২.৫০ শতাংশ ‘জনস্বার্থে সমন্বয়’ করেছে সরকার। এতে চলতি (২০২৩-২৪) অর্থবছরে অর্থাৎ ফেব্রুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত ৫৭০ কোটি টাকা ভর্তুকি কমবে।

কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধির ফলে প্রতিদিন সরকারের বাড়তি আয় হবে ৮৬ কোটি ২৫ লাখ টাকা। বছরে যার পরিমাণ হবে অন্তত ১ হাজার ৩৫ কোটি টাকা।

পেট্রোবাংলার প্রক্ষেপণ অনুযায়ী ২০২৩-২৪ অর্থবছরে বিদ্যুৎকেন্দ্রে প্রতিদিন ১৪৪৬ মিলিয়ন ঘনফুট এবং ক্যাপটিভে ৬৭৪ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ হবে। পরের অর্থবছরে (২০২৪-২৫) গ্যাস সরবরাহের পরিমাণ দাঁড়াবে যথাক্রমে ১৪৪৬ ও ৬৭৬ মিলিয়ন ঘনফুট। এভাবে পর্যায়ক্রমে গ্যাস সরবরাহের পরিমাণ বাড়তে থাকবে।

পেট্রোবাংলার ওই প্রক্ষেপণ বিবেচনায় নিলে আগামী অর্থবছরে প্রতিদিন ২১১০ মিলিয়ন ঘনফুট বা প্রায় ৫ কোটি ৯৮ লাখ ইউনিট গ্যাস সরবরাহ হবে। প্রতি ইউনিট গ্যাসের বর্ধিত দর ৭৫ পয়সা বিবেচনায় নিলে বছরে বাড়তি টাকার পরিমাণ দাঁড়াবে প্রায় ১ হাজার ৬৩৬ কোটি টাকা। পরের বছরগুলোতে এর পরিমাণ আরও বাড়বে।

তবে কর্মকর্তারা বলছেন, গ্যাস সংকটের কারণে প্রক্ষেপণ অনুযায়ী সরবরাহ করা যাবে কি না, তা নিয়ে সংশয় থাকায় এর পরিমাণ কম করে হিসাব করা হয়েছে। গ্যাস সরবরাহ বৃদ্ধি নির্ভর করবে আমদানিকৃত এলএনজির ওপর।

মন্ত্রণালয়ের এক শীর্ষ কর্মকর্তা জানান, বিদ্যুৎকেন্দ্রে গ্যাসের দাম বাড়িয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদনে আরও ৪০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস দেওয়ার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে যাতে বিদ্যুতের উৎপাদন বাড়নো যায়। কারণ গ্রীষ্মে বিদ্যুতের চাহিদা এখনকার চেয়ে প্রায় দ্বিগুণ হবে।

গতকাল মঙ্গলবার প্রকাশিত জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের এক প্রজ্ঞাপনে বিদ্যুৎকেন্দ্রে ব্যবহৃত প্রতি ইউনিট গ্যাসের দাম ১৪ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১৪ টাকা ৭৫ পয়সা এবং কলকারখানায় ব্যবহৃত ক্যাপটিভ বিদ্যুতের (কারখানার নিজস্ব উদ্যোগে নির্মিত বিদ্যুৎকেন্দ্র) গ্যাসের দাম ৩০ টাকা থেকে বৃদ্ধি করে ৩০ টাকা ৭৫ পয়সা করা হয়েছে। চলতি মাসের ফেব্রুয়ারি থেকেই নতুন মূল্য কার্যকর হবে।

গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধির ফলে বিদ্যুতের উৎপাদন ব্যয় বাড়বে। ফলে ভোক্তা পর্যায়ে দুয়েক দিনের মধ্যে বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধির আদেশ আসতে পারে বলে জ্বালানি বিভাগ জানিয়েছে।

এবার বিদ্যুতের দাম ইউনিটপ্রতি ৩৪ পয়সা থেকে ৭০ পয়সা পর্যন্ত বাড়তে পারে। অর্থাৎ বেশি বিদ্যুৎ ব্যবহারকারীদের বেশি দাম দিতে হবে। পহেলা মার্চ থেকেই বিদ্যুতের নতুন দর কার্যকর হবে।

বিদেশ থেকে আমদানি করা এলএনজিসহ (তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস) বর্তমানে প্রতি ইউনিট (এক হাজার ঘনফুট) গ্যাসে সরকারের খরচ হচ্ছে ২৪ টাকা। কিন্তু গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে প্রতি ইউনিট গ্যাস বিক্রি হচ্ছে ১৪ টাকা করে। লোকসান কমাতে এ খাতের গ্যাসের দাম ইউনিটপ্রতি ২০ টাকা করার পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের। বর্তমানে জ্বালানি খাতে সরকার প্রতি বছর ভর্তুকি দিচ্ছে প্রায় ৬ হাজার টাকা।

গ্যাস উৎপাদনে সরকারের যে ব্যয় হয় তার চেয়ে কম মূল্যে সরবরাহ করার কারণে প্রতি বছর এ খাতে লোকসান বৃদ্ধির সঙ্গে বাড়ছে ভর্তুকির পরিমাণ। বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে ভর্তুকি থেকে সরে আসার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এজন্য আগামী তিন বছরে ধাপে ধাপে গ্যাস-বিদ্যুতের দাম বাড়িয়ে এর উৎপাদন ব্যয় সমন্বয়ের পথে হাঁটছে সরকার।

বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ বলেন, ‘আসলে গ্যাস-বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধি করা হচ্ছে না, বরং সমন্বয় করা হচ্ছে। কারণ এ খাতে সরকার তার রাজস্ব থেকে বিপুল পরিমাণ ভর্তুকি দিচ্ছে। সেই ভর্তুকি কমিয়ে আনতেই উৎপাদন ও বিক্রির মধ্যে সামঞ্জস্য রাখতে মূল্য সমন্বয় করা হচ্ছে। কোনো পণ্য বিক্রি করে মুনাফা করার পর যদি এর দাম বাড়ে তাহলে সেটাকে মূল্যবৃদ্ধি বলা হয়। কিন্তু এখানে তো সরকার লোকসান গুনছে। ফলে এটাকে দাম বৃদ্ধি বলার কোনো সুযোগ নেই।’

বিদ্যুৎ বিভাগ বলছে, দেশের বাজারে মার্কিন ডলারের বিপরীতে টাকার মান কমেছে। সরকারি হিসাবে এক ডলারের বিনিময় মূল্য কমবেশি ১১০ টাকার মতো হলেও ডলার সংকটের কারণে খোলাবাজার বা কার্ব মার্কেট থেকে তা কিনতে গিয়ে প্রায় ১২০ টাকার কাছাকাছি ব্যয় হচ্ছে। বর্তমানে ডলারপ্রতি প্রায় ৪০ টাকা লোকসান হচ্ছে। বিদ্যুৎ ও জ্বালানির দাম সরকারকে ডলারে পরিশোধ করতে হওয়ায় লোকসানের পরিমাণ বাড়ছে।

এ প্রসঙ্গে প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ বলেন, ‘ডলারের দাম বৃদ্ধির ফলে বিদ্যুৎ, জ্বালানি খাতে ব্যয় বেড়ে গেছে অনেকখানি। এ কারণে এখন আমাদের বিদ্যুৎ ও গ্যাসের দাম সমন্বয় করতে হচ্ছে। ডলার প্রাইসের কারণে যে ঘাটতি তৈরি হয়েছে, সে জায়গাটা সমন্বয় করা হচ্ছে। এ ক্ষেত্রে সাধারণ মানুষের ওপর যাতে একেবারে অনেক বেশি চাপ না পড়ে, সেজন্য ধাপে ধাপে অল্প অল্প করে মূল্য সমন্বয়ের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।’

বিশ্ববাজারে এখনকার জ্বালানির দাম এবং ডলারের দাম ১১০ টাকা হিসাবে ধরে সরকারের পরিকল্পনা হলো ধাপে ধাপে গ্যাস-বিদ্যুতের দাম বাড়িয়ে মূল্য সমন্বয় করে তিন বছরের মধ্যে ভুর্তকি উঠিয়ে দেওয়া। তবে কোনো কারণে জ্বালানি কিংবা ডলারের দাম বাড়লে এ সময়সীমা চার-পাঁচ বছর লাগতে পারে। অথবা আরও বেশি মূল্যবৃদ্ধির প্রয়োজন হবে।

জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. বদরূল ইমাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘দেশে বিপুল পরিমাণ গ্যাসের সম্ভাবনা থাকলেও সরকার অনুসন্ধানে গুরুত্ব না দিয়ে অতিমাত্রায় আমদানি নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। আর উচ্চমূল্যের এলএনজি আমদানির ফলে গ্যাসের ব্যয় বেড়েছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘জ্বালানি ও অন্যান্য খাতে কোটি কোটি টাকার দুর্নীতি হচ্ছে। কিন্তু তাদের ধরা হচ্ছে না। সরকার যদি এ লুটপাট বন্ধ করত তাহলেও সেই টাকা দিয়ে ভর্তুকির চাপ সামলানো যেত। এটা আসলে মানসিকতার ব্যাপার। দুর্নীতি বন্ধ করবে, নাকি সরকার এটাকে জিইয়ে রেখে জনগণের ওপর বোঝা চাপাবে।’

গ্যাসের দর পুনর্নির্ধারণের কারণ ব্যাখ্যা দিয়ে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের উপপ্রধান তথ্য কর্মকর্তা মীর মোহাম্মদ আসলাম উদ্দিন বলেন, ‘প্রাকৃতিক গ্যাসের উৎপাদন, আমদানি, সরবরাহ মূল্যের সঙ্গে বিক্রয় মূল্যের পার্থক্যের কারণে সরকারকে এ খাতে ২০২৩-২৪ অর্থবছরে আর্থিক ক্ষতি/ভর্তুকি দিতে হবে প্রায় ৬,৫৭০.৫৪ কোটি টাকা। কৃষি সেচ মৌসুম, রমজান মাস ও গ্রীষ্মকালে বিদ্যুৎ উৎপাদনে গ্যাসের চাহিদা আরও বেশি থাকে। শিল্প, গৃহস্থালি, সার উৎপাদন, সিএনজি, বাণিজ্যিক ও চা শিল্পে মূল্য সমন্বয় অপরিবর্তিত রয়েছে। এ মূল্য সমন্বয়ের ফলে এলএনজির (তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস) বর্তমান বাজারমূল্য ও ডলার বিনিময় হার বিবেচনায় বিদ্যমান ভর্তুকি ৬ হাজার কোটি টাকার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা সম্ভব হতে পারে।’

বর্তমানে দেশে ৮ শ্রেণির গ্যাস ব্যবহারকারী রয়েছে। এর মধ্যে বিদ্যুৎ উৎপাদনে ৩৭ শতাংশ, শিল্পে ২৩ শতাংশ, ক্যাপটিভ বিদ্যুতে ১৮ শতাংশ, বাসাবাড়িতে ১০ শতাংশ, সার উৎপাদনে ৭ শতাংশ, সিএনজিতে ৪ শতাংশ এবং বাণিজ্যিক ও চা শিল্পে ১ শতাংশ গ্যাস ব্যবহৃত হয়।

সর্বশেষ গত বছর জানুয়ারিতে বিদ্যুৎ উৎপাদনে গ্যাসের দাম প্রতি ঘনমিটারে ৫ টাকা ৮ পয়সা থেকে বাড়িয়ে ১৪ টাকা এবং ক্যাপটিভে ১৬ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৩০ টাকা করা হয়েছিল। তখন শিল্প, বিদ্যুৎ ও বাণিজ্যিক খাতে গ্যাসের দাম বাড়ানো হয়। তবে পরিবহন খাতে ব্যবহৃত সিএনজি ও আবাসিকে গ্যাসের দাম বাড়ায়নি সরকার।

ভোক্তা অধিকারবিষয়ক সংগঠন ক্যাবের জ্বালানি উপদেষ্টা অধ্যাপক এম শামসুল আলম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘অন্যায় ও অযৌক্তিক ব্যয় সমন্বয় না করে বারবার বিদ্যুৎ-জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি করে সরকার গ্যাস-বিদ্যুতের দাম বাড়িয়ে ভর্তুকি সমন্বয় করতে চাইছে। এতে দৈনন্দিন ব্যয় মেটাতে গিয়ে হিমশিম খাওয়া মানুষের জীবন আরও দুর্বিষহ হয়ে উঠবে। এর পরিণতি ভয়াবহ।’

এর আগে গণশুনানির মাধ্যমে বিদ্যুৎ ও গ্যাসের দাম বৃদ্ধি করার একক ক্ষমতা ছিল বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি)। সেখানে দাম বৃদ্ধির পক্ষে-বিপক্ষে নানারকম যুক্তি-তর্ক হতো। ফলে ইচ্ছেমতো দাম বৃদ্ধির সুযোগ ছিল তুলনামূলক কম। কিন্তু গত বছর থেকে সরকার নির্বাহী আদেশে দাম বৃদ্ধির জন্য আইন করে। এরপর গণশুনানি ছাড়াই গ্রাহক পর্যায়ে বিদ্যুতের দাম তিন দফায় ১৫ শতাংশ এবং গ্যাসের দাম ১৭৯ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানো হয়। এবারও একই কায়দায় গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধি হয়েছে।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত