এক ভবনেই ডজনের বেশি রেস্তোরাঁ

আপডেট : ০২ মার্চ ২০২৪, ০৪:৫৩ পিএম

রেস্তোরাঁ বা রেস্টুরেন্টে ঠাসা নারায়ণগঞ্জ শহর। নগরীর চাষাড়া থেকে ২ নম্বর রেলগেট পর্যন্ত প্রায় প্রতিটি ভবনেই রয়েছে এক বা একাধিক রেস্টুরেন্ট। অনেক বহুতল ভবনের ছাদে রয়েছে রুফটপ রেস্টুরেন্ট। চাষাড়া বালুরমাঠে কাচঘেরা ২টি পাশাপাশি ভবনের ওপর থেকে নিচ পর্যন্ত সবগুলো ফ্লোরেই গড়ে উঠেছে নামিদামি সব রেস্টুরেন্ট। কাচ্চি ভাই থেকে শুরু করে সিরাজ চুই ঝাল, সুলতান ডাইন, দাওয়াত এ মেজবান, ক্রাউন বুফেসহ ডজনখানেক রেস্টুরেন্ট আছে একটি ভবনে। প্রতিদিন এখানে ২ থেকে ৩ হাজার মানুষ খেতে আসে।

সম্প্রতি নতুন প্রায় শতাধিক রেস্টুরেন্ট চালু হওয়ায় বর্তমানে নারায়ণগঞ্জকে রেস্টুরেন্টের শহর বললে ভুল হবে না। রাজধানীর বেইলি রোডের ট্র্যাজেডির পর এখানকার মানুষের মাঝে বিরাজ করছে আতঙ্ক। এমনিতেই শহরের অধিকাংশ বহুতল ভবনে পার্কিং, বিকল্প বহিনির্গমন পথ নেই। অগ্নিঝুঁকির তালিকায়ও রয়েছে অনেক ভবন। এর মধ্যেই এসব ভবনে ব্যাঙের ছাতার মতো গড়ে উঠেছে রেস্টুরেন্ট। বাহারি নাম ও চমকপ্রদ প্রচারণায় মানুষও আকৃষ্ট হয়ে খেতে যাচ্ছে।

বৃহস্পতিবার রাজধানীর বেইলি রোডে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে ৪৬ জন নিহতের ঘটনার পর নারায়ণগঞ্জের এসব রেস্টুরেন্টের নিরাপত্তা ভাবিয়ে তুলেছে শহরবাসীকে। শুক্রবার নারায়ণগঞ্জ ক্লাবের সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্ট ইব্রাহিম খলিল তার ফেসবুক পোস্টে লেখেন, নারায়ণগঞ্জ কি ভবিষ্যতে আরেকটা বেইলি রোড এর স্বাক্ষী হবে? আমাদের চাষাড়া বালুর মাঠ এর সাথে পাশাপাশি দুটি বিল্ডিং এ নামকরা প্রায় ১০ থেকে ১২টি রেস্টুরেন্ট ও একটি স্কুল আছে। আজকে জুমার পরে আসার পথে কেন জানি হঠাৎ করে চোখে পড়ে ব্যাপারটি। এসব রেস্টুরেন্ট ও স্কুল এ দিনে কমপক্ষে তিন থেকে চার হাজার লোকের আসা-যাওয়া হয়। কিন্তু অত্যন্ত দুঃখের বিষয় এই সব বিল্ডিং এর কোনো জরুরি বহির্গমন পথ নাই। আল্লাহ না করুন যদি কোনো অগ্নিকাণ্ড ঘটে তাহলে আর একটা বেইলি রোড এর স্বাক্ষী হবে নারায়ণগঞ্জবাসী। আমার প্রশ্ন হলো: কিভাবে তারা ট্রেড লাইসেন্স পেল? এতো লোকের সমাগম হবে এটা আনুমানিক জেনে কিভাবে ফায়ার লাইসেন্স পেল? (যদিও ফায়ার লাইসেন্স আছে কি-না তা-ও সন্দেহ), পাশাপাশি নিচে রেস্টুরেন্ট এবং ওপর স্কুলের অনুমতি কিভাবে শিক্ষা মন্ত্রণালয় দিল? একজন সচেতন নাগরিক হিসাবে প্রশাসন, সিটি করপোরেশনের দৃষ্টি আকর্ষণ করছি।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, নারায়ণগঞ্জ শহরে চাষাড়া থেকে ২ নম্বর রেলগেইট পর্যন্ত প্রায় আধা কিলোমিটার এলাকায় ছোট-বড় পাঁচ শতাধিক রেস্টুরেন্ট রয়েছে। আবাসিক ভবনে গড়ে ওঠা এসব রেস্টুরেন্টের অধিকাংশই নিয়ম মেনে করা হয়নি। শুধুমাত্র সিটি করপোরেশন থেকে ট্রেড লাইসেন্স নিয়ে চলছে এসব বাণিজ্যিক কার্যক্রম। আবার অনেকগুলো ভবনের ছাদের ওপর রেস্টুরেন্ট খুলে সিলিন্ডার গ্যাসে চলে রান্না। শহরের বেশির ভাগ ভবনে এখন এটি খুবই স্বাভাবিক দৃশ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। অথচ রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক) বলছে, ছাদের ওপর রেস্টুরেন্ট করা সম্পূর্ণ বেআইনি। নিয়মের তোয়াক্কা না করেই এসব রেস্টুরেন্ট করা হচ্ছে।

রাজউকের প্রধান নগর পরিকল্পনাবিদ ও মুখপাত্র আশরাফুল ইসলাম গণমাধ্যমকে বলেন, বেআইনিভাবে এসব রেস্টুরেন্ট গড়ে উঠছে। বেশির ভাগেরই বাণিজ্যিক কার্যক্রমের অনুমোদন নেই। আমরা কমিটি করে এসব অনুমোদনহীন ভবনের সব কার্যক্রম সিলগালা করে দেওয়ার ব্যবস্থা নেব।

নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মো. জাকির হোসেনের ফোনটি বন্ধ পাওয়া যায়। তবে সিটি করপোরেশনের ফুড অ্যান্ড স্যানিটেশন অফিসার শাহাদাৎ হোসেন দেশ রূপান্তরকে বলেন, লাইসেন্স ডিপার্টমেন্ট ট্রেড লাইসেন্সগুলা ইস্যু করে থাকে। আমরাও হোটেল-রেস্টুরেন্টের ট্রেড লাইসেন্স দেওয়ার ক্ষেত্রে বিশেষ সতর্কতা অবলম্বন করে থাকি। কোনো ঘাটতি থাকলে অনুমোদন পায় না। আবার আবাসিক এলাকায় যেসব রেস্টুরেন্ট গড়ে উঠেছে এগুলোর অধিকাংশই কোনো ট্রেড লাইসেন্স নেই।

নারায়ণগঞ্জ পরিবেশ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মুহাম্মদ হাফিজুর রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, শহরের রেস্টুরেন্টগুলো বিশেষ করে কিচেন পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন আছে কি-না সেগুলো দেখা আমাদের কাজ। আর এগুলো অনুমোদন দিয়ে থাকে সিটি করপোরেশন। অপর এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, রেস্টুরেন্ট করতে হলে পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র প্রয়োজন হয়। নারায়ণগঞ্জ শহরের কতগুলো রেস্টুরেন্টের পরিবেশ ছাড়পত্র আছে তা এই মুহূর্তে বলতে পারছি না।

নারায়ণগঞ্জ ফায়ার সার্ভিস অ্যান্ড সিভিল ডিফেন্সের উপপরিচালক ফখরউদ্দিন আহমেদ বলেন, রেস্টুরেন্ট করার ক্ষেত্রে ফায়ার লাইসেন্স বাধ্যতামূলক নয়। যদি কারখানা করে তাহলে ফায়ার লাইসেন্স নিতে হয়। তবে বেইলি রোডের ঘটনার পর আমরা রেস্টুরেন্টগুলোর অগ্নিনির্বাপণ ব্যাবস্থা নিয়ে কাজ শুরু করব। যথাযথ পদক্ষেপ নেব বলে আশা করছি।

 

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত