ভারতের অরুণাচল রাজ্য নিয়ে সবসময়ই স্পর্শকাতরতা দেখিয়ে এসেছে চীন। কারণ বেইজিং ভারতের উত্তর-পূর্বের রাজ্যটিকে চীনা ভূখ- তিব্বতের দক্ষিণাংশ মনে করে এবং সেই মোতাবেক ‘দক্ষিণ তিব্বত’-এর ওপর চীনা সার্বভৌমত্বের দাবি তোলা হয়। দুই দেশের মধ্যে ‘প্রকৃত নিয়ন্ত্রণ রেখা (এলএসসি)’ বরাবর নানা জায়গায় সীমান্ত জটিলতার বড় ক্ষেত্র অরুণাচল। কিন্তু দশকের পর দশক ধরে চীনের আগ্রাসী দাবিকে পাত্তা দেয়নি ভারত। বরং রাজ্যটিতে নয়াদিল্লির নিয়ন্ত্রণ আরও জোরদারের পথনকশা তৈরি করেছে। সেই পরিকল্পনার অংশ হিসেবে গতকাল শনিবার ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি কর্তৃক অরুণাচলে ১৩ হাজার ফুট উচ্চতায় দীর্ঘ সুড়ঙ্গ নির্মাণকাজের উদ্বোধন করার কথা।
ভারতের গণমাধ্যমের খবর, একেবারে চীন সীমান্তে গিয়ে নতুন সুড়ঙ্গপথ উদ্বোধন করবেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। অরুণাচলে চীন সীমান্তবর্তী সেলা গিরিপথের দ্বিতীয় সুড়ঙ্গটির উদ্বোধন করবেন তিনি। ১৩ হাজার ফুট উচ্চতায় নির্মিত ওই সুড়ঙ্গের মাধ্যমে যে কোনো মৌসুমে চীন সীমান্তবর্তী তাওয়াং এলাকার এলএসসিতে যেতে পারবে ভারতীয় সেনা বহর।
চীন সীমান্তবর্তী ভারতের লাদাখ অঞ্চলের গালওয়ান উপত্যকায় ২০২০ সালের ১৫ জুন সংঘর্ষে জড়ান নয়াদিল্লি ও বেইজিংয়ের সেনারা। এতে ২০ জন ভারতীয় সেনা মারা যায়। আর চীনের চারজন মারা যায় বলে দাবি করে চীনা কর্তৃপক্ষ। তবে সংবাদমাধ্যমগুলো বলে আসছে, ওই সংঘাতে চীনের প্রায় ৪০ জনের মতো সেনা মারা গেলেও তা প্রকাশ করেনি বেইজিং। গালওয়ান উপত্যকা ভারত ও চীনের সীমানা বিরোধের ঐতিহাসিক এক কেন্দ্র। ১৯৬২ সালে ভারত ও চীনের মধ্যে যুদ্ধ হয়। গালওয়ান উপত্যকার ওই সংঘাতের পর দুই দেশের তরফে কয়েক দফা আলোচনা চলেছে গত কয়েক বছর ধরে। কিন্তু কোনো সমাধান মেলেনি।
ভারতের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের সূত্র উল্লেখ করে দেশটির গণমাধ্যমগুলো বলছে, গালওয়ান উপত্যকার রক্তক্ষয়ী সংঘাতের পর লাদাখসহ সিকিম ও অরুণাচল প্রদেশজুড়ে এলএসি বরাবর চীনের পিপলস লিবারেশন আর্মির (পিএলএ) তৎপরতা মাথায় রেখে কৌশল সাজিয়েছে ভারত। অরুণাচলের উন্নয়ন কর্মকান্ডও এরই অংশবিশেষ। যুদ্ধকালীন পরিস্থিতিতে দ্রুত সেনা এবং সামরিক সরঞ্জাম পাঠাতে বিশেষ ভাবে সড়ক, সুড়ঙ্গ এবং রেলপথ নির্মাণে গুরুত্ব দিতে চাইছে নয়াদিল্লি। সেই কর্মসূচিরই অন্যতম অংশ সেলা গিরিপথের দুটি সুড়ঙ্গ।
অরুণাচলের সেলা গিরিপথের প্রথম সুড়ঙ্গটি ১০০৩ মিটার দীর্ঘ এবং দ্বিতীয়টি ১৫৯৫ মিটার। এতে মোট খরচ হয়েছে ৮২৫ কোটি রুপি। দ্বিতীয় সুড়ঙ্গটিকে বলা হচ্ছে বিশ্বের দীর্ঘতম বাই-লেন সুড়ঙ্গপথ। এই দুই সুড়ঙ্গের সঙ্গে তৈরি হয়েছে ৮ কিলোমিটারেরও বেশি দৈর্ঘ্যরে সংযোগ সড়ক। সীমান্ত অঞ্চল বরাবর উন্নয়ন কর্মকান্ড নিয়ে কয়েক বছর আগে প্রতিরক্ষা প্রতিমন্ত্রী অজয় ভট্ট চীন সীমান্তে বিশেষ পরিকাঠামো উন্নয়নে মোদি সরকারের প্রতিশ্রুতির কথা জানান। ওই সময় বলা হয়, চীন, পাকিস্তান, মায়ানমার এবং বাংলাদেশ সীমান্তে ৩ হাজার ৫৯৫ কিলোমিটার সড়ক নির্মাণের লক্ষ্যে কাজ করছে সরকার। এর মধ্যে চীন সীমান্তে ২,০৮৮ কিলোমিটার সড়ক নির্মাণ হবে।
নতুন সুড়ঙ্গপথটি তাওয়াং অঞ্চলকে যুক্ত করেছে; ২০২২ সালে এই তাওয়াং গ্রামে ভারতীয় সেনা ও পিএলএ জওয়ানদের মধ্যে সংঘর্ষ হয়। ওই সংঘাত নয়াদিল্লিকে উন্নয়ন কর্মকান্ডটি আরও দ্রুত এগিয়ে নিতে তাড়িত করে। সুড়ঙ্গপথটির যাত্রার শুরুর আগে ভারত সরকার গত বছরের জানুয়ারিতে সিয়ম নদীর ওপর ১০০ মিটার দীর্ঘ সেতু উদ্বোধন করে। ভারতের ‘বর্ডার রোডস অর্গানাইজেশন (বিআরও)’ সংস্থা কর্তৃক নির্মিত সেতুটি কয়েকটি দিক থেকে তাৎপর্যপূর্ণ ছিল। চীন-ভারত সীমান্তে সেনাদের যাতায়াতের পাশাপাশি রসদ সরবরাহ ও অস্ত্রশস্ত্র পরিবহনের জন্য এই সেতু গুরুত্বপূর্ণ। ২০২২ সাল পর্যন্ত বিগত পাঁচ বছরে ভারত সরকার অরুণাচলের কৌশলগত গুরুত্ব বিবেচনা করে তিন হাজার ৯৭ কিলোমিটার সড়ক নির্মাণ করেছে।