রাজধানীর একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মী আশিক আহমেদ। থাকেন ফার্মগেট এলাকায়। রোজার প্রথম দিন গতকাল মঙ্গলবার দুপুরে ইফতারিসহ অন্য আনুষঙ্গিক জিনিসপত্র কিনতে বাড়ি থেকে তালিকা করে আসেন কারওয়ান বাজারে। প্রথম রোজায় বাসা থেকে করে আনা ইফতারির লিখিত তালিকায় রেখেছিলেন আঙুর, কলা, মাল্টা, তরমুজ ও পেয়ারা। সে অনুযায়ী হিসাব করে টাকাও নিয়ে আসেন তিনি। কারণ ইফতারে ফলের সঙ্গে নিত্যপ্রয়োজনীয় অন্য সামগ্রীও কিনতে হবে। কিন্তু ফল কিনতে গিয়ে হতবাক। এক দিনের ব্যবধানে দেশি ও বিদেশ থেকে আমদানি করা সব ফলের দামই কেজিতে বেড়েছে ৩০ থেকে ৫০ টাকা। এমন পরিস্থিতিতে বাধ্য হয়ে বাজারের তালিকা থেকে আঙুর ও মাল্টা ছেঁটে ফেলে কিনলেন কলা, পেয়ারা ও তরমুজ। তবে দুই পদের ফল বাদ দিয়ে এসব কিনতেও তার নাভিশ্বাস অবস্থা। রোজা ঘিরে বাজারে খাদ্যসহ সব ধরনের পণ্যের দাম অস্বাভাবিক বাড়ায় ইফতারের থালা থেকে দুই পদের ফল বাদ দিতে হয়েছে আশিক আহমেদকে।
শুধু তিনি একাই নন, তার মতো একইভাবে এবারের রোজায় হাজারো নিম্নবিত্ত ও মধ্যবিত্তের থালায় টান পড়বে ফলের। সাধারণ মানুষ গত বছর বিদেশি ফল কিনতে না পারলেও দেশি ফলের দাম অনেকেরই নাগালের মধ্যে ছিল। তবে এ বছর বিদেশি ফলের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বেড়েছে দেশি ফলের দামও। রাজধানীর কয়েকটি ফলের বাজার ঘুরে এমন চিত্র দেখা গেছে। অনেক বিক্রেতার সঙ্গেই ফলের দাম বাড়া নিয়ে ক্রেতাদের বাগ্বিতণ্ডা করতে দেখা যায়। এমনকি তাদের অনেকেই ফল না কিনে রাগান্বিত হয়ে খালি ব্যাগ নিয়ে চলে যান।
রাজধানীর অন্যতম বড় পাইকারি ও খুচরা কাঁচাবাজার কারওয়ান বাজারে ফলের দোকানগুলো ঘুরে দেখা যায়, পাইকারি দোকানে ক্রাউন আপেল ২০ কেজির বক্স বিক্রি হচ্ছে ৩ হাজার ৮০০ থেকে ৪ হাজার টাকায়। পাইকারিতে প্রতি কেজি আপেলের দাম পড়ছে ১৯০-২০০ টাকা। আর খুচরা বাজারে তা বিক্রি হচ্ছে কেজিপ্রতি ২৮০ থেকে ৩০০ টাকা। ফুজি আপেলের ২০ কেজির বক্স ৪৫০০-৪৭০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। সে হিসাবে প্রতি কেজি ফুজি আপেলের দাম পাইকারিতে পড়ছে ২২৫-২৩৫ টাকা। খুচরা বাজারে এই আপেল বিক্রি হচ্ছে ২৯০ থেকে ৩০০ টাকা। গত এক বছরে আপেলের দাম কেজিপ্রতি বেড়েছে ২০ থেকে ২৫ টাকা।
মিসরের মাল্টা ১৫ কেজির বক্স পাইকারিতে বিক্রি হচ্ছে ২৯০০ থেকে ৩০০০ টাকায়। খুচরা বাজারে বিক্রি হচ্ছে ৩৩০ থেকে ৩৫০ টাকায়। ভারতের ছোট আকৃতির সাদা আঙুর প্রতি ক্যারেট (৯ কেজি) বিক্রি হচ্ছে ২১০০ থেকে ২২০০ টাকা, একই আঙুর বড় আকৃতির প্রতি ক্যারেট (৯ কেজি) ৩৮০০ থেকে ৩৯০০ টাকা এবং দেশটির ছোট আকৃতির কালো আঙুর প্রতি ক্যারেট ৩০০০ থেকে ৩২০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। এসব আঙুর প্রকারভেদে খুচরা বাজারে বিক্রি হচ্ছে ৩২০ থেকে ৩৫০ টাকা কেজিতে।
চায়না কমলা (৯ কেজি) ১ কার্টন পাইকারিতে বিক্রি হচ্ছে ১৮৫০ থেকে ১৯০০-২০০০ টাকায়, কেজি ২০০-২১০ টাকা। খুচরা বাজারে প্রকারভেদে এ কমলা বিক্রি হচ্ছে ২৮০ থেকে ৩০০ টাকা। সবুজ কমলা পাইকারিতে বিক্রি হচ্ছে কেজি ১৫৭ টাকা, খুচরা বাজারে তা বিক্রি হচ্ছে ২৩০ থেকে ২৫০ টাকায়।
খুচরাপর্যায়ে শবরি কলা বিক্রি হচ্ছে প্রতি ডজন ১৫০, বাংলা কলা ১২০, চাঁপা (চম্পা) ৯০ ও সাগর কলা ১৪০ টাকায়। বিক্রেতারা জানান, দুদিন আগে শবরি কলার ডজন ছিল ১০০-১২০, বাংলা কলা ৮০, চাঁপা ৬০ ও সাগর কলা ১২০ টাকা। বেল প্রতি পিস আকারভেদে ১০০ থেকে ২০০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হচ্ছে। আকারে একটু ছোট হলে ৬০-৮০ টাকা। আর কতবেলের পিস ৫০ টাকা। থাই পেয়ারা ৮০-১০০ ও দেশি ১০০-১২০ টাকা। কিন্তু দুদিন আগেও থাই পেয়ারার দাম ছিল ৭০-৯০ ও দেশি পেয়ারা ৮০-১০০ টাকা। প্রতি পিস বাঙ্গি বিক্রি হচ্ছে ৮০ থেকে ১৫০ টাকায়। মানভেদে প্রতি পিস আনারস ৫০ থেকে ৭০ আর প্রতি কেজি পেঁপে ১২০ থেকে ২০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
ফলের দাম বাড়ার কারণ জানতে চাইলে কারওয়ান বাজারের ফল ব্যবসায়ী মো. রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘গতকালের (সোমবার) চেয়ে পাইকারি বাজারে ফলের দাম বেড়েছে। যার প্রভাব খুচরা বাজারে পড়ছে। গত সপ্তাহে ৮০ টাকা কেজিতে বিক্রি করা পেঁপে বর্তমানে বিক্রি হচ্ছে ১২০ থেকে ২০০ টাকায়। শুধু পেঁপে নয়, সব ধরনের ফলের দাম বেড়েছে। ৫০ থেকে ৬০ টাকার তরমুজ বিক্রি হচ্ছে ৮০ টাকা কেজিতে। ৫০ টাকার আনারস বিক্রি হচ্ছে ৭০ টাকায়।’
ওমর আলী নামে এক ক্রেতা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘মাসের শুরুতে বাড়িভাড়া, সন্তানের স্কুল খরচসহ যাবতীয় খরচ মিলিয়ে সঞ্চয় প্রায় শেষের দিকে। তাই দেনা করে মাসের বাকি দিনগুলো পার করতে হবে। এজন্য ইচ্ছা থাকলেও ইফতারিতে পছন্দের জিনিসগুলো রাখা সম্ভব নয়। তাই দেশি ফলের ওপর ভরসা। কিন্তু সেই দেশি ফলের দামও এখন বেশি। তাহলে আমাদের মতো মধ্যবিত্তরা কীভাবে বাঁচবে?’
একাধিক ব্যবসায়ীর সঙ্গে কথা হয় এই প্রতিবেদকের। তারা বলেন, ডলারের উচ্চমূল্যের পাশাপাশি আমদানি করা আপেল, কমলা ও আঙুরের ওপর গত বছরের মে মাস থেকে ২০ শতাংশ নিয়ন্ত্রণমূলক শুল্ক আরোপ করায় প্রায় এক বছর ধরেই এসব ফলের দাম বাড়তি। রমজানে চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় নতুন করে আবার দাম বেড়েছে। সরকার আমদানি করা ফলকে বিলাসী পণ্যের অন্তর্ভুক্ত করে ২০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করেছে। সম্প্রতি আরও দুটি ফলে নতুন করে শুল্ক বাড়ানো হয়েছে। এ ছাড়া রমজানের কারণে ফলের চাহিদাও বেড়েছে। এ কারণে ফলের বাজার কিছুটা অস্থির হয়ে উঠেছে।
এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ ফ্রেশ ফ্রুট ইম্পোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি সিরাজুল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমাদের দেশে বেশিরভাগ ফল আমদানি করতে হয়। কিন্তু গত বছর থেকে সরকার এসব ফলকে বিলাসী পণ্য তকমা দেওয়ায় নতুন সমস্যা তৈরি হয়েছে। রাজস্ব বোর্ড ২০ শতাংশ নিয়ন্ত্রণমূলক শুল্ক আরোপ করেছে। এর সঙ্গে ডলার সংকট, তেল ও জাহাজের কনটেইনারের ভাড়া বাড়ায় ফলের বাজার নিয়ন্ত্রণে আসছে না। তবে রমজান উপলক্ষে সরকার ফল আমদানিতে এলসি খোলার পর্যাপ্ত সুযোগ দেওয়ায় বাজারে ফলের কোনো সংকট নেই। দাম কমানোর উপায় আমাদের হাতে নেই। সরকার চাইলে কিছু করা সম্ভব।’
এ বিষয়ে কনজ্যুমার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সহসভাপতি এস এম নাজের হোসাইন বলেন, ‘ফলের বাজার এখন নিম্নমধ্যবিত্ত তো বটেই মধ্যবিত্তদেরও নাগালের মধ্যে নেই। এর কারণ সরকারের শুল্কারোপের সঙ্গে ব্যবসায়ীদের অতিমাত্রায় মুনাফা অর্জন। রমজানকে ব্যবসায়ীরা সুযোগ হিসেবে নেন এবং কারণ ছাড়াই ফলের দাম বাড়ান। অন্যান্য পণ্য কিছুটা মনিটরিং করা হলেও ফলের বাজারে কোনো মনিটরিং নেই।’
