‘আমি ঈশ্বরকে দেখেছি, তিনি ভারতের হয়ে চার নম্বরে ব্যাট করেন’, মুখ ফুটে কথাটা বলেছিলেন ম্যাথু হেইডেন। তবে আরও অনেকেই এই অস্ট্রেলিয়ানের সঙ্গে একমত। শচিন রমেশ টেন্ডুলকার নামের বেঁটেখাটো মারাঠি ভদ্রলোকটি আসলে ঠিক মানুষ নন, ঈশ্বরের মানবরূপ।
ভারতীয় কিংবা গ্রিক পুরাণে যে সব দেবদেবী বা ঈশ্বর-ঈশ্বরীদের বিবরণ পাওয়া যায়, তারা দেখতে এবং স্বভাব চরিত্রে অনেকটা মানুষেরই মতো। তাদের ভেতরও কাজ করে প্রেম, ঈর্ষা এমন অনেক অনুভূতি। কিন্তু মানুষের সঙ্গে তাদের মূল পার্থক্য হচ্ছে দেবদেবীরা অমর, অজর। অলিম্পাস বা কৈলাসের শৃঙ্গে বাস করা সেই সব দেবদেবীদের প্রত্যেকের এক একটা মৌলিক বৈশিষ্ট্য আছে। কেউ শিকারের দেবতা, কেউ বিদ্যার দেবী, কেউ সুরের কেউ বা চিকিৎসার। পৌরাণিক যুগ হলে শচিন টেন্ডুলকার নিঃসন্দেহে ক্রিকেটের দেবতা হিসেবেই পূজিত হতেন। নিশ্চিত করেই বলা যায়, তার মতো একাগ্রতা নিয়ে খেলাটা কেউ খেলেনি। শত কোটির প্রত্যাশার জোয়াল এত লম্বা সময় ধরে আর কাউকে বইতে হয়নি।
আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে অভিষেক ১৬ বছর বয়সে। করাচি টেস্টে পাকিস্তানের বিপক্ষে। শচিন ব্যাট করতে নেমেছিলেন ছয়ে, প্রতিপক্ষের তিন পেসার ওয়াসিম আকরাম, ওয়াকার ইউনিস ও ইমরান খান। শরীরে বাউন্সার সয়েছেন শচিন, তাকে বলা ‘দুধ খাওয়া বাচ্চা’ কথাটা ফিরিয়ে দিয়েছেন সুদে-আসলে। ঘরের মাঠ ওয়াংখেড়েতে ২০১৩ সালের ১৫ নভেম্বর খেললেন ভারতের হয়ে শেষ ইনিংসটা। গায়ানার অখ্যাত এক অফস্পিনার নারসিং দেওনারাইন, গোটা ক্যারিয়ারেই যার মাত্র ২৪ উইকেট শচিন টেন্ডুলকারকে শেষবারের মতো আউট করার কৃতিত্বটা হয়ে রইল তারই। ১৯৮৯ থেকে ২০১৩, দুই যুগের ক্যারিয়ারে শচিন টেন্ডুলকার ক্রিকেট মাঠে এমন সব জাদুকরী মুহূর্ত তৈরি করেছেন যেসবের রেশ এখনো কাটেনি।
ডন ব্র্যাডম্যান শচিন সম্পর্কে বলেছিলেন, ‘আমি তার খেলা শুধু টেলিভিশনেই দেখেছি। তার ব্যাটিং টেকনিক দেখে আমি মন্ত্রমুগ্ধের মতো আটকে গিয়েছিলাম। আমি আমার স্ত্রীকে ডেকে বললাম, ‘আমি কখনো আমাকে খেলতে দেখিনি, তবে এই ছেলেটা মনে হচ্ছে একদম আমার মতোই খেলে’। মাসখানেক আগে অস্ট্রেলিয়ান ব্রডকাস্ট করপোরেশন একটি তথ্যচিত্র বানিয়েছে, ব্র্যাডম্যান আর শচিনের সাক্ষাৎ নিয়ে। সেখানেই ডনের কণ্ঠে শচিনের এই প্রশংসা যেন এখনো শিহরণ জাগায় ক্রিকেটপ্রেমীদের মনে। শচিন উত্তরে বলেছিলেন, ‘কোনো ক্রিকেটারের জন্য এর চেয়ে বড় কোনো প্রশংসা আর হতে পারে না’।
রান আর শতকের সংখ্যায় ওয়ানডেতে শচিনকে ছাড়িয়ে গেছেন বিরাট কোহলি। তাকে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল দুজনের মধ্যে কে সেরা? কোহলির উত্তর ছিল, ‘আমার সঙ্গে এমন একজনের তুলনা করা হচ্ছে যাকে দেখে আমি ক্রিকেটার হতে চেয়েছি। দক্ষতার জায়গাতে তো কোনো তুলনাই হতে পারে না। উনি হচ্ছেন সর্বকালের সবচেয়ে পরিপূর্ণ ক্রিকেটার’।
খেলোয়াড়ি জীবনে শচিনের সবচেয়ে বেশি তুলনা হয়েছে ব্রায়ান লারার সঙ্গে। ত্রিনিদাদের রাজপুত্রও অকপটে স্বীকার করেছেন, ‘আমার চোখে সে আমার সময়ের অন্যতম সেরা ব্যাটসম্যান, যে কোনো সময়ের মানদ-েই অন্যতম সেরা। দারুণ টেকনিক, রানের জন্য অপরিসীম ক্ষুধা। সে খুব কম বয়সে খেলা শুরু করে। ১৯-২০ বছর বয়সে আমি যখন ওয়েস্ট ইন্ডিজের হয়ে খেলতে শুরু করি, তখনই আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে তার বছর দুয়েক হয়ে গেছে। আমি ভাবতাম আমি কেন এত আগে শুরু করতে পারিনি, পরে বুঝেছি কারণ শচিন ছিল অসামান্য প্রতিভাবান।’
বহুভাষা আর ধর্মের ভারতকে এক সুতোয় বেঁধেছিলেন শচিন। তিনি ব্যাট করতে নামলে হিন্দু-মুসলিম-জৈন-শিখ সবাই স্রষ্টার কাছে প্রার্থনা করতেন লম্বা ইনিংসের। ২০১১ সালের বিশ্বকাপের ফাইনালে শচিন যখন ব্যাট করতে নামেন, তখন গোটা ওয়াংখেড়েতে একটাই শব্দের অনুরণন। শচিইইইন শচিইইইন। বিশ্বকাপ জয়ের পর তাই তো সতীর্থতা শচিনকে কাঁধে নিয়েই দিয়েছিলেন ভিক্টরি ল্যাপ।
বছর পঞ্চাশেক আগে আজকের মতো স্মার্টফোনের বালাই ছিল না, তাই ছবি তোলা হতো কালেভদ্রে। শচিনের শৈশবের একটা ছবি এখনো দোলা দিয়ে যায় মনকে। বছর পাঁচেকের শিশু শচিন খালি গায়ে হাফপ্যান্ট পরে ব্যাট হাতে স্টান নিয়েছেন। খালি গায়ে কোঁকড়া চুলের সেই শিশুটি আজ পা রেখেছে ৫১-তে। শচিন নিজেই এখন বছর চব্বিশের এক ক্রিকেটারের বাবা। ছেলে অর্জুন বাবার মতো হয়নি, বামহাতি মিডিয়াম পেসার আর ব্যাটিংটাও করে বামহাতে। মুম্বাই ইন্ডিয়ানসের নীল জার্সিতে খেলেছিলেন শচিন, সেই একই দলেই অভিষেক হয়েছে অর্জুনের। উৎকণ্ঠা নিয়েই খেলা দেখছিলেন শচিন, কেভিন পিটারসেনকে এক টুইটের জবাবে লিখেছেন, ‘অভিভাবকের দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে অনেকগুলো উৎকণ্ঠার সময় আসবে, অর্জুনকে খেলতে দেখা ছিল তার মধ্যে একটা।’
পৃথিবীর আবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে বয়স বেড়েছে ক্রিকেট ঈশ্বরেরও। প্রথম শ্রেণি আর ওয়ানডে মিলিয়ে ২১২টা হাফসেঞ্চুরি শচিনের, আজ পূরণ করে ফেললেন জীবনেরও ৫১ বছর বয়স। ঐ সংখ্যাটাকে রান বললেও ভুল কিছু হবে না। শচিনের শুরুর দিকের সময়ের সতীর্থ ডাব্লিউ ভি রমন একবার বলেছিলেন, ‘শচিনের রসবোধ অসাধারণ। তবে তারকাখ্যাতির জন্য সে তার চরিত্রের এই দিকটা বিসর্জন দিয়েছে।’
খেলোয়াড়ি জীবনের অবসান হওয়াতে বোধহয় শচিন ফিরে গেছেন আগের ফর্মে, তাই তো কেক কেটে বলেছেন, ‘এটা আমার জীবনের সবচেয়ে ধীরগতির হাফসেঞ্চুরি (৫০ বছরে পা রাখা)। তবে এই হাফসেঞ্চুরিটাই সবচেয়ে পরিপূর্ণ আর রোমাঞ্চকর। এই হাফসেঞ্চুরি জীবনে উত্থান আর পতনের এক দারুণ প্যাকেজ। এই হাফসেঞ্চুরিটা আমি প্রতিটি পদেই উপভোগ করেছি। এই ইনিংসটায় আমি অনেক কিছু শিখেছি। আর সবচেয়ে বড় ব্যপার হচ্ছে, এই ৫০ বছরের ২৪টা বছরই আমি কাটিয়েছি ভারতের হয়ে খেলে।’
জন্মদিনে অগুনতি ভক্ত, সতীর্থ, এক সময়ের প্রতিপক্ষের ভালোবাসায় সিক্ত হয়েছেন শচিন। সবারই কামনা, এই ৫১ বছরের ইনিংসটাকে যেন সেঞ্চুরিতে রূপ দেন সেঞ্চুরির সেঞ্চুরি করা মাস্টার ব্লাস্টার।
