সারা দেশের মতো উত্তরের জেলা পঞ্চগড়েও টানা তাপপ্রবাহ বইছে। জেলায় প্রায় টানা আট মাস ধরে ভারী বৃষ্টি না হওয়ায় কৃষিতে সংকট সৃষ্টি হয়েছে। চলমান তীব্র তাপপ্রবাহে মাটি শুকিয়ে ক্ষতি হচ্ছে চা বাগানের, মরছে একরের পর একর জমির চা গাছ। চাষিরা বলছেন, প্রাকৃতিক এ দুর্যোগে দিশেহারা হয়ে পড়েছেন তারা।
শুধু পঞ্চগড়ই নয়, তীব্র তাপপ্রবাহ আর কাঁচা চা-পাতার মূল্য কমে যাওয়ায় দিশেহারা হয়ে পড়েছেন উত্তরের পাঁচ জেলার সমতলের ক্ষুদ্র চা চাষিরা। তারা জানান, অনাবৃষ্টি আর তীব্র তাপপ্রবাহে মাটি শুকিয়ে লাল হয়ে পড়েছে। ফলে সেচ দিতে হচ্ছে বেশি।
ভুক্তভোগী চাষিরা বলেন, গত বছর ভাদ্র মাসে শেষ বৃষ্টি হয়েছিল। তারপর আর বৃষ্টির দেখা মেলেনি। ফলে পানির স্তর নেমে গেছে অনেক নিচে। সেচের পানি জমিগুলো ধরে রাখতে পারছে না। যে কারণে সেচ বেশি দিতে হয়। খরচ বেড়ে গেছে। অনেক ক্ষুদ্র চাষি টাকার অভাবে বাগানে সেচ দিয়ে পানি দিতে পারছেন না। এমন অবস্থায় এবারে চা উৎপাদন কমে যাওয়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে।
পঞ্চগড়ের তেঁতুলিয়া উপজেলার কালান্দিগজ এলাকার চা চাষি মিজানুর রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘৪৫ দিন পরপর কাঁচা চা-পাতা তুলি। এই ৪৫ দিনে আগে দুই থেকে তিনবার সেচ দিয়ে পানি দিতে হতো। খরার কারণে এ বছর ৪৫ দিনে পানি দিতে হচ্ছে অন্তত ১০ থেকে ১২ বার। প্রতি একর চা বাগানে পানি দিতে খরচ হয় দুই হাজার টাকা।’
আজিজনগর এলাকার চা চাষি দেলোয়ার হোসেন বলেন, ‘অনাবৃষ্টির জন্য এক একর জমি থেকে সর্বোচ্চ দুই হাজার কেজি কাঁচা চা-পাতা পাওয়া যায়। কারখানা কর্তৃপক্ষ প্রতি কেজি কাঁচা চা-পাতা কেনে মাত্র ১০ টাকা দরে। এক একর জমি থেকে মাত্র ২০ হাজার টাকা পাই। সেচ খরচ, সার কীটনাশক, মজুরিসহ এক একর জমিতে খরচ পড়ে ৪০ হাজার টাকা। বর্তমানে চা বাগানের যতœ নিতে পারছি না। চা বাগান মরে যাচ্ছে। সরকার আমাদের দিকে না তাকালে মাঠে মারা যাব আমরা।’
আবহাওয়া অধিদপ্তর বলছে, আট মাস ধরে পঞ্চগড়ে ভারী বৃষ্টিপাত হয়নি। তাপমাত্রা ৩৫ থেকে ৩৯ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে ওঠানামা করছে। তবে এ জেলায় মে মাসের প্রথম সপ্তাহের দিকে বৃষ্টির সম্ভাবনা আছে।
বাংলাদেশ চা বোর্ডের পঞ্চগড় আঞ্চলিক কার্যালয়ের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ও ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা কৃষিবিদ আমির হোসেন জানান, কাঁচা চা-পাতার দাম কমে যাওয়ার কারণে অনেক চাষি চা বাগানে সেচ দিচ্ছে না। তারা লোকসানের আশঙ্কা করছেন।
পঞ্চগড়সহ উত্তরাঞ্চলের পাঁচ জেলায় (পঞ্চগড়, ঠাকুরগাঁও, নীলফামারী, লালমনিরহাট ও দিনাজপুর) বর্তমানে নিবন্ধিত ৯টি ও অনিবন্ধিত ২১টি বড় চা বাগান (২৫ একরের ওপরে) রয়েছে। এ ছাড়া ২ হাজার ৫৩টি নিবন্ধিত ও ৬ হাজার ৩০২টি অনিবন্ধিত ক্ষুদ্রায়তনের চা বাগান আছে। বাড়ির আনাচে-কানাচে ক্ষুদ্র চাষিরা চা বাগান গড়ে তুলেছেন। সব মিলিয়ে প্রায় ১২ হাজার ৭৯ একর জমিতে চা চাষ হচ্ছে। গত মৌসুমে পাঁচ জেলার সমতল ভূমিতে ১ কোটি ৭৭ লাখ ৫৯ হাজার ২২৬ কেজি চা উৎপাদিত হয়। চা চাষের জন্য ২৮ ডিগ্রি থেকে ৩০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা সবচেয়ে সহনীয়। তবে বর্তমানে এই এলাকায় এর চেয়ে অনেক বেশি তাপমাত্রা বিরাজ করছে।