ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের আদর্শিক জোট হিসেবে ১৪ দলের গুরুত্ব দিন দিন কমছে। কাগজে কলমে এ জোট থাকলেও সরকারের কোনো কিছুতে নেই আর।
আওয়ামী লীগ ও জোটের শরিক কয়েকটি দলের নেতারা বলছেন, টানা ক্ষমতায় থাকার কারণে আওয়ামী লীগের কাছে এক সময়ের গুরুত্বপূর্ণ জোটটির কদর কমে গেছে।
আওয়ামী লীগের নীতিনির্ধারণীয় পর্যায়ের কোনো কোনো নেতা জোটের শরিকদের রাজনৈতিক অক্ষমতা তুলে ধরে বলেছেন, শরিক দলগুলো তাদের কাছে এক রকম বোঝা হয়ে উঠেছে।
অবশ্য ১৪ দলীয় জোটের সমন্বয়ক আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদ সদস্য আমির হোসেন আমু দেশ রূপান্তরকে বলেন, ১৪ দল আছে, ১৪ দল থাকবে।
জোটের শরিক জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের (জাসদ) সভাপতি হাসানুল হক ইনুও স্বীকার করেছেন যে, একসময়ে ১৪ দলীয় জোটের জৌলুশ ছিল। এখন সেটি নেই। এটাকে একেবারেই রাজনৈতিক উত্থান-পতন হিসেবে দেখছেন তিনি।
৭ জানুয়ারির দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের স্বতন্ত্র প্রার্থীর কাছে পরাজিত হওয়া ইনুর এমন পর্যবেক্ষণের সঙ্গে জোটের বর্তমান অবস্থার মিল রয়েছে। আওয়ামী লীগের সঙ্গে ২৩ দফার ভিত্তিতে ২০০৪ সালে প্রতিষ্ঠিত আদর্শিক এ জোটের কর্মকান্ডও চোখে পড়ে না। আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদ সদস্য আমির হোসেন আমুকে জোটের সমন্বয়কের দায়িত্বে রাখার মধ্যেই শুধু দলটির সঙ্গে ১৪ দলের সম্পর্কের বিষয়টি যেন সীমাবদ্ধ হয়ে আছে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে আওয়ামী লীগসহ জোটের অন্য শরিক দলের নেতারা দেশ রূপান্তরকে বলেন, টানা ক্ষমতায় থাকার কারণে আওয়ামী লীগের রাজনীতিতেও পরিবর্তন এসেছে।
অবশ্য, গত শুক্রবার আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের সংবাদ সম্মেলনে বলেছেন, ১৪ দলীয় জোটকে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তি হিসেবে কাছে টানতে হবে। সবকিছু মিলিয়ে নিজেদের প্রস্তুতি নিতে হবে। এর ওপর নির্ভর করে পরিস্থিতি মোকাবিলা করা হবে।
২০০৪ সালের ২১ আগস্ট রাজধানীর বঙ্গবন্ধু এভিনিউতে আওয়ামী লীগের সমাবেশে ভয়াবহ গ্রেনেড হামলার পর ১৪ দলীয় জোট গড়ে ওঠে। বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টি, সাম্যবাদী দল, গণতান্ত্রিক মজদুর পার্টি, জাসদ (ইনু), গণতন্ত্রী পার্টি, ন্যাপ, গণআজাদী লীগ, কমিউনিস্ট কেন্দ্র, বাসদ, তরিকত ফেডারেশন ও আনোয়ার হোসেন মঞ্জুর নেতৃত্বাধীন জাতীয় পার্টিকে (জেপি) নিয়ে এ জোট গঠন করা হয়।
এরপর বিএনপি সরকারের বিরুদ্ধে ধারাবাহিক আন্দোলন গড়ে ওঠে, যার সমাপ্তি ঘটে ২০০৭ সালে সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের ক্ষমতা গ্রহণের মধ্য দিয়ে। এক-এগারোর সরকার হিসেবে পরিচিত ওই তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে ২০০৮ সালের নির্বাচনের মধ্য দিয়ে আওয়ামী লীগ, ১৪ দলীয় জোট ও জাতীয় পার্টিকে নিয়ে গড়া মহাজোট ক্ষমতায় আসে। সরকারের শরিকরাও স্থান পায়। ২০১৪ সালের বিএনপিবিহীন নির্বাচনের পর আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন সরকারেও শরিকদের জায়গা হয়েছিল। কিন্তু ২০১৮ সালের একাদশ সংসদ নির্বাচনের পর আর মন্ত্রিসভায় স্থান পাননি শরিকরা। দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনেও বহু দেনদরবার করে অল্প কয়েকটি আসনে ছাড় পেয়েছেন শরিকরা। কিন্তু নির্বাচনে তাদের দুজন ছাড়া কেউ জয় পাননি।
আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর দুই সদস্য দেশ রূপান্তরকে বলেন, শরিক দলগুলো তাদের কাছে এক রকম বোঝা হয়ে উঠেছে। কারণ, ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের সামনে যখন লড়াই-সংগ্রাম মোকাবিলা করতে হয়েছে, সহায়ক শক্তি হিসেবে মাঠে নামেনি জোটের কোনো শরিক দলই। ক্ষমতার চেয়ারে বসে নিজের দলকেও শক্তিশালী করতে পারেনি দলগুলো। বিপদে-আপদে পাশেও দাঁড়াবে না, নিজের দলকেও শক্তিশালী করতে পারবে না, তাহলে ক্ষমতার সঙ্গী করে লাভ কী, এমন প্রশ্নও তুলেছেন তারা।
আওয়ামী লীগের সম্পাদকমণ্ডলীর এক সদস্য দেশ রূপান্তরকে বলেন, ১৪ দলের শীর্ষ নেতৃত্ব ক্ষমতার রাজনীতিতে এতই আবিষ্ট যে, দলের রাজনীতি তারা নষ্ট করেছেন। দলীয় অবস্থান নষ্ট হওয়ার ফলে জোটভুক্ত দলগুলোর অবস্থান ও প্রয়োজনীয়তা আওয়ামী লীগের কাছে শূন্যের কোঠায় চলে গেছে। এ পরিণতির জন্য জোটের শীর্ষ নেতৃত্বই দায়ী।
এ নেতা বলেন, আওয়ামী লীগ শরিক দলগুলোকে যথেষ্ট সুযোগ দিয়েছে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠার।
জানতে চাইলে ১৪ দলীয় জোটের অন্যতম শরিক সাম্যবাদী দলের সাধারণ সম্পাদক দিলীপ বড়ুয়া দেশ রূপান্তরকে বলেন, ১৪ দলীয় জোটের উপযোগিতা, প্রাসঙ্গিকতা রয়েছে বলে মনে হয় না। আওয়ামী লীগের সঙ্গে জোটের সম্পর্কও কাগুজে মনে হয় তার কাছে।
জোটের মধ্যম সারির নেতারা দেশ রূপান্তরকে বলেন, জোটের এমন পরিণতি মেনে নেওয়ার অন্যতম কারণ, শরিক দলগুলোর শীর্ষ নেতাদের ব্যক্তিগত স্বার্থ ও সুযোগ-সুবিধা আদায়ের রাজনীতি।
তবে জোটের প্রাসঙ্গিকতা এখনো আছে বলে মনে করেন এক সময় সরকারের মন্ত্রিসভার সদস্য শরিক জাসদ নেতা ইনু। তিনি বলেন, ১৫ বছর টানা ক্ষমতায় থাকার কারণে আওয়ামী লীগও একভাবে চলছে না। ইনু বলেন, জোট নেতা শেখ হাসিনার সঙ্গে একটি বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে। মূলত সেই বৈঠকের পরেই ১৪ দলীয় জোট নতুন কর্মপরিকল্পনা ঠিক করবে। এখন সবাই ধৈর্য ধরে অপেক্ষা করছেন।
যদিও প্রধানমন্ত্রী এই জোটের সঙ্গে সর্বশেষ বৈঠক করেছিলেন দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনের আগে গত বছর। কিন্তু নির্বাচনে আসন ছাড় দেওয়া নিয়ে ওই বৈঠকে আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা শরিক দলের নেতাদের জোটের সমন্বয়কের সঙ্গে বসার পরামর্শ দিয়েছিলেন। ওই বছরের প্রথম দিকে মার্চেও একবার জোট নেতাদের সঙ্গে বৈঠকে বসেছিলেন তিনি। এর আগে প্রধানমন্ত্রী ১৪ দলের শরিক নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করেছিলেন ২০১৮ সালের নির্বাচনের আগে।
রাজনীতিতে জোটের গুরুত্ব কমে যাওয়ার আরেকটি কারণ জানালের জোটের একাধিক নেতা। তারা বলছেন, বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলনের সময় রাজনৈতিক পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে তখন প্রায় নিয়মিত বৈঠক হতো। নানা কৌশল অনুসরণ করে রাজনীতি করতে হয়েছে। তখন জোটের নেতাদের বক্তব্যও গুরুত্ব পেয়েছে আওয়ামী লীগের কাছে। তখন ক্ষমতায় থাকা বিএনপিও ফ্যাক্টর মনে করেছিল ১৪ দলীয় জোটকে। কিন্তু আওয়ামী লীগ গত দেড় দশক ক্ষমতায় থাকায় রাজনীতির মাঠেও বিরোধীদের সামাল দেওয়ার বিষয়টি আওয়ামী লীগকেই সামলাতে হয়। দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনের আগেও আওয়ামী লীগকেই মূলত বিরোধীদের আন্দোলন সামলাতে হয়েছে। তখনো ১৪ দলের শরিকদের শক্তি-সামর্থ্য নিয়ে প্রশ্ন উঠেছিল।
জোটের শরিক দলগুলোর নেতারা মনে করেন, আওয়ামী লীগ তাদের দূরে সরিয়ে রাখতে চায়। সর্বশেষ জাতীয় নির্বাচনে ক্ষমতাসীন দল সেটা স্পষ্ট করেছে। আওয়ামী লীগ নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের একাধিক নেতার দাবি জোটভুক্ত দলগুলোর রাজনৈতিক অবস্থানই তাদের আওয়ামী লীগের কাছে গুরুত্বহীন করে তুলেছে।
