ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) নির্মাণাধীন বিভিন্ন ভবনের জন্য লিফট কিনতে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য (শিক্ষা) অধ্যাপক ড. সীতেশ চন্দ্র বাছারসহ চার সদস্যের একটি প্রতিনিধি দল ফিনল্যান্ড গিয়েছেন। সম্প্রতি গণমাধ্যমে এমন খবর প্রকাশ হওয়ার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমসহ বিভিন্ন মাধ্যমে ব্যাপক সমালোচনার সৃষ্টি হয়েছে।
বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা গেছে, চার সদস্যের এই প্রতিনিধি দলের ফিনল্যান্ড যেতে যে খরচ হবে তা বিশ্ববিদ্যালয় বহন করবে না। প্রি–শিপমেন্ট ইনস্পেকশনের (পিএসআই) অংশ হিসেবে এ প্রতিনিধি দল ফিনল্যান্ড যাচ্ছেন, ফলে তাদের এই ব্যয় বহন করবে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। ঠিকাদারের সঙ্গে চুক্তিতে ব্যয়ের বিষয়টি উল্লেখ রয়েছে বলেও জানা গেছে।
সরকারের বিভিন্ন দপ্তরে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, কেবল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্ষেত্রেই নয় সরকারী সব কেনাকাটার প্রোপোজালেই বিদেশ ভ্রমণের বিষয়টি উল্লেখ রয়েছে। আর এই ভ্রমণের পুরো ব্যয় বহন করে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। এ ক্ষেত্রে যুক্তি দেখানো হয়, বিদেশ সফর করলেও এতে সরকারের বা সংশ্লিষ্ট দপ্তরের কোন ব্যয় বাড়বে না। প্রশাসনের এই প্রথা বিদেশ ভ্রমণে প্রলুব্ধ করছে সংশ্লিষ্ট দপ্তরের কর্তাদের।
এদিকে ব্যয় না বাড়ার যে যুক্তি দেখানো হয় এর সঙ্গে একমত নন বিশিষ্টজনেরা। তারা মনে করেন, বিদেশ সফরের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান যে সুবিধা দেয় তা অনৈতিক। এটা অনেকটা ঘুষ গ্রহণের শামিল। একটা কাজের ক্ষেত্রে যখন প্রতিষ্ঠানের কর্তা ব্যক্তিরাই আর্থিক সুবিধাভোগ করেন তখন ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান নানাভাবে সুবিধা গ্রহণ করে। কেনোনা বিদেশ ভ্রমণের যে অতিরিক্ত টাকা খরচ হয় তা তো ওই প্রতিষ্ঠান বহন করবে না, তারা কোনো না কোনোভাবেই সংশ্লিষ্ট কাজ থেকে এই খরচের টাকা বের করে নেবে। যা কাজের মান কমিয়ে অথবা প্রকল্পের ব্যয় বাড়িয়ে দেয়।
তারা বলেন, বিদেশ সফরের ক্ষেত্রে বিমান ভাড়া, উন্নত হোটেলে থাকা, খাবার খরচ, সফরে থাকার সময় ঘুরতে যাওয়াসহ বিভিন্ন কাজে যে খরচ হয় সেই টাকাও দিয়ে থাকে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। এখন এই খরচ তা যদি সফরে না গিয়ে কমানো যেত তাহলে সরকারের খরচ বাঁচত এবং কাজের মান বাড়ত। তাছাড়া এতে ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানকে মূল প্রতিষ্ঠানের কাছে অধিক জবাবদিহিতা দিতে হত।
এ প্রসঙ্গে সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার দেশ রূপান্তরকে বলেন, প্রশাসন বা সরকারি প্রতিষ্ঠানের বিদেশ সফরের প্রতি দুর্বলতা নতুন নয়। বিভিন্ন সময় এমনও হয়েছে যে— একটি ক্যামেরা কিনতে তিনজন বিদেশ সফরে গিয়েছেন। শুধু তাই নয়, এক হাজার সরকারি কর্মকর্তাকে খিচুড়ি রান্না শিখতে ও পরিবেশন করতে বিদেশ পাঠানোর মতো অদ্ভুত প্রস্তাব দিতেও দেখা গেছে। অথচ আমাদের গ্রামে গঞ্জে খিচুড়ি রান্না ও পরিবেশন করার সুদীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে। এজন্য বিদেশ সফরের চেয়ে আমাদের দেশের যেকোনো একটা পাড়াগাঁয়ে পাঠানোই ভালো হত।
পেশাগত উন্নয়ন ও উচ্চতর প্রশিক্ষণ, অভিজ্ঞতা বিনিময়, প্রযুক্তিগত বিষয়ের ক্ষেত্রে যন্ত্র চালানোর ক্ষেত্রে দক্ষতা অর্জনের জন্য সরকারি দপ্তরের কর্মকর্তাদের বিদেশ সফর করার প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। কিন্তু অহেতুক বিদেশ সফরের পক্ষে কোনো যুক্তি হতে পারে না। বিভিন্ন সময় দেখা গেছে সরকারের উচ্চ পর্যায় থেকে কর্মকর্তাদের বিদেশ ভ্রমণে নিরুৎসাহিত করা হয়েছে। কিন্তু তা উপেক্ষা করে বিভিন্ন কৌশলে বিদেশ যাওয়া অব্যাহত রেখেছেন কর্মকর্তারা।
গণমাধ্যমে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, ২০২২ সালের জুন মাসে চর দেখতে যুক্তরাষ্ট্র-অস্ট্রেলিয়া সফরে গিয়েছিল একটি বহর। এই দুই দেশ ভ্রমণ করে চর বিষয়ে জ্ঞান অর্জন করতে সচিব, মন্ত্রীর পিএস, সচিবের পিএস, ডিপুটি কালেক্টর, অতিরিক্ত ডিপুটি কালেক্টরসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে নিয়োজিত কর্তারা এই দেশ দুটি সফরে যান। সফরের উদ্দেশ্য ছিল ভূমিহীন মানুষদের চরে স্থানান্তর করে তাদের জীবন-জীবিকার উন্নয়ন। এখন যে দুটি দেশে তারা ভ্রমণে গিয়েছিলেন সেই অস্ট্রেলিয়া বা যুক্তরাষ্ট্রে নিকট অতীতে ভূমিহীন মানুষদের চরে পাঠানোর কোনো উদাহরণ নিকট অতীতে নেই। তাহলে তারা এই দুই দেশ ভ্রমণ করে কী অভিজ্ঞতা অর্জন করলেন কিংবা এই অভিজ্ঞতা ফিরে আসার দুই বছর পর কী কাজে লাগলো তা দৃশ্যমান নয়।
ওই সফরে এমন অনেক কর্তা ব্যক্তি ছিলেন যারা সফর শেষে অবসরে চলে যান কিংবা অন্য মন্ত্রণালয়ে বদলী হয়ে যান। সম্প্রতি আরও একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের খোঁজ পাওয়া গেছে যেখানে প্রায় ৭০ জনের একটি বহর জ্ঞান অর্জন ও প্রশিক্ষণের জন্য দক্ষিণ কোরিয়া যান সরকারী খরচে। সরকারের মোটা অঙ্কের টাকা খরচ করে তারা দেশে ফিরে এসে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানে যোগদান না করে পূর্বের প্রতিষ্ঠানে চাকরী করছেন। অথচ তাদের সফরের শর্তে স্পষ্ট উল্লেখ ছিল— কোরিয়া থেকে ফিরে এসে নতুন প্রতিষ্ঠানে যোগ দিতে হবে। গত কয়েকমাসে একাধিক নোটিশ দেওয়ার পরও তারা বিভিন্ন অজুহাত তৈরি করে পূর্বের প্রতিষ্ঠানেই রয়ে গেছেন তারা।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একটি প্রকল্পের পরিচালক দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমরা যখন কোনো প্রকল্পের কাজ পাই তখন এই কাজের যত ধরনের ব্যয় হয় তা প্রকল্প থেকে পুষিয়ে নিতে হয়। আমার অভিজ্ঞতা থেকে বলতে পারি, বিভিন্ন সময় কর্তাদের প্রস্তাব না মানার কারণে আমার প্রকল্পের ফাইল আটকে দেওয়া হয়েছে। সবকিছু ঠিক থাকার পরও অদ্ভুত অজুহাতে ভুল ধরে দিনের পর দিন প্রকল্পের কাজ বন্ধ রাখা হয়েছে। যখন তাদের দাবী মেনে নিয়েছি তখন সেসব আর কখনো দেখা দেয়নি।’
জনগণের টাকার অপচয় করে মশলা চাষ, লিফট কেনা, পুকুর কাটা, নলকূপ বসানো বা খিচুড়ি রান্না শেখার মতো তুচ্ছ বিষয়ে বিদেশ সফরে গিয়ে সরকারের অর্থ অপচয় নিয়ে সুশীল সমাজ থেকে আপত্তির পর তা উপেক্ষা করে বিদেশ সফরের নামে অর্থ লোপাট চলছে। এই লোপাটের ফলে জনগণের ট্যাক্সের টাকার অপচয় হলেও তা নিয়ে কিছুই করার নেই জনগণের।
