মঙ্গলবার, ১৮ জুন ২০২৪, ৪ আষাঢ় ১৪৩১
দেশ রূপান্তর

অবৈধ পথে ঝরছে প্রাণ

কোনো কৌশলেই থামছে না মানব পাচার

  • মানব পাচার নিয়ন্ত্রণ করে ৭০ সিন্ডিকেট
  • সিন্ডিকেটে আছে রাজনৈতিক নেতাও
  • কথিত ট্রাভেল এজেন্সিগুলোর অপকর্ম
আপডেট : ১৮ মে ২০২৪, ০৫:৫৫ পিএম

কিছুতেই মানব পাচার রুখতে পারছে না আইনপ্রয়োগকারী সংস্থাগুলো। মাঝেমধ্যে ছোটখাটো মানব পাচারকারী ধরা পড়লেও এর পেছনের কারিগররা অধরাই থাকে। তালিকার পর তালিকা করার পরও কাজের কাজ কিছুই হচ্ছে না।

মানব পাচার প্রতিরোধ করতে পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা দফায় দফায় বৈঠক করছেন। তালিকায় যাদের নাম রয়েছে তাদের বেশিরভাগই প্রভাবশালী। তাদের ৭০ জনকে প্রভূত ক্ষমতার অধিকারী মনে করছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। তারা প্রত্যেকেই একটি করে সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ করে। ব্যবসার সঙ্গে সঙ্গে তারা রাজনীতিতেও জড়িত।

ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে ট্রাভেল এজেন্সির মাধ্যমে মানব পাচারের অপকর্ম করা হচ্ছে। বৈধ ব্যবসার আড়ালে অবৈধভাবে ইউরোপসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে মানব পাচার করছে তালিকাভুক্তরা। মানব পাচার প্রতিরোধ ও তালিকাভুক্তদের আইনের আওতায় নিতে পুলিশের সব ইউনিটকে বিশেষ নির্দেশনা দিয়েছে পুলিশ সদর দপ্তর।

সংশ্লিষ্টরা দেশ রূপান্তরকে জানায়, কঠোর নজরদারির মধ্যেও থেমে নেই বিদেশে মানব পাচার। বিভিন্ন দেশে চাকরি দেওয়ার নাম করে লোকজনকে পাচার করা হচ্ছে। বিভিন্ন ট্রাভেল এজেন্টের মাধ্যমে মানব পাচার হচ্ছে বেশি। লিবিয়া, ইতালি, ফ্রান্স প্রভৃতি ইউরোপীয় দেশে চাকরি দেওয়ার কথা বলেই লোকজনকে নেওয়া হচ্ছে।

গত এক বছরে ভূমধ্যসাগর দিয়ে ইতালিসহ ইউরোপের অন্য দেশগুলোতে পাড়ি দিতে গিয়ে দুই হাজারের বেশি লোক মারা গেছে। তাদের মধ্যে বাংলাদেশির সংখ্যাই বেশি। পাচারের সঙ্গে কথিত রাজনীতিক; বেবিচক, বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস ও অন্যান্য এয়ারলাইনস এবং আইনপ্রয়োগকারী সংস্থা, ট্রাভেল এজেন্সির লোকজন জড়িত। দিনে দিনে ভয়ংকর হয়ে উঠছে পাচারকারী চক্র।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কঠোর অভিযানের মধ্যেও তাদের অপকর্ম থেমে নেই। সম্প্রতি পুলিশের একটি সেমিনারে বলা হয়েছে, ২০১০ সালে আমেরিকার তৎকালীন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা জাতীয় দাসত্ব ও মানব পাচার প্রতিরোধে জানুয়ারি মাসকে ন্যাশনাল সেøøভারি অ্যান্ড হিউম্যান ট্রাফিকিং প্রিভেনশন মান্থ হিসেবে ঘোষণা করেছিলেন। প্রতি বছর বিশ্বে প্রায় আড়াই কোটি নারী, পুরুষ ও শিশু পাচারের শিকার হচ্ছে।

বাণিজ্যিকভাবে তাদের যৌনকাজে ব্যবহার, বলপূর্বক শ্রম ও ঋণ-দাস হিসেবে ব্যবহারের উদ্দেশ্যে কেনাবেচা করা হচ্ছে। পাচারকারীরা বিশ্বের প্রতিটি দেশে মানুষকে তাদের শিকারে পরিণত করার মাধ্যমে হাজার কোটি টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে। খুলনা, মাদারীপুর, শরীয়তপুর, রাজশাহী, চট্টগ্রাম, ঢাকা, রংপুর, কুমিল্লা, চাঁদপুর প্রভৃতি জেলা থেকে মানব পাচার হচ্ছে সবচেয়ে বেশি।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘মানব পাচার কারবারের সঙ্গে যারা জড়িত তাদের ধরতে পুলিশ-র‌্যাবসহ সব ইউনিটকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। গ্রামাঞ্চল থেকে সহজ-সরল লোকদের বিদেশে নেওয়ার কথা বলে প্রতারণা করা হচ্ছে। তাদের ক্ষমা করা হবে না। সিন্ডিকেট যতই শক্তিশালী হোক, তাদের আইনের আওতায় আনা হবেই।’

পুলিশ সূত্র জানায়, কয়েক মাস বন্ধ থাকার পর মানব পাচারকারী চক্র নতুন করে সক্রিয় হয়েছে। পাচারকারীরা দালালচক্রের মাধ্যমে বেশি বেতনের ভালো চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে যুবক, নারী ও শিশুসহ বিভিন্ন শ্রেণির মানুষের কাছ থেকে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে।

সৌদি আরবে যাওয়ার স্বপ্ন দেখিয়ে কয়েক মাস আগে দেশের বিভিন্ন জেলার ১৮ যুবকের কাছ থেকে কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে একটি চক্র ও এজেন্সি মালিকরা। ওই যুবকদের এখন পথে বসার দশা। কেউ জমি ও স্বর্ণালঙ্কার বন্ধক রেখে, কেউ চড়া সুদে, আবার কেউ ধানের সময় প্রতি লাখে বাড়তি ধান দেবেন এ শর্তে টাকা ধার নিয়েছিলেন। আশা ছিল সৌদি আরবে যাওয়ার। কিন্তু টাকা হাতিয়ে নিয়ে গা-ঢাকা দিয়েছে প্রতারক চক্র। চক্রটি যে এজেন্সির মাধ্যমে তাদের সৌদি আরবে পাঠানোর কথা দিয়েছিল, তারা কোনো দায় নিচ্ছে না। উল্টো ভুক্তভোগীদের নানাভাবে ভয়ভীতি দেখাচ্ছে।

পুলিশ সূত্র জানায়, ওই ১৮ যুবককে ঢাকার নয়াপল্টনের ভিক্টরী হোটেলের চারতলায় থাকা উত্তরবঙ্গ ওভারসিজ নামের একটি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে দেশের বাইরে পাঠানোর কথা ছিল।

পাচারকারী চক্রের সদস্য আবু সাঈদ, শাহাবুদ্দিন, ফজলু কাজী এসব অপকর্ম করছেন। নোয়াখালীর কবিরহাটের পারভেজ ও রাকিব নামে দুই ব্যক্তি অভিযোগ করেন, তারা প্রতারণার শিকার। বছরখানেক আগে তার দুই আত্মীয়কে ইতালি নিয়ে যাওয়ার কথা বলে প্রথমে লিবিয়ায় নিয়ে যাওয়া হয়। পরে সাগরে করে ইতালি নেওয়ার সময় স্পিডবোট উল্টে যায়। পাচারকারীরা তাদের কাছ থেকে প্রায় ২০ লাখ টাকা নিয়েছে। পাচারকারীদের দুজন শাসক দলের নেতা। তারা এলাকায় প্রকাশ্যে ঘুরছে বলে পুলিশ সূত্র জানিয়েছে।

মাদারীপুরের রাজৈর উপজেলার কবিরাজপুরের শাওন ফকির পুলিশের কাছে অভিযোগ করেছেন, ‘দালালদের ৮ লাখ টাকা দিয়ে শ্যালক কায়সারকে ইতালি পাঠিয়েছিলাম। তাকে লিবিয়া থেকে জাহাজে করে ইতালি পৌঁছে দেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু তার আর ইতালি যাওয়া হয়নি, নৌকার তলায় রাখায় দমবন্ধ হয়ে মারা যায় কায়সার।’ তিনি জানান, কায়সারসহ আটজনকে নৌকার পাটাতনের নিচে রাখে পাচারকারীরা। অক্সিজেন সংকটে দমবন্ধ হয়ে মারা যায় সবাই।

গত ১৫ ফেরুয়ারি লিবিয়া থেকে নৌকাযোগে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দেওয়ার পথে তিউনিশিয়া উপকূলে অন্তত নয়জন অভিবাসনপ্রত্যাশী মারা গেছেন। তাদের আটজনই বাংলাদেশি। ওই ঘটনায় বিমানবন্দর থানায় একটি হত্যা মামলা হলেও এখনো কেউ গ্রেপ্তার হয়নি।

মাদারীপুরের রাজৈর উপজেলার কদমবাড়ির নয়ন বিশ্বাস, একই উপজেলার খালিয়ার মামুন শেখ ও সজল, একই উপজেলার বাজিতপুর নতুনবাজারের কাজি সজীব ও কবিরাজপুরের কায়সার, গোপালগঞ্জের মুকসুদপুর উপজেলার রাগদীর রিফাত, দিগনগরের রাসেল ও গঙ্গারামপুর গোহালার ইমরুল কায়েস ওরফে আপন পাচারকারীদের হাতে মারা যান।

এর বছরখানেক আগে অবৈধভাবে ইতালি যাওয়ার পথে ভূমধ্যসাগরে মাদারীপুুরের রাজৈর ও গোপালগঞ্জের মুকসুদপুরের আজিজুল সিকদারের ছেলে সাগর সিকদার, হোসেনপুর গ্রামের আজিজ শেখের ছেলে জিন্নাত শেখ, উল্লাবাড়ি গ্রামের বিজেন্দ্রনাথ মল্লিকের ছেলে সাধন মল্লিক, মুকসুদপুরের তপারকান্দি গ্রামের ফজলু মুন্সীর ছেলে সজিব মুন্সী মারা যান। সবার পরিবার এখন নিঃস্ব। যারা এসব অপকর্ম করেছে তারা প্রভাবশালী হওয়ায় পুলিশ ব্যবস্থা নিচ্ছে না।

পুলিশ সদর দপ্তরের ডিআইজি পদমর্যাদার এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘শরীয়তপুরসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে মানব পাচারচক্রের সদস্যদের অবৈধ কার্যক্রম থেমে নেই। লিবিয়া, তুরস্ক, গ্রিস, ইতালি, স্পেনে পাঠানোর কথা বলে পাচারকারীচক্র সাধারণ মানুষের কাছ থেকে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে। ইউরোপে নিতে বাংলাদেশ থেকে প্রথমে দালালরা লিবিয়ায় পাঠায়। পরে সেখান থেকে ঝুঁকিপূর্ণ নৌকায় ইতালি পাঠায়। তাছাড়া পাচারকারীচক্র পাশবিক নির্যাতন করে তার ভিডিও পাঠিয়ে স্বজনদের কাছ থেকে টাকা আদায় করছে। টাকা দিতে না পারলে মেরে ফেলে।’

তিনি বলেন, ‘আমরা পাচারকারীদের তালিকা করেছি। বেশিরভাগই প্রভাবশালী। পুলিশের সবকটি ইউনিটকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে পাচারকারীদের নিয়ন্ত্রণ করতে। তালিকায় সিলেটের তালতলার ট্রাস্ট ট্রাভেল এজেন্সি, জিন্দাবাজারের ইয়াহিয়া ওভারসিজ, পুরানা পল্টনের নোয়াখালী টাওয়ারের বিএমএস ট্রাভেলস, মাহবুব এন্টারপ্রাইজ, মতিঝিলের জিএসএ অব ইথিওপিয়ান এয়ারলাইনস, পুরানা পল্টনের স্কাইভিউ ট্যুর অ্যান্ড ট্রাভেলসে নানা অপকর্ম হয় বলে আমরা জেনেছি। মানব পাচারের ঘটনা খুবই উদ্বেগজনক।’

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত আলোচিত