ভারতবর্ষ, আফ্রিকা এবং ক্যারিবিয়ান দ্বীপগুলোর মতো আমেরিকাতেও ছিল ব্রিটিশ উপনিবেশ। ১৭৫৭ সালে পলাশীর যুদ্ধের মাধ্যমে ভারতবর্ষে স্বাধীনতার সূর্য অস্তমিত হয় আর ঠিক ২৬ বছর পর ১৭৮৩ সালে সশস্ত্র স্বাধীনতা সংগ্রামের মাধ্যমে আমেরিকান উপনিবেশগুলো ব্রিটিশদের কাছ থেকে স্বাধীন হয় জর্জ ওয়াশিংটনের নেতৃত্বে। ভাষাগত নৈকট্য থাকলেও সাংস্কৃতিকভাবে ব্রিটিশদের থেকে আলাদা ও স্বতন্ত্র হতে চায় স্বাধীন আমেরিকানরা, যার প্রমাণ মেলে গাড়ি চালানোর দিক থেকে শুরু করে বানান, টাইয়ের নকশা এমনকি খেলাধুলাতেও।
ব্রিটিশদের কল্যাণে যে খেলাটা গোটা বিশ্বে ফুটবল নামে পরিচিত, আমেরিকায় তার নাম সকার। আমেরিকাতেও ফুটবল তুমুল জনপ্রিয়, কিন্তু তার সঙ্গে আমাদের চেনা ফুটবলের কোনো মিল নেই, নামে ফুটবল হলেও খেলাটা হয় হাত দিয়ে! ক্রিকেটের মতোই ব্যাট বলের খেলা বেসবল তুমুল জনপ্রিয়, এখানে ছক্কা নয় আছে হোম রান। যদিও রান আউট এবং ক্যাচ আউটের মতো কিছু নিয়ম আছে, যা মিলে যায় ক্রিকেটের সঙ্গে।
ক্রিকেট মার্কিনিদের কাছে নিতান্তই অপরিচিত একটি খেলা, তাই তো জাতীয় দলে অভিবাসীদের ছড়াছড়ি। নানান জাতীয়তার ক্রিকেটাররা এক হয়েছেন লাল-নীল পতাকা তলে, তাদের বিপক্ষেই লাল-সবুজের তিন ম্যাচের সিরিজ। যার প্রথমটা মাঠে গড়াবে আজ বাংলাদেশ সময় রাত ৯টায়, প্রেইরি ভিউ ক্রিকেট মাঠে। যে কমপ্লেক্সের একটি মাঠেই বাংলাদেশ এবারের টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের প্রথম ম্যাচ খেলবে শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে।
এই মাঠেই কিছুদিন আগে কানাডার বিপক্ষে ৫ ম্যাচের টি-টোয়েন্টি সিরিজ খেলেছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। তারা জিতেছে ৪-০ ব্যবধানে। দলটার খেলোয়াড় তালিকায় চোখ বুলালেই দেখা যাবে সিং পদবির দুই জন, কুমার পদবির দুই জন, প্যাটেল দুই জন। বোঝাই যাচ্ছে ভারতীয় বংশোদ্ভূত ক্রিকেটাররাই বেশি মার্কিনি দলে। একটা নাম একটু বেমানান। কোরি অ্যান্ডারসন, নিউজিল্যান্ডের হয়ে খেলা এই অলরাউন্ডার একটা সময় ৩৬ বলে সেঞ্চুরি করে শহিদ আফ্রিদির দীর্ঘদিন ধরে টিকে থাকা দ্রুততম ওয়ানডে শতকের রেকর্ড ভেঙেছিলেন। স্ত্রীর মার্কিন জাতীয়তার সূত্রে ২০২০ সালে অকল্যান্ড থেকে ডালাসে চলে আসেন অ্যান্ডারসন আর এই বছরের মার্চেই তিনি যুক্তরাষ্ট্রের হয়ে খেলার যোগ্যতা অর্জন করেছেন। সবশেষ ম্যাচে কানাডার বিপক্ষে ৪৮ বলে ৫৫ রানের ইনিংস খেলেছেন, নতুন দেশের হয়ে তার প্রথম হাফ-সেঞ্চুরি।
মার্কিনি দলে আছেন দক্ষিণ আফ্রিকায় জন্ম নেওয়া এবং সেখানেই ঘরোয়া ক্রিকেট খেলা শ্যাডলি ক্লদ, পাকিস্তানের যুবদলে খেলা শায়ান জাহাঙ্গীর, ভারতের হয়ে যুব বিশ্বকাপে এবং পরবর্তী সময়ে আইপিএল এবং ঘরোয়া ক্রিকেটের ক্রিকেটাররাও আছেন এই দলে। ক্রিকেটাররা একেবারে অনভিজ্ঞ নন তবে বাস্তবসম্মত ভাবেই অনেকেই পুরোদস্তুর পেশাদার ক্রিকেটার নন। সৌরভ নেত্রাভালকর যেমন ওরাকল-এর হয়ে কাজ করা সফটওয়্যার প্রকৌশলী। ২০১০ সালের যুব বিশ্বকাপে ছিলেন লোকেশ রাহুল, মায়াঙ্ক আগারওয়ালদের সতীর্থ। তবে ক্রিকেটের চেয়ে কি-বোর্ডেই বেশি মনোযোগী হয়েছেন পরবর্তী সময়ে। নীতিশ কুমার কানাডার হয়ে খেলেছেন আগে, এখন তিনি মার্কিনি দলে।
বাংলাদেশ দলের সাবেক কোচ, বাংলাদেশের অনূর্ধ্ব-১৯ দলের সদ্য সাবেক কোচ স্টুয়ার্ট ল এখন আমেরিকার ক্রিকেট দলের কোচ। বাংলাদেশ সম্পর্কে নিজের দলের খেলোয়াড়কে একটা ভালো ধারণাই তিনি দিতে পারবেন। তবে সেসব কাজে লাগিয়ে কতটুকু করতে পারবে মার্কিনিরা সেটাই প্রশ্ন, কারণ পুরোদস্তুর পেশাদার দলের বিপক্ষে ফেলে আসা জীবনের ক্রিকেট খেলার অভিজ্ঞতা কতটাই বা আর কাজে লাগানো যাবে!
তিন ম্যাচের এই সিরিজ বরং বাংলাদেশের জন্যই নিজেদের ঝালিয়ে নেওয়ার মঞ্চ। প্রথম ম্যাচের আগে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জল-হাওয়ায়, ১১ ঘণ্টা সময়ের পার্থক্যে ঘুমের সূচিতে অভ্যস্ত হয়ে ওঠার ব্যাপার আছে। শ্রীলঙ্কা দলও যুক্তরাষ্ট্রে পৌঁছেছে এবং অনুশীলন করছে নর্থ ক্যারোলাইনার মরিসভিলে। বাংলাদেশও প্রেইরি ভিউ মাঠে অনুশীলন করেছে। ঠিক এই মাঠেই বিশ্বকাপের ম্যাচ হবে না, সেটা হবে কাছাকাছিই আরেকটা ভেন্যু গ্র্যান্ড প্রেইরি ক্রিকেট স্টেডিয়ামে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে এসে পৌঁছানোর পরই একটা দুঃসংবাদ পেয়েছে বাংলাদেশ। ঝড়ে উড়ে গেছে মাঠের অস্থায়ী অনেক স্থাপনা। হোটেলে জিম সেশনের পর রবিবারই মাঠে সূর্যের আলোয় অনুশীলন করেছে বাংলাদেশ দল। খেলা শুরু হবে স্থানীয় সময় সকাল ১০টায়। উইকেটের অবস্থা ঝড় বৃষ্টির পর খুব ভালো না হওয়াটাই স্বাভাবিক।
তবে একটি ওয়েবসাইটে মাঠের মালিক তানভীর আহমেদ জানিয়েছেন, ‘আমি একটা মৌলিক ক্রিকেট অবকাঠামো বানিয়েছি যেটা খেলাটাকে এগিয়ে নিয়ে যাবে’। মাঠের একাধারে কিউরেটর, মাঠকর্মী এবং অপারেশন ম্যানেজারের কাজ করা মাঙ্গেশ চৌধুরী জানিয়েছেন আমরা সবসময় অবকাঠামো উন্নয়নের ওপর জোর দিয়েছি। সঠিক অবকাঠামো ছাড়া ক্রিকেট এগিয়ে যাবে না’। ৮৬ একরের এই ক্রিকেট কমপ্লেক্সে আছে ৫টা টার্ফ উইকেটের মাঠ আর একটা হাইব্রিড টার্ফ উইকেটের মাঠ।! মিরপুর থেকে এখানে টার্ফে খেলে এরপর বিশ্বকাপে খেলতে হবে ড্রপ ইন পিচে। রূপান্তরের মাত্রাটা একটু বেশিই। তবুও প্রস্তুতি পর্বে মার্কিনিদের বিপক্ষে ব্যাটসম্যানদের বড় ইনিংস হতে পারে আত্মবিশ্বাসের বটিকা। জল-হাওয়ার সঙ্গে মানিয়ে নেওয়া, নিজেদের ঝালিয়ে নেওয়া আর ব্যাটসম্যানদের আত্মবিশ্বাস বাড়িয়ে নেওয়া; শুধু জয় নয় এসবও লক্ষ্য এই সিরিজে বাংলাদেশের। আর পচা শামুকে পা কাটলে সেটা বিশ্বকাপের আগে বিপদের ঘণ্টা।
