পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক (আইজিপি) বেনজীর আহমেদের আরও ১১৯ দলিলের সব স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি জব্দ (ক্রোক) ও অবরুদ্ধের (ফ্রিজ) আদেশ দিয়েছে আদালত। দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে গতকাল রবিবার ঢাকা মহানগর সিনিয়র স্পেশাল জজ আদালতের বিচারক আসসামছ জগলুল হোসেন এ আদেশ দেন। এর আগে ২৩ মে দুদকের আবেদনে বেনজীর আহমেদ, তার স্ত্রী-সন্তানদের নামে ৮৩ দলিলের স্থাবর সম্পদের ওপর ক্রোকাদেশ এবং তাদের নামে থাকা ৩৩টি ব্যাংক হিসাব অবরুদ্ধ করার আদেশ হয় একই আদালতে। ওই আদেশের চার দিনের মধ্যে গতকাল এ আদেশটি হলো।
দুদকের আইনজীবীরা দেশ রূপান্তরকে বলেছেন, বেনজীরের নামে আরও কোনো স্থাবর-অস্থাবর সম্পদ আছে কি না, তার খোঁজ নেওয়া হচ্ছে এবং থাকলে সেগুলোর বিষয়েও আদালতের দৃষ্টি আকর্ষণ করা হবে। কিছুদিন আগে একটি দৈনিক পত্রিকায় বেনজীরের আর্থিক অনিয়ম, জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জন এবং ক্ষমতার অপব্যবহার নিয়ে একাধিক প্রতিবেদন প্রকাশ হয়। এরপর থেকে তাকে নিয়ে দেশজুড়ে আলোচনা-সমালোচনা চলছে। দুদক সূত্রে জানা গেছে, তিনি বা তার পরিবারের কেউ যেন দেশের বাইরে যেতে না পারে, সে বিষয়েও আদালতের নির্দেশনা চাওয়া হবে।
গতকাল আদালতের আদেশে বেনজীরের যেসব স্থাবর ও অবস্থার সম্পদের ওপর ক্রোক ও ফ্রিজের আদেশ এসেছে, সেগুলোর মধ্যে আছে গুলশান আবাসিক এলাকার বি ব্লকে ১৩৪ (পুরাতন ১৩০) নম্বর সড়কের ১ নম্বর প্লটে ১০ কাঠা ১২ ছটাক ভূমির ওপর একই ভবনে (র্যানকন টাওয়ার) ৪টি ফ্ল্যাট। দুটি ফ্ল্যাটের আয়তন ২ হাজার ২৪২ দশমিক ৯৯ বর্গফুট। অন্য দুটি ফ্ল্যাটের আয়তন ২ হাজার ৩৫৩ দশমিক ৪০ বর্গফুট। এর তিনটি বেনজীরের স্ত্রী জীশান মির্জার নামে, একটি জারা জারিন বিনতে বেনজীরের নামে। বাকি ১১৫টি তফসিলভুক্ত সম্পত্তির মধ্যে সাভারের মৈন্তাপাড়া মৌজায় ১টি দলিলে ৫৮৮ শতাংশ জমি। এ ছাড়া মাদারীপুরের রাজৈরে সাতপাড় ডুমুরিয়া মৌজার ১৪টি দলিলের সম্পত্তি। এগুলো বেনজীরের স্ত্রী জীশান মির্জার নামে কেনা। অস্থাবর সম্পদের মধ্যে বেনজীরের নামে ৩০ লাখ টাকার একটি সঞ্চয়পত্র এবং তার তিন মেয়ের নামে তিনটি বিও অ্যাকাউন্ট অবরুদ্ধ করার আদেশ এসেছে। এ ছাড়া বেনজীর আহমেদ ও তার পরিবারের শতভাগ মালিকানাধীন যৌথ মূলধন কোম্পানি ও ফার্মগুলোর পরিদপ্তরের রেজিস্ট্রিকৃত চারটি কোম্পানি এবং ১৫টি কেম্পানির শেয়ার অবরুদ্ধ করা হয়েছে।
আদালতের কাছে দুদকের আবেদনে বেনজীরের বিষয়ে বলা হয়, তার বিরুদ্ধে ক্ষমতার অপব্যবহার, বিভিন্ন অনিয়ম ও দুর্নীতির মাধ্যমে নিজ নামে, স্ত্রী জীশান মির্জা ও মেয়েদের নামে দেশ-বিদেশে শত শত কোটি টাকার জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জন করা হয়েছে।
বিশ্বস্ত সূত্রে জানা যাচ্ছে, অভিযোগ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা তাদের মালিকানাধীন ও তাদের স্বার্থসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের নামীয় স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি হস্তান্তরের চেষ্টা করছেন, যা করতে পারলে অত্র অনুসন্ধানের ধারাবাহিকতায় মামলা রুজু, আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল, আদালত কর্তৃক বিচার শেষে সাজার অংশ হিসেবে অপরাধলব্ধ আয় থেকে অর্জিত সম্পত্তি সরকারের অনুকূলে বাজেয়াপ্তকরণসহ সব উদ্দেশ্যই ব্যর্থ হবে।
দুদকের কৌঁসুলি মাহমুদ হোসেন জাহাঙ্গীর দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘অনুসন্ধানকারী কর্মকর্তারা দ্বিতীয়বারের মতো ওনার (বেনজীর) এবং তার পরিবারের সদস্যদের সম্পত্তির তথ্য পেয়েছেন। বিষয়টি আমরা আদালতের নজরে এনেছি। আদালত স্থাবর সম্পত্তিগুলো ক্রোক ও অস্থাবরগুলো ফ্রিজের আদেশ দিয়েছেন; অর্থাৎ এসব সম্পত্তি তিনি হস্তান্তর করতে পারবেন না। ব্যাংক হিসাব ফ্রিজ করার কারণে তিনি টাকা উত্তোলন করতে পারবেন না।’
গত ৩১ মার্চ ও ২ এপ্রিল একটি দৈনিকে প্রতিবেদন প্রকাশের পর ৪ এপ্রিল সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী সালাউদ্দিন রিগ্যান সাবেক আইজিপি বেনজীরের সম্পদের বিষয়ে অনুসন্ধানের দাবি জানিয়ে দুদক চেয়ারম্যানের উদ্দেশ্যে চিঠি দেন। সাড়া না পাওয়ায় ১৮ এপ্রিল সংস্থাটিকে আইনি নোটিস দেন তিনি। তাতেও পদক্ষেপ না নেওয়ায় ২১ এপ্রিল হাইকোর্টে রিট আবেদন করেন এই আইনজীবী। এতে বেনজীরের বিরুদ্ধে সম্পদের অনুসন্ধানের নির্দেশনাসহ তার অনিয়ম-দুর্নীতি, ক্ষমতার অপব্যবহার অনুসন্ধানে দুদকের নিষ্ক্রিয়তাকে চ্যালেঞ্জ করা হয়। ২৩ এপ্রিল বিষয়টি শুনানিতে এলে দুদকের আইনজীবীরা আদালতকে এই বলে অবহিত করেন যে বেনজীরের অনুসন্ধানের বিষয়ে দুদকের তরফে একটি অনুসন্ধান কমিটি গঠন করে অনুসন্ধান শুরু করেছে।
শুনানি নিয়ে অনুসন্ধান সাপেক্ষে দুই মাসের মধ্যে হাইকোর্টে অগ্রগতি প্রতিবেদন দিতে নির্দেশ দেয়। ২৩ মে বেনজীরের স্থাবর-অস্থাবর সম্পদ উল্লেখ করে তা জব্দ ও অবরুদ্ধের নির্দেশনা চেয়ে সংস্থাটির অনুসন্ধানকারী কর্মকর্তা (উপপরিচালক) মো. হাফিজুল ইসলাম আবেদন করেন। শুনানি নিয়ে আদালত আদেশ দেয়। ওই দিন আদেশে বলা হয়, বর্ণিত স্থাবর সম্পত্তি জব্দ এবং অস্থাবর সম্পত্তি অবরুদ্ধ করা না হলে তা হস্তান্তর হওয়ার সমূহ আশঙ্কা রয়েছে, যা পরবর্তী সময়ে রাষ্ট্রের অনুকূলে বাজেয়াপ্ত করা সম্ভব হবে না। অতএব অর্থ পাচার প্রতিরোধ আইন, ২০১২-এ ১৪ ধারা এবং দুর্নীতি দমন কমিশন, বিধিমালা-২০০৭-এর ১৮ বিধি অনুযায়ী স্থাবর সম্পদ জব্দ এবং অস্থাবর সম্পদ অবরুদ্ধ করা হলো। আদেশে উল্লেখ করা হয়, স্থাবর সম্পদের ওপর জব্দের আদেশ কার্যকর থাকা অবস্থায় কোনো অবস্থাতেই তা হস্তান্তর বা বিনিময় করা যাবে না। আর অস্থাবর সম্পদে অবরুদ্ধের আদেশ কার্যকর থাকা অবস্থায় ব্যাংক হিসাবগুলোতে অর্থ জমা করা যাবে, কিন্তু উত্তোলন করা যাবে না।
