বাংলা ভাষায় একটি প্রবাদ বাক্য আছে, 'নিজের নাক কেটে পরের যাত্রা ভঙ্গ করা'। খুব সম্ভবত বাংলাতেই এরকম একটি প্রবাদ আছে কারণ অন্য কোন জাতির আচরণে বা ব্যবহারে এমন আত্মঘাতী স্বার্থপরতার কোন উদাহরণ খুঁজে পাওয়া যাবে না বলেই এই জাতীয় বাগধারা তাদের ভাষায় স্থান পায়নি। বাঙালী এই অপকর্মে সিদ্ধহস্ত। সবশেষ প্রমাণের জন্ম দিয়েছে সেন্ট লুসিয়ায় বাংলাদেশ ক্রিকেট দল। তারা নিজেরা সেমিফাইনালে যাবার চেষ্টা করেনি, আফগানিস্তানকে হারিয়ে অস্ট্রেলিয়ার মত শক্তিশালী দলকে সেমিফাইনালে খেলার সুযোগও করে দেয়নি। রান-রেটে বাড়িয়ে নিয়ে ১৩ ওভারের ভেতর জয়ের প্রচেষ্টায় না গিয়ে 'সম্মানজনক' পরাজয় নিশ্চিত করেছে ৮ রানে হেরে, সেই সঙ্গে আফগানিস্তানকে তুলে দিয়েছে প্রথমবারের মত কোন বিশ্ব আসরের সেমিফাইনালে।
তারিখটা মনে নেই তবে দিনটা মনে আছে স্পষ্ট। ভেন্যু খুব সম্ভবত বর্তমান হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টাল, সেসময়ের রূপসী বাংলা। এশিয়ান ক্রিকেট কাউন্সিলের প্রধান, বিসিবির সাবেক সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফুল হক ২০১৪ সালের এশিয়া কাপের উদ্বোধনী সংবাদ সম্মেলনে বলেছিলেন যে এবারই প্রথম আফগানিস্তান অংশ নিচ্ছে। তারা একটা রোমাঞ্চকর দল, যে কোন অঘটন ঘটাতে পারে। সেটাই ছিল ৫০ ওভারের ক্রিকেটে কোন টুর্নামেন্টে আফগানদের অংশগ্রহণ এবং সত্যিই তারা হারিয়ে দিয়েছিল স্বাগতিক বাংলাদেশকে। যে দলটা বছর দুই আগে এশিয়া কাপের ফাইনালে খেলেছিল, হেরেছিল মাত্র ২ রানে! একই বছর বাছাই পর্ব থেকে উত্তীর্ণ হয়ে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে প্রথম জায়গা করে নেয় আফগানিস্তান। আফগানদের প্রথম ম্যাচ বাংলাদেশেরই বিপক্ষে। ৭২ রানে অলআউট হয়ে সেই ম্যাচটা ৯ উইকেটে হেরেছিল আফগানিস্তান।
১০ বছর পর বাংলাদেশকে ডাকওয়ার্থ লুইস মেথডে ৮ রানে হারিয়ে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে চলে গেল আফগানিস্তান। ১০ বছর আগের সেই দলে থাকা সাকিব আল হাসান, মাহমুদউল্লাহরা চেয়ে চেয়ে দেখলেন। নেপথ্যে মমতাজ এর 'ফাইট্টা যায়' গানটাও জুড়ে দেয়া যায় আবহসংগীত হিসেবে। আসলেই তো 'বন্ধু' আমার বাড়ির সামনে দিয়েই সেমিফাইনালে চলে গেল! সেটাও একরকম বিনা বাধায়।
ম্যাচের আগের দিন সহকারী কোচ নিক পোথাসের কথাবার্তা শুনেই মনে হয়েছিল একগাদা অজুহাত তৈরি আছে বাংলাদেশের। মাঠে আফগানিস্তানকে যখন ২০ ওভারে ৫ উইকেটে ১১৫ রানে আটকে রাখা গেল, যদিও শেষ ওভারে তানজিম সাকিবকে মারা রশিদ খানের দুটো ছক্কা অত্যন্ত মূল্যবান ব্যবধান গড়ে দিয়েছে তারপরও রানটা আপাত দৃষ্টিতে নাগালের মধ্যেই ছিল। মোটা দাগে ১৩ ওভারের ভেতরে ১১৬ রান করে ফেললেই বাংলাদেশ সেমিফাইনালে খেলবে। স্রেফ একটা ম্যাচ, একটা ইনিংস বাংলাদেশকে পৌঁছে দিতে পারত একটা বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে। কিন্তু বাংলাদেশ বেছে নিল সম্মানজনক হারের পথ। অধিনায়ক নাজমুল হোসেন শান্ত'র ভাষায়, 'পরিকল্পনাটা এমন ছিল যে আমরা প্রথম ৬ ওভার চেষ্টা করব। পরিকল্পনা ছিল, যদি আমরা ভালো শুরু করি, দ্রুত উইকেট যদি না পড়ে, তাহলে আমরা সুযোগটা নেব। কিন্তু যখন আমাদের দ্রুত ৩ উইকেট পড়ে গেল, তখন আমাদের পরিকল্পনা ভিন্ন ছিল—যেন আমরা ম্যাচটা জিততে পারি। তারপরও আমি বলব, মিডল অর্ডার ভালো সিদ্ধান্ত নেয়নি। যার কারণে ম্যাচটা আমরা হেরে গেছি।'
অথচ পরিকল্পনাটা হতে পারত সর্বাত্মক লড়াইয়ে ম্যাচটা ১৩ ওভারের মধ্যেই জেতার চেষ্টা করা। টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটে ড্র বলে কিছু নেই। এই ম্যাচটা জিততে গিয়ে যদি আগেই হেরে যেত বাংলাদেশ, তবুও আফসোস থাকত না বলে ফেসবুকে লিখেছেন সাবেক অধিনায়ক মাশরাফি বিন মর্তুজা, 'লিটনের ইনটেন্ট আর নন স্ট্রাইকারের নিরবতা দেখে বোঝা যায় ক্লিয়ার কোন ম্যাসেজ ব্যাটিং ইউনিটের কাছে ছিলোনা। যদি থেকেও থাকে তাহলে প্রতি এক বা দুই ওভার পরপর চেন্জ হয়েছে যেটা শেষমেষ এমন যায়গায় দাড়িয়েছে যে শ্রেফ ম্যাচটা জিতে।
অথচ আজকের হিসাবটা ছিলো শুধুই ১২.১।এর বাইরে কিছুই ভাবার সুযোগ ছিলোনা। তাতে যদি ৫০ রানেও দল অল আউট হতো অন্ততো সবাই সেটা সহজ ভাবে নিতো।
আর যদি এই ম্যাচ জিততাম, তাও বিবেকের কাছে হেরে যেতাম। এ ম্যাচ আর দশটা ম্যাচের মতো ছিলোনা আমাদের জন্য, এটা ছিলো ইতিহাস গড়ার সমান।' বাংলাদেশের ব্যাটসম্যানদের মানসিকতা হওয়া উচিত ছিল পার্ল হারবার আক্রমণে জাপানের সেই 'কামিকাজি' বৈমানিকদের মত, কিন্তু তারা লক্ষণ সেনের মত পেছনের দরজা দিয়ে পালিয়ে যাওয়ার নিয়তিকেই বেছে নিয়েছেন।
টি-টোয়েন্টি থেকে অবসর নেয়া তামিম ইকবালও মনে করেন, বাংলাদেশের এই রানটা তাড়া করা উচিত ছিল। সাবেক অধিনায়ক বলেছেন বলেছেন, 'বাংলাদেশের এই রানটা তাড়া করতে যাওয়া উচিত ছিল। তা করতে গিয়ে যদি তারা ৭০-৮০ রানে অলআউটও হয়ে যেত তারপরও। তারা কিন্তু এমনিতেও হেরেছে, অথচ তাদের সামনে সুযোগ ছিল খুব বিশেষ কিছু একটা করার। এই ধরনের সুযোগ সহজে আসে না। বিশেষ করে সুপার এইটে কোন ম্যাচে না জেতার পর, শেষ ম্যাচে সামনে একটা সুযোগ আসে বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে খেলার, তখন উচিত যবকিছু এবং যে কোন কিছু করা যাতে লক্ষ্যটা অর্জিত হয়। একটা সময় মনে হয়েছিল বাংলাদেশ রানটা তাড়া করবে, কিন্তু এরপর উইকেট পড়ল, ব্যাটিংয়ে জেতার আগ্রহের অভাব দেখা গেল আর কয়েকটা ওভারে সবকিছু খুব কঠিন হয়ে গেল।'
জেতার আগ্রহের অভাব হিসেবে যে উদাহরণটা সবার সামনে আসে, দীর্ঘদিনের সতীর্থ এবং সবশেষ বিপিএলেও সতীর্থ হিসেবে শিরোপা জেতা মাহমুদউল্লাহ'র নামটা তামিম হয়তো ইচ্ছে করেই এড়িয়ে গেছেন। নুর আহমেদের করা ম্যাচের ১০ম ওভারে ৫টা ডট বল দিলেন মাহমুদউল্লাহ, একটা বাউন্ডারি মারলেও শেষ পর্যন্ত ফল ৬ বলে ৪ রান। যেখানে ১৩ ওভারের ভেতর রানটা তাড়া করার শেষ সুযোগ, ১৮ বলে ৪৩ রান করার সমীকরণটা মেলাবার চেষ্টা না করে দিলেন ৫টা ডট বল। ওখানেই সব সম্ভাবনার মৃত্যু। হয়তো ভেবেছিলেন আরো একবার শেষের অংক মিলিয়ে নায়ক হবেন। কিন্তু প্রকৃতি তাদের ক্ষমা করে না, রশিদ খানের বলে আউট হয়ে ফিরেছেন প্রবঞ্চনার প্রতীক হয়ে। তার জন্য সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে শুধুই ঘৃণা আর হতাশা প্রকাশ করছেন দেশের ক্রিকেট অনুরাগীরা।
শান্ত খুব সম্ভবত প্রশ্নের মুখে কিছু একটা বানিয়ে বলেছেন। আসলে গোটা খেলা দেখেই মনে হয়েছে যে বাংলাদেশের কোন পরিকল্পনাই ছিল না। কোচেরা ডাগআউটে মূর্তির মত বসে থাকেন। কারও সঙ্গে কথা বলতেও দেখা যায় না। সংবাদ সম্মেলনে আসলে খারাপ খেলার পক্ষে একগাদা অজুহাত দেন, কেউ বলেন যা পেয়েছ এটা বোনাস। সুপার এইটে আসাটাই বড় কৃতিত্ব। সঙ্গে ক্রিকেট, রাজনীতি আর ব্যবসার ককটেল গুলে খাওয়া সেরা অলরাউন্ডার তো আছেনই। দলের হারজিতে যার কোন অভিব্যক্তিই নেই। খুব সম্ভবত বাংলাদেশ কিছুই করতে চায়নি, খেলতে চেয়েছে তথাকথিত নিজেদের স্বাভাবিক খেলা। তাই হেরেছে ৮ রানে। যদি কিছু করতে চাইত, তাহলে হয় ম্যাচটা তারা ১৩ ওভারের ভেতর তাড়া করে জেতার চেষ্টা করে জিতত অথবা হারত। এখানেই অন্যদের সঙ্গে বাংলাদেশের পার্থক্য। জেতার চেষ্টাটাও তাদের করতে দেখা যায় না।
