বছর চারেক আগে আহমদ ছফা ভাইয়ের সাথে আমার প্রথম দেখা। এক সকালে তার শাহবাগের অফিসে গেছি। ছফা ভাইয়ের রুমটা দোতলায়। রুমে ঢুকেই তাজ্জব বনে গেছি। এলোমেলো রুম। বিশৃঙ্খলভাবে চারিদিকে জিনিসপত্র ছড়ানো। বইপত্র, পেপার, কম্পিউটার..। এক কোণায় দেখি কাঁথা বালিশ দলা করে রাখা। সেগুলো ময়লা। প্রায় অন্ধকার রুম। ঘরে বাল্ব জ্বলছে। ছফা ভাই মুড়ি খাচ্ছেন। হাতের ফাক গলে কিছু মুড়ি টেবিলে পড়ছে। ফ্যানের বাতাসে সেসব মুড়ি উড়ে যাচ্ছে। ছফা ভাই উড়ন্ত মুড়ি ধরার চেষ্টা করছেন।
আমি বিস্ময় নিয়ে তাকিয়ে আছি। এত নামিদামি একজন মানুষ এত সাধারণ এবং এভাবে থাকতে পারেন! ছফা ভাই সম্পর্কে এরকম চিন্তা করাতো দূরের কথা কল্পনায়ও ছিলো না।
ছিয়াশি-সাতাশি সালের দিকে ছফা ভাইয়ের নাম শুনি। তখন হুমায়ূন আহমেদের খুব নাম হয়েছে। সেই নামী লেখকের উথ্থান প্রসঙ্গে আহমদ ছফার নাম শুনেছি। আহমদ ছফা হুমায়ূন আহমদের প্রথম বই ছাপানোর সমস্ত ব্যবস্থা করেছিলেন। তখন থেকেই মনের ভেতর অজান্তেই একটা অন্যরকম ভক্তি ছফা ভাইয়ের জন্য তৈরি হয়ে গেছে। আমি তখন নিজে নিজেই কিছু লেখালেখি করি। কোথাও ছাপতে দেবো সেই সাহস নেই। কিন্তু মনেমনে এটা ভেবে আস্থা জাগে যে আমাকেও যদি একদিন হুমায়ূন আহমেদের মত এরকম সাহায্য করেন! এ কথা চিন্তা করে নিজের ভেতরেই গোপনে সুখবিলাস বোধ করতাম।
প্রসঙ্গক্রমে বলে রাখি বড় মানুষরা যখন কোনো কিছু নিয়ে লেখেন, তখন দশ জনের কথা বেশি বলেন। নিজের কথা বলেন কম। আমি অতি ক্ষুদ্র মানুষ। ফলে এই লেখায় নিজের কথা বেশি চলে আসছে। এজন্য পাঠকের কাছে ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি।
১৯৯৩ সালে আমার প্রথম উপন্যাস বের হয়। আমাদের এখানে তরুণদের বই সাধারণত সিনিয়র লেখকরা পড়েন না। আনিস ভাই (আনিসুল হক) পড়লেন। সেই সুবাদে ভোরের কাগজে লেখার জন্যও বললেন। বলতে গেলে আমাকে সুযোগ করে দিলেন। তার কাছে আমার কৃতজ্ঞতার শেষ নেই।
এরপর দ্বিতীয় উপন্যাস লিখলাম। সেটা এক সম্পাদকের ড্রয়ারে এক বছর পড়ে রইলো। উনি পড়ার সময় পেলেন না। দিলাম আরেকজন সাপ্তাহিকীর সম্পাদকের কাছে। সেখানেও ড্রয়ারে থাকলো আরো ছয়মাস। ওনারও পড়ার সুযোগ হয়নি। বিভুদা (বিভুরঞ্জন সরকার) উদ্যোগী হয়ে পাঠালেন এক বিখ্যাত প্রকাশকের কাছে। নতুন লেখক বলে উনি লেখা ছাপতে পারবেন না বলে জানালেন। তখন আহমদ ছফা ভাইয়ের কথা বড় মনে হয়েছে। কিন্তু এত বড় একটা লোকের কাছে পৌঁছাবো কি করে? মন দুর্বল। ছফা ভাইয়ের সাথে ঘনিষ্ট যোগাযোগ আছে এমন একজন পত্রিকা কর্মীর (নাম বলছি না) কাছে কায়দা করে কথা বলি ভারতে সাগরময় ঘোষ, বাংলাদেশে কবি হাসান হাফিজুর রহমান কিংবা কবি আহসান হাবিব, উনারা জহুরী সম্পাদক। জহুরী যেমন পাথর চেনেন, ওনারা লেখক চিনতেন। পৃষ্ঠপোষকতা দিতেন। এই দেশের দুজনের কেউ বেঁচে নেই। বেঁচে আছেন কেবল আহমদ ছফা। ছফা ভাই ঠিক সময়ে হুমায়ূন আহমেদের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন।
ওই পত্রিকার কর্মী আমার কথায় পাত্তা দেন না। বরং এমন ভাব ধরে কথা বলেন যাতে মনে হয় আহমদ ছফা ভাই উচ্চ গোত্রীয় ব্রাহ্মণ। আমি নিম্ন বর্ণের নমঃশূদ্র। সুতরাং তার কাছে ভেঁড়া যাবে না।
তিন বছর ধরে বিভিন্ন ড্রয়ারে বন্দি থাকা উপন্যাসটা ১৯৯৭ সালে চলতিপত্র ঈদ সংখ্যায় ছাপা হলো। সেখানে আরো দুটি উপন্যাস ছাপা হয়েছিলো। একটি বিলেত প্রবাসী বিখ্যাত লেখক আবদুল গাফফার চৌধুরীর। অন্যটি আনিসুল হকের। গাফফার ভাই আমার উপন্যাসটি পড়ে লন্ডন থেকে বাংলাদেশে ফোন করে বিভিন্ন জনের কাছে লেখাটির খুবই প্রশংসা করেন। আমার কপাল খুলে যায়। ঐতিহ্যবাহি সন্ধানী প্রকাশনী আমার ‘রূপা বেঁচে আছে’ নামক উপন্যাসটি প্রকাশ করল। বইয়ের প্রচ্ছদ করলেন বিখ্যাত শিল্পী কাইয়ুম চৌধুরী। পরবর্তীতে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ও ঢাকাতে সেটির উচ্ছসিত প্রশংসা করেন। মনটা দুর্বল হয়ে গিয়েছিলো। সাহস ফিরে এলো। সেই সাহসের বরকতেই একদিন একা চলে আসি শাহবাগে। লেখক আহমদ ছফার অফিসে। তার সাথে দেখা করবার জন্য। তাকে নিজের কিছু বই দেয়ার জন্য।
ছফা ভাই মুড়ি চিবাতে চিবাতে আমার দিকে তাকালেন। চঞ্চল চোখ। চাহনীটাও যেন ক্যামন। আমি সালাম দিয়ে খুব লজ্জার সাথে নিজের নাম বললাম এবং তার কাছে আসবার কারণ ও উদ্দেশ্য জানালাম।
আমি দেশের কিছু ‘বড়’ লেখককে চিনি। যাদের কেউ কেউ বই দিয়ে এলে পড়া তো দূরে থাকুক সেগুলো অন্যদেরকে দিয়ে দেন। একজন লেখক আছেন যিনি তরুণদের ঐসব বই ডাস্টবিনে ফেলে দেন এবং সে কথা গৌরব করে দশজনকে বলেন।
তরুণ লেখককে নিরুৎসাহিত করেন, ‘কিচ্ছু হচ্ছে না’ বলে। আহমদ ছফা ভাই সেরকম না হলেও উনিও বড় লেখক। আমার সম্পর্কে কিছুই জানেন না। চেনেন না। আমি ভয়ে ভয়ে আছি, আমার বই দেখে কি রিয়াকশন দেন। কয়েক মুহূর্ত পর নিজের নাম বলে বললাম, ছফা ভাই, আমি ভোরের কাগজে লিখি। তিনি মুখের মুড়ি গিলে উৎফুল্ল গলায় বললেন, আমি আপনার নাম জানি।
রুমে আরো দু-তিনজন লোক বসা ছিল। তারা তাকালো। আমি শরমে বিব্রত হচ্ছি। ছফা ভাই বলে চললেন, আমি শাখারী বাজার যেয়ে আপনার নাম প্রথম শুনেছি। ওরা আপনার খুব ভক্ত। তারা আমাকে বলেছে, আমরা আবু সুফিয়ানের লেখা আগে পড়ি। তারপরে অন্য লেখা। আপনি ‘কামেল’ লোক। বসেন। চা খান। তিনি চায়ের অর্ডার দিলেন। এখানে বলে রাখি ‘কামেল’ শব্দটা ছফা ভাইয়ের খুবই প্রিয় ছিলো। কারো কিছু প্রশংসা করলেই তিনি ‘কামেল’ শব্দটা ব্যবহার করতেন।
আমার মনে যে ভয় ছিল সেটা কেটে গেল। কিন্তু ছফা ভাইয়ের পুরো আচরণে খুবই লজ্জিত বোধ করতে লাগলাম। এতবড় একজন মানুষ এভাবে প্রশংসা করলে শরমিন্দা হওয়া ছাড়াতো উপায় থাকে না। কেননা আমি আমি এর যোগ্য নই। কিন্তু সে কথা বলতেও পারছি না।
ছফা ভাইকে আমার বই উপহার দিলাম। এক কাপ লাল চা এবং একমুঠ মুড়ি খেয়ে চলে এলাম। মনে বিরাট ফূর্তি। ছফা ভাই বললেন, আসবেন। যোগাযোগ রাখবেন।
বাঙালি পরনিন্দায় পঞ্চমুখ, প্রশংসায় কৃপণ। ছফা ভাই ঐ ধারার ব্যতিক্রম। তার এইটুকুন প্রশংসা একজন মানুষের জীবনে, একজন তরুণ লেখকের মনে যে কত গভীর আত্মবিশ্বাস ও সাহস যোগায় সেটি আমাদের বড় লেখকরা কি কোনোদিনও বুঝতে পারবেন? অনুভব করতে পারবেন?
প্রেমিক ছফা ভাই
ছফা ভাইয়ের সাথে আমার দেখা হয় কম। (ল্যান্ড) ফোনে কথা হয়। এরমধ্যে হাকিমাবাদের পীর সাহেব শ্রদ্ধেয় মোহাম্মদ মামুনুর রশীদের কবিতার বই তিনি পড়েছেন। পড়ে তার কাছে মনে হয়েছে উনি ‘কামেল’ লোক। ছফা ভাইয়ের এই এক গুণ ছিলো। তাকে যে বিষয় আলোড়িত করতো, ছুয়ে যেতো, যেমন- ইত্তেফাকের নাজিমউদ্দিন মোস্তান নোবেল বিজয়ী বিজ্ঞানী ড. আব্দুস সালামের একটি জটিল বৈজ্ঞানিক বিষয় খুব সহজ করে ইত্তেফাকে লিখেছিলেন। সেটা যে কোনো সাধারণ মানুষ সহজেই বুঝতে পেরেছিলেন। বিজ্ঞানের এমন জটিল জিনিস যিনি এত সহজ করে লিখতে পারেন। ছফা ভাইয়ের মতে নিশ্চয়ই তিনি একজন ‘কামেল’ লোক। সুতরাং ছফা ভাই নাজিমউদ্দিন মোস্তানের সাথে সাক্ষাৎ করতে ছুটে গিয়েছিলেন। এইভাবেই তিনি মানুষের গুণকে ইজ্জত করতেন। একইভাবে কবি মোহাম্মদ মামুনুর রশীদ সাহেবের সাথে সাক্ষাৎ করার জন্যও তিনি বাংলাবাজার গিয়ে সিরহিন্দ প্রকাশনীতে কবিকে খুঁজেছেন। পাননি। পরে আমাকে ডেকে নিয়ে একটা চিঠি দিলেন কবি মামুনুর রশীদ সাহেবকে। সেই চিঠির এক জায়গায় লিখেছেন ‘মামুনুর রশীদ সাহেবের কবিতা তার অনুভূতিকে আলুলায়িত করেছে’।
মাঝখানে ছফা ভাই বেশ অসুস্থ ছিলেন। আমাকে নিয়ে কবি ও আধ্যাত্মিক পুরুষ মোহাম্মদ মামুনুর রশীদ সাহেব একদিন ছুটে এলেন তাকে দেখবার জন্য। জানালেন ছফা ভাইয়ের আরোগ্যের জন্য পীরসাহেব মোহাম্মদ মামুনুর রশীদ হাকিমাবাদ মসজিদে দোয়া করিয়েছেন। কিছু সদকা করেছেন। ছফা ভাইয়ের জন্য উপহার হিসাবে তিনি একটা কফির কৌটাও নিয়ে এসেছেন। আসলে অফিসিয়ালি ছফা ভাই তখন হাসপাতালে ভর্তি ছিলেন। শরীর খুবই অসুস্থ। হাসপাতাল থেকে দিনের বেলা পালিয়ে এসে অফিসে বসেন। সন্ধ্যার পরে হাসপাতালে চলে যান। মোহাম্মদ মামুনুর রশীদ সাহেবকে দেখে, তার কথা শুনে তিনি এত প্রাণচঞ্চল এবং উৎফুল্ল হয়ে উঠলেন যে আমি তাকে ওভাবে উৎফুল্ল ও আনন্দিত হতে আর কখনও দেখিনি।
রুমে তখন চার পাচজন মানুষ ছিলো। ছফা ভাই চিৎকার করে বলতে লাগলেন, হুজুর আমার জন্য দোয়া করেছে। হুজুর আমার জন্য দোয়া করেছে। পীরসাহেবের দেয়া কফির কৌটাটা হাতে ধরেও উচু করে তুলে সবাইকে দেখাচ্ছেন, এই যে দেখো, হুজুর আমার জন্য কফি নিয়ে এসেছে। দেখো..
একটা শিশু যেভাবে কোনো কিছু পেলে আনন্দিত হয়, ছফা ভাইয়ের এই আনন্দটা আমার কাছে শিশুর আনন্দের মতো সরল ও সুখী মনে হয়েছে। ছফা ভাই পরে বিভিন্ন সময় আমাকে বলেছেন, মোহাম্মদ মামুনুর রশীদ সাহেবের কাব্যে তিনি ‘ক্বলবের সন্ধান’ পেয়েছেন। তার আচরণে তিনি মানুষকে ভালোবাসার সুঘ্রান পেয়েছেন।
আজকের দিনে আমাদের আলেম-ওলামা, পীর-মাশায়েখদের সাথে লেখক কবি, বুদ্ধিজীবী, শিল্পীদের মধ্যে বিরাট একটি ব্যবধান তৈরি হয়েছে। আলেম-ওলামা পীর-মাশায়েখরা লেখক, কবি, বুদ্ধিজীবী, শিল্পীদের বিষয়ে উদাসীন। আবার লেখক, সাহিত্যিক-কবি উনারা তাদের বিষয়ে উদাসীন। এই উদাসীনতা আর উন্মাসিকতা এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে কেউ কাউকে সহ্য করতে পারেন না। একজন আরেকজনকে মুরতাদ বা মৌলবাদী বলে গালাগালিও করেন।
হাকিমাবাদের পীরসাহেব মোহাম্মদ মামুনুর রশীদ সুশিক্ষিত মানুষ। সত্তরের দশকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংবাদিকতা বিভাগ থেকে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করেছেন। বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছেন। নিজে শক্তিমান কবি, প্রাবন্ধিক, গদ্যশিল্পী। বিশ্বসাহিত্য অনুরাগী। তার চেয়েও বড় কথা তিনি মানুষকে ভালোবাসতে শিখেছেন। যেটা আমাদের এখানকার উপরোল্লিখিত শ্রেণীর মধ্যে বিরল। অনেকেই গজারীর লাঠি নিয়ে, কাফন পরে মিছিল করেন। মসজিদে পুলিশ মারেন। মোহাম্মদ মামুনুর রশীদের পক্ষে সম্ভব হয়েছে উদাসীনতাকে অতিক্রম করে উন্নাসিকতার পরোয়া না করে ঐ মানুষগুলোকেও সম্মান করা, ভালোবাসা। একজন পীরসাহেবের এই অসাধরণ সব গুণের সংমিশ্রণ ছফা ভাইকে দুর্দান্তভাবে চমকে দিয়েছে। তিনি আমাকে বলতেন, সুফিয়ান, জীবনে এত পাপ করেছি যে আল্লাহতায়ালা দোযখেও জায়গা দেবেন না। এসব পীর-মুর্শিদের দোয়ায় যদি আল্লাহ্তায়ালা মাফ করেন!
আমরা সাধারণ মানুষ, কখনো ছফা ভাইয়ের মতো ওভাবে চিন্তা করি না। নিজেদেরকে পাপী বা গুনাহগার মনে করি না। সাধারণত নিজেদের ক্ষেত্রে কোনো নেগেটিভ কিছু ঘটলে বলি কি এমন পাপ করেছি যে আল্লাহ্ এরকম করলেন! প্রকৃতপক্ষে কেবল ঈমানদার মুমিন মানুষই নিজেকে পাপী বা গুনাহগার মনে করেন। করতে পারেন। ওটার জন্যও ‘ক্বলব’ লাগে। ছফা ভাইয়ের সেটা ছিলো এতে কোনো সন্দেহই নেই।
মানুষের সমস্ত প্রার্থনা বা এবাদত এবং আমল বা কর্ম দুই-ভাগে বিভক্ত। একটি হচ্ছে ‘হক্কুল্লাহ্’। আরেকটি ‘হক্কুল ইবাদ্’। ‘হক্কুল্লাহ্’ কেবলই আল্লাহর জন্য। যেমন নামাজ রোজা ইত্যাদি। কেউ যদি সেগুলো না করে থাকেন। আল্লাহতায়ালা গফুরুর রাহীম। ক্ষমাকারী। ইচ্ছা করলেই তিনি সেটা ক্ষমা করে দিতে পারেন। এটি নিরঙ্কুশভাবে তার ইচ্ছাধীন।
অপরদিকে মানুষ, গাছ-মাছ-অন্যান্য প্রাণী, প্রকৃতি পরিবেশসহ সকলকিছুর প্রতি আমাদের যে দায়িত্ব ও কর্তব্য সেটিই হচ্ছে ‘হক্কুল ইবাদ্’। আল্লাহতায়ালা ‘হক্কুল্লাহ’ না পালনের জন্য ক্ষমা করে দিলেও কেউ যদি মানুষসহ অন্যান্য জীবের প্রতি তার দায়িত্ব ও হক্ পালন না করেন, সেটা ক্ষমা করবেন না।
এই প্রসঙ্গে একটি ঘটনা বলি। এক দুপুরে ছফা ভাইয়ের বাসার বারান্দা কাম ছাদ সংলগ্ন ছোট ঘরে বসে কথা বলছি। হঠাৎ দেখি তিনি কথাবার্তা বাদ দিয়ে বাইরের দিকে তাকিয়ে হাত তুলে ‘তু-তু বাবু-তু-তু..’ করছেন। চট করে দেখলে যে কেউ তাকে পাগল বলবেন, বা ভাবতে পারেন নেশায় ধরেছে। ছাদে যেয়ে মোটামোটি রাউন্ড দিয়ে নৃত্যভঙ্গিতে ‘তু-তু বাবু-তু-তু..’ করছেন।
আমি ঘটনা কী জিজ্ঞাসা করলাম। উত্তরে বললেন, তিনি যে শালিকগুলোকে পালেন, তাদের বাচ্চা হয়েছে। বাচ্চাগুলোর খিদে লাগাতে তারা ডাকছে। ওদের খাবার দেবেন। এজন্য ডাকাডাকি করলেন। একটা সামান্য শালিকর বাচ্চার জন্যও ছিলো তার অগাধ মমতা। ভালোবাসা। পরিচর্যা।
আরেকটা ঘটনার কথা মনে পড়েছে। এ বছর (২০০১ সাল) ১লা জুন হাকিমাদের ঈদে মিলাদুন্নবী অনুষ্ঠান শেষে দুপুরে খেতে বসেছি। ছফা ভাইয়ের পায়ে ব্যথা। তাই স্টেজে বসতে পারেননি। ভেতরের ঘরে আমি এবং ছফা ভাই একত্রে খেতে বসেছি। বসার কিছুক্ষণের মধ্যে প্রচণ্ড বেগে বাতাস এবং বৃষ্টি শুরু হলো। বাতাস আর বৃষ্টি দেখে ছফা ভাই বারবার খাওয়া বন্ধ করে আমাকে বলছেন, সুফিয়ান এই বৃষ্টিতে সবগুলো মানুষ ভিজে যাচ্ছে। ওরা কীভাবে খাবে! অনুষ্ঠানস্থলে কোনো তাবু বা প্যান্ডেল ছিলো না। তাকে বুঝালাম, একটা ব্যবস্থা হবে। উনি মানেন না। আমাকে বললেন, দেখেন। এতগুলো মানুষ ভিজে যাবে, আর আমরা আরামে বসে খাবো, কেমন কথা!
তিনি উদ্বিগ্ন হয়ে বারংবার জানালার দিকে তাকাচ্ছেন। রফিকুল্লাহ্ ভাইও তাকে আশ্বস্ত করলেন।
একইভাবে ছফা ভাইয়ের বৃক্ষ প্রেমের বিষয়তো সর্বজনবিদিত। আর বস্তির শিশুদের প্রতি তার প্রীতির কথা কে না জানে।
আমার মনে হয় মানুষের প্রতি, বৃক্ষের প্রতি, বিহঙ্গের প্রতি ছফা ভাইয়ের যে মমতা ছিলো তা অতুলনীয়। ‘হক্কুল্ ইবাদতের’ ক্ষেত্রে তিনি তার দায়িত্বের চেয়েও অনেক বেশি করেছেন। এ কথা তার শত্রুরাও স্বীকার করবেন।
খ-খ-ভাবে দেখা ছফা ভাই
ছফা ভাই তার ‘পুষ্প বৃক্ষ ও বিহঙ্গ পুরান’ উপন্যাসটা আমাকে দিয়েছিলেন। আপেল গাছের একটা চমৎকার ঘটনা ওখানে আছে। প্রথম আলোতে সেটি লিখেছি। এজন্য এখানে লিখলাম না। সেই আপেল গাছের ঘটনা পড়ে পরদিন আমি ছুটে এলাম তার বাসায়। এসে দেখি ছফা ভাই গভীর মনোযোগ দিয়ে গান শুনছেন। সনজীবদা (শিল্পী ও সাংবাদিক সনজীব চৌধুরী) বসা। ছফা ভাইকে বললাম, আপেল গাছটা দেখবো। তিনি খুশি মনে ইদ্রিসকে ডাকলেন, মিয়া মোহাম্মদ ইদ্রিস আলী চৌধুরী, এদিকে আসো, সাহেবকে আপেল গাছ দেখাতে নিয়ে যাও।
আপেল গাছ তার স্কুলে। ইদ্রিসকে বললাম, আপনার নাম কি মিয়া মোহাম্মদ ইদ্রিস আলী চৌধুরী? ইদ্রিস বললো, আরে না। সাহেব ঢং কইরা ওই কথা কয়। ছফা ভাই যে ঢংও করতে পারেন, আমি তখনই জানলাম।
ছফা ভাইয়ের সাথে বসে আমি প্রায়ই বিভিন্ন গল্প করি। পরস্পরকে বোঝার চেষ্টা করি। প্রসঙ্গক্রমে একদিন তার সাথে হুমায়ুন আজাদের বিতর্কের প্রসঙ্গ তুললাম। তার ব্যক্তিগত রাগ বা বিদ্বেষটা বোঝার চেষ্টা আর কি! লেখনীর ঐ শৈল্পিক লড়াই প্রসঙ্গটি বলার সাথেসাথে ছফা ভাই বিনীতভাবে বললেন, মানবজমিনে হুমায়ূন আজাদের সাথে ওই বিতর্কটা করার জন্য আমি দুঃখিত এবং লজ্জিত।
হুমায়ূন আজাদ সম্পর্কে তারমধ্যে যে কোনো ব্যক্তিগত রাগ বা বিদ্বেষ নেই সেটা পরিষ্কার ছিলো। রাগ যেটা ছিলো, লড়াই যেটা ছিলো সেটা বুদ্ধিবৃত্তিক লড়াই, চিন্তার লড়াই, প্রজ্ঞার লড়াই।
এরমধ্যে ছফা ভাই এক সকালে আমাকে (ল্যান্ডফোনে) ফোন করলেন (তখন এরকম মোবাইল ছিলো না)। বললেন, তিনি আমার নতুন উপন্যাস ‘নীড়ে তার নীল ঢেউ’ পড়েছেন এবং চমৎকৃত হয়েছে। বললেন, এটা আমি ছবি বানাবো। এবং এই ছবি হাউসফুল হবে। হিট করবে। খুবই মজার লেখা।
তিনি খ্যাতিমান চলচ্চিত্র পরিচালক শহিদুল ইসলাম খোকনের কথা বললেন। তাকে বইটির কথা বলেছেন। পরিচালক শহিদুল ইসলাম খোকন ছফা ভাইয়ের বন্ধু। আমিতো মহাখুশি। ফুরফুরা মনে যেয়ে দেখা করলাম ছফা ভাইয়ের সাথে। সেদিন তার মন অত্যন্ত আনন্দিত। কেননা (অসুস্থতাজনিত কারণে) দুই বছর পরে তিনি নিজ হাতে সেদিন লিখেছেন। টেলিফোনে বাংলা বাজার পত্রিকার ইয়াহিয়া সাহেবের সাথে কথা বলছিলেন। বললেন, এখন থেকে তিনি নিজ হাতে লিখবেন। এবং যা কিছু ‘অসাহিত্য’ সেগুলো লিখবেন না। আমার ব্যবসা বাণিজ্যের খোঁজ নিয়ে বললেন, এক সময় আমারও প্রেস ব্যবসা ছিল।
ইত্তেফাকের সম্পাদক আখতার-উল আলম ভাইয়ের কাছে শুনেছি প্রেস ব্যবসা করার সময় ছফা ভাইয়ের সাথে তার একবার দেখা হয়েছিলো। তখন ছফা ভাই আখতার ভাইয়ের সাথে বুক মিলিয়েছিলেন। ছফা ভাইয়ের বুকে হাড্ডি ছাড়া কিছু ছিলো না। বুকের খাচা বের হয়ে গিয়েছিলো। ঐ কথা মনে হলে আমিও ভাবি প্রেস ব্যবসা করে আমারও না বুকের খাচা বের হয়ে যায়। ছফা ভাইকে বললাম, প্রেস ব্যবসা করবোনা।
কথা প্রসঙ্গে একবার আমাকে জিজ্ঞাসা করলেন, মামুনুর রশীদ সাহেবের মুরীদ কয় হাজার? ত্রিশ-চল্লিশ হাজার হবে।
ছফা ভাই বললেন, আচ্ছা ওনাদের নিয়ে আমরা একটা বিপ্লবতো করতে পারি। আমি কোন উত্তর দেইনা। তিনি একা একাই বলেন, একটা কাজ করি, হুজুরকে নিয়ে আমরা আটরশি দখল করি। ওইটাকে খানকা বানিয়ে ফেলি।
আমি হাসি। শেষে বললেন, আমাকে একটা খেলাফত দেয়া যায় না? আপনি হুজুরকে বলবেন।
আমি কোনো কিছু বললাম না। হয়তো বলা যেতো, বিপ্লব করা যায়। আবার প্রতি বিপ্লবও হয়। দখলও করা যায়। দখল করলে পাহারা বসাতে হয়। নয়তো বেদখলের সম্ভাবনা থাকে। সবই অস্থায়ী। কিন্তু মানুষের হৃদয়কে যদি জয় করা যায়, তাহলে কোনো ভয়ই থাকে না। এটি স্থায়ী। টেকসই।
শান্তির খোঁজে ছফা ভাই
১লা জুলাই (২০০১) তারিখে সকালে ছফা ভাইয়ের বাসায় এসেছি। তিনি পানঞ্জাবী পায়জামা-টুপি পরে তৈরি হলেন। হাকিমাবাদ খানকায় ঈদে মিলাদুন্নবী (স.) অনুষ্ঠানে যাবেন। বললেন, ওবেইদ জায়গীরদার যেতে চাচ্ছেন। তাকে ফোন করলেন। ওবেইদ জায়গীরদারের কি কাজ যেন পড়েছে। বললেন, যেতে পারবেন না। আগামী বছর যাবেন। জবাবে ছফা ভাই বললেন, আগামী বছর যে যাবেন সেই হায়াতের গ্যারান্টি আপনাকে কে দিয়েছে? বলে ফোন রেখে দিলেন।
ছফা ভাইয়ের মাথায় একটা কালো টুপি। আমি ভাবলাম ওটা ইদ্রিসের টুপি হবে। নিশ্চিত হওয়ার জন্য জিজ্ঞাসা করাতে বললেন, ওটা আমারই (ছফা ভাইয়ের) টুপি।
তিনি সেজেগুজে বসে আছেন। নিচে গাড়ি এলো। গাড়িতে ইত্তেফাক পত্রিকার সম্পাদক আখতার-উল আলম ভাই বসা। আমরা নেমে এলাম। ছুটলাম হাকিমাবাদে। ওই অনুষ্ঠানের পরে আখতার-উল আলম ভাই একদিন বললেন, গাড়িতে ফেরার সময় আহমদ ছফা আমাকে বলেছে, সে জীবনভর খুব অশান্তির মধ্যে কাটিয়েছে। একটা শান্তির নোঙর খুঁজেছে। সারাজীবন কোথাও শান্তি পায়নি। আহমদ ছফা মিলাদুন্নবী (স.) অনুষ্ঠান থেকে ফেরার পথে তাকে বলেছেন, আজ হাকিমাবাদে একটা শান্তির ঠিকানা পেয়ে তিনি ফিরে যাচ্ছেন। (আখতার-উল আলম ভাই পরে ইত্তেফাকে তার ‘স্থান-কাল-পাত্র’/‘লুব্ধক’ উপসম্পাদকীযতে একটা লেখা লিখেছেন)
এখন মনে হচ্ছে বোধহয় শান্তির সন্ধানেই গত ২৮ জুলাই (২০০১) ছফা ভাই যাত্রা করেছেন। হয়তো স্থায়ী শান্তির নোঙর তিনি পেয়েছেন। যে কারণে চলে গেলেন। চির দিনের জন্যই চলে গেলেন।
(এই লেখাটি ২০০১ সালে আহমদ ছফা স্মরণে পাক্ষিক চিন্তার বিশেষ সংস্করণে প্রকাশিত হয়েছিলো)
