সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশ ত্যাগের পরদিন পুঁজিবাজারে বড় উত্থান ঘটেছে। ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পরদিনই প্রধান পুঁজিবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে (ডিএসই) লেনদেন হওয়া ৮২ শতাংশ শেয়ারের দর বেড়েছে। মাসব্যাপী আন্দোলনে সফলতার পর গতকাল মঙ্গলবার বড় মূলধনি বেশিরভাগ শেয়ারের দর বাড়ায় স্টক এক্সচেঞ্জটির প্রধান মূল্যসূচক ডিএসইএক্স ১৯৭ পয়েন্ট বা পৌনে ৪ শতাংশ বেড়েছে। সর্বোচ্চ ৯ থেকে ১০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে ১০৬টি শেয়ারের দর। তবে এমন উল্লম্ফনের দিনে আওয়ামী লীগ নেতাদের মালিকানাধীন কোম্পানির শেয়ারগুলো সর্বোচ্চ দর হারিয়েছে।
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন দমনে পদত্যাগকারী সরকার সহিংস পথ বেছে নিলে পুরো দেশব্যাপী ভীতিকর পরিস্থিতি তৈরি হয়। শত শত ছাত্র ও সাধারণ মানুষ নিহত হন। তবে প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে শেখ হাসিনার পদত্যাগের মধ্য দিয়ে দেশে গত তিন সপ্তাহেরও বেশি সময়ের অচলাবস্থার অবসান হয়েছে। কোটা সংস্কার আন্দোলন নিয়ে যে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি হয়েছিল, তার অবসান হওয়ায় বিনিয়োগকারীদের মধ্যে স্বস্তি ফিরেছে। তারা বাজারে আবার সক্রিয় হয়েছেন। যার প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে পুঁজিবাজারেও।
আন্দোলন দমাতে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরকার বুধবার পর্যন্ত সাধারণ ছুটি ঘোষণা করেছিল। তবে সেনাবাহিনীর কাছে ক্ষমতা দিয়ে দেশত্যাগের পর সোমবারই সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে ব্যাংকসহ সব সরকারি-বেসরকারি অফিস খোলা রাখার ঘোষণা দেওয়া হয়। এর ফলে গতকাল স্বাভাবিক সময়ে পুঁজিবাজারের লেনদেন শুরু হয়।
পর্যালোচনায় দেখা যায়, গতকাল পুঁজিবাজারে লেনদেন শুরু হলে সাইডে থাকা বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণ বাড়ায় অধিকাংশ শেয়ারের দাম বাড়তে শুরু করে। গতকাল ডিএসইতে লেনদেন শুরুর প্রথম ১০ মিনিটেই প্রধান সূচক ২০০ পয়েন্ট বেড়ে যায়। আর প্রথম ৩০ মিনিটে লেনদেন ছাড়িয়ে যায় ৩০০ কোটি টাকা। লেনদেনের একপর্যায়ে শতটিরও বেশি শেয়ার সর্বোচ্চ দরে কেনাবেচা হয়। সাম্প্রতিক সময়ে দর হারানো মৌলভিত্তির বড় মূলধনি কোম্পানিগুলোর শেয়ারে বিনিয়োগকারীদের বেশি আকৃষ্ট হতে দেখা গেছে। সূচকের উল্লম্ফনের এটিই বড় কারণ।
গতকাল ডিএসইতে কেনাবেচা হওয়া ৩৯৭টি শেয়ার ও মিউচুয়াল ফান্ড ইউনিটের মধ্যে দাম বেড়েছে ৩২৮টির। বিপরীতে কমেছে ৬০টি ও অপরিবর্তিত রয়েছে ৯টির দর। অধিকাংশ শেয়ারের দাম বাড়ায় গতকাল ডিএসইর প্রধান সূচক আগের দিনের চেয়ে ১৯৭ পয়েন্ট বেড়ে ৫৪২৬ পয়েন্টে উন্নীত হয়। ডিএসইর অন্য দুই সূচক উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে।
গতকাল সূচক বাড়াতে অগ্রণী ভূমিকা রেখেছে মৌলভিত্তির বড় মূলধনি কোম্পানিগুলো, যেগুলো সাম্প্রতিক সময়ে দর হারিয়েছিল। সূচক বাড়াতে সবচেয়ে বেশি ভূমিকা রেখেছে বিএটিবিসি, গ্রামীণফোন, স্কয়ার ফার্মা ও ব্র্যাক ব্যাংক। এই চারটি প্রতিষ্ঠানের দরবৃদ্ধিতে ডিএসইর প্রধান সূচক বেড়েছে ৫৩ পয়েন্ট। এ ছাড়া রেনাটা, পূবালী ব্যাংক, লাফার্জহোলসিম, অলিম্পিক, ইস্টার্ন ব্যাংক ও রবির দরবৃদ্ধিতে সূচকটিতে আরও ৪৩ পয়েন্ট যোগ হয়েছে।
খাতওয়ারি পর্যালোচনায় দেখা যায়, এদিকে গতকাল পুঁজিবাজারে প্রায় সব শেয়ারের দর বাড়লেও শেখ হাসিনার উপদেষ্টা সালমান এফ রহমারসহ আওয়ামী লীগ নেতাদের মালিকানাধীন কোম্পানিগুলোর শেয়ারের দরপতন হয়েছে। সালমান এফ রহমানের মালিকানাধীন কোম্পানিগুলোর মধ্যে একটি ছাড়া অন্য সবগুলোর দর সর্বোচ্চ কমেছে। বেক্সিমকো লিমিটেডের শেয়ারে এখনো ফ্লোর প্রাইস আরোপ থাকায় শেয়ারটির দাম কমার কোনো সুযোগ ছিল না। তবে বেক্সিমকো ফার্মাসিউটিক্যালস, শাইনপুকুর সিরামিকস ও আইএফআইসি ব্যাংকের শেয়ার দরে সর্বোচ্চ পতন হয়েছে।
সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আত্মীয় শেখ কবির হোসেনের মালিকানাধীন কোম্পানি সোনার বাংলা ইন্স্যুরেন্সের দর গতকাল সবচেয়ে বেশি কমেছে। শেখ কবির দীর্ঘদিন ধরেই কোম্পানিটির চেয়ারম্যান পদে রয়েছেন। এ ছাড়া বাংলাদেশ ইন্স্যুরেন্স অ্যাসোসিয়েশনেরও দীর্ঘদিনের প্রেসিডেন্ট। একইভাবে ময়মনসিংহের আওয়ামী লীগ নেতা মো. আমিনুল হক শামীমের মালিকানাধীন কোম্পানি সিপার্ল বিচ রিসোর্ট অ্যান্ড স্পা লিমিটেডের শেয়ারদরও সর্বোচ্চ ৩ শতাংশ কমেছে।
উল্লম্ফনের দিনে দরপতনের ধাক্কা লেগেছে ওরিয়ন গ্রুপের শেয়ারগুলোয়ও। গতকাল ওরিয়ন ইনফিউশনস, ওরিয়ন ফার্মা, কোহিনুর কেমিক্যালস, স্যালভো কেমিক্যাল, বীকন ফার্মা এবং গ্রুপটির অধিকাংশ শেয়ারের দখল থাকা খান ব্রাদার্স পিপি ওভেন ব্যাগের শেয়ারও সর্বোচ্চ দর হারিয়েছে। ওরিয়ন গ্রুপের সঙ্গে আওয়ামী লীগ সরকারের ঘনিষ্ঠতা রয়েছে।
জেমকন গ্রুপের মালিকানাধীন চিংড়ি রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান জেমিনি সি ফুডের শেয়ারও সর্বোচ্চ দর হারিয়েছে। জেমকন গ্রুপের পরিচালক কাজী নাবিল আহমেদ আওয়ামী লীগের সাংসদ ছিলেন।
গতকাল সামিট গ্রুপের কোম্পানি শেয়ারও দর হারিয়েছে। কোম্পানিটির মালিকানায় রয়েছেন সাবেক আওয়ামী লীগ সাংসদ ও বিমান ও পর্যটনমন্ত্রী ফারুক খানের পরিবার। তার ভাই আজিজ খান সামিট গ্রুপের চেয়ারম্যান পদে রয়েছেন। কয়েক বছর আগে সামিট গ্রুপ বাংলাদেশে থাকা তাদের সব সম্পদ অবৈধভাবে সিঙ্গাপুরে স্থানান্তর করে নেয়। মূলত বাংলাদেশে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের শীর্ষ ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠান সামিট গ্রুপ। গ্রুপটির ১৮টি বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র রয়েছে। এর পাশাপাশি খুলনা পাওয়ার কোম্পানি, সামিট কমিউনিকেশনস, সামিট এলএনজি টার্মিনাল, সামিট অয়েল অ্যান্ড শিপিং কোম্পানিসহ বিভিন্ন খাতের কোম্পানি রয়েছে। গতকাল তালিকাভুক্ত সামিট পাওয়ার ও এসএ পোর্ট কোম্পানির শেয়ারের সর্বোচ্চ দর কমেছে।
সমাবেশে সর্বস্তরের জনগণসহ বিএনপি এবং এর অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের সব পর্যায়ের নেতাকর্মীকে যোগদানের জন্য বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে অনুরোধ করা হয়েছে।
