ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের বহির্বিভাগে চিকিৎসা করাতে গত রবিবার যান মোশাররফ হোসাইন। রোগীদের লম্বা ভিড় ঠেলে সিরিয়ালে দাঁড়িয়ে অনেক কষ্টে চিকিৎসকের চেম্বারে প্রবেশ করেন তিনি। চিকিৎসককে দেখানোর পর চেম্বার থেকে বের হওয়ার সাথে সাথেই ওষুধ কোম্পানির কয়েকজন প্রতিনিধি তাকে ঘিরে ধরে প্রেসক্রিপশনের ছবি তুলতে চান। ছবি তোলার জন্য কোনো অনুমতি না নিয়েই হাত থেকে টান দিয়ে প্রেসক্রিপশন নিয়ে একজন ছবি তোলার চেষ্টা করেন। মোশাররফ ছবি তুলতে বাঁধা দিলে বাকবিতণ্ডায় জড়ান প্রতিনিধিরা।
মোশাররফ হোসাইন দেশ রূপান্তরকে বলেন, চিকিৎসা রোগীদের গোপনীয় বিষয়, এটা অন্য কারও জানা উচিৎ নয়। এখন ওষুধ কোম্পানির বা অন্য যে কেউ যদি প্রেসক্রিপশনের ছবি তুলতে চান তাহলে তাকে অবশ্যই রোগীর অনুমতি নেওয়া উচিত। কিন্তু কোম্পানীর প্রতিনিধিরা তা তোয়াক্কা করেন না। আমাদের অনেক ধরনের অসুখ হয়ে থাকে যা সমাজে বা আত্মীয় স্বজন জানাজানি হলে বিব্রতকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হতে পারে।
রেহনুমা বেগমের শ্বাসকষ্ট দেখা দিলে পরিবারের সদস্যরা শুক্রবার তাকে রাজধানীর একটা বেসরকারি হাসপাতালের এক চিকিৎসকের চেম্বারে নিয়ে যান। চিকিৎসক তাকে জরুরি ভিত্তিতে কয়েকটি টেস্ট করানোর পরামর্শ দেন। চেম্বার থেকে বের হতেই তাকে ৩-৪ জন ওষুধ কোম্পানির বিক্রয় প্রতিনিধি ঘিরে ধরেন এবং প্রেসক্রিপশনের ছবি তুলতে চান। রেহনুমার ছেলে আলিফ তার মায়ের সমস্যার কথা বলে দ্রুত চলে যাওয়ার চেষ্টা করলেও লাভ হয়নি। প্রেসক্রিপশন হাতে নিয়ে যে যার মতো ছবি তোলার চেষ্টা করেন।
এটা কেবল মোশাররফ বা রেহনুমার ঘটনাই নয় দেশের সরকারি বেসরকারি হাসপাতাল, ক্লিনিক, ডায়াগনস্টিক সেন্টারে চিকিৎসা করাতে যাওয়া প্রায় সব রোগীর অভিজ্ঞতাই এরকম। চিকিৎসা করাতে গিয়ে ওষুধ কোম্পানির প্রতিনিধিদের সঙ্গে দেখা হয়নি এমন রোগী খুঁজে পাওয়া দুষ্কর। অনেকক্ষেত্রে দেখা যায় রোগীদের বাইরে রেখেই কোম্পানির প্রতিনিধিদের সঙ্গে চেম্বারে দেন দরবার শুরু করেন চিকিৎসকরা। এ নিয়ে রোগীরা হাঁসফাঁস করলেও চিকিৎসক কিংবা প্রতিনিধি কেউ ই তোয়াক্কা করেন না। বিভিন্ন সময় প্রেসক্রিপশনের ছবি তোলাকে কেন্দ্র করে রোগী কিংবা তার স্বজনদের সঙ্গে উত্তপ্ত বাক্যবিনিময় কিংবা বিভিন্ন ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনাও ঘটে থাকে।
গত জুন মাসে এমনি অপ্রীতিকর ঘটনার মুখোমুখী হন প্রকৌশলী আনিসুর রহমান। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে (বিএসএমএমইউ) চিকিৎসকের চেম্বার থেকে বের হলে প্রেসক্রিপশন টেনে নিয়ে ছবি তোলার চেষ্টা করছিলেন বিক্রয় প্রতিনিধিরা।আনিসুর তাদেরকে বাঁধা দিলে এ নিয়ে তর্কাতর্কি শুরু হলে এক পর্যায়ে তার ওপর হামলা চালান রিপ্রেজেন্টিভরা। এ নিয়ে বেশ সমালোচনার সৃষ্টি হয়েছিল সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমসহ বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মে।
এরমধ্যে গতকাল বৃহস্পতিবার ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ওষুধ কোম্পানির বিক্রয় প্রতিনিধিদের ঢোকা নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। এরইমধ্যে বেসরকারি হাসপাতাল ও ডায়াগনাস্টিক সেন্টারের প্রতিনিধিদের বিষয়েও কর্তৃপক্ষ শক্ত বার্তা দিয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকারের ১০০ দিনের কর্মসূচির অংশ হিসেবে এসব সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ।
বিষয়টিকে ইতিবাচক হিসেবেই দেখছেন রোগী ও তাদের স্বজনরা। রোগীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, হাসপাতালে যারা চিকিৎসার জন্য যায় তারা নানা ঝামেলায় থাকে। মনের ভেতর দুশ্চিন্তা কাজ করে। অনেক সময় রোগীর সমস্যা গুরুতর থাকে। এরমধ্যে সময় নষ্ট করে জোর করে প্রেসক্রিপশনের ছবি তোলার চেষ্টা যে কাউকেই বিরক্ত করে। এ নিয়ে নানা সমালোচনার পরও তা বন্ধ করা যাচ্ছে না চিকিৎসকদের কারণে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক বিক্রয় প্রতিনিধি দেশ রূপান্তরকে বলেন, চাকরি বাঁচাতে মান সম্মান নষ্ট করে এই কাজটা করতে হয়। আমি জানি এটা রোগীদের বিব্রত করে কিন্তু আমাদের নিয়োগ ই দেওয়া হয় এই কাজের জন্য। ফলে চাকরি বাঁচাতে কাজটা করতে হয়। চিকিৎসকরা কোম্পানীর কাছ থেকে দামি দামি উপহার নেন, নানা সুযোগ সুবিধা নেন ওষুধ লেখার কথা বলে। আমাদের কাজ হয় চিকিৎসকদের নিজেদের কোম্পানীর ওষুধ লিখতে প্রভাবিত করা ও তার ফলাফল কোম্পানিকে জানানো।
তিনি বলেন, আমরা কোম্পানির নতুন নতুন ওষুধ সম্পর্কে চিকিৎসকদের জানাই। ডাক্তাররা সেগুলো লেখেন কী না সেটা কোম্পানিকে জানাতে হয়।
