‘ভাবিনি আর কখনও সন্তানদের আদর করতে পারব’

আপডেট : ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৪, ০৪:০৭ পিএম

‘ভাবিনি আর কখনও মাকে দেখব, ছেলে মেয়েকে নিজ হাতে আদর করতে পারব। ৪৫ দিন অনবরত কেঁদেছি। রাতদিন কান্না করে আল্লাহর কাছে শুধু বলেছি, ইয়া আল্লাহ আমাদের কি অপরাধ? দেশের ছাত্রদের পাশে দাড়িঁয়ে তাদের জন্য সমবেদনা জানাতে গিয়ে বিদেশের মাটিতে আজ আমরা সবাই জেল খাটছি। আমরা দেশে ফিরতে চাই। পরিবার নিয়ে জীবন কাটাতে চাই। ইয়া আল্লাহ আপনি ছাড়া কেউ আমাদের এই বিপদ থেকে উদ্ধার করতে পারবে না। শেষ পর্যন্ত আল্লাহ আমাদের কথা শুনেছে।’

বলছিলেন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন চলাকালীন সংযুক্ত আরব আমিরাতে আন্দোলন করতে গিয়ে সাজাপ্রাপ্ত সীতাকুণ্ড উপজেলার বাড়বকুণ্ড ইউনিয়নের হাশেম নগর গ্রামের নতুন পাড়ার মৃত রুস্তম আলীর ছেলে মো. রফিকুল হাসান বাবু। ১০ বছরের সাজাপ্রাপ্ত হয়েছিলেন তিনি। তার সাথে আরও অনেকে ছিলেন, যাদের কারো কারো ২৫ বছর পর্যন্ত সাজা হয়েছিল। 

তিনি বলেন, ‘প্রবাস জীবন এমনিতেই অনেক কষ্টের। মা-বাবা, স্ত্রী, পুত্র-কন্যা রেখে হাজার মাইল দূরে একা পড়ে থাকা। মাঝে-মাঝে বুক ফেঁট যাওয়ার অবস্থা হয়, প্রচণ্ড ইচ্ছা হয় সন্তানদের আদর করি। তখন ভিডিও কলে তাদের সাথে কথা বলে নীরবে চোখের পানি ফেলা ছাড়া আর কিছু করার থাকে না। যখন সে দেশের পুলিশ ডেকে নিয়ে গিয়ে আমাদের আটক করল প্রথমে আমরা ভেবেছিলাম হয়তো দেশে ফেরত পাঠাবে। কারণ একই ঘটনায় পাকিস্থানীদের ডেকে নিয়ে দেশে ফেরত পাঠিয়েছিল। কিন্তু আমাদের বেলায় হল উল্টো। ডেকে নেওয়ার পর বিচার করে প্রত্যেককে ১০ বছরের ওপরে জেলে থাকার আদেশ দেওয়া হল। আমাদের কয়েকজনকে ১০ বছর করে সাজা দেয় সে দেশের আদালত। অনেককে ১৫ বছর, ১৮ বছর ও ২৫ বছরের সাজা দেওয়া হয়। সাজার কথা শোনার পর থেকে আমাদের চোখে কেবল দেশের কথা, পরিবারের কথা, সন্তানদের ছবি ভাসছিল। কখনো আবার দেশে ফিরতে পারব সম্পূর্ণ আশা হারিয়ে ফেলেছিলাম। কারণ ১০ বছর কম সময় নয়। এছাড়া জেলের ভেতর আমাদের প্রতিটি মুহুর্ত কাটছিল চরম উৎকণ্ঠায়। সেখানে কারো সাথে কথা বলার কোন সুযোগ দেওয়া হয় না। আমরা যে সে দেশে জেল খাটছি সেটাও দেশে জানানোর কোন সুযোগ পাইনি। দেশে মা-বাবা, স্ত্রী, সন্তানরা কিভাবে আছে কোন খোঁজ নেওয়ারও সুযোগ ছিল না। তাছাড়া দেশে সংসার কীভাবে চলবে, কী খাবে। প্রতি মুহুর্তে সেটা অনুভব করেছি আর আল্লাহর কাছে শুধু সেজদায় পড়ে কেঁদেছি।

রকিবুল হাসানের মা শামসুন্নাহার বলেন, দেড় মাস আমার ছেলের কোনো খবর পাইনি। ছেলের কি হয়েছে, কোথায় আছে কিছুই জানি না। রাতদিন ছেলের জন্য আল্লাহর কাছে কেঁদেছি। আল্লাহ আমার কথা শুনেছে। আমার বুকের ধনকে আমার বুকে ফিরিয়ে দিয়েছেন।

অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টার জন্য এক লাখ বছর আয়ু কামনা করে তিনি বলেন, ‘ইউনুসের প্রতি ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতার কোনো শেষ নেই। আল্লাহ উনাকে ১ লাখ বছর বাচিঁয়ে রাখুন। আমার ছেলের সাথে আরও যাদের সাজা হয়েছে তাদের অনেকে এখনও ছাড়া পায়নি। যে কোন মূল্যে তাদের সাজা মওকুফ করে দেশে ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা করেন। কারণ সন্তান বিদেশে নিখোঁজ হলে বা জেলে থাকলে সেটা কতটা কষ্টের কেবলমাত্র একজন মা বুঝতে পারেন।

রকিবুল হাসান জানান, আবুধাবির মোট ৮টি প্রদেশে বৈষম্যবিরোধী আন্দোলন সমর্থনে মানববন্ধন হয়েছিল। তার মধ্যে ২/৩ স্থানে একটু ভাঙচুর ও বিশৃঙ্খলার ঘটনা ঘটে। অথচ ভাঙচুরের সাথে যারা জড়িত তারা ঘটনা ঘটিয়ে পালিয়ে সরে পড়েছিল। আর সেদেশের পুলিশ আমাদের আটক করে। আটককৃত সাজাপ্রাপ্তদের মধ্যে ৫৭ জনের সাজা মওকুফ করা হলেও অনেকে এখনো সেদেশের জেলে রয়েছেন। খালি হাতে দেশে ফিরে এসেছে জানিয়ে সরকারের কাছে তিনি তাদের পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করার অনুরোধ জানান।

 

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত