ভুলে ভরা বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে নর্দান ইলেকট্রিসিটি সাপ্লাই কোম্পানি লিমিটেড (নেসকো) অন্তত ১৪ জন নির্বাহী প্রকৌশলী নিয়োগ দিয়েছে, যাদের প্রয়োজনীয় অভিজ্ঞতা নেই। কারও নির্ধারিত/কাক্সিক্ষত বয়স পার হয়ে গেছে। অভিজ্ঞতার ভুয়া সনদও দিয়েছেন অনেকে। আবার কেউ উপবিভাগীয় প্রকৌশলীর যোগ্যতাই অর্জন করেননি। অযোগ্য এসব প্রকৌশলীর ছয়জনকে আবার করা হয়েছে তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী।
ভুক্তভোগীরা বলছেন, তাদের নিয়োগ দিতে গিয়ে বিদ্যুৎ বিতরণ খাতে কর্মরত অন্তত পাঁচজন যোগ্য প্রার্থীকে বাদ দেওয়া হয়েছে, যারা লিখিত পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে মৌখিক পরীক্ষায়ও ভালো করেছিলেন। গত ২৭ মার্চ এবং গত বছরের ১৪ সেপ্টেম্বর দু-দফায় নির্বাহী প্রকৌশলী থেকে তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী করা হয়েছে আটজনকে; সেখানেও জ্যেষ্ঠতা লঙ্ঘনের এবং মেধার অবমূল্যায়নের অভিযোগ রয়েছে।
অভিযোগে বলা হয়েছে, নির্বাহী প্রকৌশলী নিয়োগের নেপথ্যে রয়েছে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার মুখ্য সচিব আহমেদ কায়কাউস ও নেসকোর তৎকালীন চেয়ারম্যান রহমত উল্লাহ মো. দস্তগীরের সিন্ডিকেট। পিডিবির তদন্তে অনিয়ম-দুর্নীতি প্রমাণিত হওয়ার পরও তাদের চাপে সব ধামাচাপা দেওয়া হয়েছে।
এই নিয়োগ প্রক্রিয়ার বিরুদ্ধে ২০১৯ সালে নেসকোর ৩৫ জন সহকারী প্রকৌশলী আদালতে মামলা করলে আহমেদ কায়কাউসের চাপে প্রত্যাহার করতে বাধ্য হন তারা। নানা রকম হেনস্তারও শিকার হন ভুক্তভোগীরা।
নেসকোর ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও পরিচালনা পর্ষদের সদস্য জাকিউল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, পরিচালনা পর্ষদের সিদ্ধান্তে কোম্পানির নিয়োগ-পদোন্নতি হয়। তাই এ ব্যাপারে তার কোনো মন্তব্য নেই।
প্রতিষ্ঠানটির তৎকালীন চেয়ারম্যান রহমত উল্লাহ মো. দস্তগীর দেশ রূপান্তরকে বলেন, তার সময়ে এ ধরনের কোনো নিয়োগ হয়নি। তবে নেসকো জানিয়েছে, ওই নিয়োগ প্রক্রিয়ার আগে এবং পরে চেয়ারম্যান ছিলেন মো. দস্তগীর। আহমেদ কায়কাউসের ফোন নম্বর বন্ধ পাওয়া গেছে।
ত্রুটিপূর্ণ নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি : নির্বাহী প্রকৌশলীর ৫৫টি শূন্যপদে ২০১৮ সালের ৪ ও ৫ জুলাই নিয়োগ বিজ্ঞাপ্তি প্রকাশের পর ২১ জুলাই সংশোধনী বিজ্ঞপ্তি দেয় নেসকো। বাছাইকৃত প্রার্থীদের মধ্যে নিয়োগের লিখিত পরীক্ষায় ২৮৪ জন অংশ নেন, তাদের ৬৪ জন মৌখিক পরীক্ষায় অংশগ্রহণের সুযোগ পান। ২৫ জনকে নিয়োগ দেওয়া হয়।
২০১৬ সালে যাত্রা শুরু হওয়া প্রতিষ্ঠানটির ওই সময় নিজস্ব চাকরিবিধি না থাকায় আরেক বিতরণ কোম্পানি ওয়েস্টজোন পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেডের (ওজোপাডিকো) নিয়োগবিধি অনুসরণ করার কথা ছিল।
ওই বিধিতে নির্বাহী প্রকৌশলী পদের জন্য ‘রিলেভেন্ট ফিল্ডে’ প্রার্থীর সর্বনিম্ন সাত বছরের অভিজ্ঞতা থাকার কথা বলা হয়েছে। বিদ্যুৎ উৎপাদন, সঞ্চালন বা বিতরণকারী কোনো প্রতিষ্ঠানে উপবিভাগীয় প্রকৌশলী বা সমমানের পদে তিন বছরের অভিজ্ঞতা থাকতে হবে। প্রার্থীর বয়স হবে সর্বোচ্চ ৪০ বছর। কিন্তু নেসকোর প্রকাশিত বিজ্ঞপ্তিতে এই বিধান মানা হয়নি।
নেসকোর নির্বাহী প্রকৌশলী পদে নিয়োগে অনিয়ম-দুর্নীতি তদন্তে বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (পিডিবি) তিন কর্মকর্তার সমন্বয়ে একটি কমিটি হয়। তারা ২০১৯ সালের ১০ জুন প্রতিবেদন জমা দেন, তাতে অনিয়ম-দুর্নীতি হয়েছে বলা হয়।
‘ইউনিফায়েড সার্ভিস গাইডলাইনস’ লঙ্ঘন করে নিয়োগের বিষয়ে তদন্ত কমিটি সংশ্লিষ্টদের কাছে জানতে চাইলে তারা বলেন, কোম্পানির বোর্ড সার্ভিস রুল সংশোধন করার ক্ষমতা রাখে। তবে পরিচালনা বোর্ড পরিবর্তনের পক্ষে কোনো প্রমাণ উপস্থাপন করতে পারেনি।
তদন্ত প্রতিবেদনে ১০ কর্মকর্তাকে দায়ী করে বলা হয়, জাতীয় বেতন গ্রেড অনুযায়ী নির্বাহী প্রকৌশলী পঞ্চম গ্রেডের পদ। এ পদে অযোগ্য লোক ভুয়া সনদ দিয়ে নিয়োগ পেলে উত্তরবঙ্গের বিদ্যুৎ খাত হুমকির মুখে পড়বে।
নির্বাহী প্রকৌশলীদের তালিকা পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, ২৫ জনের মধ্যে ১৪ জনই অযোগ্য। তাদের একজন মো. ইয়াসির আরাফাতের চাকরির অভিজ্ঞতা ৭ বছরের চেয়ে ১৪ দিন কম। তার চাকরির এক বছর দুই মাস আবার বিদ্যুৎ উৎপাদন/সঞ্চালন কিংবা বিতরণকারী প্রতিষ্ঠানে নয়। তার ওই অভিজ্ঞতা পারটেক্স প্লাস্টিক লিমিটেড এবং সিপি বাংলাদেশ লিমিটেডে চাকরি করার। গত ৯ সেপ্টেম্বর তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী হিসেবে পদোন্নতি পেয়েছেন তিনি।
মো. সাইফুল্লাহ রায়হান সাত বছরের চাকরির অভিজ্ঞতা দেখিয়েছেন, এর পাঁচ বছরই গ্রামীণফোনে। তিনিও এখন তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী। টেলিকমিউনিকেশনে চাকরির অভিজ্ঞতা দেখিয়ে আরও যারা নির্বাহী প্রকৌশলী হয়েছেন তারা হলেন মো. মোস্তাফিজুর রহমান ভূঁইয়া (বর্তমানে তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী), কামাল আহমেদ ও মো. ফজলুর রহমান।
নির্বাহী প্রকৌশলী পদে আবেদনের বয়সসীমা সর্বোচ্চ ৪০ বছর হলেও তার চেয়ে বেশি বয়সী মো. গোলাম মোস্তফাকে নিয়োগ দিয়েছে নেসকো কর্তৃপক্ষ। বর্তমানে তিনিও তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী। অন্যদিকে ওষুধ কোম্পানির চাকরির অভিজ্ঞতা দেখিয়ে নির্বাহী প্রকৌশলীর পদ বাগিয়েছেন মো. মোছাদ্দেক কবির (বর্তমানে তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী)।
নিয়োগের শর্ত লঙ্ঘন করে আরও যাদের নির্বাহী প্রকৌশলী হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে তারা হলেন মো. মাহমুদুল হাসান, মাহমুদুর রহমান, মো. হাবিবুর রহমান, মো. আসাদুর রহমান খান, মোহাম্মদ নাফিদ হাসান গালিব, মো. আবদুল মতিন এবং মো. মনির হোসেন।
বঞ্চিতদের অভিযোগ : নেসকোর নিয়োগে বঞ্চনার শিকার হওয়ার অভিযোগ তুলে সম্প্রতি বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খানের কাছে লিখিত আবেদন করেছেন ওজোপাডিকোর পাঁচ প্রকৌশলী। তারা সিনিয়রিটিসহ নেসকোতে নিয়োগ দেওয়ার অনুরোধ জানিয়েছেন।
ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, লিখিত পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে মৌখিক পরীক্ষায় অংশ নিলে নেসকোর তৎকালীন চেয়ারম্যান রহমত উল্লাহ মো. দস্তগীর তাদের বলেন, ওজোপাডিকোর প্রার্থীদের ভাইভা নেওয়া হবে না। মো. শফিক উদ্দিনের (ওজোপাডিকোর তৎকালীন ব্যবস্থাপনা পরিচালক) সঙ্গে আলাপ হয়েছে, আপনাদের নেসকোতে নেওয়া হবে না।’
প্রার্থীদের অনুরোধে মৌখিক পরীক্ষা নেওয়া হলে সব প্রশ্নের উত্তর তারা দেন। কিন্তু তাদের নিয়োগ দেওয়া হয়নি, লিখিত আবেদনে উল্লেখ করেন ভুক্তভোগীরা।
ওজোপাডিকোর তৎকালীন ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. শফিক উদ্দীনের সঙ্গে মোবাইল ফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করেও সাড়া মেলেনি।
দায়ীদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি : নির্বাহী প্রকৌশলী নিয়োগে অনিয়ম-দুর্নীতির সঙ্গে নেসকোর পরিচালক (অর্থ ও প্রশাসন) সৈয়দ গোলাম আহাম্মদসহ ১০ কর্মকর্তাকে দায়ী করে প্রতিবেদন দিয়েছে বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (পিডিবি) কর্মকর্তাদের নিয়ে গঠিত তদন্ত কমিটি। আর যাদের দায়ী করা হয়েছে তারা হলেন নেসকোর তৎকালীন নির্বাহী প্রকৌশলী (কারিগরি ও অপারেশন) এ এইচ এম কামাল, উপব্যবস্থাপক (প্রশাসন) এ বি এম ইমতিয়াজ উদ্দিন আহমেদ, ব্যবস্থাপক (প্রশাসন) সুবীর রঞ্জন পোদ্দার, সহকারী ব্যবস্থাপক আরিফুর রহমান, ইমদাদুল হক মিয়া, মোছা. মাসুমা আক্তার, মোহাম্মদ আবদুর রহিম, ফয়সাল বিন ওমর ও সজীব কুমার ঘোষ। কিন্তু তাদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।
গত ৩১ আগস্ট সৈয়দ গোলাম আহাম্মদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমি ওই নিয়োগ প্রক্রিয়ার সঙ্গে জড়িত ছিলাম না।’ পরে তিনি ফোন কেটে দেশ রূপান্তরের টেলিফোন নম্বরটি ‘ব্লক’ করে দেওয়ায় ওইদিন আর কথা হয়নি। পরদিন অন্য নম্বর থেকে ফোন দেওয়া হলে তিনি জানান তার বোন মারা গেছেন। সর্বশেষ গত রবিবার তাকে ফোন করা হলে তিনি কল কেটে দেন।
তদন্ত কমিটির একজন সদস্য দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘পিডিবির নির্দেশে তারা ওই তদন্ত করেছিলেন। নিরপেক্ষভাবে করা ওই তদন্ত প্রতিবেদনে যেসব অনিয়ম-দুর্নীতি এবং যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ করা হয়েছে তাদের সম্পর্কে তথ্য-প্রমাণও জমা দেওয়া হয়েছে। পরে কী হয়েছে আমরা জানি না।’ কাদের চাপ ছিল? এ প্রশ্নের জবাবে ওই কর্মকর্তা বলেন, ‘সেটা আর না বলি। তারা এখন পালিয়ে বেড়াচ্ছেন।’
কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের সিনিয়র সহসভাপতি ও জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক এম শামসুল আলম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘যারা এভাবে অনিয়মের মাধ্যমে নিয়োগ পেয়েছেন এবং যারা নিয়োগ দিয়েছেন, তাদের সেবা ভোক্তারা নেবেন না। তাদের বিষয়ে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া দরকার।’
