রাজধানীর মিরপুর-২ এলাকার অভিযাত্রী স্কুলের ষষ্ঠ শ্রেণীর ছাত্র মো. শাহরিয়ার হোসেন (১২)। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সময় শাহরিয়ার বাম পায়ে গুলিবিদ্ধ হন। গত ৭ আগস্ট ধরে অসহ্য যন্ত্রণায় রাজধানীর জাতীয় অর্থোপেডিক হাসপাতাল ও পুনর্বাসন প্রতিষ্ঠান (পঙ্গু হাসপাতালে)’র ৫ নম্বর বেডে ভর্তি আছেন। ছাত্র-জনতার এক দফা আন্দোলনের মুখে দেশ ছেড়ে পালিয়েছেন শেখ হাসিনা। পতন হয়েছে আওয়ামী লীগ সরকারের ১৫ বছরের শাসনাআমল। গঠিত হয়েছে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার, খুলেছে স্কুল-প্রতিষ্ঠান।
স্কুল খুললেও শাহরিয়ায়ের দিন কাটছে হাসপাতালের বেডে। বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা, খেলাধূলার বদলে তার নিত্যদিনের সঙ্গী এখন ড্রেসিং যন্ত্রণা। গতকাল (১০ সেপ্টেম্বর) পঙ্গু হাসপাতালের মডেল-বি ওয়ার্ডে তার সঙ্গে কথা হয় এই প্রতিবেদকের।
কীভাবে গুলিবিদ্ধ হয়েছেন জানতে চাইলে শাহরিয়ার দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘গত ১৯ জুলাই থেকে আমি আন্দোলনে যাওয়া শুরু করি। প্রথম দিনেই একটি রাবার বুলেট আমার পিঠে লাগে। কিন্তু দূর থেকে লাগার কারণে তেমন ব্যাথা অনুভূত হয়নি। কিন্তু সেটি বাসাই জানাতে সাহস পাইনি। সেদিন থেকেই আমি বড় ভাইদের সঙ্গে আন্দোলনে অংশ নিতাম। গত ৫ আগস্ট সকালের দিকে মিরপুর ২ মডেল থানার পাশেই আন্দোলন চলছিল। আন্দোলন চলাকালে প্রথমদিকে পুলিশ শান্ত ছিল। হঠাৎ পুলিশ আমাদের লক্ষ্য করে গুলি ছুড়তে থাকে। সবাই ভয়ে দৌঁড়াতে থাকে। আমিও বড় ভাইদের অনুসরণ করে দৌঁড়ানোর এক সময় মাটিতে পড়ে যাই। সবাই পালিয়ে যায়, আমি একা হয়ে পড়ি। পরে থানার সামনেই কিছু বড় পাইপ রাখা ছিল, সেখানে আমি লুকানোর চেষ্টা করি। তখন পুলিশ সামনে এগুতো থাকে। আমি ভয়ে দৌঁড় না দিয়ে সেখানেই বসে থাকি।
আমি ভাবছিলাম ছোট হওয়ায় পুলিশ আমাকে ছেড়ে দিবে। কিন্তু পুলিশ কাছে আসার পর আমাকে পাইপের ভিতর থেকে নিয়ে আসে। তারপর দৌঁড়াতে বলে শটগান দিয়ে পায়ে গুলি করলে আমি পড়ে যাই। গুলি লাগার সঙ্গেই আমার পা দুলতে থাকে, রক্ত পড়া শুরু হয়। আমার শরীর নিস্তেজ হয়ে আসলে আমি রাস্তায় পড়ে থাকি। পরে অন্যপাশ থেকে কিছু শিক্ষার্থী এসে আমাকে স্থানীয় কোন এক হাসপাতালে নিয়ে গিয়ে ভর্তি করে। পরে গত ৭ আগস্ট আমাকে পঙ্গু হাসপাতালে আনা হয়। সেই থেকে আমি হাসপাতালে ভর্তি আছি।’
পায়ের বর্তমান অবস্থা কী জানতে চাইলে চোখ মুছতে শুরু করে শাহরিয়ার। কান্নাজড়িত কণ্ঠে পাশে থাকা মাকে জড়িয়ে ধরে বলে, ‘ও-মা আমি আবার পায়ে হেটে স্কুলে যেতে চাই।’ এই কথা বলার পর মা সাদিয়া বেগমও কাঁদতে থাকেন।
শাহরিয়ার মা সাদিয়া বেগম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমাকে না জানিয়ে রোজ লুকিয়ে আমার ছেলে আন্দোলনে যাইতো। গত ৫ আগস্ট দুপুরের দিকে একজন ফোন করে আমাকে বলে আপনার ছেলে গুলি খাইছে। এই কথা শোনার পর আমি দিশেহারা হয়ে পড়ি, আমার মনে হয় ছেলে হয়তো বেঁচে নেই। পরে হাসপাতালে গিয়ে ছেলে অজ্ঞান অবস্থায়। আমার ছেলের পায়ে এখন রিং পড়ানো আছে। ডাক্তার বলেছে সুস্থ হয়ে সময় লাগবে। আমার ছেলে সুস্থ না হওয়া পর্যন্ত দুশ্চিনা কাটবে না। যারা আমার ছেলেকে কাছ থেকে গুলি করেছে তাদের বিচার চাই আমি। প্রত্যেকটা দিন হাসপাতালে আমাদের দুশ্চিনায় দিন কাটছে। আমার ছেলে তবু বেঁচে আছে কিন্তু এই আন্দোলনে অনেক মায়ের বুক খালি হয়েছে, অনেকের পা কাটা পড়েছে। তাদের দিকে তাকালে ছেলের কথা মনে পড়ে।’
এদিকে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে আহতদের তদারকি করছে বিভিন্ন কলেজের শিক্ষার্থীরা। পঙ্গু হাসপাতালের প্রবেশপথেই তাদের একটি ডেস্ক আছে। সেখানে মো. আসিফ নামের এক সেচ্ছাসেবক দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে আহত ৯৪ জন এখন হাসপাতালে ভর্তি আছেন। চিকিৎসা শেষে প্রতিদিন কয়েকজন হাসপাতাল ছাড়ছেন। আর যারা ভর্তি আছেন তাদের হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ও সমাজসেবা থেকে ওষুধ সরবরাহ করা হচ্ছে। তার বাইরে কিছু লাগলে আমরা সাপোর্ট দিচ্ছি।’
তানভীরের মৃত্যু কেড়ে নিলো পরিবারের স্বপ্ন
কমলায় ধরাশায়ী ট্রাম্প?
এক বছরে পেশা ছেড়েছেন ২ লাখ ৩০ হাজার কৃষক 