ডাক্তারের ভুল চিকিৎসায় চোখের আলো হারালেন মঞ্জুরুল

আপডেট : ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৪, ০৪:০৮ পিএম

মঞ্জুরুল হক (২৮)। অভাবের সংসারে পড়াশোনা করতে না পেরে ছোটবেলায় শেখেন ইলেকট্রিক মিস্ত্রির কাজ। ২০০৮ সাল থেকে রেফ্রিজারেটরের মেকানিক হিসেবে কাজ করেই পরিবারের ঘানি টানছেন তিনি। 

সাত ভাই-বোনের মাঝে মঞ্জুরুল তৃতীয়। তার বড় দুই বোন। ফলে পরিবারের বড় ছেলে হিসেবে চার বোনের বিয়েও তিনি দিয়েছেন। নিজেও করেছেন বিয়ে। বাবা-মা, স্ত্রী ও তিন মেয়ে নিয়ে বেশ সুখেই চলছিল সংসার। কিন্তু সেই সুখের সংসার তছনছ করে দেওয়ার অভিযোগ ওঠেছে চিকিৎসকের বিরুদ্ধে। তাদের দাবি চিকিৎসকরে ভুল চিকিৎসায় নিভে গেছে মঞ্জুরুলের চোখের আলো। 

বৃহস্পতিবার (২৬ সেপ্টেম্বর) সকালে একটি ব্যাগে অনেকগুলো কাগজ নিয়ে ষাটোর্ধ্ব বাবা মো. নূরুল ইসলাম ছেলে মঞ্জুরুল হককে নিয়ে আসেন ঈশ্বরগঞ্জ উপজেলা প্রেসক্লাবে। কিছু বলার আগেই হাউমাউ করে কান্নায় ভেঙে পড়েন মঞ্জুরুল। 

কান্নাজড়িত কণ্ঠে মঞ্জুরুল হক বলেন, 'আমি এই চোখ নিয়ে আর কাজ করতে পারব না। আমার চোখ অন্ধ করে দিয়েছে। অন্ধ হয়ে বেঁচে থাকার চেয়ে আমাকে মেরে ফেললেও ভালো হতো বলেই ফের কান্নায় ভেঙে পড়েন মঞ্জুরুল।

মঞ্জুরুলের বাড়ি ময়মনসিংহের ঈশ্বরগঞ্জ উপজেলার বড়হিত ইউনিয়নের মধ্যপালা গ্রামে।

মঞ্জুরুল ও তার পরিবার জানায়, গত ৭ সেপ্টেম্বর বাড়ি থেকে বাজারে যাওয়ার পথে মঞ্জুরুলের বাম চোখে বালির কণা পড়ে অসুস্থ হয়। পরদিন ৮ সেপ্টেম্বর পার্শ্ববর্তী গৌরিপুর উপজেলার বোকাইনগর ডা. মুকতাদির চক্ষু হাসপাতালে চিকিৎসার জন্য যান তিনি। হাসপাতলের মেডিকেল অফিসার ডা. মারুফ ওয়াহিদ তার সহযোগিকে দিয়ে মঞ্জুরুলের বাম চোখে সুইঁ দিয়ে দুটি ছিদ্র করে ফেলে। 

এ সময় মঞ্জুরুলের চিৎকারে লোকজন জড়ো হলে ডাক্তাররা বলাবলি করে চোখটি ছিদ্র হয়ে গেছে। তখন তড়িঘড়ি করে তার চোখে ব্যান্ডেজ লাগিয়ে বিদায় করে দেয় চিকিৎসকরা। বাড়িতে আসার পর মঞ্জুরুলের চোখে শুরু হয় তীব্র ব্যাথা। পরদিন ফের সেই ডাক্তারের কাছে গেলে ব্যবস্থাপত্রে ওষুধ পরিবর্তন করে দেয়। কিন্তু এতেও ব্যাথা কমেনি। পরে গত ১৪ সেপ্টেম্বর তৃতীয় দফায় ডা. মুকতাদিরকে বিষয়টি অবহিত করেন মঞ্জুরুলের বাবা। 

তিনি বলেন, মঞ্জুরুলের চোখ নষ্ট হয়ে গেছে। চোখটি উঠিয়ে ফেলতে হবে। তা না হলে ডান চোখও নষ্ট হয়ে যাবে। চিকিৎসকের এমন কথা শুনে মঞ্জরুল ও তার বাবা চিন্তিত হয়ে পড়েন। পরে নিরুপায় হয়ে মঞ্জুরুল বাংলাদেশ চক্ষু হাসপাতাল এন্ড ইনস্টিটিউটের অ্যাসোসিয়েট প্রফেসর ও কর্নিয়া কনসালটেন্ট ডা. মো. আমিরুজ্জামানের শরণাপন্ন হন। 

তিনি বলেন, আমার চোখটি ফুটো করে ফেলায় অপারেশন করতে হবে, হয়তো ভাগ্য ভালো হলে চোখের দৃষ্টি ফিরে আসতে পারে। পরে ওই চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী  গত ১৯ সেপ্টেম্বর চোখের অপারেশন করানো হয়। কিন্তু এখনও মঞ্জুরুলের চোখের দৃষ্টি ফিরে আসেনি।

মঞ্জুরুলের বাবা নূরুল ইসলাম বলেন, 'আমার সুস্থ ছেলেটাকে সারা জীবনের জন্য অন্ধ বানিয়ে দিয়েছে। আমার ছেলের মতো আর কোনো বাবা-মায়ের সন্তানের যেন এমন না হয়। এর বিচার চাইতে ঈশ্বরগঞ্জ থানা পুলিশের কাছেও গিয়েছিলাম তারা বলেছেন, এইটা আমাদের কাজ না। এখন কোথায় গেলে বিচার পাব। আমি ঘটনার সুষ্ঠু বিচার চাই।

এ বিষয়ে ডা. মুকতাদির চক্ষু হাসপাতালের চীফ কনসালটেন্ট অধ্যাপক ডা. এ কে এম এ মুকতাদির মোবাইলে জানান, 'মঞ্জুরুলের চোখে লোহার কণা পড়েছিল। আমার বড় ছেলে হাসপাতালের মেডিকেল অফিসার মারুফ ওয়াহিদ তার চিকিৎসা করেন। ৮ সেপ্টেম্বর মঞ্জুরুলের চোখ দেখে ওষুধ দিয়ে দেওয়া হয়। দুইদিন পর তাকে সাক্ষাৎ করতে বলে দেওয়া হয়। কিন্তু রোগী আসে ৫ দিন পর অর্থাৎ ১৪ সেপ্টেম্বর।  ৫ দিন দেরিতে আসায় রোগীর চোখে ভাইরাস ছড়িয়ে পড়ে। পরে আমি তাকে উন্নত চিকিৎসার কর্নিয়া কনসালটেন্ট ডা. মো. আমিরুজ্জামানের কাছে রেফার্ড করি। ডাক্তার কখনওই চায় না রোগীর চোখ নষ্ট করতে। রোগী সময়মত না আসার ফলে এমনটি হয়েছে।

তবে ভোক্তভোগী মঞ্জুরুল বলেন, '৮ সেপ্টেম্বর আমাকে ব্যান্ডেজ করে বাড়িতে পাঠিয়ে দেওয়ার পর ২১ সেপ্টেম্বর পরবর্তী সাক্ষাতের জন্য বলেন ডাক্তার। দুইদিন পর সাক্ষাতের বিষয়টি সম্পূর্ণ মিথ্যা।

এ প্রসঙ্গে অভিযুক্ত চিকিৎসক ডা. মারুফ ওয়াহিদের সাথে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি। তবে ডা. মুকতাদির চক্ষু হাসপাতালের ক্যাশিয়ার আলম খান মোবাইলে বলেন, 'মারুফ স্যার বিশেষ কাজে মালয়েশিয়া গিয়েছেন। আগামী মাসের ৪ তারিখ দেশে ফেরার কথা রয়েছে।’

এ বিষয়ে মঞ্জুরুল হক ময়মনসিংহ জেলা সিভিল সার্জন কর্মকর্তার কাছে অভিযোগ দিয়েছেন। অভিযোগপত্র নিয়ে ঘুরে এসেছেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও পুলিশের কাছ থেকেও। 

ঈশ্বরগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. ওবায়দুর রহমান বলেন, 'হাসপাতলটি যেহেতু গৌরিপুরের অধীনে সেক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট থানা পুলিশ বিষয়টি দেখবে। আমি গৌরিপুর থানার ওসিকে বলে দিব।

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সারমিনা সাত্তার বলেন, 'মঞ্জুরুল তার বাবাকে নিয়ে গতকাল বুধবার আমার অফিসে এসেছিলেন অভিযোগ দিতে। বিষয়টি আসলে খুবই দুঃখজনক। আমি মর্মাহত হয়েছি। হাসপাতালটি গৌরিপুর উপজেলায় হওয়ায় আমি ভোক্তভোগীকে গৌরিপুরের ইউএনও বরাবর অভিযোগ দিতে পরামর্শ দিয়েছি। পাশাপাশি গৌরিপুরের ইউএনওকে বিষয়টি গুরুত্বসহকারে দেখার জন্য আমি ফোনে বলে দিয়েছি।

এ প্রসঙ্গে ময়মনসিংহ সিভিল সার্জন ডা. মোহাম্মদ নজরুল ইসলাম বলেন, 'আমি এ বিষয়ে একটি অভিযোগ পেয়েছি। একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হবে। তদন্ত সাপেক্ষে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে’।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত