আওয়ামী লীগ সরকারের চার মেয়াদে সম্পদে ফুলেফেঁপে ওঠেন দলটির বহু সংসদ সদস্য ও মন্ত্রী। শুধু তাই নয়, তাদের এপিএসরাও কোটি কোটি টাকার মালিক হয়েছেন। কিনেছেন দামি গাড়ি, গড়েছেন বাড়ি। গত ১৫ বছরে মন্ত্রী-এমপির নাম ভাঙিয়ে ক্ষমতার দাপট, টেন্ডার, কমিশন ও তদবির-বাণিজ্য এবং চাকরিতে নিয়োগ, পদোন্নতি ও বদলির কারবার করে বিত্তশালী হয়েছেন এপিএসরা। ২০০৮ সালের আগে এসব এপিএস ও তাদের পরিবারের অর্থনৈতিক অবস্থা করুণ থাকলেও, ক্ষমতার পরশ পাথরের ছোঁয়ায় সেই চিত্র বদলেছে দ্রুতই।
এ বদলে যাওয়াদের একজন সাবেক দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ প্রতিমন্ত্রী ডা. এনামুর রহমানের এপিএস শামীম আহমেদ। এপিএস পদে নিয়োগের আগে টিউশনি করে জীবন চালাতেন। অথচ এখন তিনি প্রায় ২০০ কোটি টাকার মালিক। তার নিজের ব্যবসা প্রতিষ্ঠান হয়েছে, রাজধানীর বুকে রয়েছে বাড়ি, চড়েন দামি গাড়িতে। তার মালিকানায় রয়েছে অ্যাগ্রো পার্ক ও আরও সাতটি প্রতিষ্ঠান। নিজ এলাকা ময়মনসিংহের ত্রিশালের রানীগঞ্জ-পোড়াবাড়ী এলাকায় একাধিক গরু ও মাছের খামার গড়ে তুলেছেন। রানীগঞ্জে শতবিঘার ওপর করেছেন মাছের খামার। পোড়াবাড়ী এলাকায় প্রায় শতবিঘা জমির ওপর গড়ে তুলেছেন বেলা নামে একটি নার্সিং ইনস্টিটিউট। ত্রিশালের বিভিন্ন ইউনিয়নে শামীম ও তার পরিবারের সদস্যদের নামে ১২০ বিঘা জমি রয়েছে। সাভারের থানা রোড এলাকার একটি ভবনে তার রয়েছে দুটি ফ্ল্যাট। রাজধানীর গুলশানে নাভানা টাওয়ারে রয়েছে অফিস।
অভিযোগ রয়েছে, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের যেকোনো প্রকল্প পেতে ধরনা দিতে হতো শামীমের কাছে। কাজ পাওয়ার আগেই নির্দিষ্ট হারে কমিশন নিতেন তিনি। পছন্দের ঠিকাদারদের কাজ পাইয়ে দিতে প্রকল্প পরিচালকদের নানাভাবে চাপ প্রয়োগ করতেন। এমনকি জেলা-উপজেলা ও ইউনিয়ন পর্যায়ে ত্রাণ বরাদ্দে কমিশন-বাণিজ্যের অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ে নিয়োগ দিয়ে তিনি মোটা অঙ্কের টাকা নিতেন।
মূলত মন্ত্রীর কাছে যাওয়া সাধারণ মানুষের সুবিধা-অসুবিধার কথা শোনা এবং প্রয়োজনে সেগুলোর সমাধান করা এপিএসদের কাজ। এ কাজ করতে গিয়েই অনিয়মে জড়িয়ে পড়েন তারা। কখনো মন্ত্রীর জ্ঞাতসারে, কখনো অজ্ঞাতসারে সম্পদ আহরণ করে ফুলেফেঁপে ওঠেন। এপিএসরা গোটাকয়েক সুবিধাভোগী নিয়ে গড়ে তোলেন সিন্ডিকেট। এই সিন্ডিকেট দিয়েই পরিচালিত হয় খাল-বিল-নদীর ইজারা। ডিও লেটার, সুপারিশ-বাণিজ্য, নিয়োগ-বদলিসহ ক্ষমতাকেন্দ্রিক লুণ্ঠন প্রক্রিয়া নিয়ন্ত্রণ করেন তারা। স্কুল-কলেজের ম্যানেজিং কমিটির সদস্য হওয়া, টেন্ডার, টিআর, কাবিখা, সামাজিক নিরাপত্তার বয়স্ক ভাতাসহ সব কর্মসূচি এপিএসদের মাধ্যমেই হয়।
দলীয় ন্যায্য অধিকার অর্জনেও দলের দুর্দিনের কারিগরদের অসহায়ের মতো এসব এপিএসকে তোয়াজ করতে হয়। মন্ত্রীরা যখন এলাকায় যান তখন এপিএসের অনুমতি ছাড়া নেতার সঙ্গে দেখা করতে পারেন না কর্মীরা। মন্ত্রীরাও এপিএসদের এই নজরদারি ও নিয়ন্ত্রণকে সুমিষ্ট প্রলেপ হিসেবেই দেখেন। ক্ষমতার বাইরে থাকার সময় নির্যাতিত নেতাকর্মীদের খুব কমসংখ্যককেই এপিএস হতে দেখা যায়। এপিএস হন মূলত মন্ত্রীর নিকটাত্মীয় ও ঘনিষ্ঠরা। এই সুযোগে বখাটে, নানা জায়গায় ধান্দা করে বেড়ানো লোকটি এপিএস হয়ে যান। ঢুকে যান সুরক্ষিত পাওয়ার হাউজ সচিবালয়ে। সরকারি বেতন-ভাতা, অফিসকক্ষ ছাড়াও তার নিয়ন্ত্রণে থাকে গাড়ি। এসব ব্যবহার করে রাতারাতি বনে যান বাড়ি-গাড়ির মালিক। তাদের আয়ের উৎস থাকে অজানা। বেশিরভাগ দুর্নীতি, অনিয়ম ও আর্থিক কেলেঙ্কারিতে জড়িত থাকেন এপিএসরা। আর ক্ষমতার পটপরিবর্তনে জেলে যান মন্ত্রীরা। পালাবদল না ঘটলেও এপিএসদের কার্যক্রমে জনপ্রতিনিধিদের প্রতি তৃণমূলে অসন্তোষ সৃষ্টি হয়। তারা জনগণের মধ্যে বিতর্কিত হয়ে পড়েন। আর এপিএসরা থাকেন বহাল তবিয়তে।
এপিএস নিয়োগ হয় মন্ত্রীর ইচ্ছায়। তিনি সরকারি অফিসার হতে পারেন বা সরকারি চাকরির বাইরের কেউ হতে পারেন। নির্ধারিত লেখাপড়া জানা যে কাউকে মন্ত্রী এপিএস নিয়োগ দিতে পারেন। তার চাকরির স্থায়িত্বও মন্ত্রীর ইচ্ছার ওপর নির্ভর করে। এ সুযোগ থাকার পরও খুব কম মন্ত্রীই সরকারি চাকরিজীবীদের এপিএস হিসেবে নিয়োগ দেন। তারা তাদের পরিচিতজনদের মধ্যেই এ নিয়োগ দেন।
