সাড়ে ৬শ কোটি টাকা ব্যয়ে ৪৫ ফুট প্রশস্ত মেহেরপুর-কুষ্টিয়া আঞ্চলিক মহাসড়ক নির্মাণ কাজ করছে সড়ক ও জনপথ বিভাগ। কাজ চলমান এই রাস্তা বৃষ্টিতে কয়েক জায়গায় পিচসহ ধ্বসে পড়ছে। কোথাও কোথাও দেবে যাচ্ছে এখনই। নির্মাণকালে রাস্তার দুইপাশ রক্ষায় গার্ডার ওয়াল সঠিকভাবে নির্মাণ হচ্ছে না বলেও অভিযোগ ওঠেছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, নিম্নমানের সামগ্রী ব্যবহার এবং নির্মাণ পদ্ধতি মানা হচ্ছে না রাস্তা তৈরিতে। তাই কাজ শেষ হওয়ায় আগেই ধ্বসে যাচ্ছে সড়ক। অথচ- প্রতি কিলোমিটার রাস্তা নির্মাণে ব্যয় হচ্ছে সাড়ে ১১ কোটি টাকা।
সরেজমিন গিয়ে দেখা যায়, মেহেরপুর-খলিষাকুন্ড অংশের কাজীপুর, বামুন্দী, গাংনী, মোহাম্মদপুর, বাউটসহ বিভিন্ন অংশের কোথাও রাস্তা দেবে গেছে আবার কোথাও রাস্তার দুইপাড়ের অংশ ধ্বসে যাচ্ছে। কোথাও কাজ চলছে ধীর গতিতে। আবার কোথাও চোখ ফাঁকি দিতে রাতেও কাজ করা হচ্ছে। এমনকি বৃষ্টিতেও চলছে পিচ ডালাইয়ের কাজ।
গাংনীর সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান জুলফিকার আলী ভুট্টো বলেন, রাস্তা নির্মাণে নিন্মমানের পিচ, খোয়া ও পাথর ব্যাবহার করা হচ্ছে। অনুসরণ করা হচ্ছে না নির্মাণপদ্ধতি। পুরোনো রাস্তার পাথর এবং খোয়া পুনরায় ব্যাবহার করা হচ্ছে। অনেক দূর থেকে পিচ মিশ্রিত বিটুমিন গাড়িযোগে এনে রাস্তায় ঢালা হচ্ছে। ফলে সঠিক তাপমাত্রায় বিটুমিন রোলিং করা হচ্ছে না। এ কারণে নির্মাণ শেষ হওয়ার আগেই খসে কিংবা ধ্বসে পড়ছে রাস্তা। দুদিনের কয়েক ঘণ্টার বৃষ্টিতে মেহেরপুর-খলিষাকুন্ড সড়ক অংশের ২৫-৩০টি স্থানে রাস্তা ধ্বসে গেছে। কুষ্টিয়া অংশের অবস্থাও একই রকম। স্থানীয়রা প্রশাসনের কাছে লিখিত অভিযোগসহ মানববন্ধন করেও কাজ হচ্ছে না। কারণ ঠিকাদার সাবেক জনপ্রশাসনমন্ত্রী ফরহাদ হোসেনের চাচা হন।
মেহেরপুর-কুষ্টিয়া আঞ্চলিক মহাসড়কের বাসিন্দা সাইফুল আলম বলেন, ঠিকাদার কাজে দরপত্র অনুসরণ করছেন না। নিজের ইচ্ছেতেই কাজ করেন। তার কাজের মান নিয়ে মেহেরপুর-চুয়াডাঙ্গা, মুজিবনগর-দর্শনা সড়কসহ কুস্টিয়া মেডিকেল কলেজের ঢালাই ছাদ ধ্বসে যাওয়ার মতো অনেক অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। তিনি গণপূর্তের কালো তালিকাভুক্ত ঠিকাদার। তারপরও প্রভাব খাটিয়ে গত ১৫ বছরে আড়াই হাজার কোটি টাকার কাজ করেছেন।
স্থানীয় ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার সামিউল বাসার বলেন, ঠিকাদারের দুর্নীতির কারণে শত কোটির কাজ পানিতে ধুয়ে যাচ্ছে। সঠিকভাবে গার্ডার ওয়াল বা সড়ক শাসন ব্যাবস্থা করা হচ্ছে না। সড়কটি নির্মাণে সওজ বিভাগ রহস্যজনক কারণে অনেকটাই নীরব রয়েছেন।
মেহেরপুর সড়ক ও জনপথ বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, এই রাস্তা কাজ শুরু হয় ২০২২ সালের ২০ সেপ্টেম্বর মাস থেকে। আর শেষ হওয়ার কথা ২৫ সালের জুনে।
মেহেরপুর-কুষ্টিয়া ৫৭ কিলোমিটার। এরমধ্যে মেহেরপুর-খলিষাকুন্ড অংশ ৩০ কি.মি.। মেহেরপুর অংশে ব্যয় ২৭২ কোটি। চার লেনের জন্য অতিরিক্ত ৭৩ কোটি মোট ৩৪৫ কোটি টাকা বরাদ্দ।
এছাড়া মেহেরপুর-কুষ্টিয়া সড়কের বাকি (কুষ্টিয়া অংশ) ২৭ কিলোমিটারের ব্যয় ধরা হয়েছে ৩০৫ কোটি টাকা।
সড়ক ও জনপথ বিভাগ জানায়, ৩টি প্যাকেজে শুরু হয়েছে কাজ। প্রথম এবং দ্বিতীয় ধাপের কাজ ৮০ ভাগ শেষ। তৃতীয় ধাপের চার লেনের ৮টি অংশ ৬৪ ফুট চওড়া হবে। সেই কাজ এখনও শুরু হয়নি। রাস্তা রক্ষায় গার্ডার নির্মাণে ২০ কোটি টাকা ধরা আছে। সেই হিসেবে ১ কিলোমিটার দীর্ঘ রাস্তা নির্মাণে খরচ পড়ছে সাড়ে ১১ কোটি টাকা।
সওজের সূত্রটি আরও জানায়, ২১-২২ অর্থবছরে শুধুমাত্র গাংনী কাজীপুর অংশের এক কিলোমিটার রাস্তার ধস রক্ষায় ২০ কোটি টাকা ব্যয়ে আরসিসি সড়ক করা হয়েছিল। এখনও রাস্তার ঝুঁকিপূর্ণ অংশে সঠিকভাবে গার্ডার বা রির্টানিং ওয়াল নির্মাণ হচ্ছে না। এতে ভবিষ্যতে রাস্তার দুইপাশ ধসে পড়ার আশঙ্কা আছে।
গাংনী ত্রিমোনি বাজারের মিষ্টি ব্যবসায়ী আমিনুল ইসলাম মেহেরপুর সওজের প্রকৌশলী মিজানুর রহমানের বিরুদ্ধে অভিযোগ এনে বলেন, সওজ এবং ঠিকাদার মিলে রাস্তা নির্মাণে দুর্নীতি করছেন। এছাড়া সওজ জমির মালিক না হওয়া সত্ত্বেও রাস্তার পাশের ব্যবসা প্রতিষ্ঠান এবং বাড়ি মালিকদের উচ্ছেদের হুমকি দিয়ে ঘুষ নিচ্ছেন।
তিনি এ কারণে তার প্রতিষ্ঠান রক্ষায় সওজের হুমকির বিরুদ্ধে আদালত থেকে নিষেধাজ্ঞা আদেশ নিয়ে ব্যবসা পরিচালনা করছেন। তারপরও তার প্রতিষ্ঠান উচ্ছেদের হুমকি অব্যাহত আছে বলে জানান।
মেহেরপুর সড়ক ও জনপদ বিভাগের উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী মিজানুর রহমান বলেন, সংশ্লিষ্ট ঠিকাদার ও ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে নিয়ে রাস্তা পরিদর্শনে গিয়েছিলাম। বৃষ্টির কারণে কয়েক জায়গায় ফটল ও গর্তের সৃষ্টি হয়েছে। সেগুলো ঠিকাদার মেরামত করে দেবে। কাজ এখনও চলামান। ফলে, এখনই দুর্নীতির অভিযোগ উত্থাপন অমূলক। তাছাড়া কারও জমি বা প্রতিষ্ঠান উচ্ছেদের হুমকির অভিযোগ সত্য নয়।
অভিযুক্ত ঠিকাদার জহিরুল ইসলাম বলেন, কাজ দরপত্র মেনেই চলমান আছে। সঠিক সময়ের মধ্যে কাজ শেষ করা হবে। বড় কাছে ছোটখাটো ত্রুটি থাকবেই। সেগুলো মেরামতও করা হচ্ছে। পুরানো খোয়া ও পাথর সওজের অনুমতি নিয়ে ব্যবহার করা হচ্ছে। সঠিক সময়ে কাজ শেষ করার স্বার্থে দিনরাত্রি কাজ করা হয়।
দোহারে ভোটার হতে এসে দুই রোহিঙ্গাসহ আটক ৩
যবিপ্রবিতে অস্তিত্বহীন লিফট অপারেটর, বেতন পাচ্ছেন শিক্ষক
প্রকৃতির ডাকে বসেছিলেন বৃদ্ধ, ঢিলের আঘাতে মৃত্যু