যবিপ্রবি’র হলে ডাকাতি, ঘটনার সম্পর্কে যা জানা গেল

  • নেপথ্যে গ্রুপ পরিবর্তন
  • ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ৪১ লাখ টাকা
  • গুরুতর হতাহত ৩০-৪০ জন
  • ক্ষতিপূরণ পায়নি ভুক্তভুগীরা
আপডেট : ০৪ অক্টোবর ২০২৪, ০৬:৪০ পিএম

যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (যবিপ্রবি) ইতিহাসে অন্যতম কালো অধ্যায়ের নাম ‘হল ডাকাতি’। ২০১৭ সালের ৫ অক্টোবর তৎকালীন যবিপ্রবি শাখা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক শামীম হাসানের নেতৃত্বে হয় ন্যাকারজনক এ ঘটনা। এ সময় গুরুতর আহত হন শাখা ছাত্রলীগের সভাপতি সুব্রত বিশ্বাস সহ ৩০-৪০ জন সাধারণ শিক্ষার্থী, ঘটনায় লুট ও ক্ষতিগ্রস্ত সম্পদের আর্থিক মূল্য ছিল প্রায় ৪১ লক্ষ টাকা। আবাসিক হলে আক্রমণ ও ডাকাতির অভিযোগে বহিষ্কার করা হয় ৭ শিক্ষার্থীকে, পরবর্তীতে তাদের ও অজ্ঞাত ৩০/৪০ জনের নামে মামলা করে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। উক্ত ঘটনায় বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে ভুক্তভুগী ও আহত শিক্ষার্থীদের আর্থিক ক্ষতিপূরণ প্রদান করা হলেও, সহযোগিতার টাকা লুটপাটের অভিযোগ আছে শাখা ছাত্রলীগ সভাপতি সুব্রত বিশ্বাসের বিরুদ্ধে।

 জানা যায়, তৎকালীন বিশ্ববিদ্যালয়ের শাখা ছাত্রলীগের সভাপতি সুব্রত বিশ্বাস ও সাধারণ সম্পাদক শামীম হাসানের কেন্দ্রীয় ও স্থানীয় গ্রুপ (লবিং) পরিবর্তনকে কেন্দ্র করে এ ঘটনার সূত্রপাত। কমিটির শুরু থেকেই সুব্রত ও শামীম যশোর জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক শাহীন চাকলাদার ও কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি বদিউজ্জামান সোহাগ ও সাইফুর রহমানের গ্রুপের অনুসারী ছিলেন। এমনকি ২০১৪ সালে যবিপ্রবি ছাত্র নাইমুল ইসলাম রিয়াদ হত্যা মামলার আসামি হিসেবে দুজন একসঙ্গে জেলও খেটেছেন। ২০১৭ সালের প্রথম দিকে শামীম হাসান কেন্দ্রীয় ও স্থানীয় লবিং পরিবর্তন করে এমপি কাজী  নাবিল ও  কেন্দ্রীয়  সাবেক ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক জাকির হোসেনের অনুসারী হন। ক্ষমতা ও আধিপত্যকে বিস্তারকে কেন্দ্র করে দুপক্ষের মধ্যে সৃষ্টি হয় দ্বন্দ্ব। ওই বছরে মে মাসে ক্যাম্পাস থেকে শামীম গ্রুপকে বিতাড়িত করে সুব্রত বিশ্বাস। যার ফলশ্রুতিতে  ক্যাম্পাসে আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে যবিপ্রবিতে ঘটে হল ডাকাতির মত ন্যাকারজনক এ ঘটনা।

উক্ত ঘটনায় প্রত্যক্ষদর্শী ও নিরাপত্তাকর্মীদের দেওয়া তথ্য মতে, ঘটনার দিন রাত অনুমানিক ১১টার দিকে যবিপ্রবির প্রধান ফটকের সামনে ৩/৪ টি কালো মাইক্রোবাস এসে দাঁড়ায়, এরপরে কিছু কালো মুখোশধারী লোক গাড়ি থেকে নেমে দুই আনসার সদস্যকে মারধর করে তাদের মোবাইল ফোন ছিনিয়ে নেয়। তার কিছুক্ষণের মধ্যে বোমা ও ককটেল বিস্ফোরণের শব্দে কেঁপে উঠে যবিপ্রবির শহীদ মসিয়ূর রহমান (শ.ম.র) হল। তৎকালীন শাখা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক শামীম হাসান ও তার অনুসারী সহ প্রায় ৩০/৪০জন বহিরাগত সন্ত্রাসী মুখে মাস্ক ও কালো কাপড় বেঁধে  ছাত্র হলে প্রবেশ করে। প্রবেশ করেই তারা প্রথমে কয়েক রাউন্ড ফাঁকা গুলি চালায়, এ সময় তাদের অনেকের হাতে আগ্নেয়াস্ত্রসহ বিভিন্ন দেশীয় অস্ত্র ছিল।

ঐ রাতের ভয়াবহতা সম্পর্কে হলের আবাসিক শিক্ষার্থী মোহাম্মাদ ফিরোজ বলেন, গভীর রাতে আমি ও আমার রুমমেট হিমু হঠাৎ ককটেলসহ বোমা বিস্ফোরণের আওয়াজ শুনতে পাই, এরপরে হলে শোরগোল শুরু হলে আমরা আতঙ্কিত হয়ে নিচতলায়  ১২২ নং রুমে আশ্রয় নেই। গুলি ও বোমার আওয়াজের ভয়ে  আমরা বেডের নিচে শুয়ে পড়ি, পরে পরিস্থিতি শান্ত হলে আমরা বাইরে এসে শুনতে পাই আক্রমণকারী শামীম গ্রুপ নাকি বিভিন্ন রুম থেকে মোবাইল,ল্যাপটপ ও টাকা লুট করে নিয়ে গেছে। আমরা তৎক্ষণাৎ নিজের রুমে গিয়ে দেখি আমাদের লকার ভেঙ্গে দুইটি ল্যাপটপ, মোবাইল ফোন ও মানিব্যাগ থেকে নগদ টাকা নিয়ে গেছে। পরবর্তীতে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন উক্ত ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্তদের সহয়তা চেয়ে আবেদন করতে বলে, আমরা আবেদন করলেও আমাদের মত অনেকেই প্রশাসনের পক্ষ থেকে কোনো সহযোগিতা পায়নি।

এ বিষয়ে চতুর্থ তলার ভুক্তভুগী আরেকজন আবাসিক শিক্ষার্থী বলেন, ঐদিন রাতে প্রচুর ভাঙচুর, গুলি ও বোমা ফাটানো হয়েছিল, শামীম গ্রুপ সবচেয়ে বেশি তাণ্ডব চালিয়েছিল তৃতীয় ও পঞ্চম তলায়। আমাকে ও আমার রুমে থাকা এক জুনিয়রকে তারা শারিরীকভাবে অনেক নির্যাতন করে মোবাইল , ল্যাপটপ, কিছু টাকা নিয়ে গিয়েছিল। বাঁচার জন্য অনেকেই লুঙ্গি পরে খালি গায়ে দ্বিতীয় ও তৃতীয় তলা থেকে লাফ দিয়ে নিচে পড়েছিল, অনেকেই আবার হল থেকে পালিয়ে শিক্ষক ডরমেটরিতে আশ্রয় নিয়েছিল। আমরা প্রক্টরের কাছে বিভিন্ন মাধ্যমে সহযোগিতা চাইলেও তারা আমাদের সাহায্যের জন্য এগিয়ে আসেনি। পরবর্তীতে প্রশাসনের পক্ষ থেকে ছিনতাই করা জিনিসের ক্ষতিপূরণ দিতে চাইলেও আমরা কোনো ক্ষতিপূরণ পাইনি , ডাইনিংইয়ে ভিকটিমদের এক মাসের ফ্রি খাবার বরাদ্দ ছিল কিন্তু সেই টাকাটাও পরের ছাত্রলীগ সভাপতি সুব্রত ভাগ করে নিয়েছে।

ঘটনায় আহত এফএমবি বিভাগের আরেক শিক্ষার্থী বলেন, ঐ দিন সন্ত্রাসীরা আমাকে লোহার পাইপ দিয়ে অমানবিকভাবে পেটাতে থাকে, এতে আমার পায়ের হাড় সম্পূর্ণভাবে ভেঙে যায়। আর্থিক সাহায্যের জন্য আমি আবেদন করলেও প্রথমে আমি কোনো ক্ষতিপূরণ পায়নি, পরে আমার মা প্রক্টর ও প্রভোস্ট অফিসে একাধিকবার কথা বলে আবেদন করলে যৎসামান্য কিছু সাহায্য আমাকে করা হয়।

যবিপ্রবির হলে ডাকাতির বিষয়টি সম্পূর্ণভাবে অস্বীকার করে তৎকালীন সাধারণ সম্পাদক শামীম হাসান বলেন, ঐ সময়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে অবস্থান করার বিষয়ে তৎকালীন উপাচার্য মহোদয় ও প্রভোস্ট ইকবাল কবির স্যারকে আগে থেকেই অবগত ছিলেন। ঘটনার ১০-১২ দিন আগে আনোয়ার স্যারের সাথে কথা বলি ক্যাম্পাসে আসার বিষয়ে। স্যারের সম্মতিতে আমরা ক্যাম্পাসে এসেছিলাম, আমরা সবাই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ছিলাম এবং আবাসিক ছাত্র হিসেবে হলে সিটও ছিল। ঐদিন আনুমানিক রাত ৯:৩০ টার দিকে আমরা হলে প্রবেশ করি। এরপর গভীর রাতে ঝামেলা শুরু হওয়ার পর আনোয়ার স্যার আমাকে ফোন করে বলেছিলেন 'পুলিশের সাথে আমার কথা হয়েছে, আমি তোমাদের চলে যেতে বলছি,তোমরা চলে যাও। আমি ক্যাম্পাসে এসে প্রয়োজনে এসপি-ডিসি সবাইকে নিয়ে বসে তোমাদেরকে ক্যাম্পাসে আনবো।

এরপর প্রক্টর ও প্রভোস্ট বডি এসে আমাদের সাথে কথা বলে পুলিশ প্রটেকশনে নিরাপদে শহরে পৌঁছে দেয়। কিন্তু পরবর্তীতে সাবেক উপাচার্য ড. আনোয়ার হোসেন রাজনৈতিক পক্ষপাতদুষ্ট হয়ে সভাপতি গ্রুপকে শক্তিশালী করে তোলার জন্য আমাদের নামে মিথ্যা অভিযোগ ও মামলা দিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বহিষ্কার করেন।

মোবাইল ল্যাপটপ লুটের বিষয়ে তিনি বলেন, আমরা শিক্ষার্থীদের কোনো কিছুই লুট বা ছিনতাই করি নাই, আমরা যদি এমন কিছু করে থাকতাম তাহলে ওখানে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনসহ পুলিশ বাহিনী উপস্থিত ছিল, তারা নিশ্চয় আমাদের এমন কিছু করতে দিত না। আর কারও কোনো কিছু লুট বা ছিনতাই হলে তারা থানায় অভিযোগ জানাবে, আমার জানামতে আমাদের বিরুদ্ধে কেউ থানায় এমন অভিযোগ জানাই নাই।

এ বিষয়ে সাবেক শাখা ছাত্রলীগের সভাপতি সুব্রত বিশ্বাসের সাথে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি, তবে তার বিশ্বস্ত এক অনুসারী সূত্রে জানা যায়, তৎকালীন টেন্ডারের টাকার ভাগকে কেন্দ্র করে তারা দুই গ্রুপে বিভক্ত হয় এবং পরে স্থানীয় রাজনৈতিক এক নেতার সহযোগিতায় তারা শামীম গ্রুপকে ক্যাম্পাস ছাড়া করে। পরবর্তীতে ক্যাম্পাসে আধিপত্য বিস্তার ও ছাত্রহল নিজের নিয়ন্ত্রণে আনার জন্য শামীম গ্রুপ হলে এ আক্রমণ চালায়।

হলে আক্রমণ ও ক্ষতিপূরণের বিষয়ে তৎকালীন শ.ম.র হল প্রভোস্ট ইকবাল কবির জাহিদ বলেন, ঐ দিন আমি ঢাকায় ছিলাম, হলে শামীমদের উপস্থিতির বিষয়ে আমি অবগত ছিলাম না এবং শামীম গ্রুপের সাথে আমার কোনো যোগসূত্র নেই। ঘটনার পরে ক্ষতিগ্রস্থ আনুমানিক ৯০/৯৫ জনকে তাদের আবেদনের সাপেক্ষে মেডিকেল সার্টিফিকেট ও অন্যান্য কাগজ পত্র দেখে নিয়ম মেনেই সহায়তা করা হয়েছে।

এ বিষয়ে তৎকালীন প্রক্টর অধ্যাপক শেখ মিজানুর রহমান বলেন, ঘটনার রাতে আনুমানিক সাড়ে এগারোটার দিকে আমি জানতে পেরে কয়েকজন শিক্ষক ও নিরাপত্তাকর্মীদের সঙ্গে নিয়ে   ক্যাফেটেরিয়ার সামনে গিয়ে দেখি পুলিশের দুইজন এএসপিসহ আরো পুলিশ সদস্য সেখানে আগে থেকেই উপস্থিত। আমরা জানতে পারলাম ছাত্রলীগের সুব্রত গ্রুপ বের হয়ে গেছে এবং শামীম গ্রুপ হল দখলে নিয়েছে। ঐ সময় আমরা হলে যাওয়ার জন্য প্রস্তুতি নিলে তৎকালীন উপাচার্য আনোয়ার স্যার আমাকে ফোন করে পুলিশের সহয়তা ছাড়াই হলে প্রবেশ করতে বলেন। পেশাগত দায়িত্ব পালনে জীবনের ঝুঁকি নিয়েই তখন পুলিশ বাহিনীকে ছাড়া আমরা হলে প্রবেশ করেছিলাম। হলে প্রবেশের পর ছাত্রলীগের তৎকালীন সাধারণ সম্পাদক শামীমকে হল থেকে আমি চলে যেতে বললে, ঘণ্টা দু'য়েক সময় নিয়ে হল থেকে বেরিয়ে যায়। ঘটনাস্থলে তারা যেই গাড়িগুলো নিয়ে আসছিল তার ড্রাইভারদের পাওয়া যাচ্ছিলো না, তখন পুলিশ সদস্যের মধ্যে যারা ড্রাইভিং জানে তাদের সহযোগিতায় ওরা ক্যাম্পাস ত্যাগ করে। পুলিশের উপস্থিতিতে এবং বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের সম্মতিতে এই কাজটি করা হয়েছিল। এই সকল নির্দেশনাই তৎকালীন উপাচার্য স্যারের কাছ থেকেই এসেছিল। আমি পরে এই বিষয়টা শুনেছি যে, তারা যাওয়ার সময় নাকি বেশ কিছু ল্যাপটপ, মোবাইলসহ মূল্যবান জিনিস নিয়ে চলে যায়। বিষয়টা আমি নিজ চোখে দেখিনি, আমার কাছে তখন এরকম কোনো তথ্যও ছিল না। যদি থাকতো আমি অবশ্যই বাঁধা দিতাম।

সার্বিক বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো: আনোয়ার হোসেন বলেন, ছাত্রলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক শামীমের সাথে ঘটনার দিন আমার সাথে যোগাযোগের বিষয়টি সম্পূর্ণ মিথ্যা। ওই দিন আমি ছিলাম বগুড়ায়, ঐ রাতে আমার সাথে প্রথম কথা হয় যশোরের তৎকালীন এএসপি রব্বানীর। তারা আমাকে বলেছিল যে আমি যেন তাদেরকে হলে প্রবেশ করার অনুমতি দেই, যাতে তারা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। কিন্তু আমি তো পুলিশকে একা ছাত্রহলে ঢুকতে দিতে পারি না, তাই আমি প্রক্টরকে বলি তাদের সাথে হলে ঢুকতে। কিন্তু তখন প্রক্টর এই বিষয়ে তাদেরকে কোনো সাহায্য করেনি এবং সে ঘটনাস্থলে যেতে রাজি হননি। তাকে আমি পুলিশ ছাড়া একা হলে যেতে বলেছি এই কথাটি মিথ্যা। কারণ হলের সমস্যার সমাধান করবে হল প্রভোস্ট সেখানে প্রক্টর একা কেন হলে যাবে। আমি কখনও তাকে একা যেতে বলিনি বরং আমি তাকে বলেছিলাম সে যেন পুলিশের সাথে হল প্রভোস্টকে সাথে নিয়ে হলে যায় তাও সেটা এএসপি রব্বানীর ফোনে। ঘটনার পরবর্তীতে একমাস আমি ছাত্রদের ফ্রি খাওয়ার ব্যবস্থা করে দিয়েছিলাম ও আর্থিক ক্ষতিপূরণও দিয়েছিলাম। তবে কত টাকা অনুদান দেওয়া হয়েছিল সেইটা আমার ঠিক মনে নেই। তবে সে হিসাব ও লিস্ট প্রভোস্ট ও প্রক্টর অফিসে রয়েছে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত