ওষুধের মাইগ্রেশন!

আপডেট : ১৭ অক্টোবর ২০২৪, ১২:৩২ এএম

ওষুধের গায়েই লেখা ‘সরকারি সম্পদ, ক্রয় বিক্রয় দ-নীয় অপরাধ’ অথচ সেই ওষুধ দেদার বিক্রি হচ্ছে। সরকারি হাসপাতালের বাইরে প্রাইভেট ফার্মেসি থেকে বেশি দামে কিনতে হচ্ছে রোগীদের। এমন চিত্র দেখা যাচ্ছে শেরপুর জেলায়। দেশ রূপান্তরের প্রতিবেদনে জানা গেছে, বন্যাকবলিত শেরপুরে বেড়েছে ডায়রিয়ার প্রকোপ। চাহিদা বেড়েছে ডায়রিয়ার ওষুধ, ইনজেকশন ও স্যালাইনের। জেলার নকলা উপজেলায় এসব চিকিৎসা সামগ্রীর চাহিদা বেড়েছে সবচেয়ে বেশি। কিন্তু নকলা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সেই নেই ডায়রিয়া রোগের ভিসারালজিন ইনজেকশন, আইভি স্যালাইন, বমির ইনজেকশন এবং মেট্রোনিডাজল ইনজেকশনের মতো গুরুত্বপূর্ণ ওষুধ। তবে টাকার বিনিময়ে হাসপাতালটির সামনের একাধিক ফার্মেসিতে সরকারি সিলযুক্ত ওষুধ বিক্রি হচ্ছে।

সমস্যাটি কেবল শেরপুরেই সীমাবদ্ধ নয়। বছরের পর বছর ধরে দেশের প্রায় সব অঞ্চলে ওষুধ নিয়ে এই অবৈধ কার্যকলাপ চলছে। সংবাদমাধ্যম ঘেঁটে দেখা যায়, এ নিয়ে শয়ে শয়ে সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে। কখনো কখনো কর্র্তৃপক্ষ এসবের সঙ্গে যুক্ত কিছু অপরাধীকে পাকড়াও করেছে, জরিমানা করেছে। তবে সেসব ব্যবস্থা ছিল অপ্রতুল। এই ওষুধ বিক্রি চক্রের বড় ক্রীড়নকদের কখনোই ধরা হয়নি আর এই কার্যকলাপ চলেছে অবাধে। ওষুধ প্রশাসনের কোনো তদারকি না থাকায় দিন দিন সরকারি ওষুধ বিক্রির প্রবণতা বাড়ছেই বলে অভিযোগ আছে। ফলে ভোগান্তি হচ্ছে সাধারণ মানুষের। তাদের অসহায়ত্বের সুযোগ নিয়ে অবৈধভাবে উপার্জন করছে হাসপাতালের সঙ্গে জড়িত একশ্রেণির অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারী। বন্যার অব্যবহিত পরে যখন ওষুধের প্রয়োজন সবচেয়ে বেশি সে সময়েই লোকজনকে রীতিমতো জিম্মি করে এসব কার্যকলাপ চলছে। গত সোমবার দুপুরে হাসপাতালে রোগীর স্বজনরা দেশ রূপান্তরকে বলেন, আমরা বন্যাকবলিত ছিলাম। পানি কমার সঙ্গে সঙ্গেই শিশু এবং বয়স্করা ডায়রিয়াসহ বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হচ্ছে। তাদের হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। কিন্তু হাসপাতালে দু-একটি ওষুধ ছাড়া কোনো ওষুধ দেওয়া হচ্ছে না। প্রায় সব ওষুধই বাইরে থেকে কিনতে হচ্ছে। আবার সেই ওষুধের গায়ে লেখা এটা সরকারি সম্পদ ক্রয় বিক্রয় দণ্ডনীয় অপরাধ। এসেনসিয়াল ড্রাগস কোম্পানির ওষুধ দেখিয়ে রোগীর স্বজনরা বলেন, সরকারি ওষুধ সরকারি হাসপাতালে পাওয়া যাচ্ছে না, কিন্তু দোকানে ঠিকই পাওয়া যাচ্ছে। আমরা  হাসপাতালের সামনের ফার্মেসি থেকে এই ওষুধগুলো কিনে এনেছি।

নকলা হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল অফিসার মাহমুদুল হাসান অবশ্য হাসপাতালের ওষুধ বাইরে পাচারের অভিযোগ পুরোপুরি স্বীকার করেননি। তিনি বলেন, ‘আমাদের হাসপাতাল থেকে ওষুধ বাইরে চলে গেছে এটা আগেই বলা যাবে না। সরকারি ওষুধ বাইরে বিক্রির কোনো সুযোগ নেই। তারপরও খোঁজ নিয়ে দেখছি। আমাদের হাসপাতালের কোনো কর্মকর্তা যদি জড়িত থাকেন, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’ শেরপুর জেলা সিভিল সার্জন ডা. জসিম উদ্দিন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সরকারি ওষুধ বিক্রি গুরুতর অপরাধ। যে ফার্মেসিগুলো সরকারি ওষুধ বিক্রি করছে তাদের আইনের আওতায় আনা হবে। আমাদের কোনো কর্মকর্তা যদি এর সঙ্গে জড়িত থাকেন তাহলে তাদের আইনের আওতায় নিয়ে আসা হবে।’

শেরপুর ওষুধ প্রশাসনের সহকারী পরিচালক গৌরি রানী বসাক বলেন, ‘সরকারি ওষুধ ফার্মেসিতে বিক্রি আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ। আমি শেরপুর জেলা প্রশাসন এবং উপজেলা প্রশাসনের সঙ্গে কথা বলে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করব। এই অপরাধে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’ রাষ্ট্রের অন্যতম দায়িত্ব হচ্ছে নাগরিকদের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা। দরিদ্র মানুষ যাতে জীবনরক্ষাকারী এবং ন্যূনতম ওষুধ অল্প দামে পায় এই কারণে সরকারি হাসপাতালগুলোতে কম দামে ওষুধ সরবরাহ করা হয়। জনগণের করের টাকা থেকে বেশিরভাগ সময়ে ভর্তুকি দিয়ে এসব ওষুধ সরবরাহ করা হয় যাতে জনগণের জীবন রক্ষা হয়, দরিদ্র মানুষরা ওষুধের অভাবে অসুস্থ না থাকেন। এ ব্যাপারটি নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের কেবল দায়িত্ব নয়, রাষ্ট্রের জন্য জরুরিও। কেননা, এই সেবা নিশ্চিত করতে না পারলে দেশের জনসম্পদ হানি হবে, রাষ্ট্রের মূল ভিত্তিতে ফাটল ধরবে। অথচ, কিছু অসাধু মানুষ দরিদ্র মানুষকে তাদের অধিকার থেকে বঞ্চিত করছেন। বেঁচে থাকা ও সুস্থ থাকার অধিকার ছিনিয়ে নিয়ে তা দিয়ে ব্যবসা করছেন। যুগে যুগে, সব সরকারের আমলেই এমনটা হয়ে আসছে। ওষুধের এই মাইগ্রেশন বন্ধ হোক।  বাংলাদেশ নতুন করে স্বপ্ন দেখছে একটি কল্যাণকর, ন্যায্যতার রাষ্ট্র হওয়ার। জনগণের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করাই প্রাথমিক শর্ত।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত