অসময়ের তরমুজ এনে দিল লাখ টাকা

  • মাচা পদ্ধতিতে তরমুজ চাষ
  • খরচ ৪০ হাজার আয় ১ লাখ ৪০ হাজার টাকা 
  • তরমুজ ক্ষেতে পোকা মাকড়ের আক্রমণ কম 

 

আপডেট : ১৮ অক্টোবর ২০২৪, ১০:১১ পিএম

দিনাজপুরের হাকিমপুরের হিলিতে প্রথমবারের মত মাচায় অসময়ের গ্রীষ্মকালীন তরমুজ চাষ করে তাক লাগিয়েছেন তরুণ কৃষক হাইফুল ইসলাম। ইতোমধ্যেই এই জাতের তরমুজ চাষ করে বনে গেছেন লাখপতি। এই জাতের তরমুজ চাষ ভালো লাভজনক হওয়ায় সামনের দিনে বৃহৎ পরিসরে করার ইচ্ছা প্রকাশ করেন তিনি। 

উচ্চমূল্যের এই ফসল আবাদে কৃষকদের সবধরনের পরামর্শ দেওয়া হবে জানিয়েছে স্থানীয় কৃষি অফিস।

হিলির খট্টামাধবপাড়া গ্রামের কৃষক হাইফুল ইসলাম প্রথমবারের মত মাচায় অসময়ের গ্রীষ্মকালীন তরমুজ চাষ করছেন। প্রথমবার ৪০ শতাংশ জমিতে তরমুজ চাষে ১ লাখ ৪০ হাজার টাকা লাভের পর এবার দ্বিতীয়বারের মত জমির পরিমাণ কিছুটা বাড়িয়ে ৫০ শতাংশ জায়গায় তরমুজ চাষ করেছেন। এ দিকে তার দেখাদেখি গ্রামের অনেক কৃষক এই তরমুজ চাষে আগ্রহী হয়ে উঠছেন। ইতোমধ্যেই হাইফুলের তরমুজের বাগান পরিদর্শন করে অনেকে পরামর্শ নিচ্ছেন। 

হিলির খট্টামাধবপাড়া গ্রামের কৃষক হাইফুল ইসলাম বলেন, হাকিমপুর উপজেলা কৃষি অফিস থেকে এক কৃষককে তরমুজ চাষের প্রদর্শনী দেওয়া হয়। সেই কৃষকের প্রদর্শনীর তরমুজ চাষ দেখে আমার খুব ইচ্ছা জাগে এই ধরনের তরমুজ চাষের। সেই মোতাবেক কৃষি অফিসের পরামর্শে প্রথমবারের মত আমি ৪০ শতাংশ জমিতে মাচা পদ্ধতিতে তরমুজ চাষ করি। সেই জমিতে তরমুজ লাগানো থেকে শুরু করে কর্তন পর্যন্ত আমার খরচ হয়েছিল ৪০ হাজার টাকা। আর যে পরিমাণ তরমুজ হয়েছিল ১৪ শ টাকা মন হিসেবে সেই তরমুজ আমি বিক্রি করেছিলাম ১ লাখ ৮০ হাজার টাকা। এতে করে প্রথমবার ৪০ শতাংশ জমিতে তরমুজ চাষ করেই সবখরচ বাদ দিয়ে আমার ১লাখ ৪০ হাজার টাকা লাভ হয়। প্রথম বারেই অসময়ের এই তরমুজ চাষ করে আমি লাখপতি বনে যায়। 

তিনি আরও বলেন, আরো বড় পরিসরে চাষের চিন্তায় দ্বিতীয়বারের মত ৫০ শতাংশ জমিতে সবুজ ও হলুদ বর্নের তরমুজ চাষ করেছি। আবহাওয়া ভালো থাকায় ইতোমধ্যেই আমার ক্ষেতের গাছগুলোতে ভালো তরমুজ আসছে ও সেই সাথে পাকতে শুরু করায় ক্ষেত থেকে তরমুজ উঠিয়ে বাজারজাত শুরু করেছি। গতবার ১৪শ’ টাকা মন বিক্রি করলেও বর্তমানে তরমুজ আমি ১৮শ’ টাকা মন হিসেবে বিক্রি করেছি। তাতে করে এবারে জমিতে যে পরিমাণ তরমুজ হয়েছে তাতে বিক্রি দুই লাখ টাকা ছাড়িয়ে যাবে। এতে করে এবারেও তরমুজ চাষ করে দেড় লাখ টাকার মত লাভ থাকবে আমার। ফসল লাগানোর ৭০ দিনের মধ্যেই ফলন পাওয়া যায়। আবার এই তরমুজ বিক্রি নিয়ে কোনো চিন্তা নেই। তরমুজ পেকে গেলে পাইকাররা ক্ষেত থেকেই তরমুজ কিনে নিয়ে যায়।

হাইফুল বলেন, ধানের চাইতে অধিক লাভজনক হওয়ায় আগামীতে বড় পরিসরে তরমুজ চাষাবাদের ইচ্ছা আমার। এদিকে লাভজনক হওয়ায় অনেকেই আমার কাছে এই তরমুজ চাষের পরামর্শ নিতে আসছেন। তাতে করে আশা করছি আগামী দিনে আমাদের এই অঞ্চলে আরো ব্যাপক পরিসরে এই ধরনের তরমুজের চাষাবাদ হবে।

আগ্রহী কৃষক আজমল হোসেন বলেন, আমাদের এই অঞ্চলে এর আগে এই ধরনের তরমুজ চাষাবাদ হয়নি এবারই প্রথম চাষ করা হয়েছে। ক্ষেতের যে অবস্থা দেখা যাচ্ছে তাতে করে তরমুজ বেশ ভালো হয়েছে। এছাড়া দাম ভালো রয়েছে যার কারণে এই আবাদ বেশ লাভজনক বলেই মনে হচ্ছে। এর ফলে আগামীতে আমরা যারা রয়েছি তারা এই ধরনের তরমুজ চাষাবাদ করবো বলে চিন্তাভাবনা করছি। ইতোমধ্যেই আমি তার কাছে এই তরমুজ চাষ সম্পর্কে পরামর্শ নিয়েছি। 

আরেকজন কৃষক সিদ্দিক হোসেন বলেন, আগে দেখেছি মাটিতে তরমুজ চাষ করা হতো কিন্তু এখন দেখছি মাচায় করে তরমুজ চাষ করা হচ্ছে। মাটিতে তরমুজ চাষ করা হলে বৃষ্টি হলেই নষ্ট হয়ে যায় কিন্তু এই পদ্ধতিতে চাষ করার ফলে বৃষ্টি হলেও তরমুজ নষ্ট হয় না। পোকা মাকড়ের আক্রমণ তেমন একটা নেই। মোট কথায় তরমুজ চাষে খরচ কম। শুনতেছি এই জাতের তরমুজের নাকি ফলন বেশ ভালো বাজারে দাম বেশ ভালো রয়েছে। এই তরমুজের বিক্রি নিয়ে কোনো চিন্তাও নেই। এতে করে এই তরমুজ চাষাবাদ করে লাভ করতে পারবো । আগামীবার আমি এই তরমুজ চাষ করবো। 

কর্মচারী মিরাজুল ইসলাম বলেন, আমাদের এই অঞ্চলে প্রথম বারের মত কৃষক হাইফুল ইসলাম মাচায় তরমুজ চাষ শুরু করেছেন। আমি এখানে সেই তরমুজের বাগান দেখাশোনা করি আগাছা পরিষ্কার ওষুধ ছিটানো পানি দেওয়াসহ সব কাজ করি। এ ছাড়া তরমুজ হলে সেগুলো ক্ষেত থেকে তুলে বাজারজাত করার কাজ করে থাকি। এই কাজ করে যে মজুরি পাই তা দিয়ে আমার সংসার বেশ ভালোভাবেই চালাতে পারছি। এখানে আমার মত আরো কয়েকজন শ্রমিকের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। তার মতো অন্য কৃষকরা যদি এই তরমুজ চাষ করেন তাহলে আরো বেকার শ্রমিকদের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে। 

হাকিমপুর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা আরজেনা বেগম বলেন, আমাদের কৃষি অফিসের পক্ষ থেকে তরমুজ চাষের প্রদর্শনী দেখে হিলিতে প্রথম বারের মত উপজেলার খট্টামাধবাপাড়া গ্রামের কৃষক হাইফুল ইসলাম মাচায় গ্রীষ্মকালীন অসময়ের তরমুজ চাষ করেছেন। ইতোমধ্যেই উনি তরমুজ চাষে যে পরিমাণ খরচ বা ব্যায় করেছেন তাতে উনার কাঙ্খিত ফলনের সাথে ভালো দাম পাওয়ায় বেশ লাভবান হয়েছেন। যেহেতু এটি অসময়ের তরমুজ যার কারণে এটি একটি লাভজনক ফসল। এটি খরিপ -১ ও খরিপ-২ দুই মৌসুমেই এই জাতের তরমুজ চাষ করা যায়। এটি শুধুমাত্র এক মৌসুমে নয় বিভিন্ন মৌসুমে চাষযোগ্য। এর বাজার মুল্য অনেক ভালো যার কারণে কৃষকরা অবশ্যই উপকৃত হবে। যেহেতু এটি একটি উচ্চমুল্যের ফসল সুতরায় এটি আগামী দিনে আরো বেশী সম্প্রসারিত হবে।

তিনি আরও বলেন, সেই সাথে হাকিমপুর উপজেলায় মাচায় তরমুজের যে কনসেপ্ট সেটি প্রথম হওয়ার কারণে কৃষকরা বেশ আগ্রহী। ইতোমধ্যেই বেশ কিছু কৃষক এই তরমুজ চাষে উদ্যোগ গ্রহণ করেছেন। এটি খুবই সম্ভাবনাময় একটি ফসল যার কারণে আগামীতে এই উপজেলায় বৃহৎ পরিসরে কৃষকরা এই তরমুজ চাষাবাদ করবেন। এই তরমুজ চাষে যেমন আগ্রহী হয়ে উঠবেন তেমনি কৃষকরা বেশ লাভবান হবেন।  

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত