কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার থেকে গত ৩ আগস্ট তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পদত্যাগের এক দফা দাবি ঘোষণা করেছিল বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন। এ ঘোষণার পর ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার তোপের মুখে ক্ষমতা ছেড়ে ভারতে পালিয়ে যান শেখ হাসিনা। এবার সেই কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার থেকেই রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের পদচ্যুতি ও ছাত্রলীগকে নিষিদ্ধ করাসহ পাঁচ দফা দাবিতে সময়সীমা বেঁধে (আলটিমেটাম) দিয়েছে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন। এর মধ্যে চলতি সপ্তাহের মধ্যেই রাষ্ট্রপতির পদচ্যুতি ও ছাত্রলীগকে নিষিদ্ধ করার দাবি জানিয়েছেন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতারা। গতকাল মঙ্গলবার বিকেলে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে ‘সন্ত্রাসী ছাত্রলীগকে নিষিদ্ধ ও ফ্যাসিবাদের দোসর রাষ্ট্রপতি চুপ্পুর (রাষ্ট্রপতির ডাকনাম) পদত্যাগের দাবিতে বিপ্লবী ছাত্র-জনতার গণজমায়েত’ কর্মসূচির ডাক দেয় বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন। সেখানে ছাত্র আন্দোলনের এই প্ল্যাটফর্মের পক্ষ থেকে পাঁচ দফা দাবি ঘোষণা করেন অন্যতম সমন্বয়ক হাসনাত আবদুল্লাহ।
শহীদ মিনারের এই কর্মসূচি শেষে রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের পদত্যাগের দাবিতে বঙ্গভবনের সামনে বিভিন্ন সংগঠনের ব্যানারে অবস্থান নেন কয়েকশ বিক্ষোভকারী। সন্ধ্যার পর একপর্যায়ে তারা ব্যারিকেড ভেঙে বঙ্গভবনের ভেতরে ঢোকার চেষ্টা করেন। এ সময় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা তাদের বাধা দেন। বিক্ষোভকারীদের সামলাতে সাউন্ড গ্রেনেড ছোড়ে পুলিশ। এতে আহত হন পাঁচজন। তখন পুলিশের ওপর হামলার চেষ্টা করেন বিক্ষোভকারীরা। পরে বিক্ষোভকারীদের শান্ত করার চেষ্টা করেন সেখানে উপস্থিত সেনাসদস্যরা।
এদিকে রাষ্ট্রপতির পদত্যাগের দাবি যখন জোরদার, তখন প্রধান বিচারপতি সৈয়দ রেফাত আহমেদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন আইন ও বিচার বিষয়ক উপদেষ্টা ড. আসিফ নজরুল এবং তথ্য ও সম্প্রচার উপদেষ্টা নাহিদ ইসলাম। সুপ্রিম কোর্ট প্রশাসনের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে জানান, গতকাল দুপুরের পর ওই দুই উপদেষ্টা সুপ্রিম কোর্টে যান। তারা প্রধান বিচাপতির খাস কামরায় প্রধান বিচারপতির সঙ্গে প্রায় ৪০ মিনিট বৈঠক করে বেরিয়ে যান।
অন্যদিকে ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পদত্যাগপত্রের বিষয়ে রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের বক্তব্যকে ‘মিথ্যাচার’ এবং শপথ লঙ্ঘনের শামিল বলে আইন উপদেষ্টা অধ্যাপক আসিফ নজরুল যে বক্তব্য দিয়েছেন, সেটির সঙ্গে সরকার একমত পোষণ করে। গতকাল রাজধানীর ফরেন সার্ভিস অ্যাকাডেমিতে প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইং আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে প্রধান উপদেষ্টার উপ-প্রেস সচিব অপূর্ব জাহাঙ্গীর এ কথা বলেন।
শেখ হাসিনার সরকারের পতনের পর অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের আড়াই মাসের মাথায় গত ১৯ অক্টোবর দৈনিক মানবজমিনের প্রধান সম্পাদক মতিউর রহমান চৌধুরীর সঙ্গে আলাপকালে রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিন বলেন, তিনি শুনেছেন, শেখ হাসিনা প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে পদত্যাগ করেছেন; কিন্তু তার কাছে কোনো দালিলিক প্রমাণ নেই। এই কথোপকথন পত্রিকাটির রাজনৈতিক ম্যাগাজিন ‘জনতার চোখ’-এ প্রকাশিত হয়।
এ বিষয়ে গত সোমবার সচিবালয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুল বলেন, ‘রাষ্ট্রপতি যে বলেছেন, সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পদত্যাগপত্র পাননি, এটা হচ্ছে মিথ্যাচার এবং এটা হচ্ছে ওনার শপথ লঙ্ঘনের শামিল। কারণ, তিনি নিজেই ৫ আগস্ট রাত ১১টা ২০ মিনিটে পেছনে তিন বাহিনীর প্রধানকে নিয়ে জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে বলেছেন, সাবেক প্রধানমন্ত্রী ওনার কাছে পদত্যাগপত্র জমা দিয়েছেন এবং উনি তা গ্রহণ করেছেন। রাষ্ট্রপতি যদি তার বক্তব্যে অটল থাকেন, তাহলে তার রাষ্ট্রপতি পদে থাকার যোগ্যতা আছে কি না, সেটি অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টামণ্ডলীর সভায় ভেবে দেখতে হবে।’
একই দিন রাষ্ট্রপতির বক্তব্যের প্রতিবাদে সরব হন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতাকর্মীরা। তারা রাষ্ট্রপতির পদত্যাগ দাবি করেন। এরই ধারাবাহিকতায় গতকাল কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে আয়োজিত গণজমায়েত কর্মসূচি থেকে পাঁচ দফা দাবি জানান বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতারা। দাবিগুলো হলো বর্তমান সংবিধান অনতিবিলম্বে বাতিল করে চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের আলোকে নতুন করে সংবিধান লেখা; ছাত্রলীগকে সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে চিহ্নিত করে আজীবনের জন্য নিষিদ্ধ; রাষ্ট্রপতিকে এই সপ্তাহের মধ্যে পদচ্যুত করা; চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের যে স্পিরিট তার আলোকে ‘প্রক্লেমেশন অব রিপাবলিক’ ঘোষণা এবং গত ১৪, ১৮, ২৪ এর নির্বাচনকে অবৈধ ঘোষণা করা। এই তিনটি নির্বাচনে যারা সংসদ সদস্য হয়েছিলেন তাদের সম্পদ বাজেয়াপ্ত এবং তারা যেন চব্বিশ পরবর্তী বাংলাদেশে কোনোভাবে প্রাসঙ্গিক না হতে পারেন ও নির্বাচনে অংশগ্রহণ না করতে পারেন সে বিষয়ে আইনি পদক্ষেপ নেওয়ারও দাবি জানানো হয়। এসব দাবি মেনে নেওয়া না হলে শিগগিরই রাজপথে কঠোর কর্মসূচি দেওয়া হবে বলেও হুঁশিয়ারি দেন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতারা।
গণজমায়েতে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়ক হাসনাত আব্দুল্লাহ বলেন, ‘যে শহীদ মিনার থেকে আমরা এক দফা ঘোষণা দিয়েছিলাম, সেখান থেকে পাঁচ দফা দাবি ঘোষণা করছি। যেই সংবিধানের মধ্য দিয়ে চুপ্পু (মো. সাহাবুদ্দিন) বলবৎ রয়েছেন অর্থাৎ মুজিববাদী সংবিধান অনতিবিলম্বে বাতিল করতে হবে এবং সেই সংবিধানের জায়গায় ২৪ এর গণঅভ্যুত্থানের প্রেক্ষাপটে নতুন করে সংবিধান লিখতে হবে। ৭২-এর সংবিধান যদি আমরা ছুড়ে ফেলে দিতে পারি তাহলে ওই চুপ্পুর পদ এমনিই শেষ। চুপ্পুর পদ আর থাকে না। তাই আমাদের দাবি ফ্যাসিবাদী সংবিধানের দোসর রাষ্ট্রপতি চুপ্পুকে এই সপ্তাহের মধ্যে পদচ্যুত করতে হবে।’
বিপ্লব এখনো শেষ হয়নি উল্লেখ করে তিনি আরও বলেন, ‘আমরা ৫ আগস্ট গণতন্ত্রের মাফিয়া শেখ হাসিনাকে উৎখাত করেছি, কিন্তু নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্ত করতে পারিনি। বাংলাদেশের ক্রিয়াশীল গণতান্ত্রিক ধারার যে রাজনৈতিক দলগুলো রয়েছে বিএনপি, জামায়াত, বামপন্থিসহ যে মতাদর্শের হোক না কেন, যারা বাংলাদেশের প্রশ্নে আপসহীন, বাংলাদেশের মানুষের জন্য যারা রাজনীতি করে, তাদের যতদিন সুস্থ ও গণতান্ত্রিক ধারার অধিকার ফিরিয়ে দিতে না পারছি, ততদিন পর্যন্ত আমাদের বিপ্লব শেষ হয়ে যায়নি। মুজিববাদ স্থায়ীভাবে উৎখাত না করা পর্যন্ত আমাদের ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে।’
গণজমায়েতে বক্তব্য দেন জাতীয় নাগরিক কমিটির আহ্বায়ক নাসির উদ্দিন পাটোয়ারী। তিনি বলেন, “গত ৫৩ বছরে রাষ্ট্রের যেসব বাহিনী গুম, খুনের নেতৃত্ব দিয়েছে; আমরা তাদের বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড়ানোর আহ্বান জানাচ্ছি। অনতিবিলম্বে এসব দাবি যদি না মানা হয়, বাংলাদেশের ছাত্র-জনতা যেভাবে অভ্যুত্থান করেছিল আমরা তাকে চূড়ান্ত বিপ্লবের দিকে নিয়ে যাব। সেই চূড়ান্ত বিপ্লবের দিকে নিয়ে যাওয়ার জন্য আমার অনতিবিলম্বে সব সমস্যার মূল কারিগর, আমাদের যেই ফ্যাসিস্ট সংবিধান বাকশালী সংবিধান রয়েছে, সেই সংবিধান বাতিল করে অ্যাকটিভ ন্যাশনাল দলগুলোর সঙ্গে বসে একটি ‘প্রক্লেমেশন অব রিপাবলিক’ ঘোষণা করার জন্য দাবি জানাচ্ছি।”
গণজমায়েতে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়ক সারজিস আলম বলেন, ‘আবারও যদি প্রয়োজন হয়, আমরা আমাদের চোখ দিতে প্রস্তুত, পা দিতে প্রস্তুত, হাত দিতে প্রস্তুত, এমনকি জীবন দিতে প্রস্তুত আছি। ফ্যাসিস্ট দল ছাত্রলীগ যেভাবে আমাদের ভাইদের হত্যা করেছে, তাদের উত্থান সহ্য করা হবে না। চুপ্পুর এই নয়ছয় কোনোভাবেই মেনে নেওয়া হবে না। খুনি হাসিনার মতো তাকেও দেশ ছেড়ে পালাতে হবে।’
আরেক সমন্বয়ক আবু বাকের মজুমদার বলেন, ‘ফ্যাসিবাদের মূল আদর্শ মুজিববাদিতা। ছাত্রলীগ ফ্যাসিবাদ প্রতিষ্ঠায় অগ্রনায়ক ছিল। শেখ হাসিনার সময়ও তারা এই সন্ত্রাসী কার্যক্রম জারি রেখেছে। বিগত ১৫ বছরে তারা বাংলাদেশে একটি অস্থিতিশীল পরিস্থিতি তৈরি করেছিল। হাজার হাজার মানুষকে গুম করেছিল। ছাত্রলীগ দিয়ে এই ফ্যাসিবাদের শুরু হয়। তাই এদের নিষিদ্ধ করতে হবে।’
ছাত্রলীগকে নিষিদ্ধ এবং রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের পদত্যাগের দাবিতে এর আগে মানববন্ধন করে জুলাই বিপ্লবভিত্তিক সংগঠন ইনকিলাব মঞ্চ। এদিন দুপুরে রাজধানীর শাহবাগে জাতীয় জাদুঘরের সামনে অবস্থান নিয়ে মানববন্ধন এবং শাহবাগ থেকেই বঙ্গভবন অভিমুখে পদযাত্রা করে ইনকিলাব মঞ্চ। এ সংগঠনটির সঙ্গে সংহতি প্রকাশ করে ‘ফ্যাসিবাদবিরোধী ছাত্র জনতা মঞ্চ’ এবং ‘৩৬ জুলাই পরিষদ’সহ বিভিন্ন সংগঠন।
এদিন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মধুর ক্যান্টিনের সামনে রাষ্ট্রপতির কুশপুত্তলিকা দাহ করে বাংলাদেশ ছাত্র অধিকার পরিষদ। এ সময় সংগঠনটির সংগঠনটির সভাপতি বিন ইয়ামিন মোল্লা বলেন, ‘বর্তমান রাষ্ট্রপতি একজন ফ্যাসিবাদের দোসর। উনাকে বলবৎ রেখে কোনোভাবেই নতুন বাংলাদেশ বিনির্মাণ করা যাবে না। দ্রুত সময়ের মধ্যে চুপ্পুকে পদত্যাগ কিংবা পদচ্যুত করতে হবে।’
বঙ্গভবনে বিক্ষোভকারীদের ঢোকার চেষ্টা, বাধা : রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের পদত্যাগ দাবিতে বিভিন্ন সংগঠনের ব্যানারে গতকাল বিকেল ৪টা থেকে বঙ্গভবনের সামনের সড়কে বিক্ষোভকারীরা অবস্থান নিয়ে বিক্ষোভ শুরু করেন। এর মধ্যে ছিল ইনকিলাব মঞ্চ, রক্তিম জুলাই’২৪-এর ব্যানারে বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে আহতরা, ৩৬ জুলাই পরিষদ, জিয়াউর রহমান সমাজকল্যাণ পরিষদ এবং ফ্যাসিবাদবিরোধী ছাত্র-জনতার মঞ্চ।
বিক্ষোভকারীরা একপর্যায়ে বঙ্গভবনের ভেতরে ঢোকার চেষ্টা করেন। এ সময় পুলিশ সদস্যরা তাদের বাধা দেন। রাত ৮টা ১৫ মিনিটে এক নারী বিক্ষোভকারী মাইকে বঙ্গভবনে ঢোকার ঘোষণা দেন। এরপর ৩০০-৪০০ জন বঙ্গভবনের সামনের তারকাঁটার ব্যারিকেডে ধাক্কাধাক্কি করেন। ব্যারিকেডের পেছনেই অবস্থান করছিলেন সেনাবাহিনীর সদস্যরা। ব্যারিকেড টেনে সরিয়ে ফেলেন আন্দোলনকারীরা। ৮টা ২২ মিনিটে আন্দোলনকারীদের লক্ষ্য করে সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপ করে পুলিশ। এ সময় পুলিশ সদস্যদের ধাওয়া দেন আন্দোলনকারীরা। তখন সেনাবাহিনীর সদস্যরা আন্দোলনকারীদের বোঝানোর চেষ্টা করেন। সেনাসদস্যদের সঙ্গেও আন্দোলনকারীদের ধাক্কাধাক্কি হয়। সেনাবাহিনীর সদস্যরা পুলিশ সদস্যদের বঙ্গভবনের ভেতরে পাঠিয়ে দেন। এ সময় পুলিশ সদস্যদের লক্ষ্য করে ভুয়া ভুয়া বলে স্লোগান দিতে থাকেন আন্দোলনকারীরা।
রাত সাড়ে ৯টার দিকে পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক হলে সেনাবাহিনীর সদস্যরা মাইকিং করতে শুরু করেন। তারা আন্দোলনকারীদের সরে যেতে বলেন। এ সময় বিভিন্ন গণমাধ্যমকর্মীদের সঙ্গে কথা বলেন আন্দোলনকারীরা।
সাউন্ড গ্রেনেডে আহতরা হলেন শ্যামপুর বহুমুখী স্কুল অ্যান্ড কলেজের শিক্ষার্থী ফয়সাল আহমেদ বিশাল (২৪), কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজের শিক্ষার্থী আরিফ খান (২০), বার্তা ২৪-এর স্টাফ রিপোর্টার রাজু আহমেদ (২৫), ভিডিও জার্নালিস্ট রিপন রেজা (২৮) ও হকার শফিকুল ইসলাম (৪৫)।
আহত সাংবাদিক রাজু আহমেদ বলেন, ‘বঙ্গভবনে রাষ্ট্রপতির পদত্যাগের দাবিতে ছাত্র-জনতার বিক্ষোভ চলছিল। রাতে বিক্ষোভের সময় ছাত্র-জনতা ব্যারিকেড ভেঙে ভেতরে ঢোকার চেষ্টা করে। এ সময় কে বা কারা সাউন্ড গ্রেনেড ছোড়ে। এতে আমার কানে সমস্যা হয়।’
আহত হকার শফিকুল ইসলাম জানান, বিকেল থেকে রাষ্ট্রপতির পদত্যাগের দাবিতে বঙ্গভবনের সামনে ছিলেন। বিস্ফোরণে তার পায়ে আঘাত লাগে।
চিকিৎসকের বরাত দিয়ে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল পুলিশ ক্যাম্পের ইনচার্জ (পরিদর্শক) মো. ফারুক জানান, বঙ্গভবনের সামনে থেকে পাঁচজন আহত হয়ে হাসপাতালে এসেছিলেন। তাদের মধ্যে তিনজনের পায়ে আঘাত ছিল। উচ্চশব্দের কারণে বাকি দুজনের কানে সমস্যা হয়েছে। প্রাথমিক চিকিৎসা শেষে তারা হাসপাতাল ছেড়েছেন।
রাত ৯টা ৪৫ মিনিটে পুলিশের বড় একটা দল বঙ্গভবনের দিকে আসলে তাদের ধাওয়া দিয়ে সরিয়ে দেয় বিক্ষোভকারীরা। পরে তাদের পুলিশের ওই গাড়িতে হামলা করে করতে দেখা যায়। হামলার মুখে কয়েকজন পুলিশ সদস্য অস্ত্র ফেলে চলে যান। পরে আন্দোলনকারীরা অস্ত্রগুলো সেনাবাহিনীর কাছে জমা দেন বলে জানা গেছে।
রাতে বঙ্গভবনের সামনে হাসনাত ও সারজিস : রাত ১১টা ২০ মিনিটে বঙ্গভবনের সামনে আসেন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়ক হাসনাত আব্দুল্লাহ ও সারজিস আলম। এ সময় তারা বলেন, বুধ ও বৃহস্পতিবারের মধ্যে রাষ্ট্রপতিকে পদত্যাগ করতে হবে। আর সব রাজনৈতিক দলের মতামতের ভিত্তিতে পরবর্তী রাষ্ট্রপতি কাকে বানানো যায় সে ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
বিক্ষোভকারীদের উদ্দেশে তারা বলেন, ‘রাষ্ট্রপতির পদত্যাগের দাবিতে আন্দোলনকে কেন্দ্র করে ইতিমধ্যে প্রতিবেশী দেশগুলো ষড়যন্ত্র শুরু করেছে। আমরা এ সুযোগ কাউকে দেব না।’
পরে ১১টা ৪৫ মিনিটে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের এ দুই সমন্বয়ক সেখান থেকে চলে যান। পরে আস্তে আস্তে বঙ্গভবনের সামনে অবস্থানকারী বিক্ষোভকারীর সংখ্যা কমতে থাকে। তবে রাত ১২টায় এ প্রতিবেদন লেখার সময় পর্যন্তও বঙ্গভবনের সামনে ২০০-৩০০ বিক্ষোভকারীকে অবস্থান করতে দেখা গেছে। তারা রাষ্ট্রপতি পদত্যাগের দাবিতে বিভিন্ন ধরনের স্লোগান দিচ্ছিলেন।
আইন উপদেষ্টার বক্তব্যে একমত অন্তর্বর্তী সরকার : সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পদত্যাগপত্র না পাওয়ার বক্তব্যে রাষ্ট্রপতির ‘শপথভঙ্গ’ এবং তার ‘পদে থাকার যোগ্যতা নিয়ে ভাবতে হবে’ বলে আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুলের বক্তব্যের সঙ্গে একমত অন্তর্বর্তী সরকার।
গতকাল বিকেলে ফরেন সার্ভিস একাডেমিতে সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে সরকারের এমন অবস্থান তুলে ধরে প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইং। রাষ্ট্রপতির বক্তব্যের পর আইন উপদেষ্টার মন্তব্যের বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করলে প্রধান উপদেষ্টার উপপ্রেস সচিব অপূর্ব জাহাঙ্গীর বলেন, ‘আসিফ নজরুল যা বলেছেন এটার সঙ্গে সরকার একমত পোষণ করে।’
রাষ্ট্রপতিকে সরানোর কোনো উদ্যোগ নেওয়া হবে কি না এ প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘এখন পর্যন্ত উদ্যোগ নেওয়া হয়নি।’
ভবিষ্যতে এমন চিন্তা আছে কি না জানতে চাইলে অপূর্ব জাহাঙ্গীর বলেন, ‘সেটা ভবিষ্যৎ বলে দেবে।’
যদি সরকার রাষ্ট্রপতিকে অপসারণের উদ্যোগ নেয়, সেটি কী প্রক্রিয়ায় হবে এমন প্রশ্নে প্রধান উপদেষ্টার উপ-প্রেস সচিব আবুল কালাম আজাদ মজুমদার বলেন, ‘যে সিদ্ধান্ত হয়নি সে বিষয় কোন প্রক্রিয়ায় হবে সেটা নিয়ে আলোচনা অবান্তর।’
জেলায় জেলায় বিক্ষোভ : রাজধানী ঢাকার মতো রাষ্ট্রপতির পদত্যাগসহ ছাত্রলীগ নিষিদ্ধের দাবিতে বিক্ষোভ হয়েছে দেশের বিভিন্ন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় এবং জেলায় জেলায়। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের (জাবি) শিক্ষার্থীরা গতকাল বিকেলে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ব্যানারে বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ করেন। একই দাবিতে মাগুরায় বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার ব্যানারে গণজমায়েত ও বিক্ষোভ মিছিল কর্মসূচি পালন হয়। ঝিনাইদহ শহরের কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার চত্বর থেকে গতকাল বিকেলে বিপ্লবী ছাত্র-জনতার ব্যানারে বিক্ষোভ মিছিল বের হয়। বরিশাল নগরীতে লাঠি মিছিল করেছে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন। সিরাজগঞ্জ শহরে সন্ধ্যায় মশাল মিছিল করেন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতাকর্মীরা।
কুমিল্লার মুরাদনগরে কুমিল্লা-সিলেট আঞ্চলিক মহাসড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করেন কোম্পানীগঞ্জ বদিউল আলম ডিগ্রি কলেজ শিক্ষার্থীরা। নড়াইলে বিক্ষোভ ও সমাবেশ হয়েছে সর্বস্তরের ছাত্র-জনতার ব্যানারে।
প্রতিবেদনটিতে তথ্য দিয়েছেন সংশ্লিষ্ট বিশ্ববিদ্যালয় ও জেলার প্রতিনিধিরা
