ঢাকা মেডিকেলেই কেন বারবার ভুয়া ডাক্তার আটক?

  • ভুয়া চিকিৎসক সাজতে টেইলার্স থেকে অ্যাপ্রোন কিনেন অভিযুক্তরা
  • মানুষের সঙ্গে প্রতারণা করে অর্থ উপার্জনেই তাদের উদ্দেশ্য
আপডেট : ১৮ নভেম্বর ২০২৪, ০১:১৪ পিএম

সরকারি স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতাল সর্ববৃহৎ। যেখানে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে মানুষ সেবা নিতে আসেন। বিশেষ করে সাধারণ মানুষের চিকিৎসা সেবা নিশ্চিতের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে হাসপাতালটির নাম। কারণ অল্প খরচে ভালো মানের চিকিৎসা মিলে ঢামেকে। তাই হাসপাতালটিতে প্রতিদিন হাজার হাজার রোগী ও স্বজনদের ভিড় লেগেই থাকে। যাদের অধিকাংশই আসে রাজধানীর বাইরে থেকে।

হাসপাতালের চাহিদার তুলনায় রোগীর সংখ্যা বেশি হওয়ায় নানা ভোগান্তি পোহাতে হয় রোগীদের। বিশেষ করে দালালদের দৌরাত্ম্য। নানা সময় রোগীদের সঙ্গে প্রতারণার খবর জনসম্মুখে আসে। এসবের মধ্যে কিছুদিন পর পর ঢাকা মেডিকেলে ভুয়া চিকিৎসক আটক করা হয়। গতকালও পাপিয়া আক্তার স্বর্ণা (২২) নামে এক ভুয়া নারী চিকিৎসককে আটক করে আনসার সদস্যরা। এর আগে গত ২১ জুন রিপা আক্তার ও গত বছরের ২৪ ডিসেম্বর মুনিয়া রোজা (২৫) নামে এক ভুয়া চিকিৎসকে আটক করে আনসার সদস্যরা। এই তিনজন নারী চিকিৎসক পরিচয় দেওয়ার জন্য টেইলার্স থেকে অ্যাপ্রোন কিনেছেন বলে স্বীকারোক্তি দেন।

এদিকে ঢাকা মেডিকেলেই কেন বারবার ভুয়া ডাক্তার আটক হয় তা নিয়ে সচেতন মহলে নানা প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। বিষয়টি নিয়ে ঢাকা মেডিকেলে কর্মরত কয়েকজনের সঙ্গে কথা হয়েছে এই প্রতিবেদকের।

তারা দেশ রূপান্তরকে জানিয়েছেন, ‘প্রতিদিন প্রায় কয়েক হাজার মানুষের সমাগম হয় ঢামেকে। যাদের সবাই নিজেদের কাজে ব্যস্ত থাকে। কেউ সেবা দিতে ব্যস্ত, কেউ আবার সেবা নিচ্ছেন। তাই অন্যকিছু খোয়াল করার সময় তেমন থাকে না। এর মাঝেই কিছু অসাধু মানুষ সাধারণ মানুষদের জিম্মি করে অর্থ উপার্জন করে। এই অর্থ উপার্জনের জন্যই বিভিন্ন কৌশল অবলম্বন করে থাকে। অ্যাপ্রোন পরে চিকিৎসক সেজে মানুষের সঙ্গে প্রতারণা করা তাদের কৌশলের একটি অংশ। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বিভিন্ন সময় এসব অপরাধীদের ধরতে অভিযান পরিচালনা করে। তারপরেও অপরাধীরা নানা কৌশলে অপরাধ করে থাকে।’

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, গতকাল ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালের নাক, কান, গলা বিভাগে এক রোগীর কাছ থেকে টাকা নেওয়ার সময় পাপিয়া আক্তার স্বর্ণা (২২) নামে এক ভুয়া নারী চিকিৎসককে আটক করে পুলিশ। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে আটক পাপিয়া জানান, তিনি উচ্চ মাধ্যমিক পর্যন্ত পড়াশোনা করেছেন। ঢামেকের চিকিৎসক পরিচয়ে তিনি বিভিন্নজনের কাছ থেকে অর্থ হাতিয়ে নিতেন।
জানা যায়, মুখে টিউমারজনিত সমস্যার কারণে গত বুধবার হাসপাতালের নাক কান গলা বিভাগে ভর্তি হন কিশোরগঞ্জের বাসিন্দা নুরুল আলম। আটক পাপিয়ার সঙ্গে তার স্ত্রী কল্পনা এক আত্মীয়ের মাধ্যমে হাসপাতালে পরিচিত হন। পাপিয়া নিজেকে তখন ঢাকা মেডিকেল কলেজের শিক্ষার্থী ও জুনিয়র চিকিৎসক পরিচয় দেয়। নিয়মিত চিকিৎসকের অ্যাপ্রোনও পড়ে থাকত।

কল্পনা অভিযোগ করেন, অপারেশন দ্রুত করিয়ে দেবে বলে পাপিয়া ৩০ হাজার টাকার চুক্তি করে। সেই চুক্তির ২৮ হাজার টাকা আগেই নিয়ে নেয়। বাকি ২ হাজার টাকা নিতে রবিবার তাদের ওয়ার্ডে এসেছিল।

আটক পাপিয়া নিজেকে ভুয়া চিকিৎসক স্বীকার করে সাংবাদিকদের জানান, রোগী আমার পরিচিত। তাকে দ্রুত অপারেশন করিয়ে দেওয়ার জন্য ওয়ার্ডের চিকিৎসকদের কাছে নিজেকে ঢাকা মেডিকেল কলেজের কে-৭৮ ব্যাচের স্টুডেন্ট পরিচয় দিয়েছিলাম। তবে ওয়ার্ডটিতে স্বর্ণা নামে দায়িত্বরত আরেক নারী চিকিৎসক ছিলেন, যিনি আমার বিস্তারিত পরিচয় জানতে চান। তখনই তারা বুঝে ফেলেন আমি এখানকার স্টুডেন্ট না।

আটক ভুয়া চিকিৎসক পাপিয়ার বাড়ি নরসিংদীর মনোহরদী উপজেলার নলুয়া গ্রামে। বাবার নাম আনোয়ার হোসেন বাদল। মনোহরদীর একটি কলেজ থেকে তিনি উচ্চ মাধ্যমিক পাশ করেন। এক বছর আগে জসিম উদ্দিন নামে এক যুবককে বিয়ে করে। তাকে নিয়ে বকশিবাজারে এলাকায় থাকেন। স্বামী একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের চাকরি করে।

ঢাকা মেডিকেল পুলিশ ক্যাম্প ইনচার্জ ইন্সপেক্টর মো. ফারুক জানান, হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ভুয়া চিকিৎসক স্বর্ণাকে আটক করে আমাদের কাছে সোপর্দ করেছে। পরবর্তীতে আমরা ওই তরুণীকে শাহবাগ থানা পুলিশের কাছে তুলে দিয়েছি। তারা তদন্ত করে আইনানুগ ব্যবস্থা নেবে।

এর আগে গত ২১ জুন রিপা আক্তার নামের আরেক ভুয়া চিকিৎসককে আটক করে হাসপাতালের কর্তৃপক্ষ। এই নারীকে ঢামেকের ২১২ নম্বর ওয়ার্ডের গাইনি বিভাগ থেকে আটক করা হয়। আটকের সময় ওই নারী জানান,নিউমার্কেট থেকে অ্যাপ্রোন কিনে তিনি ঢাকা মেডিকেলে আসা যাওয়া করতেন। পরে এই নারীকেও ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পুলিশ ক্যাম্পে কর্তৃপক্ষ  হস্তান্তর করে। তারপর তাকে শাহবাগ থানায় নেওয়া হয়। 

এদিকে গত বছরের ২৪ ডিসেম্বর মুনিয়া রোজা (২৫) নামে এক ভুয়া চিকিৎসকে আটক করে আনসার সদস্যরা। যিনি নিজেকে হাসপাতালের গাইনি বিভাগের চিকিৎসক পরিচয় দিতেন। এই নারীও চিকিৎসক পরিচয় দিয়ে মানুষের সঙ্গে প্রতারণা করেন বলে সেই সময় শিকার করেন। আটকের পর তার বিরুদ্ধে মামলা করে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। পরে তিনি জেলও খাটেন। আটকের পর  মুনিয়া রোজা বলেন, নিউমার্কেট থেকে পরিচয়পত্র ও চিকিৎসকের অ্যাপ্রোন কিনেছিলেন মুনিয়া। আর মিটফোর্ড থেকে কিনেছেন স্টেথেস্কোপ।

এসব বিষয়ে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. আসাদুজ্জামানের সঙ্গে টেলিফোনে যোগাযোগ করার চেষ্টা করলে তিনি ফোন রিসিভ করেননি।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত