দ্বীনদরদি আলেম ইলিয়াস (রহ.)

আপডেট : ২৯ নভেম্বর ২০২৪, ০৫:১৩ এএম

ফুল কার না ভালো লাগে। ফুলের বাগান আরও বেশি মন কাড়ে। ফুল অথবা ফুলের বাগানের পেছনে একজন মালির মায়া থাকে। খাঁখাঁ খোলা মাঠে ফুলের বাগান সাজানোর জন্য হৃদয় নিংড়ানো দরদ লাগে। মাথার ঘাম পায়ে ফেলে তার সঙ্গে এক নদী দরদ মিশিয়ে যতœ নিতে হয়। তবেই সেই বাগানে রঙ-বেরঙের ফুল ফোটে। দূর-দূরান্তের মৌ আসে। যে দেখে সেই হাসে। যত দেখে ততই হাসে। হাসতে হাসতে ভালোবাসে। মানুষ ফুল কুড়িয়ে মালা গাঁথে। এ তো গেল গাছে ফোটা ফুলের কথা। আজ বলব ইসলাম নামক বাগানে হাজারো মালির মাঝে অনন্য একজন মালির কথা। লোকে তাকে ‘হজরতজি’ নামে চেনে। মাওলানা ইলিয়াস (রহ.) তার নাম। ভারতবর্ষে দ্বীন প্রতিষ্ঠার প্রাণপুরুষ শাহ ওয়ালী উল্লাহ দেহলভি (রহ.)-এর বিপ্লবী চিন্তায় প্রভাবিত ছিলেন তিনি।

জীবনীকাররা লিখেছেন, বিপ্লব তার ঘরের সম্পদ ছিল। হজরতজির বড় আব্বা মাওলানা মোজাফফর হোসাইন ছিলেন ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের সিপাহসালার সাইয়েদ শহীদ আহমদ বেরলভির (রহ.)-এর ঘনিষ্ঠ সহচর। হজরতজির শৈশব কেটেছে বালাকোট আন্দোল, বেরলভির জেহাদ ও শাহ আবদুল আজিজের এলমি সাধনার গল্প শুনে। পরিণত বয়সে তাই আফসোস করে তিনি বলেছিলেন, ‘হায়! এখনকার মুরুব্বিরা শিশুদের ব্যাঙ্গমা-ব্যঙ্গমির গল্প শুনিয়ে বড় করেন। আর আমরা বড় হয়েছি শহীদের বীরত্বগাথা শুনে।’

ছোটবেলা থেকেই দ্বীনের প্রতি গভীর দরদ ছিল ইলিয়াস (রহ.)-এর। তার নানি আম্মা ছোট্ট ইলিয়াসের দ্বীনি জজবা দেখে প্রায়ই বলতেন, ‘তোমার আখলাকে সাহাবিদের ছাপ রয়েছে।’ বড়বেলায় শায়খুল হিন্দ মাওলানা মাহমুদুল হাসানও একই কথা বলেছেন, ‘মাওলানা ইলিয়াসের আখলাকে আমি সাহাবিদের ছায়া দেখতে পাই।’ তার এক মক্তবের সহপাঠী বলেন, ‘একদিন ছোট্ট ইলিয়াস একটি লাকড়ি হাতে নিয়ে এসে বলছে, দোস্ত! চলো, বেনামাজিদের বিরুদ্ধে জিহাদ করি।’ দ্বীনের জন্য হজরতজির দিলে তো আগে থেকেই টান ছিল, সেটা আরও বাড়িয়ে দিয়েছেন মাওলানা রশিদ আহমদ গাঙ্গুহি (রহ.)। দীর্ঘ দশ বছর ইলমের এই বিশাল বৃক্ষের ছায়ায় তিনি শুধু শরিয়ত শেখেননি, বরং মারেফতের সাগরেও সাঁতার কেটেছেন মন খুলে। ওই সময়ে ভারতবর্ষে গাঙ্গুহি ছিল জ্ঞানচর্চার জন্য প্রসিদ্ধ এলাকা। এখানে শুধু কিতাবি ইলমেরই চর্চা হতো না, বরং দ্বীন প্রতিষ্ঠারও ফিকির হতো। তৎকালীন ইসলামি আন্দোলনের উদ্দেশ্য ছিল মুসলমানদের হারানো গৌরব ফিরিয়ে আনা। গাঙ্গুহি সকাল-বিকেল যে জিকিরের মজলিস হতো সেখানে দুনিয়া জুড়ে মুসলমানদের সমস্যার পাশাপাশি ভারতবর্ষে কীভাবে ইসলামের সুদিন ফিরে আসবে সেই আলোচনা হতো। এভাবে দশ বছর পরাজিত-পতিত মুসলমানদের টেনে তোলার আলোচনা নানা আঙ্গিকে, নানা বর্ণে-ঢঙে শুনতে শুনতে মুসলমানদের জন্য বিপ্লবী কিছু করার ফিকির স্থায়ী হয়ে যায় তরুণ ইলিয়াসের বুকে।

যে বুকে স্বপ্ন থাকে, সে বুকে ব্যথা থাকে। স্বপ্নপূরণ করার ব্যথা। আর এ ব্যথা আসে আল্লাহর পক্ষ থেকে। তরুণ ইলিয়াসের বুকেও স্বপ্ন ছিল। ছিল স্বপ্নপূরণের বেদনা। একদিন তিনি শায়েখ গাঙ্গুহিকে বলেন, ‘যখন আমি জিকিরে বসি, বুক খুব ভার লাগে।’ গাঙ্গুহি (রহ.) খুব অবাক হয়ে বললেন, ‘ঠিক একই কথা মাওলানা কাসিম নানুতুবি (রহ.) তার পীর হাজি ইমদাদুল্লাহ মুহাজিরে মক্কিকে বলেছিলেন। জবাবে মুহাজিরে মক্কি বলেছিলেন, আল্লাহ তোমাকে দিয়ে দ্বীনের বড় খেদমত করাবেন।’ এরপরই উপমহাদেশে সবচেয়ে বড় মাদ্রাসা দারুল উলুম দেওবন্দ প্রতিষ্ঠা করেন তিনি। আর হজরতজি ইলিয়াস (রহ.) প্রতিষ্ঠা করেন তাবলিগ জামাত। দেওবন্দ মাদ্রাসা আর তাবলিগ জামাতের মধ্যে আরও একটি মিল রয়েছে। দুটোর পেছনেই রয়েছে রাসুল (সা.)-এর অনুমোদনের গল্প। আলেমরা বলেন, স্বপ্নে এসে নবীজি (সা.) দেওবন্দ মাদ্রাসার সীমানা দেখিয়ে দেন কাসিম নানুতুবি (রহ.)-কে। আর ইলিয়াস (রহ.)-কে দেন তাবলিগের সবক।

বলছিলাম, হজরতজির বুকের স্বপ্ন তাবলিগ হয়ে পাখা মেলেছে মেওয়াতের মাটিতে। মেওয়াত থেকে তাবলিগের সুবাস ছড়িয়ে পড়েছে পৃথিবীর আনাচে-কানাচে। একশ বছরেরও বেশি সময় তাবলিগ আলো বিলাচ্ছে দ্বীন জানে না, নামাজ জানে না, কালেমা জানে না, অজু জানে না, গোসল জানে না এমন মানুষের কাছে। সময়ের প্রয়োজনে অনেক কিছুতেই সংযোজন-বিয়োজন আনতে হয়। তাবলিগ জামাতেও দাওয়াতের কাজের ক্ষেত্রে কিছু সংযোজন আনা প্রয়োজন। বিশ^বিদ্যায়লয়ের শিক্ষার্থীদের চিন্তা বোঝার মতো মন নিয়ে দাওয়াতের মাঠে ছড়িয়ে পড়তে হবে সাথী ভাইদের। আধুনিক তরুণীর মনে জাগা প্রশ্নের জবাব দেওয়ার এলমি দক্ষতা অর্জন করতে হবে মাস্তুরাত বা মহিলা জামাতকে। আলহামদুলিল্লাহ, এগুলো নিয়ে এখন কাজ হচ্ছে। তবে এ কাজ আরও জোরদার করতে হবে। অর্থনীতি, রাজনীতি ও সমাজানীতিতে পারদর্শী করার জন্য যুগোপযোগী একটি সিলেবাস করতে পারলে তাবলিগের সৌরভে সমাজে নতুন ধারা যোগ হবে। ব্যক্তি সংশোধনের পাশাপাশি সমাজ ও রাষ্ট্র সংশোধনের জন্যও ফিকির করতে হবে তাবলিগের মুরুব্বিদের। তবেই তাবলিগ জয় করবে আধুনিক বিশ^কে।

উপমহাদেশে ইসলামের দাওয়াতি কার্যক্রমকে এগিয়ে নিতে তাবলিগ জামাতের ভূমিকা অপরিসীম। তাবলিগ জামাতের লোকেরা মানুষের কাছে গিয়ে অত্যন্ত দরদ নিয়ে দ্বীনের সঠিক বার্তা পৌঁছে দেন। দ্বীন না জানা মানুষদের কাছে গিয়ে দ্বীনের মৌলিক বিষয়গুলো শিখিয়ে দেন। হজরতজি ইলিয়াস (রহ.) তো এমন তাবলিগেরই প্রচলন করেছিলেন। কিন্তু এখন নানা কারণে তাবলিগ জামাতে দ্বন্দ্ব। তাবলিগের মুরুব্বিদের প্রতি বিনীত আহ্বান হলো, আসুন! দেশের এ কঠিন সময়ে, মুসলমানদের এই দুর্দিনে আমরা আল্লাহর জন্য, ইসলামের এক হয়ে যাই। ছাড় দিয়ে, ছেড়ে দিয়ে ঐক্য গড়ে তুলি। হে আল্লাহ! আমাদের রহম করুন। আমিন।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত