প্লাস্টিক গ্রাস করছে বিশ্বকে। এ নিয়ে ক্রমাগত উদ্বেগ বাড়ছে। তারপরও আসছে না সমাধান। সর্বশেষ জাতিসংঘের বৈঠকেও সিদ্ধান্তে আসতে পারেনি ২০০ দেশ। লিখেছেন রাইসুল আসাদ
বর্তমান পৃথিবীতে বছরে উৎপাদিত প্লাস্টিকের পরিমাণ ৪০০ মিলিয়ন টন। বলা হচ্ছে, সমগ্র মানব জনসংখ্যার ওজনের সমান এই উৎপাদনের পরিমাণ। তার চেয়ে আশঙ্কার হলো, প্লাস্টিক বিশ্বে আরও বেশি স্থান নিতে চলেছে। বর্তমানে এ হারে উৎপাদন চলতে থাকলে ২০৬০ সালে এ উৎপাদন প্রায় তিনগুণ হবে। বর্তমানে আনুমানিক ২০ মিলিয়ন টন প্লাস্টিক প্রতি বছর পরিবেশে মিশে যায়। অথচ বিশ্বব্যাপী বার্ষিক পুনর্ব্যবহারের হার মাত্র ৯ শতাংশ। বছরের পর বছর বিশেষজ্ঞ এবং সুশীল সমাজ প্লাস্টিক বর্জ্যরে ক্রমবর্ধমান ব্যবহার নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ কর আসছে। তাদের সব শঙ্কা পাশ কাটিয়ে প্লাস্টিক উৎপাদনের চাকা ঘুরছে আগের গতিতে। আরও ভয়ের বিষয় হলো, প্লাস্টিক দূষণ কমাতে ২০০ দেশ সিদ্ধান্তে আসতে চাইলেও সেটি সম্ভব হয়নি। জাতিসংঘের এক বিশেষ সংস্থা চলতি সপ্তাহে দক্ষিণ কোরিয়ার বুসানে এ বৈঠকের আয়োজন করে। সংবাদ মাধ্যমের খবরে জানা যায়, প্রতিনিধিদের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে একটি অভিন্ন কর্মসূচি ও প্রস্তাব গ্রহণ করা যাবে। কিন্তু কোনোভাবেই সহমতে পৌঁছানো যায়নি। সাতদিন ধরে বৈঠক চলার পরও প্লাস্টিক দূষণ কমানোর উপযুক্ত পরিকল্পনা ও উদ্যোগের বিষয়গুলোতে একমত হতে পারেননি ২০০ দেশের প্রতিনিধিরা। ডয়চে ভেলে এক প্রতিবেদনে জানাচ্ছে, প্লাস্টিক পণ্য ব্যবহারে চতুরতা দেখায় জ্বালানি উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলো। তারা তাদের পণ্য প্লাস্টিকের জারে সরবরাহ করে। সেগুলোর পুনর্ব্যবহার নিশ্চিত করা হয় না। এ-সংক্রান্ত একটি মামলার উদাহরণ তুলে ধরে তারা। গ্লোবাল এনভায়রনমেন্টাল অ্যাকশন এনজিও র্যাপের সিনিয়র বিশেষজ্ঞ অ্যাডাম হেরিয়ট বলেছেন, জীবাশ্ম জ্বালানি কোম্পানিগুলো বাজারে প্লাস্টিকের প্রবেশের পরিমাণকে উল্লেখযোগ্যভাবে প্রভাবিত করে। তবে তাদের প্লাস্টিক পুনর্ব্যবহারের জন্য উপযুক্ত কি না সেই প্রশ্ন উঠছে।
মামলা
সেন্টার ফর ইন্টারন্যাশনাল এনভায়রনমেন্টাল ল’ (সিআইইএল)-এর গ্লোবাল পেট্রোকেমিক্যালস ক্যাম্পেইন ম্যানেজার ডেলফাইন লেভি আলভারেস বলেন, জীবাশ্ম জ্বালানি কোম্পানিগুলো টিকে থাকার উপায় হিসেবে জ্বালানি বা পরিবহনের জন্য ক্রমবর্ধমানভাবে পেট্রোকেমিক্যাল উৎপাদনের ওপর নির্ভর করছে। যার অর্থ হলো এসব কোম্পানি আরও বেশি প্লাস্টিক উৎপাদনে বিনিয়োগ করছে। যার পরিমাণ বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়া অঙ্গরাজ্যের তেল ও গ্যাস কোম্পানি এক্সনমোবিলের বিরুদ্ধে এই বছরের শুরুতে একটি আইনি অভিযোগ দায়ের করা হয়েছে। মামলায়, ক্যালিফোর্নিয়ার অ্যাটর্নি জেনারেল রব বন্টা অভিযোগ করেছেন এক্সনমোবিল বিশ্বের একক-ব্যবহারের প্লাস্টিকের সবচেয়ে বড় উৎপাদক। তারা আক্রমণাত্মকভাবে জীবাশ্ম-জ্বালানিভিত্তিক প্লাস্টিক পণ্য বিকাশে প্রচার চালাচ্ছে এবং এর ক্ষতিকারক পরিণতি আড়াল করছে। তারা প্রায় অর্ধ শতাব্দী ধরে ক্যালিফোর্নিয়ার জনগণকে প্রতারিত করেছে এ প্রতিশ্রুতি দিয়ে যে, পুনর্ব্যবহার করা ক্রমবর্ধমান প্লাস্টিক বর্জ্য সংকটের সমাধান করতে পারে এবং করবে। ভার্মন্ট ল’ অ্যান্ড গ্র্যাজুয়েট স্কুলের ইনস্টিটিউট ফর এনার্জি অ্যান্ড দ্য এনভায়রনমেন্টের অন্তর্বর্তী পরিচালক মার্ক জেমস বলেছেন, যদিও এক্সনমোবিল তাদের পণ্য খুচরা পর্যায়ের গ্রাহকদের কাছে সরাসরি বিক্রি করে না। তবে তেল ও গ্যাস কোম্পানিগুলো খুব ইচ্ছাকৃতভাবে তাদের পণ্য সরবরাহ করে প্লাস্টিকের বোতলে। যার মাধ্যমে তারা প্লাস্টিক পণ্যের বাজার তৈরি করে। অবশ্যই তাদের প্লাস্টিকের পুনর্ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। কিন্তু তারা সেটি করে না তবে মিথ্যা আশ্বাস দেয়। এক্সনমোবিল বলছে, ক্যালিফোর্নিয়ার কর্মকর্তারা জানেন তাদের পুনর্ব্যবহারযোগ্য পদ্ধতি কার্যকর নয় এবং তারা কাজ করতে ব্যর্থ হয়েছেন।
রিসাইকেল সংস্কৃতি
কয়েক বছর আগে বিবিসির এক প্রতিবেদনে বলা হয়, বিশ্বে প্লাস্টিক রিসাইক্লিংয়ের শীর্ষে রয়েছে জাপান। তারা বিশ্বাস করে মানুষ চাইলেই প্রকৃতির দূষণ বন্ধ করা সম্ভব। কিয়োকো কাওয়ামুরার জাপানের রিসাইক্লিং আর্মির একজন সৈনিক। তিনি বলেন, আমাদের শেখানো হয়েছে যেন আমরা পৃথিবীর জন্য ভালো কিছু করতে পারি। এ জন্য আমরা আবর্জনা পড়ে থাকা জায়গা পরিষ্কার রাখি এবং সবাই আবর্জনা ঠিক স্থানে ফেলছে কি না সেটাও নজরে রাখি। যদি এই নিয়মের হেরফের হয় তাহলে আমরা ওই ব্যক্তিকে সতর্ক করে দিই। জাপানে এ ধরনের প্রবণতার অন্যতম কারণ হলো, তারা জাতিগতভাবে প্রচুর প্লাস্টিক পণ্য ব্যবহার করে। বিস্কিট থেকে শুরু করে ফল, মিষ্টি বা সেদ্ধ কোনো খাবার, প্রতিটি আলাদাভাবে প্লাস্টিকে মোড়ানো থাকে। যুক্তরাষ্ট্রের পর জাপানেই সবচেয়ে বেশি প্লাস্টিক ব্যবহার হয়। প্লাস্টিক বর্জ্য বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ইউ জং সুর মতে, জাপান রিসাইক্লিংকে প্রয়োজনের তুলনায় বেশি প্রাধান্য দিচ্ছে। একে রিসাইক্লিং প্রোপাগান্ডা আখ্যা দিয়ে তিনি বলেন, জাপানের এই প্লাস্টিক বর্জ্য দিয়ে আসলেও কী করা হয় সেটা অনেকেরই অজানা। তিনি বলেন, জাপানিরা এই রিসাইক্লিংয়ের প্রতি অতিরিক্ত সিরিয়াস। তাদের ধারণা, তারা তখনই ভালো মানুষ হবে যখন তারা বেশি বেশি রিসাইকেল করতে পারবে। জাপানের প্লাস্টিক বর্জ্যরে একটি বড় অংশ এতদিন রিসাইক্লিংয়ের জন্য চীনে পাঠানো হতো। শিল্প কারখানার মালিক সোগামিসানও তার প্রক্রিয়াজাত প্লাস্টিকের ৮০ শতাংশই পাঠিয়ে দিতেন চীনে। পরে চীনা কর্র্তৃপক্ষ হঠাৎ এই প্লাস্টিক বর্জ্যরে আমদানি বন্ধ করে দেয়। তখন তার কারখানার পাশে জমে ওঠে পাহাড় সমান প্লাস্টিক বর্জ্য। তবে শিল্প কারখানার যে প্লাস্টিক বর্জ্য রয়েছে সেগুলোর রিসাইকেলের উদ্যোগ নিয়েছেন সোগামিসান। সেখানে প্লাস্টিকগুলোকে গলিয়ে, কেটে টুকরো করে পরে চূর্ণ করা হয়। পরে তৈরি করা হয় নানা ধরনের প্লাস্টিক পণ্য। তবে কারখানায় ব্যবহৃত প্লাস্টিক উন্নতমানের এবং পরিচ্ছন্ন হওয়ায় এগুলো সহজেই রিসাইকেল করা যায়। যা কিনা গৃহস্থালির ফেলে দেওয়া নিম্নমানের প্লাস্টিকের ক্ষেত্রে সম্ভব হয় না। এ কারণেই এতদিন গৃহস্থালির প্লাস্টিক বর্জ্য চীনে পাঠিয়ে দেওয়া হতো। তবে চীন এখন সেইসব প্লাস্টিকের আমদানি বন্ধ করে দেওয়ায় বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়েছে জাপানের রিসাইক্লিং অর্থনীতি। যে কারণে তারা প্লাস্টিকের পুনর্ব্যবহার সংস্কৃতি গড়ে তুলেছে।
তবে...
পরিবেশবাদী সংস্থা গ্রিনপিস ইউএসএ গত সোমবার এক বিবৃতিতে বলে, প্রতিদিন যুক্তরাষ্ট্র সরকার প্লাস্টিক দিয়ে বিশ্বে বন্যা বইয়ে দেওয়ার অনুমতি দেয়, আমাদের সবাইকে এর মূল্য দিতে হবে। যা গ্রহের জন্য মারাত্মক পরিণতি নিয়ে আসবে। নির্মমভাবে এই সংকটের প্রথম সারিতে থাকা ব্যক্তিদের ভোগাবে। তারা এক বিবৃতিতে বলেন, আমরা এক ঐতিহাসিক মোড়ে দাঁড়িয়ে আছি। আমাদের স্বাস্থ্য, জীববৈচিত্র্য এবং জলবায়ু রক্ষা করে এমন একটি কার্যকর প্লাস্টিক চুক্তি সুরক্ষিত করার সুযোগ নাগালের মধ্যেই রয়েছে। উচ্চাভিলাষী দেশগুলো সংখ্যাগরিষ্ঠের ইচ্ছাকে রোধ করছে। তারা অল্প কয়েকটি দেশের দ্বারা সমর্থিত জীবাশ্ম জ্বালানি এবং পেট্রোকেমিক্যাল শিল্পকে অনুমতি দিচ্ছে, যা উচিত নয়। একটি শক্তিশালী চুক্তি পারে মানুষ এবং গ্রহকে রক্ষা করতে, যা আমাদের একমাত্র বিকল্প। সংবাদমাধ্যমের খবরে জানা যায়, গ্রিন পিস দুই বছর আগের আরেক বিবৃতিতে জানিয়েছিল, অধিকাংশ প্লাস্টিকই রিসাইকেল করা সম্ভব নয়। তারা ওই প্রতিবেদনে জানায়, ২০২১ সালে যুক্তরাষ্ট্রে ৫১ মিলিয়ন টন প্লাস্টিক বর্জ্য উৎপাদন হয়। এর মধ্যে মাত্র ২.৪ মিলিয়ন টন প্লাস্টিক পুনর্ব্যবহার হয়েছে, শতাংশের হারে যা মাত্র ৫ শতাংশ। তারা প্রধান সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করেছে, যুক্তরাষ্ট্রের কোনো ধরনের প্লাস্টিক প্যাকেজিংই ইলেন ম্যাকআর্থার ফাউন্ডেশনস নিউ প্লাস্টিক ইকোনমি (ইএমএফ এনপিই) ইনিশিয়েটিভের পুনর্ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিকের সংজ্ঞার মধ্যে পড়ে না। সংবাদমাধ্যমের তথ্যে জানা যায়, ইএমএফ এনপিই মানদণ্ডে একটি পণ্যকে পুনর্ব্যবহারযোগ্য শ্রেণিভুক্ত করতে হলে সেটির রিসাইক্লিং রেট অবশ্যই ৩০ শতাংশ হতে হবে।
বাংলাদেশে
‘এনভায়রনমেন্টাল পলিসি ফর প্রোগ্রেস’ শীর্ষক গোলটেবিল আলোচনায় এসব কথা বলেন বক্তারা। গত সপ্তাহে তারা বলেছেন, দেশে ২০০৫ সালে জনপ্রতি প্লাস্টিক ব্যবহারের পরিমাণ ছিল তিন কেজি। ২০২০ সালে তা ৯ কেজিতে পৌঁছেছে। রাজধানীতে এ হার আরও বেশি। ঢাকায় বছরে জনপ্রতি ২৪ কেজি প্লাস্টিক ব্যবহৃত হচ্ছে। বক্তারা আরও বলেন, পরিবেশ মন্ত্রণালয় প্লাস্টিক দূষণ কমাতে উৎপাদকের বর্ধিত দায়িত্ব বা এক্সটেন্ডেড প্রোডিউসার রেসপনসিবিলিটি (ইপিআর) নীতি নিয়ে কাজ করছে। ২০২১ সালে করা হয় কঠিন বর্জ্য ব্যবস্থাপনা বিধিমালা। পরে সেই বিধিমালায় একবার ব্যবহার্য প্লাস্টিক (এসইউপি) পণ্যের একটি তালিকা সংযোজন করা হয়। এসব পণ্য নিষিদ্ধ করার পরিকল্পনা চলমান। তবে এ নীতি বাস্তবায়নে বিদ্যমান পরিবেশগত ও অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জকে আমলে না নিলে সার্বিকভাবে তা নেতিবাচক প্রভাব বয়ে আনতে পারে। বিবিসি জানাচ্ছে, পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্য ক্ষতির বিবেচনায়, ২০০২ সালে আইন করে পলিথিন শপিং ব্যাগের উৎপাদন, ব্যবহার, বিপণন ও বাজারজাতকরণের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করেছিল বাংলাদেশ সরকার। সে সময় বাংলাদেশ ছিল এমন পদক্ষেপ নেওয়া বিশ্বের প্রথম দেশ। যদিও পশ্চিমা বিশ্বের বিবেচনায় বাংলাদেশে পলিথিন ব্যবহারের শুরুটা অনেক পরের দিকে শুরু হয়েছিল। আইন করে নিষিদ্ধ করাটা কাজেও এসেছিল। ২০০৬ সাল পর্যন্ত মোটামুটি পলিথিন ব্যাগের ব্যবহার সেভাবে দেখা যায়নি। এরপর ধীরে ধীরে নজরদারির অভাবে বাজারে জায়গা ফিরে পায় পলিথিন। এনভায়রনমেন্ট অ্যান্ড সোশ্যাল ডেভেলপমেন্ট অর্গানাইজেশন (এসডো) নামের সংস্থার একটি হিসাবে প্রতিদিন ঢাকা শহরেই সাড়ে ৪ কোটি পলিথিন ব্যাগ বর্জ্য হিসেবে ফেলে দেওয়া হয়। গবেষণা অনুযায়ী খাবার, পানি ও বাতাস, প্রায় সবদিকেই প্লাস্টিকের কণা ছড়িয়ে পড়ে মানবদেহের জন্য স্বাস্থ্যঝুঁকি সৃষ্টি করে। দূরবর্তী পর্যায়ে বিবেচনা করলে চিকিৎসা বা ওষুধপত্রের খরচটাও কম হয় না যেটা হয়তো বিবেচনা করা হয় না। বেশি মাত্রায় প্লাস্টিক থেকে নিঃসৃত রাসায়নিকের সংস্পর্শে এলে মেদ, হাঁপানি, হৃদরোগ, পাকস্থলী, ফুসফুস অথবা দৃষ্টিশক্তি সমস্যা, চর্মরোগ আরও নানাবিধ রোগের কারণ হয় বলে উল্লেখ করা হয়েছে এসডোর প্রতিবেদনে। সেখানে বলা হয়েছে, বিষাক্ত রাসায়নিকের প্রভাবে ঢাকায় ওষুধ ও চিকিৎসাবাবদ মাসে প্রায় ৫০০ কোটি টাকা খরচ হয়।
