রাশিয়ার সর্বনাশ তুরস্কের পৌষ মাস

আপডেট : ১০ ডিসেম্বর ২০২৪, ০২:২৫ এএম

স্বৈরশাসক বাশারমুক্ত সিরিয়া জুড়ে আনন্দে মাতোয়ারা হয়ে যখন মানুষ সশব্দে গুলি ছুড়ছে, দোহা সম্মেলনে হাজির ইরান ও রাশিয়ার প্রতিনিধিদের কূটনৈতিক বন্দুক তখন চুপসে গেছে। দামেস্কের ঘটনা তাদের নিস্তেজ ও অপাঙ্ক্তেয় বানিয়ে ফেলেছে। এর মাত্র ১২ ঘণ্টা আগে সম্মেলনের এক ফাঁকে রাশিয়া ও ইরান তুরস্ককে সঙ্গে নিয়ে পাঁচটি আরব দেশের সঙ্গে বৈঠক করে। তাদের উদ্দেশ্য ছিল যৌথভাবে একটি বিবৃতি দেওয়া হবে। তাতে আহ্বান জানানো হবে যেন সামরিক অভিযান বন্ধ ও সিরিয়ার ভৌগোলিক অখ-তা রক্ষা করা হয়। বৈঠকে বাশার আল-আসাদের সরকার ও বিরোধীদের মধ্যে রাজনৈতিক সমাধানের জন্য শলাপরামর্শ করা হয়। পরিস্থিতির ওপর নিয়ন্ত্রণ এখনো আছে সেটা বোঝাতে এটাই ছিল তাদের শেষ চেষ্টা। তবে কূটনীতিবিদরা সিরিয়ার প্রেসিডেন্টের পরিণতি এবং দামেস্কের রাস্তায় শিগগিরই লড়াই শুরুর সম্ভাবনা নিয়েও উদ্বেগের সঙ্গে আলাপ করেন।

বৈঠকে রুশ প্রতিনিধি জানান যে, আসাদ অনমনীয় অবস্থা নিয়েছেন, তিনি বাস্তবতা মেনে নিতে রাজি হচ্ছেন না। তার রাজধানী আক্রমণ করতে উদ্যত সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোকে পৃষ্ঠপোষকতা করছে তুরস্ক কিন্তু তাদের সঙ্গে সংলাপের প্রয়োজনীয়তা তিনি অস্বীকার করছেন। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচিকে দেখে মনে হচ্ছিল তিনি শোকাহত ও কিংকর্তব্যবিমূঢ়। বৈঠক শেষ করে বেরোনোর ছয় ঘণ্টা পর ক্লান্ত বিধ্বস্ত কূটনীতিবিদরা খবর পান যে আসাদের পতন ঘটেছে। এত অল্প সময়ের মধ্যে এতজন কূটনীতিবিদ নিজেদের অকর্মা হিসেবে আবিষ্কার করলেন, এটা একটি দুর্লভ ঘটনা। শনিবার সম্মেলন শুরু হওয়ার পর রুশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই লাভরভকে সিরিয়ার ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রশ্ন করা হয়েছিল। প্রসঙ্গটি তার জন্য ক্রমশ অস্বস্তিকর হয়ে উঠল যখন গত এক দশকে দেশটিতে রাশিয়ার কী ভূমিকা সেটা জানতে চাওয়া হলো। আল-জাজিরার সাংবাদিক জেমস বেজ-এর প্রশ্নের তোড়ে একপর্যায়ে তিনি মুখ ফসকে মন্তব্য করলেন ‘যদি আপনি চান যে আমি বলি: হাঁ, সিরিয়ায় আমরা হেরে গেছি, আমাদের নাজেহাল অবস্থা, তাহলে আমরা আলাপ চালিয়ে যেতে পারি।’ তিনি নানাভাবে প্রমাণ করার চেষ্টা করলেন যে, সিরিয়ার নিয়ন্ত্রণ কোনোভাবেই জিহাদি গোষ্ঠীগুলোর হাতে পড়তে দেওয়া যাবে না এবং একমাত্র আসাদই এটা ঠেকাতে পারেন। তিনি বললেন, ‘বিদ্যমান চুক্তি লঙ্ঘন করে সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলোর হাতে বিভিন্ন এলাকার নিয়ন্ত্রণ ছেড়ে দেওয়াটা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না।’ লাভরভের ইঙ্গিতটা ছিল হায়াত তাহরির আল-শামের প্রতি। ইদলিব প্রদেশ থেকে প্রথমে আলেপ্পো, তারপর দামেস্কমুখী অবিশ্বাস্য অভিযানে যারা নেতৃত্ব দিয়েছে।

২০১৫ সালের ডিসেম্বর মাসে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে পাস হওয়া ২২৫৪ নম্বর প্রস্তাবটি কার্যকর করা কেন জরুরি সে কথা তিনি ঘুরেফিরে তুললেন। তারপর সিরিয়ায় গণতান্ত্রিকভাবে ক্ষমতা হস্তান্তরের আহ্বান জানালেন; যদিও আসাদ এ ব্যাপারে কখনোই আগ্রহ দেখাননি। যখন জিজ্ঞেস করা হলো আসাদ কেন ক্ষমতা হন্তান্তর প্রক্রিয়ায় সাহায্য করেননি, লাভরভ জবাব দিলেন: ‘কেউই নিখুঁত নয়।’ আসাদকে বাঁচানোর জন্য জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের প্রস্তাবে রাশিয়া যে ১৭ বার ভেটো দিয়েছে সে ব্যাপারে তিনি টুঁ শব্দটিও করলেন না। সাক্ষাৎকার গ্রহণকারী যখন তারতুসে রুশ নৌঘাঁটি ও হামেইমিম বিমানঘাঁটির ভবিষ্যৎ কী হবে তা জানতে চাইলেন, লাভরভ অস্বস্তির সঙ্গে এড়িয়ে যেতে চাইলেন। তিনি বললেন, কী ঘটবে সেটা নিয়ে আন্দাজ-অনুমানের কারবারের মধ্যে তিনি নেই। তিনি কেবল এতটুকু জানেন যে, সন্ত্রাসীদের ঠেকানোর জন্য যা যা করা প্রয়োজন তার সবই মস্কো করছে। আরও যোগ করলেন, সিরিয়ার পরিণতি যদি লিবিয়া এবং ইরাকের মতো হয় তাহলে সিরিয়ার জনগণের জন্য তার দুঃখ হবে। বিশৃঙ্খল বিপ্লবের ফলে স্বৈরশাসকের পতন ঘটার পর লিবিয়া এবং ইরাকে দীর্ঘদিন ধরে গৃহযুদ্ধ হয়েছিল।  ২২৫৪ নম্বর প্রস্তাব অনুযায়ী যদি সুষ্ঠু নির্বাচন হয়, তাহলে আসাদ জয়লাভ করবেন তিনি কি সত্যিই তা বিশ্বাস করেন? এই প্রশ্নের জবাবে লাভরভ চট করে প্রসঙ্গ বদলে সিরিয়ার পূর্বাঞ্চলে মার্কিন উপস্থিতি নিয়ে বলতে শুরু করলেন যে, ঐতিহাসিকভাবে যেসব এলাকা আরব গোত্রগুলোর অধীনে ছিল সেখানেও কুর্দি বিচ্ছিন্নতাবাদীদের তৎপরতাকে আমেরিকা সমর্থন করছে। তেল ও খাদ্যশস্য হাতিয়ে নিয়ে বিশ্ববাজারে বিক্রি করছে এবং আধাখেঁচড়া যে রাষ্ট্রটি তারা তৈরি করছে সেখানে এই অর্থ ঢালছে।

এখনকার দুনিয়ায় লাভরভ সম্ভবত সবচেয়ে অভিজ্ঞ কূটনীতিবিদ কিন্তু কোনো সাক্ষাৎকারে তিনি এর আগে এত দৃশ্যমানভাবে হেনস্তা হননি। দোহার সম্মেলনে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আরাগচিও ঘুরে ঘুরে আলাপ করছিলেন। তিনি বারবার বলছিলেন যে আসাদ এ যাত্রায়ও টিকে যেতে পারেন এবং সব বহিঃশক্তি সিরিয়ার ভৌগোলিক অখ-তা রক্ষার ব্যাপারে ঐকমত্যে পৌঁছেছে। কিন্তু তাকে দেখে মনে হচ্ছিল ভূতে পাওয়া এক মানুষ যার হাত থেকে পরিস্থিতির লাগাম আচমকা ফসকে গেছে। আরব বিশ্বে তেহরানের সর্বশেষ দুর্গ ইরাক। আসাদকে উদ্ধারে তাদের হস্তক্ষেপ চেয়ে গত কয়েকদিন যাবৎ আরাগচির যাবতীয় প্রচেষ্টা ভেস্তে গেছে। সিরিয়ায় ইরানের এক যুগের উপস্থিতির অবসান ঘটতে যাচ্ছে। লেবানন ও হিজবুল্লাহর সঙ্গে ভূ-সংযোগও রুদ্ধ হয়ে যাবে। ইরানের অগ্রমুখী প্রতিরক্ষা কৌশল ধসে পড়েছে এবং কীভাবে তারা সরকার টিকিয়ে রাখবে তা নতুন করে ভাববার সময় হয়তো এসেছে। পক্ষান্তরে তুর্কি পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদান যিনি আবার তুরস্কের প্রাক্তন গোয়েন্দা প্রধানও বটে, নিজেকে সফরসঙ্গীদের ভিড়ে আড়াল করে রাখলেন। প্রকাশ্যে খুব কম কথা বললেন। তিনি আঁচ করতে পারছিলেন, আসাদের পতন ঘটলে সবচেয়ে বেশি লাভবান হবে তার দেশ। তুরস্ক সিরীয় মিলিশিয়াদের জোট সিরিয়ান ন্যাশনাল আর্মিকে হাতে রেখেছে, আবার হায়াত তাহরির আল-শামের সঙ্গেও তাদের এক রকম বোঝাপড়া আছে। তবে ক্ষমতার পিছু পিছু হাজির হয় দায়িত্বের চাপ। ওই অঞ্চলে অন্য যে-কোনো দেশের তুলনায় তুরস্কই পারে সিরিয়ার জনগণকে ঐকমত্যের ভিত্তিতে একটি স্বাধীন সরকার গঠনে সাহায্য করতে। মুক্তির আশায় দীর্ঘ সংগ্রামের পর যা সিরীয়দের ন্যায্য প্রাপ্য। (সংক্ষেপিত)

লেখক : ব্রিটিশ পত্রিকা দ্য গার্ডিয়ান-এর কূটনীতি বিষয়ক সম্পাদক

দ্য গার্ডিয়ান থেকে ভাষান্তর : রেজওয়ানুর রহমান কৌশিক

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত