পৃথিবীর মানচিত্রে কেবল বাংলাদেশেরই রয়েছে স্বাধীনতা এবং বিজয় দিবস। যে কারণে বছরের এই দুটি দিন আমাদের কাছে নতুন বার্তা নিয়ে আসে। এবারও এসেছে। দুই যুগের পাকিস্তানি শাসনের অবসান ঘটিয়ে ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর বিশ্বের মানচিত্রে নতুন দেশ হিসেবে স্থান করে নিয়েছিল বাংলাদেশ। তার ৫৩তম বার্ষিকী উদযাপন হচ্ছে আজ। বাঙালি জাতির হাজার বছরের শৌর্যবীর্য এবং বীরত্বের এক অবিস্মরণীয় এই দিন। বীরের জাতি হিসেবে আত্মপ্রকাশসহ পৃথিবীর মানচিত্রে ‘বাংলাদেশ’ নামে একটি স্বাধীন ভূখণ্ডের নাম জানান দেওয়ার দিন আজ।
২০২৪ সালের প্রেক্ষাপটে আমরা নতুন সম্ভাবনাময় বাংলাদেশের প্রথম বিজয় দিবস উদযাপন করছি। যদি আবার সেই একাত্তরের চেতনার আলোয় আলোকিত হতে চাই, তবে সেই চেতনায় জড়িয়ে থাকবে নতুন দিনের আহ্বান, নতুন সম্ভাবনা। তরুণ প্রজন্মের চিন্তাকে সামনে রেখে, সময়ের প্রয়োজনে আজ দেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট নতুন চেহারা নিয়েছে। আমরা চাই এই পরিবর্তন জাতির উন্নতি, ন্যায়বিচার এবং গণতান্ত্রিক অধিকার প্রতিষ্ঠার পথে সাফল্য নিয়ে আসবে। পরিবর্তিত এই সম্ভাবনার দিনে আবার আমাদের বৈষম্যহীন এক নতুন বাংলাদেশ গড়ার প্রতিজ্ঞা করতে হবে। যুবসমাজ, তরুণ প্রজন্ম আজ আশার আলো জ্বালিয়ে রেখেছে। তাদের মধ্যে লুকিয়ে রয়েছে যে সম্ভাবনার শক্তি, সেই শক্তিই ভবিষ্যতের চাবিকাঠি। এই প্রজন্মের কাঁধেই দেশের উন্নয়নের ভার, তাদের হাত ধরেই আমরা যেতে চাই এক নতুন-আধুনিক-স্বপ্নময় দিগন্তে।
কিন্তু দেশের যেসব বিষয় বারবার উন্নয়ন এবং সমৃদ্ধিকে বাধাগ্রস্ত করছে, তার মধ্যে প্রবল আকার ধারণ করেছে দুর্নীতি। প্রশাসনের রন্ধ্রে রন্ধ্রে দুর্নীতির রাহুকে ধ্বংস করতে না পারলে, কোনোভাবেই বিজয়কে সর্বজনীন করা যাবে না। অর্থনীতির গতিশীলতা অব্যাহত রাখতে, এর সঙ্গে জড়িত সব প্রতিষ্ঠানে প্রশাসনিক স্বচ্ছতা নিয়ে আসতে হবে। মনে রাখতে হবে, স্বাধীনতার জন্য বাঙালিকে দীর্ঘ সংগ্রামের পথ পাড়ি দিতে হয়েছে। ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের অবসানের পর দ্বিজাতিতত্ত্বের ভিত্তিতে যে পাকিস্তান রাষ্ট্রের অভ্যুদয় হয়েছিল, সেখানে বাঙালিদের ওপর নেমে এসেছিল পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকদের শোষণ-নির্যাতন।
মহামুক্তির আনন্দ ঘোর এই দিনে এক নতুন উল্লাস জাতিকে প্রাণসঞ্চার করে সজিবতা এনে দেয়। যুগ যুগ ধরে শোষিত-বঞ্চিত বাঙালি চোখে আনন্দাশ্রু আর ইস্পাত কঠিন দৃঢ়তা নিয়ে এগিয়ে যায় সামনে। বিন্দু বিন্দু স্বপ্নরা অবশেষে মিলিত হয় জীবনের মোহনায়। বিশ্বকবির সোনার বাংলা, নজরুলের বাংলাদেশ, জীবনানন্দের রূপসী বাংলা, রূপের তাহার নেইকো শেষ, বাংলাদেশ আমার বাংলাদেশ। বাঙালি যেন খুঁজে পায় তার আপন সত্তাকে। যে আত্মত্যাগে আজকের এই দিন সম্ভব হয়েছে, সেই বীরদের আত্মার কাছে আমাদের প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হওয়া উচিত যে, আমরা জাতিকে সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে নিয়ে যাব। দেশের প্রতিটি নাগরিকের অধিকার রক্ষা, সাম্যের ভিত্তিতে সমাজ নির্মাণ এবং সুষ্ঠু গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা গড়ে তোলার অঙ্গীকার যেন আমরা পালন করি। বিজয় দিবসের চেতনা আমাদের শুধু অতীতের সংগ্রামের কথা মনে করিয়ে দেয় না, বরং আমাদের সামনে একটি নতুন দিনের সম্ভাবনার দিগন্ত উন্মুক্ত করে। আমরা যেন সব রকম ভেদাভেদ ভুলে, একসঙ্গে কাজ করে দেশকে সমৃদ্ধির পথে নিয়ে যেতে পারি। আমাদের তরুণ প্রজন্ম যেন তাদের দক্ষতা, মেধা এবং পরিশ্রম দিয়ে দেশের নাম উজ্জ্বল করতে পারে, সেই দায়িত্ব আমাদেরই।
দেশের মানুষের কল্যাণের চিন্তা, উন্নয়নের গতি চালু রাখা এবং পারস্পরিক রাজনৈতিক সহাবস্থানই হোক আজকের বিজয় দিবসের প্রতিজ্ঞা। সব মানুষের কল্যাণ হোক, আমরা যেন সর্বজনীন হয়ে মিলিত হই আপন সত্তায়। নতুন প্রেক্ষাপটে, নতুন সম্ভাবনা নিয়ে এগিয়ে যাক বাংলাদেশ।
