পাকবাহিনীর আত্মসমর্পণ

সেদিন কেন অনুপস্থিত ছিলেন জেনারেল ওসমানী?

আপডেট : ১৬ ডিসেম্বর ২০২৪, ১১:৪২ পিএম

আজ ১৬ ডিসেম্বর বাংলাদেশের বিজয় দিবস। স্বাধীনতা যুদ্ধের বিজয়ের দিন। ১৯৭১ সালে ৯ মাস যুদ্ধের পর এই দিনে দখলদার পাকিস্তানি বাহিনী ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে যৌথবাহিনীর কাছে আত্মসমর্পণ করে। তখন ভারতের ইস্টার্ন কমান্ডের অধিনায়ক জগজিৎ সিং অরোরাকে আমাদের মুক্তিবাহিনী ও ভারতীয় মিত্রবাহিনীর যৌথ কমান্ডের প্রধান বলে ঘোষণা করা হয়েছিল। ফলে তাদের কাছে পাকবাহিনীর আত্মসমর্পণকে যৌথবাহিনীর কাছে আত্মসমর্পণ বলে ধরে নেওয়া হয়। ১৬ ডিসেম্বর অপরাহ্নের সেই ঐতিহাসিক মাহেন্দ্রক্ষণে মুক্তিবাহিনীর সর্বাধিনায়ক জেনারেল মহম্মদ আতাউল গণি ওসমানী অনুপস্থিত ছিলেন। স্বাধীনতার ৫৩ বছর পরও আত্মসমর্পণ অনুষ্ঠানে জেনারেল ওসমানীর অনুপস্থিতি নিয়ে চলছে নানা বিতর্ক। অথচ জেনারেল ওসমানী তার জীবদ্দশাতেই এ বিষয়ে তার অবস্থান ব্যাখ্যা করেছেন। তারপরও মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে লেখা বিভিন্ন গ্রন্থ ও বিভিন্ন জনের সাক্ষাৎকারেও ফুটে উঠে নানা ধরনের অভিমত।এ বিষয়ে কিছু তথ্য উপাত্ত পাঠকদের জন্য তুলে ধরা হল— 

প্রয়াত বীর মুক্তিযোদ্ধা ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী ‘নতুন দিগন্ত’ সাময়িকীতে এক স্মৃতিচারণে বলেছেন, যুদ্ধ চলাকালীন চিকিৎসাধীন সেক্টর কমান্ডার খালেদ মোশাররফকে দেখতে তিনি লক্ষ্নৌ গিয়েছিলেন। কলকাতা ফেরার পথে বিমানে আওয়ামী লীগ নেতা আবদুস সামাদ আজাদের সঙ্গে তার দেখা হয়। তিনি দিল্লি থেকে কলকাতায় ফিরছিলেন। আবদুস সামাদ আজাদ তাদের দু’জনের দেখা হওয়ার বিষয়টি জাফরুল্লাহকে গোপন রাখতে বলেন। এতে জাফরুল্লাহর সন্দেহ হয়। তিনি সামাদ আজাদের কাছে জানতে চান- ‘দিল্লিতে কী করলেন? কোনো চুক্তি হয়েছে কি?’ এরপর বিমানে বসে তাদের দু’জনের মধ্যে যে আলোচনা হয়, সামাদ আজাদের নিষেধ অগ্রাহ্য করে কলকাতায় ফিরে এসে ওসমানীকে সব বলে দেন জাফরুল্লাহ। শুনে ক্ষুব্ধ হন ওসমানী। 

এরপর যা ঘটেছিল, জাফরুল্লাহ’র ভাষায়- ‘‘ওসমানী সাহেব সোজা প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন সাহেবের ঘরে ঢুকে উচ্চস্বরে কথা বললেন— ‘You sold the country. I will not be a party to it’. তাজউদ্দীন সাহেব ওসমানীকে শান্ত করার চেষ্টা করলেন, নিচুস্বরে কী বললেন আমি শুনতে পেলাম না। আমি দরজার বাইরে ছিলাম।’’

জাফরুল্লাহ চৌধুরীর বর্ণনা করেন, ‘কয়েকদিন পর উভয়ের মধ্যে বাকবিতণ্ডা হয় ভারতীয় একটি প্রস্তাবনা নিয়ে। ডিসেম্বরে দেশ স্বাধীন হলে আইনশৃঙ্খলা স্থাপনের জন্য বেশ কয়েকজন বাঙালি প্রশাসক ও পুলিশ অফিসাররা বাংলাদেশের সব বড় শহরে নির্দিষ্ট মেয়াদে অবস্থান নেবেন।’

ওসমানী সাহেব বললেন, ‘এটা হতে পারে না, আমাদের বহু বাঙালি অফিসার আছেন। কেউ কেউ পাকিস্তানে আটকা পড়েছেন। তারা নিশ্চয়ই ফিরে আসবেন।’ ওসমানী সাহেবের সঙ্গে প্রবাসী বাংলাদেশ সরকারের মন্ত্রীদের মতপার্থক্যের কথা জেনে ভারতীয়রা আরও সতর্ক হলেন। ওসমানী সাহেবকে তারা কড়া নজরে রাখলেন। কাগজে-কলমে যৌথ কমান্ডের কথা থাকলেও বস্তুত তাঁরা ওসমানী সাহেবকে একাকী করে দিলেন। ভারতীয়রা সব কমান্ড নিয়ন্ত্রণ করতে শুরু করলেন। ওসমানী সাহেবের সঙ্গে ভারতীয় কর্তৃপক্ষের সম্পর্কের দ্রুত অবনতি ঘটলো।’

কলকাতায় ফিরে জেনারেল ওসমানীকে কী বলেছিলেন জাফরুল্লাহ, তা তিনি পরিষ্কার করে ব্যাখ্যা দেননি। তবে ধারণা করা হয়, তাজউদ্দীনের ওপরে ওসমানীর সেদিনের ক্ষোভের কারণ ছিল দু’দেশের মধ্যে সম্পাদিত সাত দফা চুক্তি, যা ছিল গোপনীয়। যুদ্ধ চলাকালে সরকারের শীর্ষ পর্যায়ের ২/৪ জন অবগত থাকলেও ভারতে আশ্রিত বেশির ভাগ বাংলাদেশির কাছে এই চুক্তির বিষয়টি ছিল অজানা। 

ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরীর ভাষ্যমতে, '১৬ ডিসেম্বর সকালে ব্রিগেডিয়ার গুপ্ত’র কাছে তারা প্রথম জানতে পারেন যে, ওইদিন বিকালে ঢাকায় পাকিস্তানি সেনারা আত্মসমর্পণ করবে। এ খবর শোনার পর জেনারেল ওসমানী ছিলেন চুপচাপ, কোনো কথা বলেননি।

এরপরের ঘটনা সম্পর্কে জাফরুল্লাহ লিখেছেন, ‘‘জেনারেল ওসমানীর এডিসি আমাদের প্রিয় নেতা শেখ মুজিবুর রহমানের বড় ছেলে শেখ কামাল আমাকে বলল, ‘স্যার কখন রওনা হবেন, তা তো বলছেন না। জাফর ভাই, আপনি যান, জিজ্ঞেস করে সময় জেনে নিন।’... আমি গিয়ে জিজ্ঞেস করায় ওসমানী সাহেব বললেন, ‘I have not yet received PM’s order to move to Dacca.’ আমি বললাম, আপনাকে অর্ডার দেবে কে? আপনি তো মুক্তিযুদ্ধের সর্বাধিনায়ক। ওসমানী সাহেব বললেন, ‘I decide tactics, my order is final for firing, but I receive orders from the cabinet through PM, Mr. Tajuddin Ahmed.’ কথাগুলো বললেন অত্যন্ত বিষণ্ণ কণ্ঠে। ... ঘণ্টাখানেক পর পুনরায় ওসমানী সাহেবের সামনে দাঁড়ানোর পরপরই অত্যন্ত বেদনার্ত কণ্ঠে যা বললেন তার মর্মার্থ হলো, ‘আমরা ঢাকার পথে অগ্রসর হবার নির্দেশ নেই। আমাকে বলা হয়েছে, পরে প্রবাসী সরকারের সঙ্গে একযোগে ঢাকা যেতে, দিনক্ষণ তাজউদ্দীন আহমেদ জানাবেন।’ গণতন্ত্রের আচরণে যুদ্ধের সেনাপতি প্রধানমন্ত্রীর অধীন, এটাই স্বাভাবিক বিধান। এরপর ওসমানী সাহেব কামালকে ডেকে সবাইকে তৈরি হতে বললেন। আধাঘণ্টার মধ্যে আমাদের আকাশে নিরুপদ্রব যাত্রা। ভারতীয় হেলিকপ্টারে সিলেটের পথে চলেছি।’’

প্রাবন্ধিক আনোয়ার পারভেজ হালিম তার এক লেখায় উল্লেখ করেন, ‘মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে প্রবাসী বাংলাদেশ সরকারের প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমেদের অফিস ছিল কলকাতা নগরীর ৮ নম্বর থিয়েটার রোডে। একই অফিসে বসতেন বাংলাদেশ বাহিনীর প্রধান সেনাপতি জেনারেল ওসমানী। ভারতীয় সেনাবাহিনীর ইস্টার্ন কমান্ডের হেড কোয়ার্টার ছিল ফোর্ড উইলিয়ামে। সেখানে বসতেন ইস্টার্ন কমান্ডের প্রধান লে. জেনারেল অরোরা। এ দুই বাহিনীর দুই প্রধানের মধ্যে সচরাচর দেখা-সাক্ষাৎ হতো না। বৈঠকও হতো কম। নয় মাসে ওসমানী ফোর্ড উইলিয়ামে গিয়েছিলেন একবার। তবে দুই বাহিনীর মধ্যে তথ্য আদান-প্রদানের জন্য একজন লিয়াজোঁ অফিসার ছিলেন। কর্নেল পি দাস নামের ওই গোয়েন্দা অফিসারও বসতেন থিয়েটার রোডে বাংলাদেশ সরকারের কার্যালয়ে। ফোর্ড উইলিয়ামের যে কোনো সিদ্ধান্ত কর্নেল দাস জানাতেন প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীনকে। পরে প্রধানমন্ত্রী তা জানাতেন ওসমানীকে। ভারতীয় পক্ষের সিদ্ধান্তগুলো এভাবেই ভায়া হয়ে মুক্তিযুদ্ধের প্রধান সেনাপতির কাছে আসতো। প্রবাসী বাংলাদেশ সরকারের এবং মুক্তিযুদ্ধে সহায়তাকারী দেশ ভারতের অনেক সিদ্ধান্তের সঙ্গে তিনি একমত হতে পারতেন না। ওসমানীর স্বতন্ত্র মনোভাবের কারণে ভারত সরকারের নীতি নির্ধারকদের কেউ কেউ তাঁর ওপরে অসন্তুষ্ট ছিলেন।

পরবর্তীতে যুদ্ধকালীন সরকারের দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের এবং বিদেশি লেখকদের লেখায়ও এসব তথ্য উঠে এসেছে। একজন ভারতীয় জেনারেল মনে করতেন- ‘‘ওসমানী একজন ‘ডিফিক্যাল্ট পারসন টু গেইন উইথ’, অর্থাৎ তিনি এমন একজন ব্যক্তি, যার সঙ্গে মেলামেশা কঠিন। তিনি এও মনে করেন, ওসমানী ছিলেন ‘উদ্ধত ও অহংকারী’। সুতরাং, প্রধান সেনাপতি হিসেবে সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও যুদ্ধ পরিচালনা ওসমানীর জন্য যে খুব মসৃণ ছিল, তা বলা যায় না। বলা বাহুল্য, সমর নায়ক হিসেবে মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনা ও যুদ্ধের কলা-কৌশল নির্ধারণে ওসমানীর কিছু দুর্বলতা ছিল। পাকিস্তান আর্মির বিরুদ্ধে যুদ্ধ হবে গেরিলা পদ্ধতিতে, নাকি প্রথাগত (কনভেনশনাল) পদ্ধতিতে- এ নিয়ে দোটানায় ছিলেন। ওসমানী চাইতেন, যুদ্ধ হবে প্রথাগত মিলিটারি পদ্ধতিতে। কিন্তু শুরু থেকে মুক্তিযুদ্ধ ছিল গেরিলানির্ভর। প্রবাসী সরকার এবং বাংলাদেশ বাহিনীর বেশিরভাগের সমর্থনও ছিল গেরিলা যুদ্ধের পক্ষে। শুরুতে ভারতও বাংলাদেশি যুবকদের গেরিলা প্রশিক্ষণ এবং অস্ত্রশস্ত্র দিয়ে তাদের দেশের ভেতরে পাঠাতো। অন্যদিকে ওসমানীর আগ্রহে মুক্তিযুদ্ধের সেক্টরগুলো গঠন করা হয়েছিল। ‘ফলে মুক্তিযুদ্ধের নির্দিষ্ট কোনো চরিত্র ছিল না। কখনো গেরিলা আবার কখনো প্রথাগত যুদ্ধে রূপ নিয়েছে।’ এসব নিয়ে বাংলাদেশ বাহিনীর মধ্যে অনেক ভুল বোঝাবুঝি হয়েছে। ওসমানীর বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল- তিনি সিদ্ধান্ত গ্রহণে সিরিয়াস ছিলেন না, উপরন্তু বিলম্ব করতেন। তিনি যুদ্ধের ময়দানে যেতেন না। একারণে একপর্যায়ে সেক্টর পর্যায়ের কেউ কেউ তার পদত্যাগের দাবিও তোলেন। এ নিয়ে ওসমানী ছিলেন ক্ষুব্ধ। মত দ্বৈততার কারণে তিনি পদত্যাগের আগ্রহ প্রকাশ করেন। এসব পরিস্থিতি দক্ষতার সঙ্গে মোকাবিলা করতেন তাজউদ্দীন আহমেদ।’

...কলকাতার পুরো সময়টা এভাবেই ঘরে-বাইরে প্রতীক‚ লতার মধ্য দিয়ে এগোতে থাকে সমরনায়কের যুদ্ধজীবন। এরই মধ্যে চূড়ান্ত যুদ্ধের পরিকল্পনা করা হয়। নভেম্বরে বাংলাদেশ ও ভারতীয় বাহিনীর সমন্বয়ে যৌথ নেতৃত্ব গঠনের প্রসঙ্গটি সামনে চলে আসে। কিন্তু জেনারেল ওসমানী সরাসরি যৌথ নেতৃত্ব গঠনের বিরোধিতা করেন। মুক্তিযুদ্ধে বাংলাদেশ বাহিনীর উপ-প্রধান গ্রুপ ক্যাপ্টেন একে খন্দকারের ভাষ্যে জানা যায়, ‘যৌথ সামরিক নেতৃত্ব গঠনের বিষয়টি প্রথমেই ওঠে রাজনৈতিক পর্যায়ে প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীনের কাছে। তিনি এই বিষয়টির দায়িত্ব দেন কর্নেল ওসমানীকে। তিনি এই যৌথ নেতৃত্ব গঠনের ঘোরতর বিরোধিতা করেছিলেন। ওসমানী ভারত-বাংলাদেশ একটি যৌথ সামরিক নেতৃত্ব হোক, এটা চাননি। তাঁর মনোভাব ছিল, আমাদের সামরিক তৎপরতা আমরা করবো, মুক্তিবাহিনীর সঙ্গে ভারতীয় বাহিনীর যৌথ নেতৃত্ব হবে না। শেষে যুদ্ধ পরিস্থিতির আরও অবনতি হলে রাজনৈতিক পর্যায়ে এই যৌথ সামরিক নেতৃত্ব গঠনের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। এই সময় কর্নেল ওসমানী পদত্যাগ করেন।

এর আগে তিনি কয়েকবার পদত্যাগ করেছেন মৌখিকভাবে। যুদ্ধের এই চূড়ান্ত ও সংকটজনক পর্যায়ে মৌখিকভাবে পদত্যাগের কথা বলার পর ওসমানী সাহেবকে তাজউদ্দীন আহমেদ লিখিতভাবে পদত্যাগ করতে বলেন। তখন তিনি আর লিখিত পদত্যাগপত্র দেননি। এরপর থেকে বলা যায়, তিনি নিষ্ক্রিয় থাকতেন এবং কোনো বিষয়ে কোনো উৎসাহ দেখাতেন না।

যুদ্ধের এক পর্যায়ে ওসমানীকে  কড়া নজরদারিতে রাখা হতো, সব ধরনের দায়িত্ব থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলা হয়েছিল।  তাঁকে যুদ্ধের ময়দানেও যেতে দেয়া হতো না। ওসমানীর জন্য এই পরিস্থিতি ছিল বিব্রতকর এবং অপমানজনক। তারপরও ভারতের এবং প্রবাসী বাংলাদেশ সরকারের অনেক সিদ্ধান্তের জোরালো প্রতিবাদ করতেন তিনি, তেমন দৃষ্টান্তও আছে।

৩ ডিসেম্বর পাকিস্তান বাহিনীর বিরুদ্ধে বাংলাদেশ-ভারত যৌথ বাহিনী চূড়ান্ত যুদ্ধ শুরু করে। তারা পরিকল্পিতভাবে চতুর্দিক থেকে বাংলাদেশে ঢুকে পড়ায় পাকিস্তান বাহিনী একের পর এক পরাজিত হয়ে পিছু হটতে থাকে। বাংলাদেশের অনেক এলাকা যৌথবাহিনীর দখলে চলে আসে। ওইসব এলাকাকে মুক্তাঞ্চল ঘোষণা করা হয়। যুদ্ধ খুব দ্রুতগতিতে পরিণতির দিকে ধাবিত হচ্ছিল। ওসমানী সিদ্ধান্ত নিলেন তিনি মুক্তাঞ্চল পরিদর্শনে যাবেন। ব্রিগেডিয়ার উজ্জ্বল গুপ্তের তত্ত্বাবধানে একটি এম-৮ হেলিকপ্টারে চড়ে ১৩ ডিসেম্বর বিকালে তারা কুমিল্লায় পৌঁছান, উঠেছিলেন ওয়াপদার গেস্ট হাউসে। একে খন্দকারের বর্ণনায় এর সমর্থন পাওয়া যায়।

তিনি জানান, ‘কর্নেল ওসমানী ১৩ ডিসেম্বর সিলেটের মুক্তাঞ্চল পরিদর্শনের পরিকল্পনা করেন। যাত্রার আগে তাঁকে আমি বলেছিলাম, ‘স্যার, আপনার এখন কোথাও যাওয়া ঠিক হবে না। দ্রুতগতিতে যুদ্ধ চূড়ান্ত পরিণতির দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। যেকোনো সময় যেকোনো পরিস্থিতির উদ্ভব হতে পারে। কর্নেল ওসমানী তাঁর পরিকল্পনা পরিবর্তন না করে সিলেটের উদ্দেশে রওনা হয়ে যান।’

বাংলাদেশ পুলিশের সাবেক আইজি ও স্বরাষ্ট্র সচিব আবদুল খালেকের এক বর্ণনায় এমন তথ্য পাওয়া যায়। ১৯৭১ সালে আবদুল খালেক ছিলেন সারদা পুলিশ অ্যাকাডেমির অধ্যক্ষ। মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে তিনি ভারতে গিয়ে মুজিবনগর সরকারে যোগ দেন। তিনি লিখেছেন, ‘‘বিজয় যখন দিবালোকের মতো স্পষ্ট, তখন আত্মসমর্পণ উৎসবে আমাদের যোগদান সম্পর্কে যে কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়, তাতে স্থির করা হয়েছিল ১৬ ডিসেম্বর কর্নেল ওসমানী, রুহুল কুদ্দুস ও আমি হেলিকপ্টারে ভারতীয় কমান্ডারকে নিয়ে ঢাকায় পৌঁছাবো। দমদম এয়ারপোর্টে পৌঁছার জন্য যে সময় দেয়া হয়েছিল, তার ঘণ্টাখানেক আগে আমাদের প্রশাসনে কী যেন একটি হাশ হাশ পরিস্থিতির উদ্ভব হয়। আমি তার কিছুই আঁচ করতে পারিনি। রুহুল কুদ্দুস শুধু জানালেন যে, ‘কর্নেল ওসমানীকে কোথাও খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না।’ কাজেই ডেপুটি কমান্ডার ইন চিফ একে খন্দকারকে খুঁজে বের করা হয়েছে। শুধু তিনি ঢাকায় যাবেন। আমরা দু’জন যাবো না। কর্নেল ওসমানীর সঙ্গে কার কী মতভেদ ঘটেছিল তা আর জানতে পারিনি।’’

১৯৭১ সালে কলকাতায় প্রবাসী বাংলাদেশ সরকারের প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদের একান্ত সচিব ছিলেন ফারুক আজিজ খান। তিনি তাঁর 'বসন্ত ১৯৭১' বইয়ের  ১৯৩ পৃষ্ঠায় উল্লেখ করেন, ‘১৬ ডিসেম্বর দুপুর সাড়ে ১২টায় তিনি কর্নেল দাসের কাছে জানতে পারেন, ফোর্ড উইলিয়াম থেকে খবর এসেছে যে, ওইদিন বিকালেই ঢাকায় পাকিস্তানিরা আত্মসমর্পণ করবে। তিনি এ খবরটি প্রধানমন্ত্রীকে দিলেন এবং তার কাছে জানতে চাইলেন, ‘আমাদের পক্ষে আত্মসমর্পণ অনুষ্ঠানে কে প্রতিনিধিত্ব করবে।’

ফারুক আজিজ খানের ভাষায়, ‘প্রধানমন্ত্রী নিচু স্বরে জানতে চাইলেন, ‘কর্নেল ওসমানী কোথায়?’ আমি জানালাম, তিনি ভারতীয় সেনাবাহিনীর ব্রিগেডিয়ার উজ্জ্বল গুপ্ত এবং বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর চিফ অব স্টাফ (সিজিএস) লে. কর্নেল আবদুর রবের সঙ্গে কলকাতার বাইরে গেছেন। তাঁরা একটা হেলিকপ্টারে চেপে সিলেটের দিকে গেছেন। আমরা এপর্যন্ত জানতাম। ...‘হাউ আনলাকি হি ইজ।’ প্রধানমন্ত্রী বললেন। ‘সারাটা বছর তিনি নিজের অফিসে কাটালেন। আর আজ এমন দিনে তিনি এখানে নেই।’ একটু বিরতি দিয়ে তিনি বললেন, ‘জেনারেল অরোরার সঙ্গে গ্রুপ ক্যাপ্টেন খন্দকার যাবেন বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর প্রতিনিধিত্ব করতে।”

আত্মসমর্পণ অনুষ্ঠানে জেনারেল ওসমানীর অনুপস্থিতি প্রসঙ্গে মেজর জেনারেল (অব.) কে এম শফিউল্লাহ এক সাক্ষাৎকারে  বলেন, ‘১৬ ডিসেম্বর আমি ছিলাম ঢাকার ডেমরা এলাকায়। আত্মসমর্পণ অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন জেনারেল অরোরা। যদিও থাকার কথা ছিল ভারতীয় সেনাপ্রধান জেনারেল মানেকশের। ওসমানী ছিলেন বাংলাদেশের প্রধান সেনাপতি। তবে জেনারেল ওসমানী আগে কোনও এক সময় বক্তব্যে বলেছিলেন, ‘ভারতীয় সেনাপ্রধান যদি আত্মসমর্পণ অনুষ্ঠানে উপস্থিত না থাকেন, তাহলে বাংলাদেশের উপসেনা প্রধান থাকবেন।’ কারণ, এটা প্রটোকলের প্রশ্ন। আত্মসমর্পণ অনুষ্ঠানে একে খন্দকার উপস্থিত ছিলেন। আমিও ছিলাম। তারা যখন আত্মসমর্পণ দলিলে স্বাক্ষর করেন, তখন আমি টেবিলের সামনে দাঁড়ানো ছিলাম।’

কে এম শফিউল্লাহ বলেন, ‘এছাড়া, সেদিন জেনারেল ওসমানী সিলেট সীমান্তের দিকে যাচ্ছিলেন। তাকে বহনকারী হেলিকপ্টার শক্রপক্ষের গুলিতে বিধ্বস্ত হয়। ওই ঘটনায় লেফটেন্যান্ট কর্নেল আব্দুর রব সাহেব গুলিবিদ্ধ হন।' গ্রুপ ক্যাপ্টেন এ কে খন্দকার তাঁর '১৯৭১: ভেতরে-বাইরে 'বইয়ের  ২০৭ পৃষ্ঠায় উল্লেখ করেন, ' জেনারেল ওসমানী একটা পর্যায়ে এসে ‘নিষ্ক্রিয় থাকতেন এবং কোনো বিষয়ে কোনো উৎসাহ দেখাতেন না’।

ভারতীয় মেজর জেনারেল জে. আর. এফ জ্যাকব পাকিস্তানি বাহিনীকে আত্মসমর্পণে রাজি করানো এবং এ সংক্রান্ত আনুষ্ঠানিকতার আয়োজন ও তদারকির দায়িত্বে ছিলেন। তিনি তার লেখা 'সারেন্ডার অ্যাট ঢাকা: বার্থ অব এ ন্যাশন' বইতে লিখেছেন : "দুর্ভাগ্যবশত ওসমানী এই অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকতে পারেননি। তাঁর জন্য পাঠানো হেলিকপ্টার পথিমধ্যে শত্রুর গুলির আঘাতে ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং সময় মতো সেটা মেরামত করে তোলা সম্ভব হয়নি। তাঁর অনুপস্থিতির ভুল ব্যাখ্যা করা হয়। পরবর্তীতে তা অনেক সমস্যার জন্ম দেয়।’

মুক্তিযুদ্ধকালীন বাংলাদেশ সরকারের অধীনে মুক্তিবাহিনীর সদরদফতরে তৎকালীন প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের জনসংযোগ কর্মকর্তার দায়িত্বে ছিলেন নজরুল ইসলাম।  মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে পরবর্তীতে ‘একাত্তরের রণাঙ্গন অকথিত কিছু কথা’ নামে একটি বই লিখেছেন তিনি। অনুপম প্রকাশনী থেকে প্রকাশিত এই বইয়ে পাকিস্তানি বাহিনীর আত্মসমর্পণ অনুষ্ঠানে কেন এমএজি ওসমানী ছিলেন না, সে বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য তুলে ধরা হয়েছে। বইটির ২৪১ পৃষ্ঠায় নজরুল ইসলাম লিখেছেন, ‘পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর আত্মসমর্পণ পর্ব শেষ হওয়ার দুদিন পর জেনারেল ওসমানী বিক্ষুব্ধ-উত্তপ্ত মুজিবনগর সরকারের সদর দফতরে ফিরে আসেন। ঢাকায় পাকিস্তানি সৈন্যদের আত্মসমর্পণ অনুষ্ঠানে তার অনুপস্থিতিকে কেন্দ্র করে এক অনাকাঙ্ক্ষিত ক্ষোভ ও বিভ্রান্তির সৃষ্টির হয়, যা মুজিবনগর সরকারের জন্য অস্বস্তির কারণ হয়ে উঠেছিল। পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর আত্মসমর্পণের এই অতি গুরুত্বপূর্ণ সময়ে মুজিবনগরে জেনারেল ওসমানীর  অনুপস্থিতিতে স্বাধীন বাংলা সরকারের নেতারাও তার ওপরে কিছুটা ক্ষুব্ধ হয়েছিলেন। স্বাধীন বাংলা সরকারের সদর দফতরে পা রেখে জেনারেল ওসমানী উত্তাপ কিছুটা টের পেয়েছিলেন।’

‘... জেনারেল ওসমানীর এডিসি সবিস্তারে জেনারেল সাহেবের অনুপস্থিতিতে তাকে ঘিরে কে কী মন্তব্য করেছেন, সব কথা তাকে রিপোর্ট করেন। পরিস্থিতি সম্পর্কে আরও অবহিত হওয়ার জন্য জেনারেল সাহেব আমাকে তার কক্ষে ডাকেন। খুব ধীরস্থির হয়ে বসে জেনারেল ওসমানীকে জানালাম, পাকিস্তান সেনাবাহিনীর আত্মসমর্পণ অনুষ্ঠানে আপনার অনুপস্থিতি নিয়ে এখানে রাজনৈতিক মহলে বিরূপ সমালোচনা হয়েছে।’

নজরুল ইসলাম আরও লিখেছেন, ‘জেনারেল ওসমানী কিছুটা কর্কশ কণ্ঠে বললেন, ‘দেখুন, আমরা স্বাধীনতা অর্জন করতে যাচ্ছি। কিন্তু দুঃখ হলো স্বাধীন জাতি হিসেবে আমাদের মধ্যে আত্মমর্যাদাবোধ সম্পর্কে কোনও চেতনা এখনও জন্ম হয়নি।আমাকে নিয়ে রিউমার ছড়ানোর সুযোগটা কোথায়? কোন সুযোগ নেই। তার অনেক কারণ রয়েছে। নাম্বার ওয়ান- পাকিস্তানি সেনাবাহিনী কবে আত্মসমর্পণ করবে, আমি জানতাম না। আমি কলকাতা ছেড়ে চলে যাওয়ার পর তাদের আত্মসমর্পণের প্রস্তাব এসেছে।’

জেনারেল ওসমানী বলেন, ‘নাম্বার টু- ঢাকায় আত্মসমর্পণ অনুষ্ঠানে আমার যাওয়ার প্রশ্নই ওঠে না। কারণ, এই সশস্ত্র যুদ্ধ ভারত-বাংলাদেশের যৌথ কমান্ডের অধীনে হলেও যুদ্ধের অপারেটিং পার্টের পুরো কমান্ডে ছিলেন ভারতীয় সেনাপ্রধান লেফটেন্যান্ট জেনারেল শ্যাম মানেকশ। আমি আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত কোনও নিয়মিত সেনাবাহিনীর সেনাপ্রধানও নই। আন্তর্জাতিক রীতিনীতি অনুযায়ী, পাকিস্তান সেনাবাহিনী আমার কাছে আত্মসমর্পণ করতে পারে না। কারণ, বাংলাদেশ জেনেভা কনভেনশনে স্বাক্ষরকারী কোন দেশ নয়। আত্মসমর্পণ অনুষ্ঠানে জেনারেল মানেকশকে রিপ্রেজেন্ট করেন লেফটেন্যান্ট জেনারেল অরোরা। জেনারেল মানেকশ গেলে তার সঙ্গে আমার যাওয়ার প্রশ্ন উঠতো। সার্বভৌম সমতার ভিত্তিতে আমার অবস্থান জেনারেল মানেকশের সমান। সেখানে জেনারেল মানেকশের অধীনস্থ আঞ্চলিক বাহিনীর প্রধান জেনারেল অরোরার সফরসঙ্গী আমি হতে পারি না। এটা দেমাগের কথা নয়, এটা প্রটোকলের ব্যাপার।’

ওসমানী বলেন, ‘আমি দুঃখিত, আমাকে অবমূল্যায়ন করা হয়েছে। আমাদের মধ্যে আত্মমর্যাদাবোধের বড় অভাব। ঢাকায় ভারতীয় বাহিনী আমার কমান্ডে নয়। জেনারেল মানেকশের পক্ষে জেনারেল অরোরার কমান্ডের অধীনে ঢাকায় ভারতীয় সেনাবাহিনী। পাকিস্তানি সেনাবাহিনী আত্মসমর্পণ করবে যৌথ কমান্ডের অধীনে ভারতীয় বাহিনীর কাছে। আমি সেখানে (ঢাকায়) যাবো কি জেনারেল অরোরার পাশে দাঁড়িয়ে তামাশা দেখার জন্য? হাও ক্যান আই?’
বইয়ের বর্ণনা অনুযায়ী, ওসমানী তখন নজরুল ইসলামকে বলেন, ‘আত্মসমর্পণের দলিলে স্বাক্ষর করবেন জেনারেল মানেকশের পক্ষে জেনারেল জগজিৎ সিং অরোরা আর পাকিস্তানী বাহিনীর পক্ষে জেনারেল নিয়াজী। সেখানে আমার ভূমিকা কী? খামোখা আমাকে নিয়ে টানা-হ্যাঁচড়া করা হচ্ছে।’

জেনারেল ওসমানী বলেন, ‘প্রটোকল সম্পর্কে আমাদের লোকদের কোনও ধারণা নেই, তাই এত ভুল বোঝাবুঝি সৃষ্টি। লোকজনকে বুঝিয়ে বলুন।’ একইসঙ্গে মুক্তিবাহিনীর পরিবর্তে কেন পাকিস্তানি সেনাবাহিনী মিত্রবাহিনীর কাছে আত্মসমর্পণ করেছে,সে বিষয়টিও উঠে এসেছে এই বইটিতে। বইয়ের ২৪৪ পৃষ্ঠায় লেখক নজরুল ইসলাম জানান, ‘জেনারেল ওসমানীকে জানিয়েছিলাম যে, পাকিস্তানি বাহিনী মুক্তিবাহিনীর পরিবর্তে ভারতীয় সেনাবাহিনীর কাছে কেন আত্মসমর্পণ করেছে, তা নিয়েও প্রশ্ন ও বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। এ সময় সিলেটের আওয়ামী লীগ নেতা দেওয়ান ফরিদ গাজী জেনারেল সাহেবের ঘরে গিয়ে ঢুকলেন। দেওয়ান গাজী আমার (নজরুল ইসলাম) কথা শুনতে পেয়ে বললেন, পিআরও (নজরুল ইসলাম) সাহেব ঠিকই কইছুন। মানুষ চায় পাকিস্তানি সৈন্যরা মুক্তিবাহিনীর কাছে আত্মসমর্পণ করুক।’

জেনারেল ওসমানী দেওয়ান গাজীর ওপর তির্যক দৃষ্টি নিক্ষেপ করে বলেন, ‘তোমরা লোকজনকে অন্ধকারে রেখেছো। দুনিয়ার রীতিনীতি সম্পর্কে মানুষকে কিছু জানতে দাও।’ ওসমানী বলেন, ‘যুদ্ধ-বিগ্রহ, জয়-পরাজয়, আত্মসমর্পণ সম্পর্কে জেনেভা কনভেনশনের আন্তর্জাতিক নীতিমালা আছে। জেনেভা কনভেনশনে স্বাক্ষরকারী দেশগুলো যুদ্ধ-বিগ্রহ, জয়-পরাজয়, আত্মসমর্পণ  ইত্যাদির ব্যাপারে এ নীতিমালা মানতে বাধ্য। আমরা মানে বাংলাদেশ জেনেভা কনভেনশনে স্বাক্ষরকারী দেশ নই। এই কনভেনশনের স্বাক্ষরকারী দেশ হিসেবে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী আমাদের কাছে আত্মসমর্পণ করতে রাজি হবে না। কারণ, তাদের (পাক বাহিনী) ধারণা, আমাদের কাছে আত্মসমর্পণ করলে আমরা তাদের সঙ্গে জেনেভা কনভেনশনে  বর্ণিত নীতিমালা অনুযায়ী আচরণ করবো না। যেহেতু আমরা জেনেভা কনভেনশনের আওতায় পড়ি না, তাই জেনেভা কনভেনশনের নীতিমালা মানতে আমরা বাধ্যও নই। আমাদের মুক্তিযোদ্ধারা তাদের হত্যা করে ফেলবে। কিন্তু জেনেভা কনভেনশন অনুযায়ী পরাজিত আত্মসমর্পণকারী সৈন্যদের হত্যা করা বা কোনও রূপ নির্যাতন করা যায় না। তাদের নিরাপত্তায় আইনি প্রটেকশন দিতে হয়। সামরিক রীতিনীতি অনুযায়ী তাদের সঙ্গে আচরণ করতে হয়। উন্নত খাবার, নানান সুযোগ-সুবিধা দিতে হয়। বন্দিকালীন নিরস্ত্র অবস্থায় এক্সারসাইজ, খেলাধুলা ইত্যাদির সুযোগ-সুবিধা দিতে হয়। কিন্তু আমরা তো এখনও ভারতের মাটিতেই রয়ে গেছি। বাংলাদেশই তো আমাদের নিয়ন্ত্রণে নেই। আমাদের সিভিল অ্যাডমিনিস্ট্রেশন প্রতিষ্ঠিত হয়নি। কোনও নিয়মিত সুশৃঙ্খল সেনাবাহিনী নেই। এমনকি পুলিশ বাহিনীও নেই। এ অবস্থায় ৯০ হাজার পাকিস্তানি সৈন্য আমাদের কাছে আত্মসমর্পণ করলে, আমরা তাদের রাখবো কোথায়? তাদের প্রটেকশন দেবো কিভাবে? ৯০ হাজার  সৈন্যকে তিন বেলা উন্নত খাবার দেবো কোথা থেকে। দেশে গিয়ে তো আমরাই খাবার পাবো না।’

একই বইয়েই উল্লেখ রয়েছে, ‘স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের জন্য ওসমানী একটি ভাষণ লিখেছিলেন ইংরেজিতে। যার অনুবাদে কমান্ডার ইন চীফের বাংলা মুক্তিবাহিনীর প্রধান সেনাপতি করা হয়েছে দেখে খেপে যান তিনি। নির্দেশ দেন সর্বাধিনায়ক লিখতে। বিব্রত নজরুল তথ্য মন্ত্রণালয়ে গেলে ভারপ্রাপ্ত সদস্য আব্দুল মান্নান প্রধান সেনাপতি লিখতে বলেন। ক্ষুব্ধ ওসমানী এরপর স্বাধীন বাংলা বেতারে কোনো ভাষণ দেননি গোটা মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে। প্রসঙ্গত মুজিব নগরে বাংলাদেশ সরকারের স্বাধীনতা ঘোষণায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমানকে মুক্তিযুদ্ধের সর্বাধিনায়কের পদ দেওয়া হয়। ওসমানী ছিলেন মুক্তিবাহিনীর সর্বাধিনায়ক।’

নজরুল ইসলামের এই বর্ণনার মিল পাওয়া যায় ওসমানীকে নিয়ে লেখা অন্য অনেক প্রবন্ধ - নিবন্ধেও।

এম আর আক্তার মুকুল তার 'আমি বিজয় দেখেছি' বইতে লিখেছিলেন,'১৯৭১ সালের ১৬ই ডিসেম্বর দুপুর প্রায় বারো'টা নাগাদ কলকাতাস্থ থিয়েটার রোডে মুজিবনগর সরকারের অস্থায়ী সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদের কাছে খবর এসে পৌঁছালো, ঢাকায় হানাদার বাহিনী আত্মসমর্পণ করতে সম্মত হয়েছে। আজ বিকেলেই ঢাকায় আনুষ্ঠানিকভাবে আত্মসমর্পণ হবে। মুজিবনগর সরকারের পক্ষ থেকে এই অনুষ্ঠানে প্রতিনিধিত্ব করার জন্য উচ্চপদস্থ কাউকে উপস্থিত থাকতে হবে। প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীনকে তখন কিছুটা চিন্তিত দেখাচ্ছিল। প্রধানমন্ত্রী জেনারেল ওসমানীকে দেখে আনন্দে এক রকম চিৎকার করে উঠলেন, সি-ইন-সি সাহেব ঢাকায় সর্বশেষ খবর শুনেছেন বোধহয়? এখনতো আত্মসমর্পণের তোড়জোড় চলছে! প্রধানমন্ত্রী বাকী কথাগুলো শেষ করতে পারলেন না। ওসমানী তাকে করিডোরের আর এক কোণায় একান্তে নিয়ে গেলেন। দুজনের মধ্যে মিনিট কয়েক কি কথাবার্তা হলো, আমরা তা শুনতে পেলাম না। ওসমানী সাহেবের শেষ কথাটুকু আমরা শুনতে পেলাম- "নো নো প্রাইম মিনিস্টার, মাই লাইফ ইজ ভেরি প্রেশাস, আই কান্ট গো।’

জেনারেল ওসমানী তাঁর সাক্ষাতকারে আরো বলেছিলেন:

‘ঐ দিন ও এর আগের দিন আমি ময়নামতির রণাঙ্গনে ছিলাম এবং ১৬ই ডিসেম্বর দুপুরে লে. জেনারেল স্বাগত সিংয়ের সাথে মধ্যাহ্ন ভোজন করি। ১৬ই ডিসেম্বর দুপুরের পর তদানীন্তন লে. কর্নেল শফিউল্লাহর অধিনায়কত্বে ‘এস’ ফোর্স রণাঙ্গন পরিদর্শন করার জন্য আমার যাওয়ার কথা ছিল। জেনারেল স্বাগত সিং সেদিন না যেতে অনুরোধ করেন। তিনি বলেন, যে ‘এস’ ফোর্স পরিদর্শনে অসুবিধা হতে পারে, যেহেতু তারা অগ্রসর হচ্ছেন। আমি তখন আমার সফরসূচি পরিবর্তন করে সিলেট ‘জেড’ ফোর্স পরিদর্শনে যাবার সিদ্ধান্ত নেই।’

১৬ ডিসেম্বর ওসমানী হেলিকপ্টার যোগে রওয়ানা দেন এবং তার হেলিকপ্টারে গুলি করা হয়। জীবনের সেই বিশেষ ঘটনার স্মৃতি তুলে ধরতে গিয়ে জেনারেল ওসমানী বলেন- ' ' বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর দু'টি ছোট হেলিকপ্টার আগরতলা বিমানঘাঁটিতে পৌঁছালে বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর স্কোয়াড্রন লিডার সুলতান মাহমুদ জানান যে, আমাদের ছোট দুটি হেলিকপ্টারের পরিবর্তে তিনি ভারতীয় বিমানবাহিনীর একটি বড় রুশী হেলিকপ্টার বন্দোবস্ত করেছেন। বিমানঘাঁটিতে হঠাৎ করে কয়েকজন বিদেশি সাংবাদিক আমাকে ঘিরে ধরলে সময় নষ্ট হয়। তারপর সমবেত বৈমানিকদের নিকট থেকে বিদায় নেবার জন্য সুলতান কিছু সময় নষ্ট করে ফেললেন। কেন যেন কী মনে হলো, তাই সুলতানকে বললাম, 'আমাদেরকে রেখে এই হেলিকপ্টার যদি সময় মতো না ফেরে তবে খবর নিও। প্রয়োজন হলে নিজে হেলিকপ্টার নিয়ে এসো।’

জেনারেল ওসমানী তাঁর বিবরণে বলেন: হেলিকপ্টারে উঠতে বিকেল ৪টার ঊর্ধ্বে হয়ে যায়। হেলিকপ্টারের পেছনের 'রাম্প' খোলা ছিল। হেলিকপ্টারে ভারতীয় বিমানবাহিনীর দু'জন তরুণ অফিসার, একজন পাইলট এবং আরও একজন সহ-পাইলট, তৎসহ কেরালার অধিবাসী একজন ওয়ারেন্ট অফিসার ছিলেন। পাইলটদের বললাম যে, সিলেট বিমানঘাঁটিতে যাব না, মাইন বা বাধা থাকতে পারে। আমরা যাব মেজর (পরে লে. কর্নেল) জিয়াউদ্দিন, বীরউত্তম-এর অধীনে ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের ১ম ব্যাটালিয়নের হেডকোয়ার্টারে।  আমার জানা মতে, তাঁর হেডকোয়ার্টার সিলেট ‘কেটল ফার্মের’ সন্নিকটে। এর কাছেই কলেজের হোস্টেল, সামনে বিরাট খেলার মাঠ, হেলিকপ্টার নামার উপযোগী।

পাইলটকে বললাম, ‘সিলেট শহরের নিকটে সুরমা নদীর কাছে পৌঁছলে আমাকে ডাকবে, আমি তোমাকে গাইড করবো। ছেলেটি চলে গেল তার ‘ককপিটে’। আমার সঙ্গে ছিলেন মুক্তিবাহিনীর ‘চিফ-অফ-স্টাফ’ রূপে আমার সহকারী ও মুক্তিযুদ্ধের উপ-সর্বাধিনায়ক লে. কর্নেল (পরে মেজর জেনারেল) এম.এ.রব বীরউত্তম, ভারতীয় কমান্ডের ‘লিয়াজোঁ অফিসার’ ব্রিগেডিয়ার উজ্জ্বল গুপ্ত, ডা. জাফরউল্লাহ চৌধুরী, সাময়িকভাবে আমার গণসংযোগ অফিসার মোস্তফা আল্লামা এবং আমার এডিসি সেকেন্ড লে. শেখ কামাল।’

‘হেলিকপ্টার তিন সাড়ে তিন হাজার ফুট উপর দিয়ে শান্তভাবে চলছে। আমি দাঁড়িয়ে আমার চীফ-অফ-স্টাফ কর্নেল রবের সঙ্গে কথা বলছি, তিনি আমার নিকট বসা। হঠাৎ একটা মৃদু বিস্ফোরণের শব্দে সকলেই চমকে উঠলাম। মশার মতো আমার কানের ধার দিয়ে কয়েকটি গুলি গেল। সাথে সাথে হেলিকপ্টারটা উভয় পাশে গড়ান দিল। খোলা রাম্প দিয়ে যেন পড়েই গিয়েছিলাম বলে মনে হলো। কর্নেল রব গুলিবিদ্ধ হয়ে মেঝেতে পড়ে যান। আমি ছাড়া মনে হলো অন্যরা সকলেই আহত। ডাক্তার জাফরউল্লাহ তৎক্ষণাৎ মেঝেতে পড়া কর্নেল রবের পাশে বসে তাঁকে দেখছেন, বেশ রক্তপাত হচ্ছে। আমার ধ্যান তেলের ট্যাঙ্কের দিকে, দু'টি ছিদ্র দিয়ে তেল বয়ে পড়ছে। নির্বোধের মত হাত দিয়ে থামাতে গিয়ে আমার হাতে ফোসকা পড়ল। তখন প্রবাসী বাঙ্গালীদের প্রেরিত আমার বৃষ্টি ও বাতাস হতে রক্ষাকারী জ্যাকেট দিয়ে তেলপ্রবাহ থামাবার আপ্রাণ চেষ্টা করি। এদিকে ওয়ারেন্ট অফিসার যন্ত্রপাতি চেক করছেন। ডা. জাফরউল্লাহ হাত দিয়ে দেখলেন কর্নেল রব নাড়িহীন। তবুও তিনি তাঁর বুকে কি যেন করছিলেন।’

‘হেলিকপ্টার গতি পরিবর্তন করে যেন ঘুরছে। সন্ধ্যার অন্ধকার নেমে এসেছে। কিছুক্ষণেই তেলপ্রবাহ বন্ধ হয়ে গেল এবং সকলেই আমার দিকে তাকাচ্ছেন। তারা যেন আমার মনোবল কী বা কতটুকু তা মাপছেন। এড়াবার জন্য পাইলটের ‘ককপিটে’ গিয়ে বললাম— ‘Son our number seems to up.’ তরুণ পাইলট গেজ-এর দিকে তাকিয়ে বললো: ‘শেষ হয়েছে’। আমি তার কাঁধে হাত দিয়ে বললাম: ‘Don’t worry, take it easy, it has to come for every one. Why did you go into a swing?’ ঘাবড়িয়োনা, সকলকেই একদিন যেতে হবে। তুমি হেলিকপ্টারকে গড়িয়েছিলে কেন?)। সহ-পাইলট বললো: ‘There is something in the air, Sir.’ (আকাশে কি যেন ছিল, স্যার)। আমি তখন বেশ চিন্তিত। বললাম: ‘See if you come get down anywhere.’ (দেখে একটি জায়গায় নেমে যাও)। তখনো আমার হাতটা ছেলেটার ঘাড়ে, জানিনা এতে সে স্বস্তিবোধ করছিল কি না।’

‘আমরা ঘুরে ঘুরে নামারই চিন্তা করছিলাম, এমন সময় একটা উজ্জ্বল নগরী যেন কোথা হতে নিচে ভেসে উঠলো। হঠাৎ মাথায় ঢুকলো না, এটা কোন জায়গা। শুধুই চিন্তা, কোন সময় হেলিকপ্টারের ইঞ্জিন বন্ধ হবে বা আগুন লেগে খাড়াভাবে ভ‚মিতে পড়ে একটা বিস্ফোরণ হবে। অন্ধকারে পাইলট নামার চেষ্টা করলে আমি একবার বিরাট জলাশয় ও একবার বিরাট পাহাড় দেখে উপরে উঠে যেতে বললাম। হঠাৎ মনে হলো ‘Landing light’ এর কথা। বলতেই পাইলট সেটা জ্বালালো এবং আমরা একটা ধানশূন্য খেতের উপর নিজেদের পেয়ে বললাম- এখানেই নামো।’

‘পাইলট অতি স্থির ও শান্তভাবে হেলিকপ্টার নামালো। নামার সাথে সাথে আপনা আপনি পাখা বন্ধ হয়ে গেল। আমরা জানি না কোথায়, আমি প্রথমে লাফ দিয়ে নামি, কোথায় এলাম দেখতে। নেমে দেখি ফেঞ্চুগঞ্জ ব্রিজের সন্নিকটে, লোকজন এসে ভিড় করলে তাদের একটি চৌকি আনতে বলি। ইতিমধ্যে, ডাক্তার জাফরউল্লাহ কর্নেল রবকে নামালেন এবং বললেন: ‘Sir. His pulse is back’. তাঁর কথায় কিছুটা আশ্বস্ত হয়ে মহান সৃষ্টিকর্তাকে ধন্যবাদ জানালাম।’

জেনারেল ওসমানী সামরিক ব্যক্তিত্ব হলেও ১৯৭০ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের মনোনয়নে পাকিস্তান জাতীয় পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন। মুজিবনগর সরকার তাকে মন্ত্রীর মর্যাদায় মুক্তিবাহিনীর প্রধান করেছিল। আওয়ামী লীগের তৎকালীন সাধারণ সম্পাদক, প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ ১১ এপ্রিল (১৯৭১) স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রে ভাষণ দেন।  ঐ ভাষণে তিনি বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর অবকাঠামো গঠনের কথা উল্লেখ করে এম এ জি ওসমানীকে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর প্রধান সেনাপতি হিসেবে ঘোষণা দেন। 

স্বাধীনতার পর জেনারেল ওসমানী  বঙ্গবন্ধু সরকারের মন্ত্রী থাকাকালে তাঁর ব্যক্তিগত সহকারী (এপিএস) ছিলেন শাহনূর চৌধুরী। তিনি দেশদর্পনকে বলেন, ' জেনারেল ওসমানী প্রখর ব্যক্তিত্ব সম্পন্ন ও ন্যায়- নীতির মানুষ ছিলেন। পদমর্যাদার কারণে তিনি ১৯৭১ সালে পাকিস্তানী বাহিনীর আত্মসমর্পণ অনুষ্ঠানে তিনি অনুপস্থিত ছিলেন বলে তার ধারণা। এখানে কোনো রাজনৈতিক প্রতিহিংসার ব্যাপার ছিল না।’

শাহনূর চৌধুরী জানান, ' ১৯৭৩ সালের বাংলাদেশের  প্রথম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তিনি আওয়ামী লীগের প্রার্থী হিসেবে তৎকালীন সিলেট-৬ আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন। পরে বঙ্গবন্ধু সরকারে ডাক, তার, টেলিযোগাযোগ, অভ্যন্তরীণ নৌ যোগাযোগ, জাহাজ ও বিমান মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। পরবর্তীতে একদলীয় সরকার ব্যবস্থা প্রবর্তনের বিরোধিতা করে তিনি সংসদ সদস্য, মন্ত্রিত্ব এবং আওয়ামী লীগ থেকে পদত্যাগ করেন।'

তিনি বলেন, ' ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের নৃশংস ঘটনার পর দেশের স্বার্থে তিনি খন্দকার মোস্তাক সরকারকে সহযোগিতা করলেও বঙ্গবন্ধুর প্রতি ছিলেন সবসময়ই শ্রদ্ধাশীল। পরে আওয়ামী লীগের চরম দুঃসময়ে ১৯৭৮ সালে তিনি গণ ঐক্য জোটের প্রার্থী হিসেবে জিয়াউর রহমানের সঙ্গে নৌকা প্রতীক নিয়ে রাষ্ট্রপতি পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে আওয়ামী লীগকে ভোটের রাজনীতিতে ফিরিয়ে আনেন।'

ভারতীয় সেনাবাহিনী  বা মুজিবনগর সরকারের কারো ষড়যন্ত্রে জেনারেল ওসমানী ১৯৭১ সালে পাক বাহিনীর আত্মসমর্পণ অনুষ্ঠানে অনুপস্থিত ছিলেন কিনা এ বিষয়ে জানতে চাইলে শাহনূর চৌধুরী বলেন, ' এ বিষয়ে তাঁকে কখনো কিছু বলতে শুনিনি। তাজউদ্দীন সাহেবসহ মুজিবনগর সরকারে দায়িত্ব পালনকারী সকলের সঙ্গে তাঁর চমৎকার সম্পর্ক দেখেছি। সকলেই তাঁকে সম্মান করতেন। নীতিগত কারণে তিনি আওয়ামী লীগ ও মন্ত্রিত্ব ছাড়লেও মুক্তিযুদ্ধকে বিতর্কিত করার সকল অপচেষ্টার তিনি তীব্র প্রতিবাদ করতেন।'

স্বাধীনতার পর ১৯৭১ সালের ২৬ ডিসেম্বর তিনি (ওসমানী) বাংলাদেশ সশস্ত্রবাহিনীর জেনারেল পদে উন্নীত হন এবং তাঁর এ পদোন্নতি ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর থেকে কার্যকর হয়। ১৯৭২ সালের ৭ এপ্রিল তিনি সামরিক বাহিনী থেকে অবসর গ্রহণ করেন।

লেখক: সাংবাদিক 

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত